মোদি যে কারণে ঝুঁকিপূর্ণ

মোদি
লোকসভা নির্বাচনের প্রথম দুই-তৃতীয়াংশ আসনের মধ্যে সৌভাগ্যক্রমে কাশ্মীরের নামটা নেই। ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) তার নির্বাচনী ইশতেহারে বলেছে, তারা ক্ষমতায় গেলে সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদটি মুছে ফেলা হবে। এই অনুচ্ছেদে এই রাজ্যটিকে বিশেষ ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। এটা কোনো নতুন ব্যাপার নয়। বিজেপি অনেক দিন ধরেই এ কথা বলে আসছে। কিন্তু তা খুব একটা হালে পানি পায়নি। এর পরই নরক নেমে এল।
এমনকি পাকিস্তানি সেনাপ্রধানও এই তর্কে নেমে গিয়ে ঘোষণা করলেন, কাশ্মীর হচ্ছে তাঁর দেশের ‘রক্তনালি’। বিহারের বিজেপি নেতা গিরিরাজ সিং যে মন্তব্য করলেন, যাঁরা মোদিকে ভোট দেবেন না, তাঁদের পাকিস্তানে চলে যাওয়া উচিত, তাঁর এই কথায় পুরো পরিস্থিতিটা কিছুটা হলেও নষ্ট হলো। কিন্তু বিজেপি এই বক্তব্যকে গ্রহণ না করায় যে ধুলা জমেছিল, তা কেটে যেতে শুরু করল। সন্দেহ নেই, কাশ্মীরের নেতা ফারুক আবদুল্লাহর মন্তব্যে জল আরও ঘোলা হলো। তিনি বলেন, যাঁরা মোদিকে ভোট দেবেন, তাঁদের সমুদ্রে ঝাঁপ দেওয়া উচিত। তার পরও আবদুল্লাহ যে মন্তব্য করলেন, তাতে পরিবেশটা নষ্ট হয়নি, কারণ তিনি আগেও এরূপ সুরে কথা বলেছেন। তা কখনো গুরুতরভাবে নেওয়া হয়নি। বড় ক্ষতিটা করেছেন মোদি নিজে, ভোট পাওয়ার জন্য তিনি এহেন কাজ নেই, যা করতে দ্বিধাবোধ করেন। তিনি পরিবেশকে এমনভাবে বিষিয়ে তুলেছেন যে হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যকার এই দূরত্ব ঘোচাতে অনেক সময় লেগে যাবে। কাশ্মীরের বিরাজমান পরিস্থিতির জন্য মোদি শেখ আবদুল্লাহকে আক্রমণ করেছেন। ঐক্য-প্রক্রিয়াবিষয়ক কোনো তথ্য মোদির কাছে নেই। কিন্তু শেখ সাহেবের কাছে এমন কোনো জনপ্রিয় ও ঋজু নেতা নেই, যিনি মুসলমান-অধ্যুষিত কাশ্মীরের সঙ্গে হিন্দু-অধ্যুষিত ভারতের সম্মিলন ঘটাতে পারেন। শেখের ছেলে ফারুক আবদুল্লাহ বলেছেন, কাশ্মীর সাম্প্রদায়িক ভারতের অংশ হবে না। এ কথায় সাম্প্রদায়িকতার ইঙ্গিত। সব অসাম্প্রদায়িক শক্তিকে একত্র হয়ে সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়তে হবে। ফারুককেও এ লড়াইয়ের মুখোমুখি হতে হবে। এ দেশকে আমাদের অসাম্প্রদায়িক ও গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে হবে। এ সমস্যার সমাধানে তিনি একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
একই সঙ্গে পাকিস্তানেও যাঁরা স্বাধীনতার জন্য প্রাণ দিয়েছেন, তাঁদের জন্যও এটা গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের প্রথম প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু পাকিস্তানের স্বার্থের গুরুত্বের কথা বুঝতে পেরেছিলেন। তিনি শেখ আবদুল্লাহকে ইসলামাবাদে পাঠিয়েছিলেন, একটি অভিন্ন স্বার্থ খোঁজার লক্ষ্যে। শেখ পাকিস্তানের তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আইয়ুব খানের সঙ্গে দেখা করেছিলেন। ১৯৬৪ সালে শেখ আইয়ুব খানের সঙ্গে দেখা করেন, অচলায়তন ভাঙার এটাই ছিল শেষ প্রচেষ্টা। আইয়ুব ১৯৭২ সালের এপ্রিল মাসে ইসলামাবাদে আমাকে বলেছিলেন, ‘নেহরু জীবনের শেষ প্রান্তে এসে পাকিস্তানের সঙ্গে সমঝোতায় আসার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছিলেন, তাঁর চোখে সে উদ্বেগও দেখা গেছে।’ কিন্তু শেখের সফর থেকে তেমন ইতিবাচক কিছু আসেনি। আলোচনা যখন চলছে, নেহরু তখন মৃত্যুশয্যায়। সুতাটাকে টেনে লম্বা করার ব্যাপারে পাকিস্তানের উদ্বেগ ছিল। কিন্তু শাস্ত্রী-আইয়ুব বৈঠকে কোনো সমাধান আসেনি। শাস্ত্রী কাশ্মীর বিষয়ে আলোচনা করতে না চাইলে এক হতাশা এসে ভর করে। এমনকি এ বিষয়টি যৌথ ঘোষণায়ও আসেনি। অথচ এ বিষয়ে ভারত-পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রসচিব পর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা ছিল। আজাদীর কথা বললে, জঙ্গিরা এটা বুঝতে পারে না যে তালেবানরা যে পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে, এর ফলে কাশ্মীরের বিদ্রোহীরা মৌলবাদী হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। চরমপন্থী শাহ আবদুল গিলানি এ ধারণাকেই তেল-জল দিয়ে পুষ্ট করেছেন যে রাজ্যের স্বাধীনতার দাবি ও ধর্মীয় আবেগ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। পাকিস্তানে যারা কাশ্মীরের স্বাধীনতার ঘোরতর বিরোধী ছিল, তারা এখন শান্ত।
