সাংবাদিক নির্যাতন- এই বর্বরতার শেষ কোথায়? by শামীম আহমেদ

একবিংশ শতাব্দীতে আমরা যখন সভ্যতা ও সংস্কৃতির চরম উৎকর্ষের কথা বলছি, তখন বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের আহত,
নিহত হওয়ার ঘটনা আমাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন করে সত্যিকারার্থে আমরা কতটুকু সভ্য হয়েছি? রাষ্ট্রের চতুর্থ সত্মম্ভ গণমাধ্যম সমাজ ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনা, অনিয়ম-দুর্নীতি তুলে ধরে রাষ্ট্রযন্ত্রের চাকাকে সচল রাখে। এই গুরম্ন দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে বিশ্বব্যাপী সংবাদকর্মীরা প্রতিনিয়ত শাসকগোষ্ঠীর রোষানলের শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে তাদের জেল-জুলুমসহ হত্যাও করা হচ্ছে। আমরা মানবতা, মানবাধিকার, ন্যায়বিচারের কথা বলি, শ্রেণী বৈষম্যহীন শোষণমুক্ত সমাজের স্বপ্ন দেখি। কিন্তু এসব কর্মকা-কে যারা এগিয়ে নিয়ে যায়, সেসব সংবাদ কর্মীকে স্বার্থের দ্বন্দ্বে আমরা নাজেহাল করতে উন্মুত্ত হয়ে উঠি। বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকদের আহত, নিহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে আমরা এখন বর্বর যুগে বসবাস করছি। বিগত কয়েক বছরের তথ্য-উপাত্ত বিশেস্নষণ করলে দেখা যায়, সাংবাদিক হত্যার পরিমাণ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে আশঙ্কজনভাবে। ইন্টারন্যাশনাল প্রেস ইনস্টিটিউট (আইপিআই) এর ওয়ার্ল্ড প্রেস ফ্রিডম রিভিউ থেকে জানা যায় বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ২০০৯ সালে ১১০ সাংবাদিককে হত্যা করা হয়। আহত ও জেল-ঝুলুমের শিকার হন আরও অনেক সাংবাদিক। অথচ ২০০৮ সালে সাংবাদিক হত্যার পরিমাণ ছিল ৬৬ জন এবং ২০০০ সালে ৫৬ জন। চলতি দশকের প্রথম অর্ধেকের তুলনায় শেষ অর্ধেকে সাংবাদিক গুপ্ত হত্যার পরিমাণ প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে।
গত বছর ফিলিপিন্সে সাংবাদিক হত্যার চিত্র ছিল ভয়াবহ। ৩১ নবেম্বর ফিলিপিন্সে ৩২ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়। সব মিলিয়ে ফিলিপিন্সে ২০০৯ সালে ৩৮ জন এবং গত এক দশকে ৯৩ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়। এসব হত্যাকা-ের অধিকাংশেরই এখনও কোন বিচার হয়নি। কর্মকা-ের হোতারা রয়ে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
২০০৯ সালে পাকিসত্মানে ৮ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়। তালেবান জঙ্গী দমনে দণি-ওয়াজিরিসত্মানে সামরিক অভিযানের প্রেেিত পাকিসত্মানে আত্মঘাতী হামলার পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রায় প্রতিদিনই দেশটির কোথাও না কোথাও হামলার ঘটনা ঘটছে। এসব হামলার শিকার হয়ে সাধারণ জনগণ থেকে শুরম্ন করে সারিক বাহিনীর সদস্যরার প্রাণ হারাচ্ছেন। পাকিসত্মানে চলমান দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় পরিস্থিতিতে বেশ ঝুঁকি নিয়ে সাংবাদিকদের কাজ করতে হচ্ছে। জঙ্গীরা সাংবাদিকও অপহরণ করছেন। ২২ ডিসেম্বর পেশোয়ার প্রেসকাবের বাইরে আত্মঘাতী বোমা হামলায় ঘটনাস্থলে তিনজন সাংবাদিক নিহত হন। সে সময় পাকিসত্মান প্রেস ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক ও আইপিআই সদস্য ওয়েশ আলী বলেন, অবস্থা দিন দিন খারাপ থেকে খারাপতর হচ্ছে।
শ্রীলঙ্কায় গত তিন দশক ধরে সামরিক বাহিনী ও তামিল গেরিলাদের মধ্যে চলামান গৃহযুদ্ধের অবসান হয় গত মার্চ মাসে। শ্রীলঙ্কার পরিস্থিতি গণমাধ্যমের স্বাধীনতার জন্য সুখকর ছিল না। সাংবাদ পরিবেশনের েেত্র সরকারের পৰ থেকে অনেক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। এমন কি তামিল উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে এখনও সাংবাদিকদের ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। এ ছাড়া সরকার কর্তৃক গত ২৬ জানুয়ারির প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ও পরে রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। শ্রীলঙ্কায় ২০০৯ সালে দু'জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়। এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন, সানডে লিডার পত্রিকার সাবেক প্রধান সম্পাদক, যিনি আগে থেকে তাঁর মৃতু্যর বিষয়টি ধারণা করতে পেরেছিলেন। মৃতু্যর তিনদিন পর প্রকাশিত এক সম্পাদকীয়তে দেখা যায়, সেখানে তিনি লিখেছেন মৃতু্য যে তাঁর পায়ে পায়ে তা তিনি জানেন। এদিকে, তামিলদের বিরম্নদ্ধে পরিচালিত সামরিক অভিযানের সমালোচনা করায় কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইনে এক তামিল সাংবাদিককে বিশ বছরের কারাদ- দেয় শ্রীলঙ্কান সরকার।
বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের প্রেেিত যখন কারও স্বার্থে আঘাত লাগে বা মুখোশ উন্মোচিত হয়, তখন শাসকগোষ্ঠী কঠিন আইনের যাঁতাকলে গণমাধ্যমের কণ্ঠ রোধ করতে মরিয়া হয়ে ওঠে। ২০০৯ সালের অক্টোবর মাসে ভিয়েনায় "দি ওয়ার অন ওয়ার্ডস- টেররিজম, মিডিয়া এ্যান্ড দি ল" শীর্ষক এক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। আইপিআই এবং দি সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল লিগ্যাল স্টাডিজ (সিআইএসএল) যৌথভাবে এই সম্মেলনের আয়োজন করে। ভিয়েনা ঘোষণায় সন্ত্রাসের বিরম্নদ্ধে যুদ্ধে গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার জন্য বিশ্বের সরকারপ্রধানদের প্রতি আহবান জানানো হয়।
মধ্যপ্রাচ্যে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খুব কম। সংবাদকর্মীরা ইচ্ছে করলেই সরকার বা শাসকগোষ্ঠীর বিরম্নদ্ধে সমালোচনা করতে পারেন না। অবশ্য আগের তুলনায় গত বছর ইরাকে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। ২০০৮ সালে যেখানে ১৪ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়, ২০০৯ সালে সেই সংখ্যা নেমে আসে ৪ জনে। এর মূল কারণ হচ্ছে ইরাক সরকার সংবাদপত্রের স্বাধীনতার বিষয়টি গুরম্নত্ব সহকারে বিবেচনা করছে। দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা নিশ্চিত কারর জন্য সাংবাদিকরা যেন কোন আপোষ না করে সে ল্যে একটি খসড়া আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। অন্যদিকে, ইরানে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার অবস্থার উন্নতি না হয়ে বরং খারাপ হচ্ছে। গত জুনে প্রেসিডেন্ট আহমেদিনেজাদের পুনর্নির্বাচিত হওয়ার পেছনে কারচুপির অভিযোগ এনে বিরোধীরা বিােভ শুরম্ন করলে সরকার কঠোর হসত্মে তা দমন করে। সে সময় এ সংক্রানত্ম সংবাদ পরিবেশনের েেত্র সাংবাদিকদের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। সেসময় অনেক সাংবাদিককেও নির্যাতন করা হয়।
অফ্রিকার দেশ সোমালিয়া ইতোমধ্যে সন্ত্রাসী জঙ্গীদের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। ২০০৭ সাল থেকে দেশটিতে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি বিরাজ করছে। এখানে সাংবাদিকদের জীবনের কোন নিরাপত্তা নেই। ২০০৯ সালে দেশটিতে ৯ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়। আফ্রিকার অন্যান্য দেশে সাংবাদিকদের নাজেহাল, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও নানা বিধিনিষেধের যাঁতাকলে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা ভূলন্ঠিত করা হচ্ছে। তিউনেশিয়ায় অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে ও পরে গণমাধ্যমের ওপর কঠোর চাপ প্রয়োগ করা হয়। সে সময় অনেক সাংবাদিককে গ্রেফতার করা হয়। এদের মধ্যে দু'জনকে কারাদ- প্রদান করা হয়। এদিকে ফ্রান্সে বসবাসকারী তিউনেশিয়ার একজন সাংবাদিক প্রতিনিয়ত মৃতু্যর হুমকী পাচ্ছেন। জাম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া জামিহ রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত জিআরটিএস টেলিভিশনে ঘোষণা করেন, "কোন সাংবাদিক যদি মনে করেন তিনি যা খুশি তা লিখতে পারবেন, তিনি তা করতে পারেন , তবে তা হবে তাঁর জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।' এর কিছুদিন পরই, ২০০৪ সালে প্রখ্যাত সাংাবদিক দায়দা হাইদ্রা হত্যার কোন সুরাহা না হওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তেলায় ছয়জন সাংবাদিকের বিরম্নদ্ধে রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা ও সুনামহানির অভিযোগ আনা হয়।
