বাজেট পর্যালোচনা-খেলায় এখন হাফ টাইম : প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের এখনও সময় আছে by বিনায়ক সেন অজয় দাশগুপ্ত

জাতীয় সংসদে ২০১২-১৩ অর্থবছরের বাজেট পেশ করা হয়েছে বৃহস্পতিবার। এ সময়ে বিরোধীরা সংসদে ছিল না এবং বাজেট আলোচনায় অংশ নেবে, এমন সম্ভাবনাও প্রায় নেই। এ নিয়ে যা কিছু পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা, সেটা দেখছি সংসদের বাইরে।
এতে একাডেমিক চর্চা আছে, অর্থনীতিবিদদের আলোচনা আছে। রাজনীতিকরা তো মুখর আছেনই। আলোচনায় জোর পড়ছে মোট দেশজ প্রবৃদ্ধি বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি কত হয়েছে এবং কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় হয়েছে কি-না, আগামী বছর প্রবৃদ্ধি ৭.২ শতাংশে নেওয়া এবং মূল্যস্ফীতি ৭.৫ শতাংশে কমিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা যাবে কি-না এবং এ ধরনের আরও কিছু বিষয়ে। তবে আমাদের মনে হয়, আমজনতা যাদের বলি তাদের ঠিক পরিসংখ্যানের হ্রাস-বৃদ্ধি নিয়ে ততটা মাথাব্যথা থাকে না। তারা চায় প্রতিদিন প্রয়োজন পড়ে এমন পণ্যের দাম সহনীয় মাত্রায় থাকুক, আইন-শৃঙ্খলা ভালো থাকুক, জীবনযাপন সহজ থাকুক।
অর্থনীতি যেভাবে চলছে তাতে কেউ আশাবাদের কথা বলতে পারেন, কেউবা হতাশার দিকটিকেই বড় করে দেখবেন। এ ছাড়া নিরন্তর সংশয়বাদীরা তো রয়েছেনই। তারা এমনকি চূড়ান্ত হিসাবের জন্য অপেক্ষা করতেও রাজি নন। গত ২০১০-১১ অর্থবছরে যখন প্রথমে ৬.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির কথা বলা হলো, তখন তারা বলতে থাকলেন_ হতেই পারে না। বস্তুতপক্ষে ওই বছরে চূড়ান্ত হিসাবে এই ৬.৭ শতাংশ হারেই প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছিল। এ বছরেও অর্থাৎ ২০১১-১২ অর্থবছরে বলা হতে থাকল সরকারের ঋণের চাপ, মূল্যস্ফীতি, ডলারের তুলনায় টাকার দাম কমতে থাকা, কুইক রেন্টালজনিত সমস্যা, বৈদেশিক সাহায্য কম আসা ইত্যাদি কারণে অচিরেই সংকট নেমে আসবে। এমন অবস্থা ২০০৭-০৮ সময়েও ছিল। সেটা অনেকটা বৈদেশিক সহায়তায় কাটিয়ে ওঠা গেছে। এবারেও গত তিন-চার মাসে পরিস্থিতির কিছুটা রাশ টানা সম্ভব হয়েছে। সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা এবং আমদানি হ্রাস ও রফতানি বাড়ানোর পদক্ষেপ গ্রহণের কারণে মূল্যস্ফীতি কমেছে, টাকা অপেক্ষাকৃত স্থিতিশীল রয়েছে। বিশ্বব্যাংকও সর্বশেষ প্রতিবেদনে এর প্রশংসা করেছে। এ ধরনের নীতি-কৌশলও কিন্তু অর্থনীতির পণ্ডিতদের জন্য উদাহরণ হতে পারে।
এবারে বাজেটের প্রসঙ্গে আসি। অর্থনীতিতে কী ভালো হয়েছে, সেটা কেউ স্বীকার করতে পারেন, না-ও পারেন। মন্দ দিক প্রসঙ্গেও একই কথা। কিন্তু চলতি প্রসঙ্গে ব্যস্ত থেকে যেন আরও ভালো করার জন্য কী করা দরকার এবং কীভাবে করা দরকার সে আলোচনা থেকে নিজেদের সরিয়ে না রাখি। এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে কাঠামোগত সংস্কার। এটি করা না গেলে অর্থনীতিতে টেকসই গতিশীলতা আসবে না, সেটা অনেকেই স্বীকার করবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ব্যাপারে সরকারের আগ্রহ বড়ই কম পরিলক্ষিত হচ্ছে।
