স্বপ্ন দেখতে চাই by শামীম আহমদ

বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড প্রথম অনুষ্ঠিত হয় সম্ভবত ১৯৭৪ সালে আমেরিকার নর্থ ক্যারোলিনা স্টেটে। উদ্দেশ্য ছিল, ছাত্রছাত্রীদের বিজ্ঞান বিষয়ের প্রতি উৎসাহী করে তোলা, চিন্তাশক্তির বিকাশ ঘটানোর পরিবেশ তৈরি করা ও এ ব্যাপারে উৎসাহিত করা। এরপর ধীরে ধীরে এই গঠনমূলক উদ্যোগটি পুরো আমেরিকায় ছড়িয়ে পড়ে এবং উদ্যোক্তারা ব্যাপক সফলতা লাভ করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, মিশিগান স্টেটে বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে শুরুতে প্রতিযোগীর সংখ্যা ছিল


মাত্র ৬০০ জন, বর্তমানে এই প্রতিযোগীর সংখ্যা লক্ষাধিক। পুরো আমেরিকায় এখন প্রায় ১৬ হাজার স্কুল বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডে অংশগ্রহণ করে। এমনিতেই ওইসব দেশে শিক্ষা ব্যবস্থা অনেক উন্নত, ছোটবেলা থেকেই শিক্ষার্থীদের মুখস্থ করতে নিরুৎসাহিত করা হয়, শুরু থেকেই তাদের চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য সুন্দর পরিবেশ তৈরি করা হয়। তার ওপর বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের মতো আয়োজন তাদের আরও বেশি দক্ষ হয়ে উঠতে উৎসাহিত করে।
ইউএনডিপির তথ্য অনুসারে, মানবসম্পদ উন্নয়ন সূচকে বাংলদেশের অবস্থান ১৪৬, যেখানে জনসংখ্যা বহুল চায়না ও ইন্ডিয়ার অবস্থান যথাক্রমে ১০১ ও ১৩৪। আমাদের প্রাকৃতিক সম্পদ নেই। প্রায় প্রাকৃতিক সম্পদবিহীন দেশ জাপান, শুধু জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা, সততা আর পরিশ্রমের মাধ্যমে মানবসম্পদে পরিপূর্ণ বিশ্বের দ্বিতীয় অর্থনৈতিক শক্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। জাপানের পথ অনুসরণ করে কোরিয়া, মালয়েশিয়া, হংকংসহ অনেক দেশ এগিয়ে যাচ্ছে।
একটা সময় ছিল, সবচেয়ে মেধাবীরা বিজ্ঞান পড়তে উৎসাহিত হতো, কিন্তু এখন সেই চিত্রও বদলে যাচ্ছে। বিষয়টির গুরুত্ব বুঝতে পেরে বাংলাদেশ একাডেমী অব সায়েন্স, স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের এবং শিক্ষকদের বিজ্ঞান বিষয়ে উৎসাহিত করতে ২০০৬ সাল থেকেই নানামুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করে যাচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় তৃতীয়বারের মতো জাতীয় বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ১৩ জানুয়ারি সারা দেশে একসঙ্গে আঞ্চলিক পর্যায়ে এই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হবে এবং এসব আঞ্চলিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতা থেকে বাছাইকৃত প্রতিযোগীরা জাতীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। লিখিত পরীক্ষায় অংশগ্রহণ ছাড়াও ছাত্রছাত্রীদের জন্য একটি উন্মুক্ত প্রশ্ন-উত্তর পর্ব থাকবে, যেখানে কিছু বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ছাত্রছাত্রীদের জ্ঞানবিজ্ঞান সংক্রান্ত বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেবেন। এবারের বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের বড় একটি বিষয় এর সঙ্গে আয়োজক হিসেবে যুক্ত হয়েছে সমকাল।
