সদরে অন্দরে-কন্যাশিশু যে আমাদেরই সন্তান by মোস্তফা হোসেইন

চোখ যখন পৃৃথিবীর বিশালত্বকে অবলোকন করার সুযোগ পায়, তখনই চোখের সামনে বড়মাপের পর্দা দেওয়া হয় শক্তভাবে। মজবুত এই পর্দা ভেদ করে শিশুটি দেখতে পারে না তার সামনে কী হচ্ছে। কোথায় যেতে হবে তাকে? কিংবা বেঁচে থাকার জন্য যে সুন্দর পথ আছে সামনে, সেই পথও পাবে না সে।


অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, এই অবস্থাটা আমাদের দেশের প্রায় সব কন্যাশিশুর বেলায় প্রযোজ্য। ব্যতিক্রম অবস্থাটা ব্যতিক্রমই। খুব কম কন্যাশিশু স্বাধীনতা পায় মানুষ হিসেবে বেঁচে থাকার জন্য। তার সামনের পৃথিবী উন্মুক্ত হলেও সেখানে তার হাত-পা বাঁধা থাকে। পারিবারিক ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতায় তার জীবন হয়ে ওঠে দুর্বিষহ। এই চিত্র গোটা বাংলাদেশের। শহর কিংবা গ্রামে এর পার্থক্য শুধু অবস্থানগত। এমনকি শিক্ষিত পরিবেশেও একজন কন্যা নিগৃহীত হয়। কোনো প্রতিকার আমাদের নেই যেন। কন্যা হলেই কি তাকে দুর্ভোগ পোহাতে হবে? এই প্রশ্নও দীর্ঘদিনের। কেউ জানে না সহজে এর প্রতিকার হবে কি না।
তার চেয়েও ভয়াবহ অবস্থা আমাদের দেখতে হয় অহরহ। বিশ্বাস করতে অসুবিধা হলেও সত্য, শুধু মেয়ে হওয়ার কারণে কোনো কোনো কন্যাশিশুর ভ্রূণ মাতৃগর্ভেই নিপাত করে দেওয়া হয়। দুনিয়ার আলো দেখার আগেই এভাবে কন্যাশিশুকে হত্যা করার উদাহরণও আমাদেরই সভ্য পৃথিবীতে অনেক। আবার অন্যভাবে যদি দেখি, কন্যার দায় বইতে না পেরে বাবা কিংবা মা মেয়েকে দত্তক দিতে চান। সেটা ওই তুলনায় অনেক ভালো হলেও কন্যাশিশুর প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশে কিন্তু মোটেও কম নয়। আবার এমনও তো দেখা যায়, মেয়েটিকে কোনো জনারণ্যে আস্তে করে ঠেলে দিয়ে পালিয়ে গেল তার মা-বাবা। মেয়েটি একসময় বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় মা-বাবার সানি্নধ্য থেকে। উদাহরণ আছে আরো কত! এমন গল্প তো আরো আছে, রেলস্টেশনে গেছে বাবা। হাতে ধরা কন্যা। কত আহ্লাদে মেয়েটি বাবার কাছে বায়না ধরেছে বিস্কুট খাবে। বাবাও মেয়েটিকে পায়ে পায়ে দোকানের সামনে নিয়ে যায় হাত ধরে কিংবা কোলে করে। হাতে তুলে দেয় এক প্যাকেট বিস্কুট। খাও মা বলে হয়তো প্যাকেটটিও খুলে দেয় মেয়ের সামনে। মেয়েটি বাবার আদর পেয়ে মহাখুশি। তৃপ্তিসহ খেতে থাকে বাবার কেনা বিস্কুট। কিন্তু সে জানে না এটাই তার জীবনের শেষ বাবার আদর। কারণ একটু পর ট্রেন এলে বাবা দৌড়ে যান ট্রেনের দিকে। মেয়ে থেকে যায় পেছনে রেলওয়ে স্টেশনের দোকানঘরের সামনে। ট্রেন ছাড়ে স্টেশন এলাকা। গতি বাড়ে ট্রেনের। আর সেই যে শিশুটি তারও দূরত্ব বাড়ে। একসময় স্টেশনটা হারিয়ে যায়। আর মেয়েটি? সে মিশে যায় অদৃশ্য হয়ে যায় বাবার চোখে। হারিয়ে যায় অচেনা পৃথিবীতে। এই চিত্রটি গল্পের মতো মনে হলেও এমন দৃশ্য কিন্তু একেবারেই অবাস্তব নয়।
কন্যাশিশুর দুরবস্থা নিয়ে আমাদের দেশে সেমিনার হচ্ছে, বক্তৃতা হচ্ছে, গোলটেবিল কিংবা টক শো_এসবের কমতি নেই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, ভাগ্যের হেরফের হয় না তাদের। এত কিছুর পরও কন্যাশিশুর জীবনে আশাব্যঞ্জক কোনো পরিবর্তন আসে না কেন? এই প্রশ্ন সামনে রেখেও অনেকেই প্রবন্ধ লিখেছেন। যৌথ পরিবারের কন্যাশিশুটির ভাতের প্লেটে ছেলেশিশুর চেয়ে কম তরকারি দেওয়া দিয়েই তো শুরু। তারপর জামাকাপড় কিংবা খেলনা দেওয়া। সেখানেও মেয়েটার ভাগ্যে নিম্নমানের খেলনা ইত্যাদি দেওয়া হয়। অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন হিসাব দিয়েছেন কন্যাশিশু এভাবে সারা পৃথিবীতে নিগৃহীত হচ্ছে। আর এভাবে হারিয়ে যাওয়া কন্যাশিশুর সংখ্যা ১০ কোটিরও বেশি। আঁতকে ওঠার মতো পরিসংখ্যান আমাদের সামনে। কী হচ্ছে এভাবে? জেন্ডার সমস্যাটা এখন শুধু সুযোগ-সুবিধার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। পৃথিবীর কোথাও কোথাও ছেলে আর মেয়ের আনুপাতিক হার অস্বাভাবিক হারে পার্থক্যকে দেখিয়ে দিচ্ছে। বৃহত্তম জনগোষ্ঠীর দেশ চীনে