বিদেশি সহায়তা চলতি বছরে কম এসেছে। ১৯৮০-এর দশকের প্রথম দিকে বাজেটে বিদেশি ঋণ-অনুদানের পরিমাণ থাকত জিডিপির ১০ শতাংশের মতো। কিন্তু এবারে মিলেছে ১.৩ শতাংশ। ২০০৯-১০ অর্থবছরে মিলেছে ১.৩৪ শতাংশ। যখন আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি বিরূপ থাকে, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ে, আমদানি ব্যয় বাড়ে_ এ ধরনের পরিস্থিতিতে বছরে ১০০-১৫০ কোটি ডলার বিদেশি সহায়তা পেলেই রাজস্ব ও উন্নয়ন বাজেটের ঘাটতি মেটানো যেত। ফলে ফিসকাল ঘাটতি মেটানোর অপর উৎস অভ্যন্তরীণ সূত্রের ওপর (ব্যাংকিং ও অ-ব্যাংকিং খাত থেকে সরকারের অপেক্ষাকৃত বেশি সুদে ঋণ গ্রহণ) এভাবে চাপ পড়ত না। এখন প্রশ্ন, প্রতিকূল পরিস্থিতিতে ১০০-১৫০ কোটি ডলার বৈদেশিক সহায়তা জোগাতে কেন পারছি না? বাজেটে এ নিয়ে আলোচনা থাকা উচিত ছিল, কিন্তু নেই। শুধু এ বছর নয়, আগেও মেলেনি। কী কারণে পাওয়া যায়নি সেটা তুলে ধরা হলে জনগণ বুঝতে পারত যে এ জন্য কে দায়ী এবং কেনই বা ঋণ-নির্ভর বাজেট (যেটা জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া বলেছেন)। এটা মস্ত ধাঁধা যে সরকার একদিকে বিদেশি সাহায্য সংগ্রহ করতে পারছে না, অন্যদিকে পাইপলাইনে প্রচুর অর্থ-প্রস্তাব জমা পড়ে আছে। একদিকে আমরা বিদেশি সাহায্য চাইছি, একই সঙ্গে ঘরের দোরে এ সাহায্য প্রস্তাব নিয়ে কেউ কেউ হাজির থাকলেও সেটা নিতে পারছি না।
যদি সক্ষমতার অভাব হয়ে থাকে, তাহলে সমাধান হচ্ছে এটি বাড়াতে হবে। কোন কোন মন্ত্রণালয়ে বৈদেশিক সহায়তাধীন প্রকল্প বাস্তবায়নে বেশি ঘাটতি সেটা নিয়ে শীর্ষস্থানীয় নেতৃত্বের অধীনে সভা হতে পারে। দরকার মনে করলে পদস্থ কর্মকর্তাদের জন্য এ সক্ষমতাকে পদোন্নতি ও অন্যান্য সুবিধার শর্ত করা যায়।
যদি দেখা যায়, দাতাদের কোনো কোনো শর্ত অযৌক্তিক, যেমনটি অতীতে দেখেছি_ সেটাও জনগণকে বলা দরকার। তাহলে দাতারাও বড় মুখে বলতে পারবে না যে বাংলাদেশ সরকার ঋণ-অনুদান ব্যবহার করতে অসমর্থ।
এ ক্ষেত্রে আরেকটি প্রশ্ন স্বাভাবিকভাবেই আসবে_ আমাদের প্রশাসনিক দক্ষতা কি কমে গেছে? যদি এটা হয়ে থাকে তার সমাধান হচ্ছে দক্ষ ও সৎ ব্যক্তিদের এসব প্রকল্পে দায়িত্ব প্রদান করা। পদ্মা সেতু নির্মাণ প্রকল্পে যে ধরনের প্রশ্ন উঠেছে তেমনটি ঘটতে থাকলে কখনোই ছাড় মিলবে না, এটাই এখনকার বাস্তবতা। স্পষ্টতই প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ব্যতিরেকে বৈদেশিক ঋণ-অনুদান কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় মিলবে, এমন সম্ভাবনা কম।
কাঠামোগত সংস্কার প্রশ্নে দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ ধাঁধা হচ্ছে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপির বাস্তবায়ন। এ ক্ষেত্রে বছরের পর বছর লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে অর্জন কম থাকছে। সাধারণত সৎ বা অসৎ যে কোনো লোকেরই বরাদ্দ অর্থ ব্যয় করার প্রবণতা থাকে। ঠিকাদার টাকা ব্যয় না করলে কীভাবে লাভবান হবে? তারা কেন এপ্রিলের মধ্যে অন্তত ৫০ শতাংশ এবং জুনের মধ্যে ১০০ শতাংশ বাস্তবায়ন করতে পারবে না? যদি ১০০ শতাংশ ব্যয় করা হয় তাহলে প্রশ্ন আসবে_ গুণ-মান ঠিক আছে তো? আমাদের অর্থমন্ত্রীর বাজেটে এটা কখনও সংযোজিত হতে দেখা যায়নি যে, বড় বড় কিছু প্রকল্প বাস্তবায়নে কী অগ্রগতি হয়েছে। কাজ শেষ করা গেলেই যেখানে বিল মিলবে, সেখানে কেন পুরো অর্থ ব্যয় করা