ডেসটিনি কো-অপারেটিভ সোসাইটি নিয়ে সমবায় অধিদপ্তরের তদন্ত প্রতিবেদন জমা ডেসটিনির আরও ১৫০০ কোটি টাকার কেলেঙ্কারি by আবুল হাসনাত-

নিহাজ জুট স্পিনার্স লিমিটেডের শেয়ার কেনার জন্য ১৪ কোটি ৫০ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি। তবে নিহাজ জুট স্পিনার্সের নিরীক্ষা প্রতিবেদনে বিনিয়োগের পরিমাণ দেখানো হয় সাত কোটি টাকা। অর্থাৎ সাড়ে সাত কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে সোসাইটি।


কাকরাইলে অবস্থিত ডায়মন্ড ডিপ্লোমেটিক টাওয়ারের নবম থেকে ১৮তম তলা পর্যন্ত ফ্লোর ও স্পেস কেনার খরচ দেখানো হয় ৮৪ কোটি টাকা। অথচ দেওয়া হয়েছে নয় কোটি ১৯ লাখ ছয় হাজার ৫৬৫ টাকা। বাকি ৭৪ কোটি ৮০ লাখ ৯৩ হাজার ৪৩৫ টাকা সোসাইটি আত্মসাৎ করেছে।
২০০৫ থেকে ২০১২ সালের মার্চ পর্যন্ত ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির এমন সব আর্থিক অনিয়ম খুঁজে পেয়েছে সমবায় অধিদপ্তরের গঠিত তদন্ত কমিটি। কমিটি বলছে, সাত বছরে সোসাইটি এক হাজার ৪৪৮ কোটি ৭৮ লাখ ৭৩ হাজার ৯৫২ টাকার আর্থিক অনিয়ম করেছে।
সমবায় অধিদপ্তরের নিবন্ধকের অনুমোদন না নিয়ে সমিতির সদস্যদের কাছ থেকে সংগৃহীত অর্থ ডেসটিনি ২০০০ লিমিটেডের অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোতে বিনিয়োগ, অনুমোদনহীনভাবে অলাভজনক প্রতিষ্ঠানে ঋণ বিতরণ ও সেসব প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কেনা, সম্পদের মূল্য বেশি দেখানো, বাজেটবহির্ভূত ও অনুমোদনহীন বিভিন্ন ব্যয়ের মাধ্যমে এসব অনিয়ম করেছে সোসাইটি।
তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনটি গতকাল সোমবার পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। জানতে চাইলে তদন্ত কমিটির আহ্বায়ক অমিয় কুমার চট্টোপাধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন, রোববার বিকেলে প্রতিবেদনটি অধিদপ্তরের নিবন্ধক মো. হুমায়ুন খালিদের কাছে জমা দেওয়া হয়। আজ (সোমবার) নিবন্ধক তা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়ে দিয়েছেন। এর বেশি কিছু বলতে তিনি রাজি হননি।
যোগাযোগ করা হলে গত রাতে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব মিহির কান্তি মজুমদার তদন্ত প্রতিবেদনটি পেয়েছেন বলে প্রথম আলোকে জানান। তিনি বলেন, প্রতিবেদনে কিছু বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। শিগগিরই সমবায় অধিদপ্তরের সভা করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যোগাযোগ করা হলে ডেসটিনি গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফিকুল আমীন আর্থিক অনিয়মের বিষয়টি বরাবরের মতো অস্বীকার করে গত রাতে প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটা মিথ্যা, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও মনগড়া। তাদের প্রতিবেদনে এমন কিছু এলে আমরা আইনি প্রক্রিয়ায় যাব।’
যেভাবে অনিয়ম: সূত্র জানায়, তদন্ত কমিটি বড় যে আর্থিক অনিয়মটি পেয়েছে তা হলো—ডেসটিনি ২০০০-এর পরিবেশকদের মাধ্যমে এমএলএম (বহু স্তরের বিপণন) পদ্ধতিতে সোসাইটির সদস্য সংগ্রহ করা এবং এ জন্য কমিশন দেওয়া। সাত বছরে সোসাইটি ৭৪০ কোটি টাকা কমিশন দিয়েছে। সমবায় আইনে সদস্যদের কমিশন দেওয়ার বিধান নেই, আছে বছর শেষে লভ্যাংশ দেওয়ার বিধান।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৫ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন প্যাকেজের আওতায় সদস্যদের কাছ থেকে সংগ্রহ করা ৫৫৯ কোটি ৩৬ লাখ ১০ হাজার টাকা ওই সব প্যাকেজে বিনিয়োগ না করে বাইরের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ করা হয়েছে। এটা সোসাইটি করতে পারে না।
আবার সমবায় অধিদপ্তরের অনুমোদন ছাড়াই ২০১০-১১ অর্থবছরে ২৫১ কোটি ১৯ লাখ টাকা বিনিয়োগ করে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি। এই তথ্য গোপন করে পরবর্তী সময়ে এই ২৭টিসহ ৩৪টি প্রতিষ্ঠানে অর্থ বিনিয়োগের জন্য অধিদপ্তরের নিবন্ধকের কাছে অনুমোদন নেওয়া হয়। অনুমোদন নেওয়ার আগে বিনিয়োগের বিষয়টি ২০১০-১১ অর্থবছরের নিরীক্ষায় ধরা পড়লে সমিতির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে এ বিষয়ে ব্যাখ্যা চাওয়া হয়। ব্যবস্থাপনা কমিটি জবাব দিতে ব্যর্থ হওয়ায় এবং বিনিয়োগের বিষয়টি গোপন করার কারণে ওই অনুমোদন বাতিল করা হয়।