মুখস্থ করাটা বিজ্ঞান নয়, মুখ বুজে মেনে নেওয়াটাও বিজ্ঞান নয়, বিজ্ঞান মানেই যুক্তির ওপর যুক্তি খাড়া করে সিদ্ধান্তে পেঁৗছানো, বিজ্ঞান মানেই প্রশ্ন করা আর সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা, কী হচ্ছে, কেন হচ্ছে, কীভাবে হচ্ছে ইত্যাদি। সৃজনশীলতা বিকাশের জন্য দরকার প্রয়োজনীয় অনুশীলন আর সঠিক নির্দেশনা। দুর্ভাগ্য আমাদের, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাপনা সৃজনশীল মেধা বিকাশের জন্য অনুকূল নয়।
বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের প্রশ্নগুলো সৃজনশীলধর্মী ও বিজ্ঞানের প্রায়োগিক ভিত্তিক। ফলে ছাত্রছাত্রীরা সৃজনশীলধর্মী প্রশ্নের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার পাশাপাশি বিজ্ঞানের নানাবিধ প্রয়োগ সম্পর্কে ধারণা পাবে, এর ফলে ছাত্রছাত্রীরা ও অভিভাবকরা, উভয়েই বুঝতে পারবেন যে, বিজ্ঞান বিষয়ের পাঠ্যপুস্তকের বিষয়গুলোকে আরও ভালোভাবে উপলব্ধি করা ও সেগুলোর ব্যবহারিক প্রয়োগের যোগ্যতা অর্জনের জন্য যেমন বিষয়ভিত্তিক গভীর জ্ঞান থাকা প্রয়োজন, ঠিক তেমনি তাদের চিন্তাশক্তি সৃজনশীল হওয়া প্রয়োজন।
একটি সত্যি গল্প বলা যাক। কলেজ পড়ূয়া একটি ছেলে তার ক্লাস ফাইভে পড়া বোনকে তাদের বাসার বিড়াল সম্পর্কে একটি রচনা লিখতে বলেছিল। বোনটি প্রথমে এই রচনাটি লিখতে আপত্তি করেছিল, কেননা, এটি তার পড়া নেই। ভাইটি তখন বোনকে সাহস দিয়ে বলেছিল, সে যা পারে তাই যেন লিখে। বোনটি লিখতে শুরু করল এবং চমৎকার একটি রচনা লিখল। তাদের একটি বিড়াল আছে, বিড়ালটি দেখতে সাদা, এটি দুধ খেতে পছন্দ করে এবং মাঝে মধ্যে চুরি করে দুধ খায়, বিড়ালটির নাম 'কাজলী' এবং এই 'কাজলী'। নামকরণের একটা ব্যাখ্যাও দিল যে, বিড়ালটির চোখ কাজল টানা সুন্দর বলেই হয়তো তার নাম 'কাজলী' দেওয়া হয়েছে ইত্যাদি। অর্থাৎ তাদের বিড়ালকে নিয়ে তার শিশুমনের প্রতিটি পর্যবেক্ষণ তার সৃজনশীল লেখায় ফুটে উঠেছে। সেই ছোট্ট মেয়েটি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে বিসিএস পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে, তখন তার প্রস্তুতি কেমন হচ্ছে সেটা দেখার জন্য, সেই বড় ভাই বোনটিকে 'পদ্মার ধারে একটি দুপুর'-এর ওপর একটি রচনা লিখতে বলল। মেয়েটি একটু ইতস্তত করে বলল, তার চেয়ে, পদ্মার পানি চুক্তির ওপর রচনা লিখি?'। ভাইয়া বলল, 'তা কেন, যেটা বলেছি, সেটার ওপরেই লিখ'। বোনটির আবারও উত্তর, বাংলাদেশ-ভারত নদীর পানি বণ্টন চুক্তি বা সার্কের ভবিষ্যৎ বা আন্তর্জাতিক নদীর আইনগুলোর ওপর লিখি?'। ভাইয়া অবাক হয়ে বলল, 'আমি যে বিষয়টা বলছি, সেটা তো আরও সোজা বিষয়, সেই বিষয়ের ওপর নয় কেন?' বোনটির নির্বিকার উত্তর_ 'এই বিষয়টি তার কমন নেই'। অর্থাৎ, ক্লাস ফাইভে পড়ার সময়ও যে মেয়েটির চমৎকার সৃজনশীলতা ছিল, আমাদের কোচিং সেন্টার নির্ভর আর মুখস্থভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা সেগুলো ধ্বংস করে তাকে একটি চমৎকার 'টেপ রেকর্ডার' বানিয়েছে, যে 'টেপ রেকর্ডার' রেকর্ডকৃত গান ছাড়া নতুন কিছুই শোনাতে পারে না।
