কোচিংবাণিজ্য-নীতিমালা কার্যকর হোক

দীর্ঘদিন ধরে কোচিংবাণিজ্য বন্ধের দাবি জানানো হচ্ছিল সমাজের নানা স্তর থেকে। সকলেই স্বীকার করেন, পেশাগত কাজের বাইরে দীর্ঘ সময় কোচিং করানোর ফলে ক্লাসরুমের প্রতি শিক্ষকদের নিষ্ঠা, মনোযোগ ও স্পৃহা উদ্বেগজনক হারে কমে গেছে। তারপরও কোচিংয়ের প্রতি শিক্ষকদের আকর্ষণ অদম্য। কেননা কোচিংয়ের সঙ্গে আছে অর্থযোগ।


লাগামহীন বাজারের চাহিদা মেটাতে, জীবনে স্বাচ্ছন্দ্য আনার প্রয়োজনে শিক্ষকদের একটি অংশ নির্ভর করছেন কোচিং থেকে পাওয়া বাড়তি আয়ের ওপর। কিন্তু কোচিংয়ের এই রমরমা শিক্ষার্থী ও অভিভাবক কারও জন্যই সুখকর হচ্ছে না। একদিকে দিনের দীর্ঘ সময় স্কুলে ব্যয় করে শিক্ষার্থীরা যেমন প্রয়োজনীয় পাঠ গ্রহণে সক্ষম হচ্ছে না, অন্যদিকে খেলা বা অবসরের সময়টুকুও তাদের ব্যয় করতে হচ্ছে শিক্ষকের সামনে। আর সন্তানদের কোচিং করাতে গিয়ে অভিভাবকদের গুনতে হচ্ছে মোটা অঙ্কের টাকা। এ অবস্থায় সচেতন নাগরিকরা উদ্বেগ জানিয়ে আসছেন। এবার উদ্বেগে সাড়া দিল শিক্ষা মন্ত্রণালয়। কোচিং বন্ধে একটি নীতিমালা গ্রহণ করা হয়েছে মন্ত্রণালয়ের তরফে। তবে নীতিমালায় কোচিংবাণিজ্য বন্ধের নির্দেশনা নেই। বাস্তবতা বলছে, এ মুহূর্তে নীতিমালা করে কোচিং বন্ধ করাও সম্ভব নয়। তবে লাগামছাড়া বাণিজ্যকে নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। নীতিমালা অনুসারে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষকরা নিজের প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের কোচিং করাতে পারবেন না। অন্য প্রতিষ্ঠানের নির্দিষ্টসংখ্যক শিক্ষার্থীকে বাড়িতে পড়াতে পারবেন। উদ্যোগটি ইতিবাচক। কেননা অভিযোগ আছে, অনেক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের কোচিং করতে বাধ্য করেন। এখন বাড়িতে গিয়ে কোচিং করার বাধ্যবাধকতাটি থাকছে না। তবে অন্য স্কুলের ১০ জন শিক্ষার্থীর বাইরে শিক্ষকরা কোচিং করাচ্ছেন কি-না তা যথাযথভাবে তদারক করতে হবে। স্কুলগুলো প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগে শিক্ষার্থীদের জন্য বাড়তি ক্লাস করাতে পারবে। এ জন্য তারা ক্লাসপ্রতি বাড়তি টাকা নিতে পারবে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে। প্রশ্ন উঠেছে, এ ক্লাসের জন্য যে টাকা নেওয়া হবে তা বেশি কি-না। আর শিক্ষকরা দিনে কয়টি বাড়তি ক্লাস নেবেন সেটিও নির্ধারিত হওয়া উচিত। স্কুলে যদি লাগামহীন কোচিং চলতে থাকে তবে তার ফল কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা ভাবা উচিত। এই কোচিংয়ের খরচ অবশ্যই নিয়ন্ত্রণে থাকতে হবে। আশার কথা, শিক্ষামন্ত্রী বলেছেন নীতিমালা কার্যকর করার পর ভুল-ভ্রান্তিগুলো শোধরানোর সুযোগ থাকবে। ফলে নীতিমালাকে নেতিবাচক দৃষ্টি থেকে দেখার অবকাশ নেই। শিক্ষা মন্ত্রণালয় যদি যথাযথ তদারকির মাধ্যমে নীতিমালা কার্যকর করতে পারে তবে তাতে ভালো ফল মিলবে বলে আশা করা যায়। বস্তুত শিক্ষাব্যয়কে সাধারণের আয়ত্তে আনাই এখনকার সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। জাতির বৃহত্তর স্বার্থে শিক্ষকরা এ বিষয়ে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেন না। বরং এ বিষয়ে সহযোগিতার মনোভাব নিয়ে তাদের এগিয়ে আসা উচিত। তবে সরকারকে অবশ্যই শিক্ষকদের বেতন বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনায় রাখতে হবে। অভিভাবকদেরও এ বিষয়ে সহযোগিতা থাকা চাই। ভালো বেতন পেলে মানসম্পন্ন শিক্ষক মিলবে এবং তারা শ্রেণীকক্ষে ভালো পড়াবেন। শুধু স্কুল পর্যায়ে নয়, কলেজ পর্যায়েও কোচিংবাণিজ্য আছে। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষকরা কনসালট্যান্সি ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর সুযোগ গ্রহণ করেন। এ ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানকে জানানো হয় না, প্রতিষ্ঠানের প্রাপ্যও পরিশোধ করা হয় না। যে কাজের জন্য তার পরিচয়, খ্যাতি ও চাহিদা সে কাজের প্রতিই অমনোযোগ দেখা যায়। শিক্ষাক্ষেত্রে একটি সর্বজনীন নীতি প্রতিষ্ঠা করতে হলে সর্বস্তরেই নীতিমালা করতে হবে এবং প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকরা যাতে তা অনুসরণ করেন সে ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
 

No comments

Powered by Blogger.