সিলেটে কমতে শুরু করেছে শীতের সবজির দাম-লাউ নিয়ে হতাশ কৃষক by ইয়াহইয়া ফজল,

দুই বছর আগের স্মৃতি এখনো রীতিমতো দুঃস্বপ্ন হয়ে আছে সিলেটের টুকেরবাজার এলাকা টমেটো চাষিদের জন্য। টন টন টমেটো চাষ করেও তাঁদের মুখে হাসির বদলে ঠাঁই পেয়েছিল হতাশা। প্রতি কেজি টমেটোর জন্য তখন দুুই টাকাও পাননি তাঁরা। এর পর থেকে সিলেট শহরতলির টুকেরবাজার এলাকার কৃষকরা কমিয়ে দেন টমেটো চাষ। সেই ধারায় এ বছরও অনেকে ঝুঁকি না নিয়ে কম টমেটো চাষ করেছেন। কিন্তু তাঁদের মধ্যে ব্যতিক্রমী একজন_আবদুন নূর।


তিনি তাঁর প্রায় সাড়ে তিন একর জমির পুরোটাই টমেটো চাষ করেছেন। গত ১৫ দিনে বাজারে টমেটো বিক্রি করেছেন দেড় লাখ টাকার মতো। আশা করছেন বাজারের অবস্থা ভালো থাকলে এবার তাঁর আয় হবে ১২ থেকে ১৪ লাখ টাকা।
শুধু আবদুন নূরই নন। এ রকম টমেটো চাষ করে এবার ভালো ফলন পেয়েছেন দোলারবাজার ইউনিয়নের মো. সাজ্জাদ মিয়া। তিনি তাঁর দুই একর জমিতে টমেটো ফলিয়ে এরই মধ্যে দুই লাখ টাকার মতো লাভ করেছেন। প্রতি একর জমিতে টমেটো চাষ, সারসহ রক্ষণাবেক্ষণে খরচ হয় ৬০ হাজার টাকার মতো। এর বিপরীতে ভালো ফলন হলে প্রতি একর জমির টমেটো বিক্রি করে পাঁচ-ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত আয় করা যায়। তবে শুরুর দিকে ১২০ টাকা কেজি দরে টমেটো বিক্রি করলেও গতকাল তিনি প্রতি কেজি ৬৫ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। দেশের অন্য অঞ্চল থেকে টমেটো ব্যাপক হারে না এলে এবার তাঁরা লাভবান হবেন বলে মনে করছেন সাজ্জাদ মিয়া।
টমেটোচাষিদের পাশাপাশি এবার মুখে হাসি শীতের অন্যান্য সবজি আবাদকারীদের মুখেও। সদর উপজেলার মোল্লারগাঁও, কান্দিরগাঁও, টুকেরবাজার, ফুলকচি, ডরা, মিরেরগাঁও, লামাইরচর, পুরানগাঁও, ভাইয়ারপারসহ বিভিন্ন গ্রামের কৃষকরা ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই তাঁদের সবজি বিক্রির জন্য নিয়ে আসেন টুকেরবাজারে। সাধারণত সুরমা নদীর দুপারের এসব গ্রাম থেকে সবজি আসে নৌকায়। এখান থেকেই পাইকাররা সবজি কিনে নিয়ে যান নগরীর বিভিন্ন স্থানে। গতকাল বৃহস্পতিবার বাজার এলাকা ঘুরে দেখা গেছে এ রকম দৃশ্য। কৃষকরা হাসি মুখে জানান, এবার তাঁরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন।
পশ্চিম দর্শাডরা গ্রামের কাওসার আহমদ জমিতে মুলা, ফুলকপি ও টমেটো চাষ করেছেন। স্কুলপড়ুয়া কাওসার জানায়, এক মাস ধরে মুলা বিক্রি করছি। প্রতি পণ মুলা (৮০টি মুলায় এক পণ) শুরুর দিকে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি করা যেত, এখন তা বিক্রি হচ্ছে ১৪০ টাকা দরে।
বাজারে সবজি বিক্রি করতে আসা কৃষকরা জানান, এবার বাজার দর নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট। এ রকম থাকলে এই বছর তাঁরা ভালো লাভের মুখ দেখবেন। ফুলকপি, বাঁধাকপি, বেগুন, শসা, পুঁইশাক, শিমের বাজার দর ভালো। তবে এর বিপরীত চিত্রও আছে। শহরতলির ঘোপালের কৃষক সুহেল আহমদ বললেন, শুরুতে ভালো থাকলেও বর্তমানে লাউয়ের দাম একেবারেই কমে গেছে। তিনি বলেন, কিছু দিন আগেও এক টুকরি লাউ ৫০০ টাকা দরে বিক্রি করেছি। এখন খুব বেশি হলে ১০০ টাকা পাওয়া যায়। এ রকম হলে খরচ বাদে কিছু থাকবে না।
সিলেট সদর উপজেলার কৃষি কর্মকর্তা সুবিনয় ভট্টাচার্য জানান, টুকেরবাজার এবং এর আশপাশ এলাকায় প্রায় ১৬০ বিঘা জমিতে এবার শীতের সবজি চাষ হয়েছে। এর মধ্যে বেগুন, ফুলকপি, বাঁধাকপি, লাউ, শিম, টমেটো ও ক্ষিরার চাষ হয়েছে বেশি। এসব জমি থেকে এ বছর প্রায় তিন হাজার ২০০ টন সবজি উৎপাদিত হবে জানিয়ে তিনি বলেন, 'পোকামাকড়ের আক্রমণ থেকে সবজিকে রক্ষা করতে আগে থেকেই কৃষকদের সতর্ক করার চেষ্টা করেছি আমরা। এসব জায়গায় ক্ষতিকর কিটনাশকের পরিবর্তে কৃষকদের সেঙ্ফেরেমোন ট্রেপ নামে একধরনের ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছি। এটি সরাসরি জমিতে ছিটাতে হয় না। ফলে ফসলের মধ্যে কীটনাশক মিশে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা থাকে না।'

No comments

Powered by Blogger.