ব্যতিক্রম অবশ্যই আছে। এই পশ্চাদপদ ও গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থার মধ্যে থেকেও অনেক ছেলেমেয়ে তাদের সৃজনশীলতা ধরে রাখতে পেরেছে বা পারে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আমাদের জন্য গর্ব বয়ে এনেছে। কিন্তু গতানুগতিক শিক্ষাব্যবস্থা, পরীক্ষা পদ্ধতি, প্রশ্নের ধারা, উত্তরপত্র মূল্যায়ন পদ্ধতি ইত্যাদি আমাদের ছেলেমেয়েদের একটি বড় অংশেরই সৃজনশীলতাকে ধ্বংস করে দেয় এবং তাদের প্রতিভা বিকাশে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। ফলে প্রতি বছর আমরা যে সংখ্যক সৃষ্টিশীল প্রতিভাবান পেয়ে থাকি, প্রকৃত সংখ্যা তার চেয়ে অনেক অনেক বেশি হতে পারত।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মানের গল্প এখানেই শেষ নয়। অক্টোবর ২০১১-এ প্রকাশিত বিশ্বের প্রথম ৪০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই। এমনকি এশিয়ার প্রথম ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ও নেই, এই ১০০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ইন্ডিয়ার ৩টি আইআইটি রয়েছে, বাকিগুলো মূলত জাপান, চায়না, হংকং, সিঙ্গাপুর, কোরিয়া আর মালয়েশিয়ার বিশ্ববিদ্যালয়। আমাদের লজ্জার কারণ এখানেই শেষ নয়, যে দেশটিকে কথায় কথায় প্রায় অকার্যকর দেশ বলা হয়, সেই পাকিস্তানেরও একটি বিশ্ববিদ্যালয় ৮৪ নম্বরে আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এসব র‌্যাঙ্কিং নিয়ে কিছু বিতর্ক থাকতে পারে হয়তো, এক নম্বরের বিশ্ববিদ্যালয় পাঁচ নম্বরে হবে কি-না, বা উল্টোটা ইত্যাদি। কিন্তু এক নম্বরের বিশ্ববিদ্যালয় নিশ্চয়ই ১০০তম নম্বরে যাবে না বা উল্টোটা হবে না। বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড আমাদের ছেলেমেয়েদের সম্পূর্ণ বদলে হয়তো দিতে পারবে না, কিন্তু একটা নতুন এবং বিজ্ঞানের মজার ব্যবহারিক জগৎ সম্পর্কে তাদের ধারণা দিতে পারবে। বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের ব্যতিক্রমধর্মী প্রশ্নের ধারা শুধু যে ছাত্রছাত্রীদের সৃজনশীল হয়ে উঠতে পথ দেখাবে বা উৎসাহিত করবে তা নয়, তাদের বিজ্ঞানমনস্ক করে তুলবে এবং বিজ্ঞান বিষয়গুলোকে হৃদয়ঙ্গম করার জন্য পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুর প্রাসঙ্গিক অন্যান্য বিষয়েও জ্ঞান অর্জনের জন্য উৎসাহিত করে তুলবে। তা ছাড়া বিজ্ঞান অলিম্পিয়াডের আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন প্রশ্নগুলো ছেলেমেয়েদের আন্তর্জাতিক মানের জন্য প্রতিযোগিতামুখী করে তুলবে, বিষয়বস্তুকে মুখস্থ করার চেয়ে সেগুলো বোঝার ব্যাপারে তাদের আগ্রহী করে তুলবে। কাড়ি কাড়ি নম্বর পাওয়া 'টেপ রেকর্ডার' হওয়ার স্বপ্ন দেখতে নয়, বরং তারা তাদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের জন্য মনোযোগী হবে, তাদের চিন্তাভাবনা ও কাজকর্ম আরও সৃষ্টিশীল হবে, আর এভাবে একদিন নিশ্চয়ই আমাদের এসব লুক্কায়িত প্রতিভাবান ছেলেমেয়েদের প্রতিভা বিকশিত হবে, তখন তাদের মধ্যে থেকে আমরা নতুন নতুন স্যার সত্যেন বোস, স্যার জগদীশ চন্দ্রের মতো বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানীদের খুঁজে পাব, সঙ্গে সঙ্গে আমরা আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর হারানো ঐতিহ্যও ফিরে পাব। এই স্বপ্নই আমরা দেখতে চাই, কেননা এসব স্বপ্নই আমাদের বাঁচিয়ে রাখে, শক্তি জোগায়।

লেখক : বিভাগীয় সমন্বয়কারী, বিজ্ঞান অলিম্পিয়াড ২০১২, সহযোগী অধ্যাপক, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
মেইল :ংযধসরসথপংঃ@ুধযড়ড়.পড়স

No comments

Powered by Blogger.