পরিবেশ বনাম ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প by ড. এম শামসুল আলম

এশিয়া এনার্জি কর্তৃক উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে ফুলবাড়ী কয়লা খনি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তাব অনুমোদনের প্রয়োজনে তা মূল্যায়নের জন্য সরকার প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মো. নুরুল ইসলামের সভাপতিত্বে ১১ সদস্যের একটি কারিগরি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করে।


কমিটি ২০০৬ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর সরকারের কাছে পেশকৃত মূল্যায়ন প্রতিবেদনে নিম্নবর্ণিত কারণ উল্লেখ করে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে ওই খনি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তাব নাকচ করে দেয় :
১. উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে ফুলবাড়ী কয়লাখনি উন্নয়নে স্থানীয় জনসাধারণের সম্মতি রয়েছে বলে এশিয়া এনার্জি তার পরিকল্পনা প্রস্তাবে যে দাবি করেছে, তা যথার্থ ছিল না।
২. যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে পরিবেশ সংরক্ষণ ও তদারকির জন্য কঠোর আইন ও প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা খনি উন্নয়নের ফলে এসিড মাইন ড্রেনেজ ম্যাটেরিয়ালসহ অন্যান্য পরিবেশগত সমস্যার উদ্ভব হয়েছে এবং হাজার হাজার মাইল নদীপথ এ কারণে দূষিত হয়েছে। এ বিবেচনায় পরিবেশবান্ধব কয়লা খনি উন্নয়নের লক্ষ্যে কয়লা অনুসন্ধান, খনি খনন, কয়লা উৎপাদন, মজুদকরণ, পরিবহন ও ভূমি পুনরুদ্ধার সম্পর্কিত বিদ্যমান আইনকানুন সংস্কার এবং পরিবেশ সংরক্ষণ আইন সংশোধন ও প্রয়োজনে নতুন আইন সংযোজন করা ব্যতীত উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা উৎপাদন বাস্তবসম্মত নয়।
৩. ফুলবাড়ীতে ৩৫ বছর ধরে কয়লা উৎপাদনের প্রয়োজনে খনি শুষ্ক রাখতে পাম্পের দ্বারা ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের যে পরিকল্পনা করা হয়েছে, তাতে ২১৪ কিলোমিটার এলাকা মরুকরণের শিকার হবে। ফলে সেখানে বসবাসরত দুই লাখ ৪০ হাজার অধিবাসী কি ভয়াবহ পরিস্থিতির শিকার হতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যমান ভূগর্ভস্থ জলাধারের কি পরিণতি হবে, তা বোঝা এবং প্রতিকারের মতো অভিজ্ঞতা ও সামর্থ্য এশিয়া এনার্জির নেই।
৪. পৃথিবীর যেকোনো স্থানের তুলনায় ফুলবাড়ী খুবই ঘন বসতিপূর্ণ এলাকা। অর্থাৎ প্রতি বর্গকিলোমিটারে ১০৭৯ জনেরও বেশি। অথচ অস্ট্রেলিয়ায় তিনজন, যুক্তরাষ্ট্রে ৩২ জন, ইন্দোনেশিয়ায় ১২০ জন, চীনে ৩৯ জন, জার্মানিতে ১৩৭ জন, এমনকি ভারতে ৩৬৩ জন। এ কারণে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে ফুলবাড়ী খনি উন্নয়ন অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। ৪০ থেকে ৫০ হাজার মানুষকে খনি এলাকা থেকে সরিয়ে নিতে হবে এবং তাদের পুনর্বাসনের জন্য আবশ্যকীয় জমি পাওয়া যাবে না। এসব মানুষের অধিকাংশই কৃষি থেকে চিরতরে নির্বাসিত হয়ে ছিন্নমূল ভাসমান মানুষে পরিণত হবে। এ বিপর্যয় গ্রহণযোগ্য নয়।
৫. ঘনবসতি ছাড়াও ফুলবাড়ী খনি এলাকার জমি খুবই উর্বর ও তিন ফসলি, সে বিবেচনায় এ খনি কৃষিসম্পদ ধ্বংসকারী। এ খনির প্রয়োজনে পর্যায়ক্রমে মোট ছয় হাজার ৬৮৮ হেক্টর অর্থাৎ ২৬.৪ বর্গমাইল আবাদি কৃষিজমি ব্যবহৃত হবে এবং এ বিস্তীর্ণ এলাকায় উৎপাদিত কৃষিপণ্য থেকে চিরতরে বঞ্চিত হতে হবে, যা কাম্য নয়।
৬. খনির ফলে প্রত্যক্ষভাবে মাত্র এক হাজার ৩৬০ জন মানুষের কর্মসংস্থান হবে। এ কর্মের অধিকাংশ উচ্চ প্রযুক্তিনির্ভর হওয়ায় স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের তা প্রাপ্তির সম্ভাবনা কম।
৭. খনি খননে পরিবেশ দূষণকারী দূষক পদার্থ এসিড মাইন ড্রেনেজ ম্যাটেরিয়াল সৃষ্টি হয়। পরিবেশ রক্ষার জন্য এই দূষণ পদার্থ খনির পাড়েই লম্বালম্বিভাবে মাটিচাপা দিয়ে ঢেকে রাখার জন্য ২০ বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ১২০ মিটার অর্থাৎ ৩৯৪ ফুট উঁচু একটি মাটির টিলা সৃষ্টি করা হবে। পরিবেশ সংরক্ষণের এ পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য নয়।
