শক্তিধর নেতাদের বিদায়ে উত্থান যেসব নারীর

শক্তিধর অনেক নেতার পতন। নানা কারণে তাদের পতন হয়েছে। কেউ নারীর কাছ থেকে অনৈতিক সুবিধা নিতে গিয়ে পদ হারিয়েছেন। কেউ অন্যায় আচরণেরে কারণে পদ হারাতে বাধ্য হয়েছেন। তার বিপরীতে নারীরা ক্রমশ সামনে উঠে এসেছেন। তারা শক্তিশালী হয়েছেন। নিজেদের অধিকার, তাদের ওপর চালানো অত্যাচারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হচ্ছেন। আর তাতেই কুপোকাত হয়ে পড়ছেন শক্তিধর রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, মিডিয়া ব্যক্তিত্ব।

এই ধারার সর্বশেষ শিকারে পরিণত হয়েছেন নিউ ইয়র্কের বিদায়ী গভর্নর অ্যানড্রু কুমো। তার নাম যোগ হয়েছে ওইসব পুরুষের লম্বা তালিকায়, যারা ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় পদ ব্যবহার করে নারীদের ওপর যৌন নির্যাতন চালিয়েছেন। পরিণামে ক্ষমতা থেকে বিদায় নিতে হয়েছে। ২০১৭ সালে ব্যাপক তদন্ত হয়। মামলা ও যৌন অসদাচারণের কারণে যুক্তরাষ্ট্রেই কমপক্ষে ২০০ শক্তিধর মানুষ তাদের পদ হারিয়েছেন। নিউ ইয়র্ক টাইমসের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০১৮ সালের মধ্যভাগ পর্যন্ত এসব পদে উঠে এসেছেন নারীরা। ফরচুন পরিচালনা করছে এমন ৫০০ কোম্পানিতে নারীর সংখ্যা এ বছর দাঁড়িয়েছে ৪১। ফরচুন মিডিয়ার সর্বশেষ বার্ষিক তালিকায় এ কথা বলা হয়েছে। তবু উচ্চ পর্যায়ে ক্ষমতায় এখনও লিঙ্গগত বৈষম্য রয়ে গেছে। এ খবর দিয়েছে অনলাইন আল জাজিরা।

বিদায় কুমো, ইন ক্যাথি
কমপক্ষে ১১ জন নারীকে যৌন নির্যাতন করার অভিযোগে নিউ ইয়র্কের গভর্নর পদ ত্যাগ করেছেন অ্যানড্রু কুমো। তিনি অভিশংসনের মুখোমুখি এখনও। পদত্যাগ করার পর তার বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া চলবে কিনা তা পরিষ্কার জানা যায়নি। যদি অভিশংসিত করা হয়, তাহলে ভবিষ্যতে রাজ্যের কোনো সরকারি পদে দায়িত্ব পালনে অযোগ্য হবেন কুমো। এ ছাড়া যেসব নারীর বিরুদ্ধে নির্যাতন চালিয়েছেন তাদের পক্ষ থেকে মামলার মুখোমুখি হতে হচ্ছে তাকে।
অ্যানড্রু কুমো পদ থেকে সরে যাওয়ার পর এ পদে আসছেন বর্তমানে নিউ ইয়র্কের লেফটেন্যান্ট গভর্নর ক্যাথি হোচুল। কুমো দায়িত্ব থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে সরে যাবেন ২৪ শে আগস্ট। তারপর এ রাজ্যে সর্বোচ্চ পদে আসীন হবেন প্রথম একজন নারী- ক্যাথি হোচুল। তিনি একজন ডেমোক্রেট। ২০১৫ সাল থেকে তিনি লেফটেন্যান্ট গভর্নর হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এর আগে তিনি ফেডারেল কংগ্রেশনাল প্রতিনিধি ছিলেন। তার পূর্বসূরি ক্রিস লি পদত্যাগ করার পর তিনি বিশেষ নির্বাচনে এই কংগ্রেশনাল আসনে বিজয়ী হন। ক্রিস লির বিরুদ্ধে অভিযোগ বিবাহিত অবস্থায় তিনি নিজের শার্টহীন শরীরের ছবি পাঠিয়েছিলেন এক নারীর কাছে।

বিদায় ম্যাট লুয়ার, ইন হোদা কোতব
সাবেক ‘টুডে’ শোর সহ উপস্থাপক ম্যাট লুয়ার। কর্মক্ষেত্রে অনুপযুক্ত যৌন আচরণের অভিযোগে ২০১৭ সালের নভেম্বরে তাকে এ পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। তিনি এ পদ থেকে সরে যাওয়ার পর দায়িত্বে আসেন হোদা কোতব। তার সঙ্গে অনুষ্ঠানে সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন সাভানাহ গুথ্রি। হোদা কোতবের জনপ্রিয়তা ছিল অনেক বেশি। এ জন্য ২০১৮ সালে তাকে এ পদে স্থায়ীভাবে বসানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়।

