বিদ্যুৎ সমস্যা নিয়ে উদ্বিগ্ন মহাজোটের সাংসদেরা

বিদ্যুৎ সমস্যার কারণে গ্রামের বাড়ি যেতে ভয় পাচ্ছেন ক্ষমতাসীন মহাজোটের অনেক সাংসদ। তাঁদের মতে, সরকারের ব্যর্থতা-সফলতা—সবই নির্ভর করছে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সফলতা-ব্যর্থতার ওপর। আগামী বাজেটে তাই বিদ্যুৎকে এক নম্বর অগ্রাধিকার খাত হিসেবে বিবেচনা করার পরামর্শ দেন তাঁরা।


বিভিন্ন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতিদের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সচিবালয়ে গতকাল বৃহস্পতিবার প্রাক্-বাজেট আলোচনা করেন। সেখানেই ক্ষমতাসীন মহাজোটের ছয়-সাতজন সাংসদ বিদ্যুৎ-পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
সভার শুরুতেই অর্থমন্ত্রী জানান, ২০১৫ সালের মধ্যে ১২ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে। এ ব্যাপারে তিনি আবারও একটি বিবৃতি দেবেন। আর, বরাবরের মতো আগামী বাজেটেও বিদ্যুৎসহ অগ্রাধিকার খাতের কোনো পরিবর্তন হবে না।
আলোচনায় অংশ নিয়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি সুবিদ আলী ভূঁইয়া বলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী আমরা বিদ্যুৎ দিতে পারছি না। অথচ, সরকারের ব্যর্থতা ও সফলতা—সবই নির্ভর করে এর ওপর। বিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে পারলে সবদিক থেকেই ইতিবাচক ফল পাওয়া যাবে।’ তিনি বলেন, বিদ্যুৎকে সেরা খাত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। কারণ, বিদ্যুৎই হলো উন্নয়নের চাবিকাঠি।
তথ্য মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি এ কে এম রহমত উল্লাহ অর্থমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, ২০১৫ সালের মধ্যে কত হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হবে, তা না বলে জানান, ২০১৩ সালের মধ্যে কী কী হবে। তাহলে আমরা তা জনগণকে জানাতে পারব।’
জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘২০১৩ সালের মধ্যে লক্ষ্যমাত্রা হলো সাড়ে নয় হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনের। হয়তো উৎপাদন করা যাবে আট হাজার মেগাওয়াট।’ এ সময় সুবিদ আলী ভূঁইয়া বলেন, ‘১০ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন করতে পারলে স্বস্তিদায়ক হবে।’
ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হাসানুল হক ইনু বলেন, সুবিদ আলী ভূঁইয়া বিদ্যুতের সমস্যার সমাধানের ব্যাপারে কোনো কথা বলেননি। আগামী দেড় বছরে কী পদক্ষেপ নেওয়া হবে, তা-ও বলেননি। যেভাবেই হোক উৎপাদনক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু সব সময়ই চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে এক হাজার মেগাওয়াটের মতো ঘাটতি থেকে যায়। কেন কম উৎপাদিত হচ্ছে? সচেতনভাবে কম উৎপাদন কি না? তিনি বলেন, ‘আমার গ্রামের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। বিদ্যুৎ-সংকটের কারণে আমি এখন এলাকায় যেতে ভয় পাচ্ছি।’
যোগাযোগ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত কমিটির সভাপতি মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ বলেন, ঢাকার কাছেরই একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র হঠাৎ হঠাৎ উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। ১০৫ মেগাওয়াটের উৎপাদন ক্ষমতা। চাহিদাও বেশি। কিন্তু তারা ৪০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদন করে না। এসব বিষয়ও তদারকির মধ্যে আনা দরকার।
শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় কমিটির সভাপতি ইসরাফিল আলম বলেন, বিনা মূল্যে জ্বালানিসাশ্রয়ী বাল্ব বিতরণ করা হয়েছে। তেমন কোনো ফল পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি বিতরণেও সমস্যা রয়েছে। রয়েছে পদ্ধতিগত অপচয় (সিস্টেম লস) এবং অবৈধ সংযোগ। এই অবৈধ সংযোগ বন্ধের ব্যাপারে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।
তবে এরই মধ্যে একাধিক সংসদীয় কমিটির সভাপতি বলেন, আগামী অর্থবছরে বিদ্যুতের অন্তত খুঁটিও যদি দিতে না পারেন, তাহলে ভোটের জন্য মানুষের কাছে যেতে পারবেন না। তাঁরা বলেন, দেখা যায় গুলশান, বারিধারা, বসুন্ধরা এলাকায় হঠাৎ পুরো ভবনে আলো জ্বলতে থাকে, মাস খানেক পরই আবার আলো ‘নাই’ হয়ে যায়। এসব অননুমোদিত সংযোগও বন্ধ করতে হবে।
বিদ্যুৎ নিয়ে এই আলোচনার সময় সাংবাদিকেরা উপস্থিত ছিলেন। এরপর ‘অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে কথা বলতে হবে’ জানিয়ে সভায় সাংবাদিকদের উপস্থিতি চাননি স্থায়ী কমিটির সভাপতিরা। তখন অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের ব্রিফ করা হবে জানিয়ে বাইরে অপেক্ষা করতে বলেন।
আলোচনা শেষে অর্থমন্ত্রী সংক্ষিপ্ত ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের জানান, স্থায়ী কমিটির সভাপতিরা কিছু ভালো পরামর্শ দিয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, দেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নকে রক্ষার জন্য রাজনৈতিক শান্তি প্রয়োজন। বিদ্যুৎ উৎপাদনে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি সঞ্চালন ও বিতরণেও জোর দেওয়ার কথা বলেছেন তাঁরা।
অর্থমন্ত্রী বলেন, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামী রমজানের আগেই যেন ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে পণ্য সরবরাহ বাড়ানো হয়, সেই পরামর্শও দিয়েছেন তাঁরা। এ ছাড়া নতুন রাস্তার তুলনায় পুরোনো রাস্তা মেরামতে বেশি মনোযোগ দেওয়ার কথা বলেন সদস্যরা।
মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি মেহের আফরোজ এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষাবিষয়ক কমিটির সভাপতি মমতাজ বেগম নারীর কর্মসংস্থান, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ এবং মাধ্যমিক শিক্ষার মান বাড়ানোর উদ্যোগের পরামর্শ দিয়েছেন বলে জানান অর্থমন্ত্রী।
অর্থমন্ত্রী বলেন, আগামী বাজেট প্রযুক্তিবান্ধব হবে। অন্তত দেশের ৩০ লাখ ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সুবিধার কথা বিবেচনা করা হবে।
বৈঠকের পর যোগাযোগ করলে হাসানুল হক ইনু প্রথম আলোকে বলেন, আগেরবার যাঁরা ভোটার হয়েছেন এবং নতুন যাঁরা ভোটার হচ্ছেন, তাঁরাই নির্ধারণ করবে আগামী নির্বাচনের ফলাফল। সুতরাং তাঁদের মন জয়ের বাজেট চান তিনি।
হাসানুল হক ইনু বলেন, রাজনৈতিক শান্তির জন্য অর্থ মন্ত্রণালয়ের কোনো বরাদ্দের দরকার পড়ে না। এই শান্তির জন্য বয়োজ্যেষ্ঠ হিসেবে অর্থমন্ত্রী যেন প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিপরিষদের সদস্যদের বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেন।
বৈঠকে অন্যদের মধ্যে নৌপরিবহন কমিটির সভাপতি নূর-ই-আলম চৌধুরী, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কমিটির আবুল হাসান মাহমুদ আলী, এলজিআরডির মো. রহমত আলী, রেলপথের মতিউর রহমান, পানিসম্পদের উবায়দুর মোকতাদির চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রের আবদুস সালাম প্রমুখ অংশ নেন।

No comments

Powered by Blogger.