নদীর অস্তিত্ব রক্ষা জরুরি by এ কে এম সালাহউদ্দিন

প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, কৃষি সহায়ক আবহাওয়া ও জলবায়ু, সর্বোপরি সুজলা-সুফলা, শস্য-শ্যামলায় ভরপুর আমাদের এই নয়নাভিরাম বাংলাদেশ গঠনে নদী এক অনবদ্য ভূমিকা পালন করে আসছে।
সারাদেশেই জালের মতো ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ছোট-বড় অসংখ্য নদ-নদী, যার প্রভাব বাংলাদেশের ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক অবস্থার ওপর যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। এ দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত প্রধান নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, সুরমা, কুশিয়ারা, গোমতী, বুড়িগঙ্গা, কর্ণফুলী, ধলেশ্বরী, মাতামুহুরী ও ব্রহ্মপুত্র। যার মাধ্যমে এ দেশের প্রায় ১৪০ মিলিয়ন মানুষের জীবিকা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে নির্ভর করে।
বিপুল সম্ভাবনাময় এই নদী আজ হুমকির সম্মুখীন। বিশ্বব্যাংকের এক সমীক্ষায় দেখা যায়, রাজধানী ঢাকাকে পরিবেষ্টিত করে রাখা চারটি নদী বুড়িগঙ্গা, শীতলক্ষ্যা, তুরাগ ও বালু প্রতিদিনই আশপাশের প্রায় সাত হাজার কলকারখানা থেকে নিঃসৃত বর্জ্য দ্বারা দূষিত হচ্ছে। বুড়িগঙ্গার পানি আজ কালচে রঙ ধারণ করেছে, পাশাপাশি হয়ে উঠেছে বিষাক্ত ও দুর্গন্ধযুক্ত। হাজারীবাগ ট্যানারিগুলো থেকে নিঃসৃত অপরিশোধিত বর্জ্য ও বিভিন্ন কলকারখানার ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থসহ নানা বর্জ্য এ নদীতে পড়ায় নদীর পানি বিষাক্ত হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া সাভারের বিভিন্ন কলকারখানার আবর্জনা ফেলা হচ্ছে তুরাগ নদীতে, পাশাপাশি পয়ঃপ্রণালি নির্গমনের লাইনও এ নদীতে এসে পতিত হয়েছে। ফলে নদীর পানি ব্যবহারের অনুপযুক্ত হয়ে পড়ছে।
গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর শতকরা ৯৭ ভাগেরও বেশি মানুষ ভূগর্ভস্থ পানি পান করে। অন্যদিকে রাজধানী ঢাকায় শতকরা ৮২ ভাগ পানি সরবরাহ করা হয় ভূগর্ভ থেকে তুলে। যার ফলে ঢাকা শহরে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রতি বছরই ২-৩ মিটার নিচে চলে যাচ্ছে। ২০০৭ সালের এডিপির (এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক) সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০১৫ সাল নাগাদ এ দেশে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা যাবে, যদি না অপরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ পানির যথেচ্ছ উত্তোলন ও ব্যবহার কমানো যায়। প্রতিদিন ঢাকা শহরে পানির চাহিদা দুই হাজার ১০০ মিলিয়ন লিটার; কিন্তু ওয়াসা সরবরাহ করছে মাত্র এক হাজার ৬০০ মর্িিলয়ন লিটার। এ বাড়তি চাহিদা পূরণে পরিশোধনের মাধ্যমে নদীর পানি ব্যবহারের বিকল্প নেই। প্রতি বছরই পৃথিবীতে প্রায় ১.৬ মিলিয়ন মানুষের মৃত্যু ঘটে পানিবাহিত নানা রোগের মাধ্যমে। বাংলাদেশেই প্রতি বছর অন্তত এক লাখ শিশুর মৃত্যু হয় শুধু ডায়রিয়ার মাধ্যমে।
অন্যদিকে দেশের অর্থনীতির অন্যতম চাবিকাঠি কৃষি নদীর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নদীর পানি ও বন্যা-পরবর্তী পলিমাটি ফসল উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, এই পলিমাটি দ্বারা জমির উর্বরতা বৃদ্ধি পায়। এ ছাড়া সেচ কাজে পানি অত্যাবশ্যক। নদ-নদীর পানি দূষণের ফলে একদিকে যেমন জীববৈচিত্র্য ধ্বংসের মাধ্যমে পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের মৎস্য সম্পদও হুমকির সম্মুখীন হয়ে পড়ছে। এ ছাড়া নদীতে ব্রিজ নির্মাণের ফলে ব্রিজের প্রতিটি স্তম্ভের গোড়ায় দিনের পর দিন পলি জমে স্রোতের প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয় ও নদী ভরাট হতে শুরু করে।
নদী যে কেবল জীবিকা নির্বাহেই ওতপ্রোতভাবে জড়িত তা নয়, যাতায়াতেও নদীপথ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে। শিল্পায়ন ও নগরায়নের ফলে জনসংখ্যা বিস্টেম্ফারণের চাপ রাজধানীতে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে, তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে নিরাপদ পানির সংকট। তাই পরিকল্পিত ঢাকা শহর গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ওয়াসাসহ সংশ্লিষ্ট সবার উচিত ভূগর্ভস্থ পানির উত্তোলন কমিয়ে নদীর পানি পরিশোধনের মাধ্যমে সরবরাহ নিশ্চিত করা। এ ক্ষেত্রে ১৯৯৫ সালের 'পরিশোধনের মাধ্যমে বর্জ্য নিঃসৃতকরণ' সংশ্লিষ্ট আইনের যথার্থ প্রয়োগ করতে হবে। সর্বোপরি নদীবিধৌত এ দেশকে মরুকরণ হতে রক্ষা করতে, ষড়ঋতুর পূর্ণাঙ্গ রূপ ফিরিয়ে নিয়ে আসতে ও পরিবেশ তথা জীববৈচিত্র্য রক্ষা করতে নদী ভরাট, অবৈধভাবে নদী দখল, অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, নদীদূষণসহ নদীবিধ্বংসী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে সবাইকে সোচ্চার হতে হবে। কেননা দেশ তথা জাতির অভিন্ন স্বার্থে নদীর স্বকীয় রূপ ফিরিয়ে আনা জরুরি।
য়এ কে এম সালাহউদ্দিন :শিক্ষার্থী শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা
লড়লংধঁ@মসধরষ.পড়স

No comments

Powered by Blogger.