নাজমা জেসমিন চৌধুরী_ পৃথিবীর পরবাসী by সেলিম ওমরাও খান

আমাদের এলাকা থেকে একটা পত্রিকা বের হবে বলে নাজমা জেসমিন চৌধুরীর বাসায় গিয়েছিলাম লেখা আনতে। তখনই তাকে প্রথম দেখি। উদ্দেশ্য বলতেই তিনি তার এলাকার স্মৃতির প্রতি ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। খানিকক্ষণ নীরব থেকে গম্ভীরভাবে বললেন, 'হাতে অনেকগুলো কাজ থাকলেও তোমাদের আমি লেখা দেব।'


তারপর তিনি আমাদের কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। এলাকার কথাও জানতে চাইলেন। সেদিন আমি যা লক্ষ্য করেছিলাম তা হলো, আলাপের ফাঁকে ফাঁকে তিনি যেন কেমন নীরব হয়ে যাচ্ছিলেন। পরে বুঝতে পেরেছিলাম, হয়তো নিজের আদিপুরুষের ভিটে, গ্রাম এবং তার স্মৃতিতে তিনি ডুবে যাচ্ছিলেন

দু'জন সম্মানিতা আমার স্মৃতিতে অম্লান হয়ে আছেন। একজন নাজমা জেসমিন চৌধুরী; অন্যজন রিফাত কাদের। নাজমা জেসমিন চৌধুরী গত হয়েছেন; আর রিফাত কাদের বেঁচে আছেন। সামাজিক দৃষ্টিতে রিফাত কাদের বিখ্যাত কেউ নন; কিন্তু সততা, উদারতা এবং মানবিক ভাবনায় তিনি গোপনেই বেড়ে ওঠা এক উজ্জ্বল নক্ষত্র। অন্যদিকে নাজমা জেসমিন চৌধুরী_ গভীর জীবনবোধ এবং তার ব্যাপ্ত অনুভূতিতে এক অসাধারণ মানুষ। সামাজিকভাবে তিনি প্রতিষ্ঠিত; কারণ তিনি একজন প্রতিভাবান লেখক। তার সৃষ্টির জন্যই ভবিষ্যৎ তাকে ধারণ করতে বাধ্য। ব্যক্তিগতভাবে তার আরও একটি পরিচয় আছে; তিনি আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর স্ত্রী। সমাজে অন্যান্য নারীর মতো এটি তার একমাত্র পরিচয় নয়। নিজস্ব সিদ্ধান্ত, সমাজ সম্পর্কে ব্যক্তিগত ভাবনায় তিনি এককভাবেই প্রতিষ্ঠিত, শ্রদ্ধার।
নাজমা জেসমিন চৌধুরীর সঙ্গে আমার পরিচয় তার মৃত্যুর বেশ ক'বছর আগে। অবশ্য ছোটবেলায় গোপালগঞ্জ মডেল স্কুলে পড়ার সময় তার নাম শুনেছি। গুরুজনেরা এই মহকুমা শহরের গুণীজন সম্পর্কে আলোচনা করলেই নাজমা জেসমিন চৌধুরীর নামটি উচ্চারণ করতেন। গুরুজনদের আলোচনায় আরও একটি নাম বারবার শোনা যেত; তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি বিভাগে আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক ড. নিজামুল হক। তিনিও গত হয়েছেন।