৮. কয়লা উৎপাদন শেষে খনি খননের মাটি এসিড মাইন ড্রেনেজ ম্যাটেরিয়াল মাটিচাপা দিয়ে রাখার কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় ৬৯৬ হেক্টর এলাকাজুড়ে একটি দূষিত জলাধার সৃষ্টি হবে। সব মিলিয়ে ২৬.৪ বর্গকিলোমিটার আবাদযোগ্য কৃষিজমি চিরতরে ধ্বংস হবে। স্থানচ্যুত হবে রেললাইন, মহাসড়ক ও ফুলবাড়ী শহর। এ অবস্থা গ্রহণযোগ্য নয়।
৯. এশিয়া এনার্জির পক্ষে অস্ট্রেলিয়ান কনসাল্টিং কম্পানি GHD ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প এলাকায় খনি উন্নয়নকালে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবস্থাপনা Numerical ground water modeling-এর মাধ্যমে বিশ্লেষণ করে। কিন্তু এ বিশ্লেষণের যথার্থতা প্রমাণিত (Validation) নয়।
উল্লেখ্য, টাটার উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে বড়পুকুরিয়ায় কয়লা খনি উন্নয়ন প্রকল্প দুটি কারিগরি কারণে ঝুঁকিপূর্ণ বলে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের দুজন পরামর্শক টাটার বিনিয়োগ প্রস্তাব মূল্যায়নে অভিমত দেয়। একটি হলো, খনি এলাকা থেকে পানি উত্তোলনের ফলে খনির গভীরতা যত বৃদ্ধি পাবে, তার স্কয়ার রেটে খনির চারপাশের এলাকা এবং কিউবিক রেটে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর প্রভাবিত হবে। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, গভীরতা যদি দুই মিটার বৃদ্ধি পায়, তাহলে চার বর্গমিটার এলাকা এবং আট ঘনমিটার পানির স্তর প্রভাবিত হবে। আবার গভীরতা যদি তিন মিটার বৃদ্ধি পায়, তাহলে ৯ বর্গমিটার এলাকা এবং ২৭ ঘনমিটার পানির স্তর প্রভাবিত হবে। সুতরাং সামান্য গভীরতা বৃদ্ধিতে প্রভাবিত এলাকা ও পানির স্তর কত ব্যাপক ও বিস্তৃত, তা এ উদাহরণ থেকে সহজে বোঝা যায়। অন্যটি হলো- খনি যত গভীর হবে, খনির স্লোপ বা পাড়ের ধস ঠেকানো তত কঠিন হবে। ফুলবাড়ী এলাকায় যে বিশাল ভূগর্ভস্থ পানির আধার রয়েছে, তাতে খনি শুষ্ক রাখার জন্য মিনিটে ৮-১০ লাখ লিটার পানি সরিয়ে নিতে হবে- তাও দুরূহ। ব্রিটিশ আর্থিক সহায়তায় ১৯৯১ সালে ব্রিটিশ কনসাল্টিং ফার্ম, War dell Armstrong বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা উৎপাদনের সম্ভাবনা এই দুটি বিদ্যমান ঝুঁকির কারণে নাকচ করে দেয়। ফুলবাড়ী কয়লা প্রকল্প বড়পুকুরিয়ার পাশেই এবং অনুরূপ। বিগত ১৫ বছরে প্রযুক্তির এমন কী উন্নয়ন ঘটেছে যে যা প্রয়োগে ওই ঝুঁকি মোকাবিলায় এশিয়া এনার্জি সক্ষম- এই দৃষ্টিকোণ থেকে কমিটি এশিয়া এনার্জির উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে খনি উন্নয়ন পরিকল্পনা প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য বলে গণ্য করেনি। পরিশেষে খনির যেসব এলাকা ভরাট হবে, সেসব এলাকার কৃষি উৎপাদনশীলতা আগের অবস্থায় ফিরে পাওয়া দুরূহ। খনির পাড়ে মাটিচাপা দিয়ে এসিড মাইন ড্রেনেজ ম্যাটেরিয়াল রাখা হলে তাপমাত্রার তারতম্যে ওই মাটি সংকোচন-প্রসারণ হবে এবং এ মাটিগাত্র ফেটে মাটির অভ্যন্তরে চাপা দেওয়া দূষণ পদার্থ বাইরে বেরিয়ে পরিবেশ দূষিত হবে। পানির সঙ্গে মিশে এ দূষণ আশপাশে বহু দূর পর্যন্ত বিস্তৃত হবে। উল্লেখ্য, ২০০৭ সালের ৯ মার্চ ওয়াশিংটন পোস্ট পত্রিকায় প্রকাশিত খবরে বলা হয়, ব্রিটিশ-কলাম্বিয়া এস্টেটে কানাডিয়ান সরকার উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা খনি উন্নয়নের উদ্যোগ নিলে পরিবেশদূষণ হবে- এই বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্র বিরোধিতা করায় তা বাতিল হয়।
অতএব কয়লানীতিতে কয়লা রপ্তানি এবং উন্মুক্ত খনন পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন নিষিদ্ধ না হলে এ কয়লানীতি জনস্বার্থ ও পরিবেশসম্মত হবে না।

২৮.৬.২০১২

No comments

Powered by Blogger.