সফল সিমসাকা by আকমল হোসেন

গভীর অরণ্যে বাস তাঁদের। জীবিকার তাগিদে পান চাষ করেন তাঁরা। তবু অভাব পিছু ছাড়ে না। কেননা, উপার্জনের পুরো অর্থই মহাজনের ঋণের সুদ পরিশোধ করতে চলে যায়। এভাবে আর কত দিন? নিজেরাই খুঁজে বের করলেন সমাধানের পথ।


মৌলভীবাজার জেলার কুলাউড়া উপজেলার কর্মধা ইউনিয়নের লুতিঝুড়ি পানপুঞ্জির একদল আদিবাসী নারী তাঁদের ভাগ্য ফেরাতে গড়ে তোলেন ‘সিমসাকা মহিলা সংগঠন’। এরপর শুধুই তাঁরা এগিয়ে চলেছেন।
‘সিমসাকা মহিলা সংগঠন’ গড়ে তোলার পরিকল্পনা পুঞ্জির খাসি নারী (খাসিয়া) আলমা পলং, গারো নারী ভেরোনিকা ডিব্রা ও হিমালী রিছিলের মাথায় প্রথম আসে। ৭ সেপ্টেম্বর লুতিঝুড়ি পানপুঞ্জির গির্জায় এই নারীদের সঙ্গে কথা হচ্ছিল, তখন তাঁদের চোখেমুখে ছিল স্বস্তির ছায়া।
হিমালী রিছিল বললেন, ‘মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিতাম। সে কারণে বিনা দামে মহাজনকে পান দিতে হতো। বছরের পর বছর এটা চলছিল। আমরা চিন্তাভাবনা করছিলাম, এই মহাজনি ঋণ থেকে মুক্তির উপায় কী! এরপর ২০০৮ সালের ২৭ এপ্রিল গড়ে তোলা হয় সিমসাকা মহিলা সংগঠন।’ সিমসাকা একটি গারো শব্দ। এর অর্থ হলো সজাগ হওয়া।
হিমালী রিছিলকে সভানেত্রী ও করুণা ব্যাণ্ডেলকে সাধারণ সম্পাদক করে সাত সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়। সিদ্ধান্ত হলো, প্রতি সপ্তাহে প্রত্যেকে ২০ টাকা করে চাঁদা দেবেন। সদস্য হলেন ৩৯ জন। সেই শুরু। আর এটা করতে গিয়ে তাঁরা বাইরে থেকে কোনো আর্থিক সহযোগিতা নেননি। সিমসাকার সদস্যদের চাঁদা দিয়ে চলতে লাগল এর কার্যক্রম। অর্থনৈতিক মুক্তি, মহাজনের চড়া ঋণের হাত থেকে পুঞ্জির পরিবারকে বাঁচানো এবং পুঞ্জি পর্যায়ে নারী নেতৃত্বকে আরও শক্তিশালী করা ছিল এটি প্রতিষ্ঠার অন্যতম উদ্দেশ্য।
একজন সদস্যের মাসে ২০ টাকা করে জমা হতে থাকল। সঞ্চয় বাড়াতে শুধু নারীরাই নন, পরিবারের শিশুকন্যাদেরও সিমসাকার সদস্য করা হলো। করুণা ব্যাণ্ডেল জানান, সিমসাকার সদস্যদের টাকা একটি ব্যাংকের সমিতির হিসাবে জমা আছে। বর্তমানে প্রত্যেক সদস্যের সঞ্চয় দাঁড়িয়েছে পাঁচ হাজার ৭৮৮ টাকা। ৪৮ জন সদস্যের মোট সঞ্চয় দাঁড়িয়েছে দুই লাখ ৭৭ হাজার ৮২৪ টাকা। এই সঞ্চয় থেকে যাঁর যাঁর প্রয়োজনমতো ঋণ নেন। এ জন্য বছরে পাঁচ হাজার টাকায় ৬০০ টাকা সুদ দিতে হয়, যা সমিতির হিসাবে জমা হয়ে থাকে। এ ছাড়া প্রতি সদস্য আরও দুই টাকা করে অনুদান হিসেবে জমা দেন, যা অফেরতযোগ্য। এই টাকা দিয়ে গরিব ছাত্রছাত্রীদের পড়ালেখা ও অসুস্থ ব্যক্তিদের সহযোগিতা করা হয়ে থাকে। ইতিমধ্যে এই অনুদান থেকে বিদ্যালয়ের জন্য বেঞ্চ বানিয়ে দেওয়া হয়েছে। ৫০০ টাকা করে ১০ জন অসুস্থ দরিদ্র রোগীকে সহযোগিতা করা হয়েছে। বর্তমানে এই হিসাবে সাত হাজার টাকা জমা আছে। পান চাষ করতে গিয়ে ২০টি পরিবার মহাজনি ঋণে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা ছিল। তাদের মধ্যে ১৫টি পরিবার এ ঋণের কবল থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছে।