তদন্ত কমিটি দেখেছে, ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি তার সদস্যদের বাইরে ২৭০ কোটি ৫২ লাখ ৪২ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা অনুমোদনহীনভাবে ঋণ দিয়েছে। যেসব প্রতিষ্ঠানে ঋণ দেওয়া হয়েছে তার সবই আবার অলাভজনক প্রতিষ্ঠান। একইভাবে সোসাইটি অনুমোদনহীনভাবে তার সদস্যদের বাইরে ১২০ কোটি ৬২ লাখ ৯৯ হাজার ৯৫৪ কোটি টাকা দিয়ে অলাভজনক বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের শেয়ারও কিনেছে।
বিভিন্ন প্রকল্পে বিনিয়োগের জন্য সোসাইটি অনেক সময়ই কোটি কোটি টাকা লাভ দেখিয়ে লভ্যাংশ দেওয়ার মাধ্যমে সদস্যদের প্রলুব্ধ করার প্রমাণও পেয়েছে তদন্ত কমিটি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০১১ সালের ২৩ মার্চ ফার্মগেটের আনন্দ-ছন্দ সিনেমা হল ৫৭ কোটি টাকায় কেনে সোসাইটি। ঠিক এক বছর পর এ বছরের ৩১ মার্চ পুনর্মূল্যায়ন করে ওই সম্পত্তির মূল্য ঠিক করা হয় ৭৪ হাজার আট লাখ ৪৫ হাজার ৮০০ টাকা। এক বছরে মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে ৩০ শতাংশ। কমিটি বলছে, এটা অবিশ্বাস্য। সদস্যদের প্রতারিত করতেই এমনটি করা হয়েছে।
তদন্ত প্রতিবেদন অনুযায়ী, সদস্যদের কাছ থেকে সংগৃহীত ২২৬ কোটি ৯৫ লাখ ৫৫ হাজার ৩৬০ কোটি টাকা ব্যয়ে অনুমোদনহীনভাবে জমি ও স্থাপনা কেনে সোসাইটি। সদস্যদের প্রলুব্ধ করার জন্য পরবর্তী সময়ে এসব সম্পত্তির মূল্য ১৬৩ কোটি ৩৫ লাখ ৬২ হাজার ২৫ টাকা বেশি দেখানো হয়। এ ছাড়া জমি ও স্থাপনা কেনার জন্য ১৫৯ কোটি ৭০ লাখ ২৩ হাজার ৪৭৩ টাকা অগ্রিমও দেয় সোসাইটি।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ডেসটিনি গ্রুপ ও সোসাইটি দুটি ভিন্ন আইনে নিবন্ধিত। তার পরও সোসাইটির সদস্যদের আমানতের তিন কোটি ৯৬ লাখ ৮০ হাজার ৯২২ টাকা ডেসটিনি গ্রুপের খরচের জন্য ব্যয় করা হয়। ডেসটিনি গ্রুপের পত্রিকা দৈনিক ডেসটিনির ভর্তুকি বাবদ ৩০ লাখ টাকা সোসাইটির কাছ থেকে দেওয়া হয়। এ ছাড়া টেলিবার্তার কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অগ্রিম বাবদ আরও পাঁচ কোটি ৯৬ লাখ ৫০ হাজার ৮৯২ টাকা ব্যয় করা হয়েছে। আবার সোসাইটির সাবেক কোষাধ্যক্ষ মো. ইরফান আহমেদকে বিধিবহির্ভূতভাবে ২১ লাখ ৩১ হাজার ৮৮৫ টাকা সম্মানী ভাতা দেওয়া হয়েছে। এভাবে সোসাইটিকে আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। এতে প্রতারিত হয়েছেন সোসাইটির সদস্যরা।
সদস্য নিয়ে প্রশ্ন: বর্তমানে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির সদস্য সাড়ে আট লাখ। সোসাইটির ২০১০-১১ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০৬-০৭ অর্থবছরে সোসাইটির সদস্য ছিল ১৬৭ জন। পরের বছর সদস্য বেড়ে হয় তিন হাজার ১৫৫ জনে। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে সদস্য দাঁড়ায় ছয় হাজার ৯২৩ জন। কিন্তু এক বছরের মধ্যে সদস্যসংখ্যা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে হয় এক লাখ ৭৯ হাজার ৭৯৫ জনে। আর ২০১০-১১ অর্থবছরে সদস্য দাঁড়ায় ছয় লাখ ৪০ হাজার ১৭৯ জনে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, সোসাইটির সদস্যদের মধ্যে ৩০ শতাংশেরই সুনির্দিষ্ট ঠিকানা নেই। ফলে তাঁরা পাওনা অর্থ পেতে প্রতারিত হতে পারেন।
তদন্ত প্রতিবেদন বলছে, সোসাইটির নিট মুনাফা না হওয়ার পরও সদস্যদের প্রলুব্ধ করার জন্য বিধিবহির্ভূতভাবে ১৭৪ কোটি ৭৭ লাখ ৫৯০ হাজার ৫৫৭ কোটি টাকা লভ্যাংশ দেওয়া হয়েছে। এভাবে সদস্য বাড়ানোরও প্রচেষ্টা দেখা গেছে।
কমিশন দেওয়ার বিষয়ে রফিকুল আমীন বলেন, ‘কমিশন দেওয়ার বিধান নেই তা ঠিক আছে। কিন্তু পারিতোষিক, রেয়াত দেওয়া যায়।’ ভুয়া সদস্যের বিষয়ে তিনি বলেন, সোসাইটির মিরপুর শাখার ব্যবস্থাপক ২০১০ সালে ২০০ ভুয়া সদস্য করেছিলেন। এ ছাড়া এমন আর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

No comments

Powered by Blogger.