আমাদের এলাকা থেকে একটা পত্রিকা বের হবে বলে নাজমা জেসমিন চৌধুরীর বাসায় গিয়েছিলাম লেখা আনতে। তখনই তাকে প্রথম দেখি। উদ্দেশ্য বলতেই তিনি তার এলাকার স্মৃতির প্রতি ব্যাকুল হয়ে উঠলেন। খানিকক্ষণ নীরব থেকে গম্ভীরভাবে বললেন, 'হাতে অনেকগুলো কাজ থাকলেও তোমাদের আমি লেখা দেব।' তারপর তিনি আমাদের কুশলাদি জিজ্ঞেস করলেন। এলাকার কথাও জানতে চাইলেন। সেদিন আমি যা লক্ষ্য করেছিলাম তা হলো, আলাপের ফাঁকে ফাঁকে তিনি যেন কেমন নীরব হয়ে যাচ্ছিলেন। পরে বুঝতে পেরেছিলাম, হয়তো নিজের আদিপুরুষের ভিটে, গ্রাম এবং তার স্মৃতিতে তিনি ডুবে যাচ্ছিলেন। কথা বলতে প্রথমে ভয় পেয়েছিলাম। কারণ ছোটবেলা থেকে যে বিশাল ব্যক্তিত্বের নাম শুনে আসছি, তার সামনে দাঁড়িয়ে আমি কী বলতে পারি! তবুও সাহস পাচ্ছিলাম, কারণ তার অসাধারণ মানবিক ব্যক্তিত্ব, আপন করে নেওয়ার অসামান্য ক্ষমতা ও সংবেদনশীলতা সর্বোপরি সব কিছুকে বিশাল বৃত্তে ভাববার ক্ষমতায় সেদিন আমি তার প্রতি আরও বেশি শ্রদ্ধাশীল হয়েছিলাম। একজন মানুষ যে ব্যক্তিত্বে, অনুভূতিতে, আচার-আচরণে কত বিরাট হতে পারেন_ নাজমা জেসমিন চৌধুরী তার বড় উদাহরণ। মাতৃসম শ্রদ্ধায় আমি বারবার তার প্রতি নতজানু হই। তিনি যখন এলাকার কথা জিজ্ঞেস করছিলেন তখন মনে হচ্ছিল, একজন মানুষ যখন প্রকৃত জ্ঞানী এবং চিন্তায় অসীম হয়ে ওঠেন তখন তিনি তার শিকড়ের সন্ধানে সচেতন হন; উৎসের সন্ধানে বারবার অতীতের দিকে ফিরে তাকান। যতদূর জানি, তিনি নিজ গ্রামে তেমন একটা যাননি; শহরেই মানুষ। তারপরও সেই আদিগ্রামের প্রতি তার এত আকর্ষণ কেন? এত শ্রদ্ধা কেন? অনেককেই তো জানি গ্রাম থেকে শহরে এসেই আদিকে অস্বীকার করেন; কিন্তু নাজমা জেসমিন চৌধুরী? তিনি তা পারেননি। কারণ তিনি তো অসাধারণ মানুষ; জীবন, মানুষের ব্যাপ্তি, তার অরক্ষিত গন্তব্য সবকিছুর প্রতি তার গভীর ভাবনা। প্রকৃত জ্ঞানী ছিলেন বলেই এই মাটি, মানুষ এবং বিশাল জগৎকে তিনি মানবজীবনের অবিচ্ছেদ্য প্রবাহ মনে করতেন। অবশ্য ভাববার কারণ নেই যে তার মাঙ্গলিক ভাবনা নিজ আদিতেই সীমাবদ্ধ ছিল। অতীতের দিকে ফিরে তাকানো এক, আর তাবৎ জগতের কল্যাণ-ভাবনা অন্য। যদিও আদি অবস্থানের প্রতি ভালোবাসা-ভক্তি এক সময় মানুষ অতিক্রম করে; পরে সেই ভালোবাসা তাবৎ জগতে মঙ্গলপ্রদীপ হয়ে জ্বলতে থাকে। অফুরন্ত কল্যাণ ভাণ্ডারের দ্বার খুলে যায়। অনন্তের দিকে ছুটে চলে মানুষ। তখন সম্ভবত উচ্চারিত হয় মঙ্গল আর কল্যাণের বাণী।