২০০৯ সালে রাশিয়ায় কমপ ে৫ জন সাংবাদিককে হত্যা করা হয়। গত বছর রাশিয়া সাংবাদিকদের জন্য বিপজ্জনক দেশের তালিকায় পাঁচ নাম্বার ছিল। ডিসেম্বরে এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয় রাশিয়ার নিহত হওয়া সাংবাদিকদের আত্মীয়স্বজনরা মস্কোতে এক স্মরণসভায় প্রায় ৩০০ জন সাংবাদিকের ছবি বহন করছিল, ১৯৯৩ সাল থেকে ২০০৯ পর্যনত্ম যাদেরকে হত্যা করা হয় বা বিভিন্ন পরিস্থিতিতে মারা যান। এসব হত্যাকা-ের সঠিক তদনত্মের ব্যর্থতার জন্য নিহত সাংবাদিকদের আত্মীয়স্বজনরা সরকারের কঠোর সমালেচনা করেন।
মেক্সিকোতে সাংবাদিকরা প্রতিনিয়ত মাদক পাচারকারী ও মাফিয়াদের হুমকি সহ্য করে দায়িত্ব পালন করতে হয়। দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে মেক্সিকোতে ১১ জন সাংবাদিক মাদক পাচারকারী ও মাফিয়াদের হাতে খুন হন।
বাংলাদেশের দিকে তাকালে দেখা যায়, বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারে আমলে দেশে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্ব হয়। সংবাদকর্মীরা দিন কাটায় আতঙ্ক ও অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে। বর্তমান সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারের একটা এজেন্ডা ছিল গণমাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। অথচ স্বাধীন মতামত প্রকাশ করার দরম্নন ২০০৯ সালে যশোর, চুয়াডাঙ্গা, পটুয়াখালী, গলাচিপাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বেশ কয়েক সাংবাদিক নির্যাতিত হন। আবার অনেকে সাংবাদিকের বিরম্নদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করে হয়রানি করা হয়।
গণমাধ্যম ও সাংবাদিকের ওপর আঘাত কোন সুশীল সমাজের বৈশিষ্ট্য হতে পারে না। সাংবাদিকরা সমাজের ভাল মন্দ সব চেহারা তুলে ধরবেন এটাই স্বভাবিক। এতে অনেক সময় শাসকগোষ্ঠীর স্বার্থে আঘাত লাগতে পারে। সত্যিকার গণতান্ত্রিক সরকারের উচিত হবে সংবাদকর্মীর সমালোচনা আমলে নিয়ে নিজেদের সংশোধন করা। কারণ সাংবাদকর্মীরা নিজেদের কথা বলেন না। তারা দেশ ও জনগণের কথা বলেন। গণমাধ্যম চেক এ্যাণ্ড ব্যালেন্সের মাধ্যমে সমাজের ভারসাম্য রা করে। গণমাধ্যমের ওয়াচডগ ও সার্ভিলেন্স ভূমিকার কারণে সরকার থেকে শুরম্ন করে সাধারণ মানুষ পর্যনত্ম কেউই যা ইচ্ছে তা করা সাহস করেন না। যে সমাজে গণমাধ্যমের ভূমিকা যত শক্তিশালী হবে, সে সমাজে গণতন্ত্র তত বেশি সুদৃঢ় হবে। গণমাধ্যমকে কখনও প্রতিপ ভাবা ঠিক নয়। তাই সরকারের পদপে হওয়া উচিত গণমাধ্যমের স্বাধীন মতামত প্রকাশের সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করা।
গত ১১ জানুয়ারি ২০১০ সংবাদপত্রের সাংবাদিক, সম্পাদক ও প্রকাশক এবং লেখকদের অহেতুক হয়রানি বন্ধে ফৌজদারি কার্যবিধি (সংশোধন) বিল-২০১০ উখ্যাপন করা হয়। বিলটি উত্থাপনকালে আইনমন্ত্রী বলেন, দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী করতে সরকার কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর-১৮৯৮ সংশোধন করছে। সংশোধনী অনুযায়ী, হয়রানি বন্ধের ল্যে সংশিস্নষ্ট ব্যক্তিদের বিরম্নদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানার পরিবর্তে সমন জারির কথা বলা হয়েছে। এই আইন পাস হলে সাংবাদিক, সম্পাদক ও প্রকাশক ও লেখকদের বিরম্নদ্ধে অহেতুক হয়রানি বন্ধ হবে। এদিকে, গত ২৭ জানুয়ারি সঠিক তথ্য-প্রমাণ ছাড়া সংবাদ প্রচার বন্ধে নতুন আইন প্রণয়ন করার সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি। গণমাধ্যমের স্বচ্ছতা ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে তথ্য মন্ত্রণালয়কে এ আইন প্রণয়নের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। শুধু গণমাধ্যম বা সাংবাদিক নয়, সব বিষয়েরই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকা জরম্নরী। সাংবাদিকদের যেমন মতার অপব্যবহার করে অসত্য, অর্ধ সত্য, বিভ্রানত্মিমূলক, অতিরঞ্জিত তথ্য পরিবেশন করা উচিত নয়, তেমনি আইনের যাঁতাকলে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা খর্বের কোন অপচেষ্টা দেশের জন্য মঙ্গলকর হবে না।

ংযধসববসধযসবফ৭৯@মসধরষ.পড়স

No comments

Powered by Blogger.