যায় না_ এ রহস্যের জট খোলা দরকার। একান্তই যদি আমাদের সচিবালয়কেন্দ্রিক কেন্দ্রীয় সরকারের সামর্থ্যের সীমাবদ্ধতা থাকে তাহলে ১০-১৫ শতাংশ কাজ স্থানীয় সরকারের হাতে তুলে দিতে সমস্যা কোথায়? ইউনিয়ন পরিষদ ও পৌরসভা এবং সিটি করপোরেশনগুলোকে এ ভার দেওয়া যেতে পারে। তারা স্থানীয় বাস্তবতার নিরিখে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রণয়ন করবে। এভাবে ফিসকাল বিকেন্দ্রীকরণ করে সমস্যার সমাধান মিলতে পারে। ভারতের কেরালা রাজ্যে বাজেটের এক-তৃতীয়াংশ স্থানীয় সরকারের কাছে দেওয়া হয়। উন্নত দেশগুলোতে এর হার আরও বেশি।
প্রশ্ন আসতে পারে স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা রয়েছে কি-না। এ ক্ষেত্রে অংশীদারিত্ব হতে পারে_ কেন্দ্রীয় সরকার দেবে ৮০ শতাংশ এবং স্থানীয় সরকার ২০ শতাংশ। নিজস্ব রাজস্ব আয় থেকে তারা এ অর্থের জোগান দেবে। গত এক দশক ধরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের ওপরে থাকছে। ইউনিয়ন পর্যায়ে কর আদায়ের সুযোগ বেড়েছে। এ ক্ষেত্রে অর্থমন্ত্রীকে ট্যাক্স-কোড কিছুটা বদলাতে হবে_ স্থানীয় সরকারের কোন কর্তৃপক্ষ কী ধরনের কর আদায় করতে পারবে সে বিষয়টি এতে স্পষ্ট করা থাকবে। লোকাল গভর্নমেন্ট সাপোর্ট প্রজেক্ট নামে একটি প্রকল্প রয়েছে, যার উদ্দেশ্য স্থানীয় সরকারের সক্ষমতা বাড়ানো। প্রকৃতই বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির ১০-১৫ শতাংশ বিকেন্দ্রীকরণ করে কেন্দ্রীয় সরকারের ঘাটতি স্থানীয় সরকার কর্তৃক পূরণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
তৃতীয় যে সংস্কারের প্রশ্নটি তুলতে চাই সেটা হচ্ছে ঢাকার অভ্যন্তরে এবং বাইরের জেলা-উপজেলাগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ানো। এ লক্ষ্য অর্জন কেবল সম্পদ বরাদ্দের বিষয় নয়। যারা বস্তিতে থাকে, তারা কি এভাবে থাকতে চায়? প্রকৃতপক্ষে তারা কাজের স্থলের কাছাকাছি থাকতে চায়। দূরে থেকেও যদি সহজে আসা-যাওয়া করা যায়, তাহলে সে বিকল্প অবশ্যই বিবেচনায় থাকত। শ্রীলংকার কলম্বো শহরে দেখেছি গল এক্সপ্রেস অনেকেরই পছন্দ। এতে চেপে সকালে অনেকে রাজধানীতে আসে এবং সন্ধ্যায় ফিরে যায়। এর প্রভাব কলম্বোতে যানজট নিয়ন্ত্রণ সহজ হয়। শহরের ভেতরে ও বাইরে যোগাযোগ বাড়ানোর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিকও রয়েছে। আমাদের জাতীয়তাবাদ এক। রাজধানী এক। মধ্যবিত্ত-নিম্নবিত্ত-গরিব_ সবাই এক সমাজের অংশীদার। বিদেশে গেলে দেখি, সব ধরনের নাগরিক বাস-ট্রাম-রেলগাড়ি-মেট্রোরেল, এক্সপ্রেসওয়ে-ফেরি_ এসব যান ব্যবহার বেশি করে। কিন্তু আমাদের দেশে চলার পথেই শ্রেণী বিভাজন স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। গরিবরা পায়ে হাঁটে, নিম্নবিত্তরা বাসে চাপে, মধ্যবিত্তরা রিকশা-সিএনজি ব্যবহার করে। আর সচ্ছলরা চাপে প্রাইভেট কার কিংবা সিএনজিতে। যেখানে উন্নত পুুঁজিবাদী দেশগুলোতে পরিবহনের ক্ষেত্রে চালু রয়েছে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা, সেখানে আমরা গণতান্ত্রিক সমাজ দাবি করেও পরিবহনের ক্ষেত্রে চালু রেখেছি অগণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এবং দিনে দিনে তা প্রকট হচ্ছে। আমাদের জাতীয় বাজেটে এমন কোনো প্রস্তাব নেই যাতে গণপরিবহন ব্যবস্থা সুলভ হতে পারে। এ জন্য যে বিনিয়োগ সুবিধা দরকার, সেটা একেবারেই অনুপস্থিত। যদি আমরা এ পথে অগ্রসর হই, জাতীয় সঞ্চয়েও তার প্রভাব পড়বে। অনেক অনেক নারী-পুরুষ ব্যক্তিগত যানবাহন ছেড়ে পাবলিক ট্রান্সপোর্ট ব্যবহার করতে শুরু করলে পারিবারিক ও জাতীয় সঞ্চয় বাড়বে।