দিন চারেক পর লেখাটি আনতে গেলাম। ধারণা করেছিলাম_ তিনি হয়তো কয়েক পাতার একটি লেখা দেবেন। কিন্তু হাতে নিয়ে দেখলাম প্রায় বিশ পাতার একটি লেখা। ঝরঝরে বাংলায় তিনি তার গ্রাম, গোপালগঞ্জ এবং ফরিদপুরের স্মৃতিচারণ করেছেন। অল্প সময়ের মধ্যে এত বড় লেখা দেখে বিস্মিত হলাম। জিজ্ঞেস করলাম, এত বড় লেখা এত অল্প সময়ে আপনি কেমন করে লিখলেন? খানিক চুপ থেকে বললেন, 'যে ভূমিতে আমার পূর্বপুরুষের অস্তিত্ব মিশে আছে সেই গ্রাম এবং ফরিদপুরকে নিয়ে তো এই ক'দিনে বই লেখা যায়।' গল্পটি পড়ার পর আরও অবাক হলাম। কারণ স্মৃতিচারণমূলক গল্পে তিনি গ্রামের বর্ণনা দিয়েছেন। সেখানকার মানুষের পারস্পরিক সখ্য, আন্তরিকতা আর সহানুভূতির বর্ণনা দিয়েছেন ঠিকই; কিন্তু সেই বর্ণনা শেষ অবধি তার এলাকায় আটকে থাকেনি। পরিচিত মুখ ছাপিয়ে এসেছে অসংখ্য মানুষ; আর পরিচিত দৃশ্য মিশে একাকার হয়ে গেছে বাংলাদেশের দৃশ্যে। শেষ অবধি মানুষ, গ্রাম, পাখি, সন্ধ্যা সব মিলে গোটা দেশের স্মৃতিতে পরিণত হয়েছে। এমনই হয়। বড় মানুষের একান্ত কিছু থাকে না। একান্তকে তারা সমষ্টির মাঝে বিলিয়ে দেন। গল্পটি পড়ে ভাবলাম; তিনি কি জানেন, তার কাজল-কালো নীরব গ্রাম এখন আর তেমনটি নেই। গ্রামে এখন অভাব ঢুকেছে; ভীষণ অভাব। সখ্যের বদলে গ্রামে এখন প্রচণ্ড বিরোধ। এগুলো জানতেন ঠিকই; তারপরও চিন্তার সৌন্দর্যকে তিনি বাস্তবে চির প্রতিষ্ঠা করতে চাইতেন। এ জন্য অসুন্দরের বিরুদ্ধে তার প্রতিবাদ ছিল। আজ বড় পরিতাপ হচ্ছে। কারণ গল্পটির দ্বিতীয় কোনো কপি না রেখেই ম্যাডাম মূল কপি আমাদের হাতে তুলে দিয়েছিলেন। শেষে পত্রিকাটি বের হয়নি। ক'জন স্বার্থপর মানুষের কারণে অনুষ্ঠানটিও শেষে হয়নি। লেখাটি ওদের কাছ থেকেই খোয়া যায়। তবু লেখাটি উদ্ধারের উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়েছি।
এরপর তার সঙ্গে দেখা হয়েছে; আলাপও করেছি। তার মুখাবয়ব ছিল দৃঢ় আত্মপ্রত্যয় আর মায়ের প্রতিচ্ছবিতে সমৃদ্ধ। প্রতিটি মানুষেরই মা থাকে। আবার প্রতিটি ব্যক্তি মা_ সমষ্টির মূর্ত প্রতীক মা।
১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯ সকালে ম্যাডামের লাশ দেখতে গিয়েছিলাম। কফিনের ভেতর সাদা কাপড়ে মোড়ানো লাশ। নিথর হয়ে শুয়ে আছেন। অনন্ত থেকে এসেছিলেন, আবার অনন্তের গর্ভে বিলীন হয়ে যাবেন। মাঝখানে এখানে কিছু সময় থেকে যাওয়া। অনন্তের যাত্রী হয়েও ক্ষণিক জীবনের জন্য মানুষের কেন এত বিপুল আয়োজন। মৃত্যুর মুখোমুখি তো সবাইকেই হতে হয়; কিন্তু এই হিমশীতল মৃত্যু যদি অপরিণত বয়সে আঘাত হানে, তবে তা মেনে নিতে বড় কষ্ট হয়। নাজমা জেসমিন চৌধুরীর অকাল মৃত্যুতে তাই আমাদের কান্না।
 

No comments

Powered by Blogger.