ক্ষমতাসীনদের কেউ কেউ স্বাধীনতার পক্ষে কথা বলে থাকেন, এই আশায় যে স্বাধীন কাশ্মীর হয়তো শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানের সঙ্গে যোগ দেবে। যারা এ দাবি তুলেছে, তাদের এটা বুঝতে হবে, কাশ্মীর উপত্যকায় বসবাস করে তারা দুটি অঞ্চল জম্মু ও লাদাখের ভাগ্য নির্ধারণ করতে পারবে না। তাদের দাবি যতই সৎ হোক। প্রথমোক্তটি স্বরাজ্যেও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করার সময় ভারতের সঙ্গেই যোগ দেবে। দ্বিতীয়টি ভারতের ইউনিয়ন রাজ্যে রূপান্তরিত হতে চাইবে। সে কারণে স্বাধীনতার দাবি উপত্যকার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এই ভূমি দ্বারা আবদ্ধ উপত্যকা অর্থনৈতিকভাবে দাঁড়াতে পারবে কি না, সে তর্কে আমি যাব না। কিন্তু জম্মু ও লাদাখে কোনো অনুসারী না থাকা সত্ত্বেও এই দাবি করা সমীচীন কি না, এই প্রশ্ন তাদের কাছে আমি রাখতে চাই। এ কারণেই কাশ্মীরের মূল উপত্যকার বাইরে আর কোনো স্বাধীনতাকামীদের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। নরমপন্থী মিরওয়াইজ উমর ফারুক যে কাশ্মীর প্রশ্নে অভ্যন্তরীণ নীতির ঊর্ধ্বে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন, তা তেমন হালে পানি পায়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা একত্রে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিতে সক্ষম হব।’ কিন্তু ভারতে তাঁর কোনো গ্রহণযোগ্যতা নেই। তাঁর বাবা বরং বাস্তববাদী ছিলেন। তিনি ভারতীয় ইউনিয়নের মধ্যে, তবে এর সংবিধানের বাইরে কোনো সমাধান চাইতেন। পরে জঙ্গিরা তাঁকে হত্যা করে। মোদি ও বিজেপির জয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মানসিকতাকে আমি সমর্থন করি। কিন্তু নয়াদিল্লিতে আগেও বিজেপি সরকার ছিল। হিন্দুত্ববাদের তীব্র একটা রূপ হচ্ছে মোদি। কিন্তু সংবিধান হচ্ছে সর্বেসর্বা, এই সংবিধান আইনের চোখে সবার সম-অধিকারের কথা বলে।
এ ছাড়া ভারত হাজার হাজার বছর ধরে একটি বহুধর্মীয় সমাজ। মোদি তাঁর বক্তৃতায় বলেন, নির্বাচিত হলে সবাইকে সঙ্গে নিয়েই তিনি উন্নয়নে মাঠে নামবেন, এটা তাঁর এজেন্ডাও বটে। তিনি যদি এই বহুত্বকে বিনষ্ট করেন, তাহলে এই দেশের গণতান্ত্রিক ও উদার শক্তিগুলোর অন্তত এতটা শক্তি ধারণ করে যে তাঁরা বহুত্বের পক্ষে, স্বাধীনতাসংগ্রামের চেতনার পক্ষে লড়াইয়ে নামতে পারবেন। ভারতের সংবিধানের ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদে জম্মু ও কাশ্মীরকে বিশেষ মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। মোদি ও তাঁর দল এটা বাতিল করতে পারবে না, কারণ রাজ্যটি এই শর্তেই ভারতীয় ইউনিয়নে যোগদান করেছিল। রাজ্যটি চাইলে এই শর্ত পরিবর্তন করতে পারে। কাশ্মীর সমস্যা তিন পক্ষেরই আয়ত্তের বাইরে—ভারত, পাকিস্তান ও কাশ্মীর। এটা কঠিন, কারণ বিজেপি এই ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিলের দাবি জানিয়েছে। এটা করলে, নেহরু ও আবদুল্লাহর মধ্যকার বোঝাপড়ার সঙ্গে বেইমানি করা হবে। ৩৭০ নম্বর অনুচ্ছেদ বাতিল করা হলে ভারতের সঙ্গে কাশ্মীরের যুক্ত হওয়া নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠবে, ফারুক আবদুল্লাহ যার হুঁশিয়ার করে দিয়েছেন। এতে একটা বিষয় আছে। আদিতে এই অনুচ্ছেদ কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে প্রতিরক্ষা, পররাষ্ট্র ও যোগাযোগ মন্ত্রণালয় সমর্পণ করেছে। এর সঙ্গে সম্পর্কিতভাবে অনেক ভারতীয় আইন এখানে প্রযোজ্য হয়েছে, এমনকি রাজ্য আইনসভার অনুমোদন ছাড়াই। এগুলোকে সরাতে হবে। ভারতীয় ইউনিয়নে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার পরপরই রাজ্যটি যে মর্যাদা ভোগ করত, তা পুনরুদ্ধার করা গেলে কাশ্মীর সমস্যার সমাধান হবে।
ইংরেজি থেকে অনূদিত
কুলদীপ নায়ার: ভারতের সাংবাদিক।

No comments

Powered by Blogger.