দুঃখের বিষয় যে অবকাঠামো খাতের বেশ কয়েকটি প্রকল্প অগ্রাধিকার হিসেবে চিহ্নিত থাকলেও তার বাস্তবায়ন কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ের ধারেকাছেও নেই। যেমন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল, ঢাকা-চট্টগ্রাম চার লেনের সড়ক পথ, বুড়িগঙ্গা নদীর নাব্যতা বাড়ানো, রাজধানীর চারপাশে বৃত্তাকার নৌপথ এবং রেল যোগাযোগের প্রসার। এসব ক্ষেত্রে যে অগ্রগতি হচ্ছে তার প্রধান কারণ অর্থের অপ্রতুলতা নয়। প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ-আয়োজনের অভাবও গুরুত্বপূর্ণ। পদ্মা সেতু কেন হলো না, সে বিষয়ে সরকার জনগণের কাছে সঠিক তথ্য জানাতে ব্যর্থ হয়েছে। ত্রুটি কোথায় ছিল এবং তার নিরসনে যে পদক্ষেপ নেওয়া হলো দাতারা কেন তাতে সন্তুষ্ট হলো না? এটি ছিল আমাদের স্বপ্নের প্রকল্প এবং দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্বব্যাংকের বৃহত্তম আর্থিক প্রকল্প। স্বল্প সুদে ও দীর্ঘমেয়াদে ঋণ না পেলে এ ধরনের প্রকল্প লাভজনক হয় না। মালয়েশিয়া বা অন্য দেশ থেকে বেশি সুদে ঋণ নেওয়া হলে তা পরিশোধের জন্য টোলের হার বাড়াতে হবে। যমুনায় বঙ্গবন্ধু সেতুতে নামমাত্র সুদে ঋণের কারণেই টোলের হার কম রাখা সম্ভব হচ্ছে। এ বছরের বাজেটে পদ্মা সেতু খাতে ৮০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। এ ধরনের বরাদ্দ রাখা হলে ২০ বছরের বেশি সময় দরকার হবে সেতু নির্মাণে। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি প্রসঙ্গে আরেকটি কথা বলেই ফেলি। বড় বড় প্রকল্পে কেবল সরকারি নিরীক্ষা যথেষ্ট নয়। প্রকল্পের গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে কি-না, বাস্তবায়ন ঠিকভাবে হয়েছে কি-না_ এসব দেখার জন্য স্বাধীন সংস্থাকে দায়িত্ব প্রদান করা যেতে পারে। আমাদের বোধকরি তথ্য কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের মতো শক্তিশালী উন্নয়ন কর্মসূচি মূল্যায়ন কমিশন দরকার, যার কাজ হবে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পগুলোর কাজ সম্পর্কে সরেজমিন মূল্যায়ন শেষে অভিমত প্রদান। এ ধরনের প্রতিষ্ঠান উন্নত দেশগুলোতে রয়েছে। তারা সরকার ও গণমাধ্যমকে পর্যালোচনার ফল জানাবে। এমনকি বিশ্বব্যাংক ও এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের প্রকল্পগুলোর বিষয়েও এ দুটি সংস্থার স্বাধীন মূল্যায়ন টিম রয়েছে, যারা বোর্ডে সরাসরি প্রতিবেদন পাঠায়।