সিমসাকার সদস্য উষা রিছিল মহাজনি ঋণ থেকে মুক্ত হয়ে মুনাফা দিয়ে পাকা ঘর তুলেছেন। তিনি বলেন, ‘আগে মহাজনের দামেই পান বিক্রি করছি। লাভ ছিল না। এখন সমিতির টাকা নিয়ে জুম চাষ করছি। পাকা ঘর বানাইছি।’ সংগঠনের কোষাধ্যক্ষ মেলোদি পাঠাং বলেন, ‘আগে মহাজনকে বিনা দামে পান দিতাম। সমিতির কাছ থেকে টাকা ধার নিয়ে মহাজনের টাকা পরিশোধ করেছি। এখন পান চাষ করে কিস্তির টাকা (সমিতির) পরিশোধ করতে পারছি। সংসার চালাচ্ছি।’ এ ক্ষেত্রে পরিবারের পুরুষ সদস্যরাও তাঁদের সহযোগিতা ও সমর্থন দেন বলে তাঁরা জানান। লুতিঝুড়ি পানপুঞ্জির মন্ত্রী (পুঞ্জিপ্রধান) অকেন পলং জানান, সিমসাকা গঠন পুঞ্জির জন্য ভালো হয়েছে। সবাই মিলে নিজেদের উন্নতি করতে পারছে।
লুতিঝুড়ি পানপুঞ্জিতে এখন ৪৮টি আদিবাসী পরিবারের বাস। তাদের প্রধান জীবিকা ‘খাসিয়া পান’ চাষ। তাদের মধ্যে ২৫টি পরিবার গারো এবং ২৩টি পরিবার খাসি (খাসিয়া)।
আদিবাসীদের উন্নয়নে কর্মরত বেসরকারি সংস্থা আইপিডিএসের (ইনডিজেনাস পিপলস ডেভেলপমেন্ট সার্ভিসেস) প্রকল্প সহায়তাকারী লিসি সুমের জানান, এখানকার আদিবাসী নারীরা আগে ঘরে বসে থাকতেন। এখন তাঁরা সভায় আসছেন, নিজেদের উন্নয়ন নিয়ে কথা বলছেন। শুধু রান্নাবান্নাই তাঁদের কাজ নয়, এটা তাঁরা বুঝতে শিখেছেন। তাঁরা এখন নিজেরাই সংগঠন পরিচালনা করতে পারবেন। আত্মবিশ্বাসী হয়েছেন তাঁরা। একই কথা বললেন কর্মধা ইউনিয়ন পরিষদের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য সিলভেস্টার পাঠাং।
ট্রাইবাল ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের কুলাউড়া উপজেলার সাধারণ সম্পাদক থমাস রিছিল বলেন, ‘এই ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী ও পুঞ্জিগুলো অবহেলিত। সিমসাকা মহিলা সংগঠন এখানে নতুন একটি দিক উন্মোচন করেছে। আমরা যতটুকু পারি সহযোগিতা করি।’
আইপিডিএস কুলাউড়া কার্যালয়ের সমন্বয়কারী জয়ন্ত লরেন্স রাকসাম বলেন, ‘সম্পূর্ণ নিজের চেষ্টায় তাঁরা সমিতি করেছেন। তাঁদের দেখে অন্যান্য পানপুঞ্জিও অনুপ্রাণিত হয়েছে। তাঁদের মডেল ধরে আরও ২৩টি পুঞ্জিতে এ রকম সমিতি করা হয়েছে। আমরা শুধু মাঝেমধ্যে বিভিন্ন রকম পরামর্শ দিয়ে থাকি। সবটুকু তাঁরা নিজেরাই করেন।’

No comments

Powered by Blogger.