ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ by ইকবাল হোসেন

দেশে ওষুধের বাজার প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। সরকারি হিসাব অনুযায়ী ১২শ' মূল ওষুধ ২৩ হাজার ব্র্যান্ডে উৎপাদন করছে ১৬৮টি প্রতিষ্ঠান। দেশি কোম্পানির উৎপাদিত প্রায় ৮৫ আইটেমের ওষুধ বিশ্বের ৭২টি দেশে রফতানি হচ্ছে। দেশের লাখ লাখ শিক্ষিত-প্রশিক্ষিত জনশক্তি ওষুধ খাতে চাকরি করছে। তথ্যগুলো দেশের জন্য সুখবর বটে। কিন্তু শিহরিত হওয়ার মতো যথেষ্ট প্রতারণাও চলছে এই খাতে।


বিভিন্ন সময়ে পুলিশ ও ভ্রাম্যমাণ আদালতের উদ্ঘাটিত তথ্যমতে আটা, ময়দা, চিনি, বেসন ও পানির সঙ্গে রঙ মিশিয়ে তৈরি হয় জীবনরক্ষাকারী ট্যাবলেট। চক, চুনাপাথর, ইটের গুঁড়া ইত্যাদি মিশিয়ে ট্যাবলেট বানিয়ে তা নামিদামি কোম্পানির মোড়কে পুরে বাজারজাত হচ্ছে। শুধু পানি দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে চোখ ও কানের ড্রপ। ২০০৯ সালের জুলাইয়ে একটি ফার্মার প্যারাসিটামল খেয়ে ২৮ শিশুর মৃত্যুর ঘটনা পুরো দেশের বিবেককে নাড়া দেয়। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে মানুষ যেটির মাধ্যমে সুস্থ বা বেঁচে থাকার স্বপ্ন বুনে তা এখন স্বপ্নভাঙার হাতিয়ার।
চলতি বছরের ৩ জুলাই স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দেওয়া তথ্যমতে, দেশে ওষুধ কোম্পানির সংখ্যা ১৬৮টি। ১২টি প্রতিষ্ঠান বিশ্ব স্বাস্থ্য সংখ্যা বা ডবি্লউএইচওর মান অনুযায়ী ওষুধ তৈরি করছে এবং শতাধিক কোম্পানির ওষুধ ডবি্লউএইচওর জিএমপি নীতিমালা অনুযায়ী সন্তোষজনক নয়। এদের মধ্যে ৬২টি প্রতিষ্ঠানের ওষুধ খুবই নিম্নমানের। কিছু কিছু কোম্পানি সরাসরি ওয়াসার পানি ব্যবহার করে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানের ওষুধের কাঁচামালের পরিচয়ও জানা যায় না। তা ছাড়া ওষুধের গুণগত মান নিয়ন্ত্রণ, মালপত্র সংরক্ষণের জন্য তাপ ও আর্দ্রতা ব্যবস্থা কোনোটি নেই। সরকারিভাবেও মনিটরিং করা হচ্ছে না এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মতৎপরতা। ওষুধের মান নিয়ন্ত্রণ বিধি অনুযায়ী প্রতি তিন মাস পরপর সব ওষুধের মান পরীক্ষা করতে হয়। দেশে ওষুধের গুণগত মান পরীক্ষার জন্য সরকারি ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি রয়েছে মাত্র দুটি_ একটি ঢাকায়, অন্যটি চট্টগ্রামে। এগুলো প্রতি মাসে সাড়ে সাতশ' থেকে এক হাজার ওষুধের মান পরীক্ষা করতে সক্ষম। কিন্তু পর্যাপ্ত যন্ত্রপাতি ও জনবলের অভাবে তাও পরীক্ষা করতে পারে না। সংশ্লিষ্টদের মতে, উৎপাদিত ওষুধের গুণগত মান পরীক্ষার জন্য কমপক্ষে ১০টিরও বেশি ড্রাগ টেস্টিং ল্যাবরেটরি প্রয়োজন। কিন্তু সরকার সেদিকে নজর দিচ্ছে না।
দেশে শক্তিশালী ওষুধনীতি না থাকায় ৬ হাজার কোটি টাকার বিশাল এই বাজার থেকে ফায়দা লুটছে অধিক মুনাফাখোর প্রতিষ্ঠানগুলো। স্বাধীনতার পর ১৯৪০ সালের ওষুধনীতি বিদ্যমান থাকলেও ১৯৮২ সালের ১২ জুন সর্বপ্রথম জাতীয় ওষুধনীতি ও ওষুধ নিয়ন্ত্রণ অধ্যাদেশ প্রণীত হয়। এতে ওষুধ খাতের বিভিন্ন অনিয়মের জন্য ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ভিন্ন ভিন্ন মেয়াদে সাজা ও জরিমানার বিধান করা হয়।
অধ্যাদেশ অনুযায়ী ১ হাজার ৭০৭টি বাণিজ্যিক নামের ওষুধকে ক্ষতিকর ও অপ্রয়োজনীয় বিবেচনায় বাতিল এবং ভিটামিন, টনিক, হজমিসহ বেশকিছু ওষুধ আমদানি নিষিদ্ধ করা হয়। পরিতাপের হলেও সত্য, অধ্যাদেশটি পুনর্মূল্যায়ন ও মনিটরিংয়ের অভাবে নিষ্ক্রিয় হয়ে যায়। ২০০৫ সালের ১৮ এপ্রিল 'জাতীয় ওষুধনীতি-২০০৫' প্রণীত হলে আবার জনমনে আশার সঞ্চার হলেও তা শেষ পর্যন্ত আশাতেই সীমাবদ্ধ থাকে।
তাই সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ওষুধ প্রশাসনকে কার্যকরী নিয়ন্ত্রণ সংস্থা হিসেবে গড়ে তুলে ওষুধের কারখানা ও ফার্মেসিগুলোয় নিয়মিত মনিটরিং এবং মান নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিতকল্পে বিজ্ঞানভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তা বাস্তবায়ন করলে সাধারণ মানুষের সম্পদ ও জীবনের ঝুঁকি যে রকম কমবে, ঠিক একইভাবে সরকারের ওপরও জনগণের আস্থা বাড়বে।
হ শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ
ইউএসটিসি, চট্টগ্রাম

No comments

Powered by Blogger.