পরিসংখ্যান আশঙ্কাজনক। সেখানকার কোনো কোনো অঞ্চলে ছেলে আর মেয়ের আনুপাতিক হার ১৩০ঃ১০০ পর্যন্ত গিয়ে ঠেকেছে। সেখানে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, মেয়ে শিশুকে ভ্রূণ থাকতেই হত্যা করা হয়। চীনের মতো উন্নত দেশে পিছিয়ে পড়া এই উদাহরণ আমাদের কাঁপিয়ে দেয়। আর এই অবস্থা যে গরিব দেশগুলোতে কী ভয়াবহ তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর আমাদের মতো প্রযুক্তিগতভাবে পিছিয়ে থাকা দেশগুলোতে ভ্রূণ হত্যার অভিযোগ কম। এটা তাদের পিছিয়ে থাকার কারণে। তাই চীনের মতো ছেলে আর মেয়ের আনুপাতিক এই বৈষম্য হয়তো নেই, কিন্তু তাদের জন্মের পর যে অবজ্ঞা, তা কিন্তু উদ্বেগজনক।
আচরণগত বৈষম্য তাদের সমাজের নিকৃষ্ট শ্রেণীভুক্ত করেছে। কন্যাশিশুকে ধর্ষণের মতো বর্বরোচিত কাজটি এগিয়ে চলেছে ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর সঙ্গে তাল রেখে। একটি পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয় আমাদের দেশের কন্যাশিশুদের অবস্থা কী। ব্র্যাকের আয়োজনে পরিচালিত একটি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায়, ২০০৭ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়ে বাংলাদেশে ১৮ বছরের কম বয়সের কন্যাশিশুর ওপর নির্যাতন হয়েছে ব্যাপক। নারী নির্যাতনের ৬৮১টি ঘটনা বিশ্লেষণ করেছে তারা। আর সেখানে দেখা গেছে, ৮১টি ঘটনাই কন্যাশিশুকে ধর্ষণের। ধর্ষণের চেষ্টাকালে যে বর্বরোচিত নির্যাতন চালানো হয়েছে তা শুনলেও গা শিউরে ওঠে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ধর্ষণের পর শিশুটিকে হত্যা করে ফেলা হয়েছে। কোথাও এসিড দিয়ে ঝলসে দেওয়া হয়েছে তাকে। ব্র্যাক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ৬৮১টি নারী নির্যাতনের ঘটনার মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশই আবার কন্যাশিশু। এই ভয়াবহ অবস্থা দেখে অবশ্যই মনে করার কারণ আছে, চীনে যেভাবে কন্যাশিশুর ভ্রূণ থাকতেই মৃত্যুর মুখে পড়ে, আমাদের এখানে ঠিক সেভাবে হত্যা করা না হলেও তাকে তিলে তিলে মারা হয়। আর কন্যাশিশুটি যখন নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহত্যা করে, তখন তো আরো বেশি দুঃখজনক পরিস্থিতিরই সৃষ্টি হয়। নারী ও শিশু পাচার আমাদের দেশের জন্য বড় একটি সমস্যা। কিন্তু আর্থসামাজিক কারণে এই বর্বরতা থেকে আমরা রক্ষা পাচ্ছি না। ভাবতে অবাক লাগলেও সত্য হচ্ছে, আমাদের এখান থেকে প্রতি মাসে চার শতাধিক নারী-শিশু পাচার হয়ে যাচ্ছে। এই কলঙ্কজনক অধ্যায় যে কবে মুছে যাবে তা বলা মুশকিল। এ থেকে আমাদের পরিত্রাণ পেতে হবে।
আমাদের এখানে কন্যাশিশুদের চলার স্বাধীনতা নেই। নিরাপত্তাহীন তাদের জীবন। এখানে স্পষ্টত রাষ্ট্র ও সমাজ তাদের সাংবিধানিক সুবিধা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। সাধারণ নাগরিক সুবিধা থেকেও সে বঞ্চিত। কন্যাশিশু হওয়ার কারণে সে একা একা স্কুলে যেতে পারে না। বাজারে যেতে পারে না। এমনকি খেলার মতো সুবিধা থেকেও সে বঞ্চিত। এই যে বৈষম্য তা দূর করার জন্য যে সামাজিক মূল্যবোধ তাও দিনে দিনে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছে। যৌন নির্যাতনের শিকার মেয়েদের ক্ষেত্রে দেখা গেছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই তারা যখন একা থাকে তখনই তারা নির্যাতিত হয়। এই অবস্থা তাদের চলার স্বাধীনতা খণ্ডন করে দিচ্ছে, যা আমাদের দেশের সংবিধান সংরক্ষণ করার কথা। কার্যত তা অচল। আইন ও সংবিধানে কন্যাশিশুর অধিকার সংরক্ষণ করা হলেও সেখানে কার্যত তা অচল। কারণ এখানে যে সচেতনতাবোধ তার বড় অভাব। তাই কন্যাশিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে আমাদের সামাজিক মূল্যবোধ ও প্রকৃত শিক্ষা বাড়াতে হবে। এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় মূল্যবোধও মানুষকে সুপথে রাখতে সাহায্য করে। সে রকম পরিস্থিতি হোক আমাদের দেশে। আমাদের মেয়েরা নিরাপদে থাকুক।

mhussain_71@yahoo.com

No comments

Powered by Blogger.