বিদায় চার্লি রোজ, ইন আমানপোর
পিবিএস-এ চার্লি রোজ অনুষ্ঠানের উপস্থাপক ছিলেন এমি পুরস্কার বিজয়ী চার্লি রোজ। অনুপযুক্ত এবং অনাকাঙ্খিত শারীরিক সম্পর্ক সহ যৌন হয়রানির অভিযোগের প্রেক্ষিতে ২০১৭ সালে এই প্রোগ্রাম বাতিল করা হয়। পরে ওই শোয়ের স্থানে আনা হয় আমারনপোর অ্যান্ড কোম্পানিকে। ক্রিশ্চিয়ান আমানপোরের নেতৃত্বে এক ঘন্টার জনসম্পর্ক বিষয়ক শো এটি। বর্তমানে সিএনএনের আন্তর্জাতিক উপস্থাপনা বিষয়ক প্রধান আমানপোর। গর্ভাশয়ের ক্যান্সার ধরা পরার পর এ বছর গ্রীষ্মে আমানপোরের ওই অনুষ্ঠান স্থগিত করা হয়।

বিদায় রাজেক, ইন মার্থা
হিজড়া সম্প্রদায় এবং প্লাস-সাইজ মডেলদের নিয়ে মন্তব্যের কারণে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েন ভিক্টোরিয়া’স সিক্রেটের সাবেক প্রধান মার্কেটিং অফিসার এড রাজেক। এ কারণে ২০১৯ সালে পদত্যাগ করেন তিনি। পদত্যাগের পর তদন্ত শুরু হয়। তাতে দেখা যায়, অন্যায় আচরণ এবং মডেলদের অযাচিতভাবে স্পর্শ এবং আলিঙ্গন করেছেন তিনি। পরে তার পদে বসানো হয় মার্থা পিজ’কে। তিনি ভিএস কালেক্টিভ নামের একটি নতুন উদ্যোগের নেতৃত্ব দিয়েছেন। মডেলদের পরিবর্তে তাকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে প্রমীলা ফুটবল তারকা মেগান র‌্যাপিনোর মতো আইকনদের সঙ্গে।

বিদায় স্নেইডারম্যান, ইন লেতিতিয়া জেমস
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ ইয়র্কের সাবেক এটর্নি জেনারেল এরিক স্নেইডারম্যান। চারজন নারীকে তিনি শারীরিক নির্যাতন করেছেন এমন অভিযোগের পর পদত্যাগ করেন। তবে তিনি মি টু আন্দোলনের জন্য একটি প্লাটফর্ম গড়ে গেছেন। এই মি টু আন্দোলন হলো নারীদের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির লড়াই। তার সময়কালে তিনি হলিউডের চলচ্চিত্র প্রযোজক হার্ভে উইনস্টেনের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নিয়েছিলেন। এটাই তার বড় অর্জনগুলোর অন্যতম। তিনি বিদায় নেয়ার পর অন্তর্বর্তী এটর্নি জেনারেল হিসেবে দায়িত্বে আসেন বারবারা আন্ডারউড। বর্তমানে নিউ ইয়র্কে নির্বাচিত এটর্নি জেনারেল লেতিতিয়া জেমস। তিনি একজন ডেমোক্রেট। এ পদে বিজয়ী হন ২০১৮ সালে। তাকে অনুমোদন দিয়েছিলেন অ্যানড্রু কুমো। এই গ্রীষ্মে কুমোর বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করান লেতিতিয়া। এই তদন্তে পদত্যাগ করেন কুমো।

বিদায় স্কট রুডিন, ইন কেট হর্টন
কর্মক্ষেত্রে অবমাননা ও নির্যাতনের অভিযোগে গত এপ্রিলে পদ থেকে সরে দাঁড়ান চলচ্চিত্র এবং মঞ্চ বিষয়ক প্রযোজক স্কট রুডিন। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ, তা যৌন হয়রানি বা নারীদের দেহকে যৌন নির্যাতনের উদ্দেশে স্পর্শ করা নয়। অভিযোগ হলো, কর্মক্ষেত্রে তিনি পরিবেশকে বিষাক্ত করে তুলেছিলেন এবং সেখানে বিরাজ করতো আতঙ্ক। তার এ পদে দায়িত্বে এসেছেন কেট হর্টন। এর আগে লন্ডনে রয়েল কোর্ট থিয়েটার পরিচালনা করেছেন হর্টন।

বিদায় ইয়াং, ইন দেবি
প্রকাশনা এবং মিডিয়া কোম্পানি হার্স্ট। কর্মক্ষেত্রকে কাজের অনুপযুক্ত করে তোলার অভিযোগ আছে এই কেম্পানির প্রেসিডেন্ট ট্রয় ইয়াংয়ের বিরুদ্ধে। এমনকি অন্তঃসত্ত্বা একজন নারীকর্মীর কাছে তিনি জানতে চেয়েছিলেন, গর্ভস্থ শিশুটি কি তার (ইয়াংয়ের)? এসব নানা অভিযোগে ২০২০ সালের জুলাইয়ে পদত্যাগ করেন তিনি। তার পদে বসানো হয় দেবি ছিরিছেলা’কে। তিনি ছিলেন হার্স্টের নির্বাহী ভাইস প্রেুসিডেন্ট এবং প্রধান আর্থিক কর্মকর্তা। প্রথমদিকে তার নিয়োগ ছিল ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে। তবে ২০২০ সালের নভেম্বরে তাকে পূর্ণাঙ্গ প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব দেয়া হয়।


No comments

Powered by Blogger.