সাবাহ’র নিবন্ধ: বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক নিয়ে নতুন ভাবনা by আসিফ বিন আলী
আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক ইতিহাস শুরু হয় ১৯৭১ পরবর্তী সময়ে, মুসলিম বিশ্বে স্বীকৃতি ও অবস্থান নির্ধারণের রাজনীতির ভেতর দিয়ে। ১৯৭৪ সালে পাকিস্তানের লাহোরে অনুষ্ঠিত ইসলামি সহযোগিতা সংস্থা (ওআইসি) সম্মেলনে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয় তুরস্ক। ১৯৭৬ সালে ঢাকায় তুরস্ক দূতাবাস খোলে। আর বাংলাদেশ ১৯৮১ সালে আঙ্কারায় মিশন স্থাপন করে। এসব পদক্ষেপ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় যাত্রাপথের প্রাথমিক পর্যায়েই বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ককে প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেয়। পথটি অবশ্য সবসময় মসৃণ ছিল না। কিছু অস্বস্তিকর মুহূর্তও এসেছে। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল ঘিরে রাজনৈতিক ও আইনি প্রশ্ন দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কে প্রতিধ্বনি তোলে। তবে ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা সংকটের পর সম্পর্কটি নতুন ধরনের গভীরতা পায়। তুরস্ক কেবল বিবৃতি দেয়নি; স্বাগতিক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক চাপ লাঘবে মানবিক সহায়তাও বাড়িয়েছে।
ভবিষ্যৎ কোন পথে
এই সম্পর্কের ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য আন্তর্জাতিক সম্পর্ক তত্ত্বের একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি কাজে লাগানো যায়। বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি নিরাপত্তা ও ভৌগোলিক বাস্তবতায় নজর দেয়। বাংলাদেশ বঙ্গোপসাগরের এক সংবেদনশীল অংশে অবস্থান করছে। সেখানে প্রভাব বিস্তারে বড় শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা চলছে এবং প্রতিবেশী মিয়ানমার গৃহযুদ্ধে লিপ্ত। এমন পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব বাংলাদেশের জন্য বিলাসিতা নয়; এটি এক ধরনের বীমা। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ প্রতিরক্ষা সরঞ্জামের জন্য অল্প কয়েকটি দেশের ওপর নির্ভরশীল থেকেছে, যা খুচরা যন্ত্রাংশ, প্রশিক্ষণ ও রাজনৈতিক চাপের মতো ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি করেছে। ঢাকা ও আঙ্কারা যদি দূরদর্শী হয়, তবে প্রতিরক্ষা কেনাকাটার হুড়োহুড়ি না বানিয়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প হিসেবে দেখবে।
উদারবাদী ও প্রাতিষ্ঠানিক দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের দৃষ্টি টানে বাজার, নীতি ও অভিন্ন অর্থনৈতিক স্বার্থের দিকে। বাংলাদেশ ও তুরস্কের মধ্যে বাণিজ্য বেড়ে ২০২৪ সালে ১ বিলিয়ন ডলার (৪১ বিলিয়ন তুর্কি লিরা) ছাড়িয়েছে। সম্ভাবনার তুলনায় এ সংখ্যা এখনো মোটামুটি মানের। এটি সাফল্যের গল্পের চেয়ে শুরু বিন্দু বলাই ভালো। বাংলাদেশের রয়েছে তরুণ শ্রমশক্তি এবং দক্ষিণ এশিয়া ও তার বাইরের গুরুত্বপূর্ণ বাজারের কাছাকাছি অবস্থান। তুরস্কের আছে উৎপাদন, মধ্যম-স্তরের প্রযুক্তি ও বৈশ্বিক বাজারে সক্রিয় কোম্পানির নেটওয়ার্কে অভিজ্ঞতা। এই শক্তিগুলো ঠিকভাবে মেলাতে পারলে অংশীদারিত্বটি সাধারণ ক্রয়-বিক্রয়ের বাইরে গিয়ে সহউৎপাদনের স্তরে উঠতে পারে।
আরেকটি ক্ষেত্র আছে, যেখানে দুই দেশই ভারী মূল্য দিয়েছে এবং তাই জোরালো কণ্ঠস্বর অর্জন করেছে- শরণার্থী ও বাস্তুচ্যুত মানুষের রাজনীতি। তুরস্ক বহু বছর ধরে লক্ষ লক্ষ সিরীয়কে আশ্রয় দিয়েছে। বাংলাদেশ সীমিত আন্তর্জাতিক সহায়তার মধ্যেই রোহিঙ্গা সংকটের বোঝা বহন করছে। এই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশ ও তুরস্ককে দায়িত্ব ভাগাভাগি নিয়ে কথা বলার নৈতিক ভিত্তি দেয় এবং জাতিসংঘ ও ওআইসিতে বক্তৃতার বাইরে বাস্তবসম্মত সমাধানের জন্য সমন্বয়ের সুযোগ তৈরি করে।
গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি মনে করিয়ে দেয়- রাষ্ট্র কেবল স্বার্থের যোগফল নয়; রাষ্ট্র হলো সমাজ। তাই কেবল লাভ-ক্ষতির হিসাবের বাইরে তাকাতে হবে। বাংলাদেশ ও তুরস্ক দুই দেশেরই জনজীবনে ইসলামের ভূমিকা আছে, যা একে অপরের ইতিহাস ও রাজনীতিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। বৃহত্তর উম্মাহর অন্তর্ভুক্তির ধারণা আবেগী গুরুত্ব বহন করে। বাংলায় ডাব করা তুর্কি ধারাবাহিক এখন বহু বাংলাদেশির নিয়মিত বিনোদন। ঢাকার তরুণরা তুর্কি খাবারে আগ্রহী। বৃত্তি নিয়ে বাংলাদেশি শিক্ষার্থীরা তুরস্কের বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান, বন্ধুত্ব গড়ে তোলেন; কেউ কেউ একাডেমিক বা পেশাগত ভূমিকায় সেখানেই থেকে যান। বাইরে থেকে এগুলো ছোট মনে হলেও, এগুলো মানুষে-মানুষে এমন এক সেতু গড়ে তোলে, যা কূটনৈতিক স্লোগানের চেয়ে ভাঙা কঠিন। রাজনৈতিক হাওয়া বদলালে- যা বদলাবেই- এই মানবিক বন্ধনগুলো সম্পর্ককে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে।
বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে- বাংলাদেশের রাজনীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু কণ্ঠ বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ককে যেন অন্য কারও বিপরীতে একটি পছন্দ হিসেবে উপস্থাপন করছে; যেন ঢাকাকে তুরস্ক ও ভারতের মধ্যে, কিংবা তুরস্ক ও চীনের মধ্যে বেছে নিতে হবে। শুনতে নাটকীয় হলেও এটি দুর্বল পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক চিন্তা। বাংলাদেশ একটি সার্বভৌম দেশ, যার ভিন্ন ভিন্ন কারণে ভিন্ন ভিন্ন অংশীদার প্রয়োজন। অবকাঠামো অর্থায়ন ও নির্মাণে চীন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে এবং দীর্ঘদিন ধরে প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহ করেছে। ভারত সেই প্রতিবেশী, যার সঙ্গে নদী, সীমান্ত, ট্রানজিট রুট এবং সীমান্তপারের জটিল সামাজিক বন্ধন রয়েছে। তুরস্ক বাংলাদেশের একটি উদীয়মান অংশীদার- প্রতিরক্ষা উৎপাদন, মানবিক কূটনীতি ও বাণিজ্যে যার ওজন বাড়ছে। এসব ভূমিকা পরস্পর বদলযোগ্য নয়। এগুলো তাকের ওপর রাখা প্রতিদ্বন্দ্বী ব্র্যান্ডও নয়। কোনো সম্পর্ককে কৃত্রিম দ্বৈততার মধ্যে ঠেলে দিলে বাংলাদেশের কৌশলগত স্বাধীনতা সংকুচিত হয়। বিকল্প বাড়ালে কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন বাড়ে; কোনো শিবিরে আনুগত্য প্রমাণ করতে সেতু ভাঙলে নয়।
বাংলাদেশ-তুরস্ক অংশীদারিত্বের স্থিতিশীলতার সবচেয়ে বড় হুমকি বাহ্যিক নয়- অভ্যন্তরীণ। বাংলাদেশের রাজনীতি নানা স্রোতে গঠিত- ইসলামপন্থী, বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদী, বাঙালি জাতীয়তাবাদী- প্রতিটির ইতিহাসপাঠ ও পররাষ্ট্রনীতি পছন্দ আলাদা। মতবৈচিত্র্য সমস্যা নয়। সমস্যা শুরু হয় যখন বিদেশি সম্পর্ককে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে আঘাত করার হাতিয়ার বানানো হয়। তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্ক যদি বাংলাদেশের এই অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক লড়াইয়ের আরেকটি অস্ত্র হয়ে ওঠে, তবে সম্পর্কটি প্রতিক্রিয়াশীল ও ভঙ্গুর হয়ে পড়বে। গঠনমূলক পথ হলো- সাধারণ মানুষের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর ওপর মনোযোগ রাখা। যেমন কর্মসংস্থান, শিক্ষা, নিরাপদ অভিবাসন, ন্যায্য বাণিজ্য, বিশ্বাসযোগ্য মানবিক উদ্যোগ এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রতিরক্ষা সহযোগিতা।
২০২৬ সালের নির্বাচন ও ঢাকায় রাজনৈতিক পরিবর্তনের সম্ভাবনার দিকে তাকালে, বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্কের মূল শব্দ হওয়া উচিত প্রাতিষ্ঠানিকীকরণ। সরকার আসে-যায়; রাষ্ট্র থাকে। উভয় পক্ষ যদি সত্যিকারের অংশীদারিত্ব চায়, তবে এমন অভ্যাস ও ব্যবস্থাপনা দরকার, যা কোনো নির্দিষ্ট সময়ের ক্ষমতাসীনদের ওপর নির্ভরশীল নয়। বাংলাদেশ ও তুরস্কের অংশীদারিত্বকে অর্থবহ করতে নাটকীয় গল্প বা অভিন্ন শত্রুর প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন একটি বাস্তববাদী দৃষ্টিভঙ্গি।
(তুরস্কের পত্রিকা ডেইলি সাবাহ থেকে অনুবাদ)

No comments