সংসদ ও বিচার বিভাগ-বিতর্ক-সংঘাত অনাকাঙ্ক্ষিত

গণতন্ত্র ও রাষ্ট্রের প্রধান দুই স্তম্ভ জাতীয় সংসদ এবং বিচার বিভাগের মুখোমুখি অবস্থান কোনোভাবেই কাম্য নয়। কর্তৃত্ব নিয়ে সংঘাত কিংবা বাকবিতণ্ডাও অনাকাঙ্ক্ষিত। দুর্ভাগ্যজনকভাবে, ১৮ জুন জাতীয় সংসদে স্পিকারের দেওয়া একটি রুলিং এবং ২৭ আগস্ট হাইকোর্টের রায়ে এ রুলিংকে 'অকার্যকর ও আইনগত ভিত্তিহীন' বলাকে কেন্দ্র করে


এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী জাতীয় সংসদ সার্বভৌম এবং বিচার বিভাগ স্বাধীন। উভয়ের কর্মপরিধি নির্দিষ্ট। একটি প্রতিষ্ঠান আরেকটি প্রতিষ্ঠানকে খাটো করলে কিংবা তার চেষ্টা হলে প্রকৃতপক্ষে উভয়েরই মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়। ঘটনার প্রেক্ষাপট নিম্নরূপ। সড়ক ও জনপথ বিভাগের দখলে থাকা সুপ্রিম কোর্টের সম্পত্তি উচ্চ আদালতের রায়ে পুনরুদ্ধারের বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদের স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদের বক্তব্যকে হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন রাষ্ট্রদ্রোহিতা এবং আদালত অবমাননাকর বলে অভিহিত করলে তার প্রতিক্রিয়ায় জাতীয় সংসদে বিষয়টি উত্থাপিত হয়। এ সময়ে কোনো কোনো সদস্য সর্বোচ্চ আদালত সম্পর্কে বক্তব্য রাখতে সংযমের পরিচয় দেননি_ এমন অভিমত রয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক চিত্তাকর্ষক হতে পারত এবং গণতান্ত্রিক সমাজে এমনটিই প্রত্যাশিত। কিন্তু কার্যত তা সৃষ্টি করেছে উদ্বেগের। আদালতের পর্যবেক্ষণ বা রায়ের বিষয়ে কথা বলা, এমনকি সমালোচনার অধিকার সংসদের রয়েছে। বিচার বিভাগের কার্যক্রম সম্পর্কে আইন প্রণয়নের অধিকারও একান্তই তাদের। তবে এ দুটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান পরস্পর শ্রদ্ধাশীল থেকে সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করবে_ এটাই কাম্য থাকে। আমাদের অনেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য সংসদের ভেতরে ও বাইরে প্রায়শ অসংলগ্ন ও বেফাঁস মন্তব্য করেন, যা জনগণ আশা করে না। বিচার বিভাগের কাছেও থাকে অভিন্ন প্রত্যাশা। আইনমন্ত্রী ব্যারিস্টার শফিক আহমেদ হাইকোর্টের রায় প্রসঙ্গে বলেছেন, স্পিকার এ সংক্রান্ত যে রুলিং দিয়েছেন, সে বিষয়ে হাইকোর্টের রায় সঠিক হয়নি। তিনি যথার্থই বলেছেন, জাতীয় সংসদ সার্বভৌম প্রতিষ্ঠান এবং এর সদস্যদের সেখানে স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকার স্বীকৃত। স্পিকার সাংবিধানিক ক্ষমতাবলে সংসদের বিধিমালা অনুযায়ী রুলিং দিয়েছেন। সুপ্রিম কোর্ট সংবিধানের অভিভাবক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে থাকেন। বিচার বিভাগ যদি দেখে যে, সংসদে এমন আইন প্রণীত হয়েছে, যা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক তাহলে সেটা বাতিল ঘোষণার অধিকার আদালতের রয়েছে। সংবিধানের পঞ্চম ও সপ্তম সংশোধনী সম্পর্কে সর্বোচ্চ আদালতের রায় এ কারণেই যুগান্তকারী হিসেবে স্বীকৃত। জাতীয় সংসদে এ রায় দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অনুমোদিত হয়েছিল। কিন্তু আদালত তাকে সংবিধানসম্মত মনে করেননি। অষ্টম সংশোধনীর অংশবিশেষও আদালত অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছিলেন।
স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে সংসদে আলোচনার পর জাতীয় সংসদের স্পিকার অ্যাডভোকেট আবদুল হামিদ এ বিষয়ে যে রুলিং প্রদান করেন, তাতে এর নিষ্পত্তি হয়েছে_ এমনই ধারণা করা হয়েছিল। তিনি বিষয়টিকে প্রধান বিচারপতির এখতিয়ারে ছেড়ে দিয়েছিলেন। কিন্তু সোমবার হাইকোর্টের পর্যবেক্ষণ প্রকাশিত হওয়ার পর বিতর্কটি নতুন করে সামনে এসেছে। আগামী ৪ সেপ্টেম্বর জাতীয় সংসদের অধিবেশন শুরু হলে সেখানে এ নিয়ে উত্তাপ ছড়াবে_ এমন আশঙ্কাও করা হচ্ছে। তবে আশার কথা এই যে, আইনমন্ত্রী বলেছেন, সংসদ শুরু হওয়ার আগেই বিষয়টির নিষ্পত্তি হবে। আমরা আশা করব, এ প্রতিষ্ঠান দুটি যাতে আরও শক্তিশালী হয়ে একে অপরের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও সহনশীল হয়ে কাজ করতে পারে, সে বিষয়ে স্পিকার এবং প্রধান বিচারপতি তাদের প্রজ্ঞা ও বিচক্ষণতা কাজে লাগাবেন এবং এভাবে অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের অবসান ঘটবে।
 

No comments

Powered by Blogger.