প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রসঙ্গে উদ্যোগ নেই, সেটা বলেছি। সরকার নতুন কোনো প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারেনি যা এতক্ষণ যেসব সমস্যা নিয়ে আলোচনা হলো তা দূর করায় সহায়ক হতে পারে। শুধু তাই নয়, তারা চলতি দক্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর যথাযথভাবে চলার ক্ষেত্রে কিছু নেতিবাচক পদক্ষেপ গ্রহণ করছে। এখন দ্রব্যমূল্য সহনীয় পর্যায়ে নেই। ফলে কর্মসংস্থানের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। জিনিসপত্রের দাম বাড়লে এবং কর্মসংস্থান পরিস্থিতি উন্নত না হলে দুই দিক থেকেই জনগণের সমস্যা। বর্তমানে স্বনিয়োজিত ও মজুরিভিত্তিক_ এই দু'ভাবে কাজের সুযোগ সৃষ্টি হয়। মজুরিভিত্তিক কাজে সরকারের তেমন উদ্যোগ নিতে হয় না। এটা করে বেসরকারি খাত। যেমন কৃষি। এ খাতে প্রবৃদ্ধি ভালো। কৃষি মজুররা দিনে ৩০০-৪০০ টাকা আয় করে। শহর এলাকায় নির্মাণ খাতে কাজ মেলে এবং মজুরির হার ভালো। স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে গ্রামে ক্ষুদ্রঋণের রয়েছে বিশেষ ভূমিকা। কৃষি খাতের মতো এ ক্ষেত্রেও দুই দশক ধরে চলছে নীরব কর্মযজ্ঞ। এ ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের নামে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু অযাচিত উদ্যোগ লক্ষ্য করা যায়, যা স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থান পরিস্থিতিকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। এর সাম্প্রতিক উদাহরণ গ্রামীণ ব্যাংক এবং তার সহযোগী প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য গত বছর সরকারের তদন্ত কমিটি এবং এ বছর তদন্ত কমিশন গঠন। এর ফলে অন্য ক্ষুদ্রঋণ সংস্থাগুলো কিছুটা হলেও ভীত হয়ে পড়তে পারে। অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের মতো একজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তির সম্মান ও মানমর্যাদা ক্ষুণ্ন হতে পারে এই নাগরিক আশঙ্কা বাদ দিলেও স্বনিয়োজিত কর্মসংস্থানের বৃহত্তর তাগিদ থেকে এ বিষয়টি তুলে ধরছি। আশ্চর্যের কথা এই যে, যে আর্থিক সংস্থার স্বাস্থ্য নিয়ে প্রশ্ন নেই সেখানে যখন অহেতুক চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে_ এর বিপরীতে সরকারি ঋণদানকারী যেসব সংস্থার আর্থিক স্বাস্থ্য প্রকৃতই ঝুঁকিতে তাদের জন্য কোনো কমিটি-কমিশন সরকার গঠন করছে না। আশির দশকে মন্দ ঋণের কারণে অনেক প্রতিষ্ঠান মুখ থুবড়ে পড়েছিল। সে সময়ে এ বিষয়ে একটি কমিটি গঠিত হয়। এখনকার অবস্থা তখনকার তুলনায় কিছুটা ভালো হলেও অবস্থা খারাপের দিকে যাচ্ছে, এমন প্রবণতা লক্ষণীয়। এখানেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ছাড়া শুধু বরাদ্দ বাড়িয়ে সমস্যার সমাধান হবে না। এ ক্ষেত্রে তিন ধরনের ঝুঁকি রয়েছে। এক. বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে শ্রেণীবদ্ধ ঋণের পরিমাণ উদ্বেগজনক পর্যায়ে পেঁৗছেছে। এর মধ্যে যৎসামান্য নগদ আদায়_ ১০ শতাংশ বা তার কম। বাকি সবটাই পুনঃতফসিল। এ ক্ষেত্রে নিয়ম যেখানে সর্বোচ্চ তিনবার করার, সেখানে ৮-১০ বারও করা হচ্ছে। এতে করে তারল্য সংকটের কারণে নতুন ঋণগ্রহীতার কাছে তহবিল পুনঃচক্রায়িত করা যাচ্ছে না। এ ধরনের পুনঃতফসিলের কারণে সরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থনৈতিক প্রভাব অনেকখানি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। দুই. যেসব ঋণ গত কয়েক বছরে দেওয়া হয়েছে তার অধিকাংশ উৎপাদনমুখী খাতে দেওয়া হয়েছে কি-না, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগে কতটা দেওয়া হয়েছে তার মূল্যায়ন কোনো সরকারি প্রতিবেদনে পাওয়া যায় না। এ জন্য কোনো কাজ হচ্ছে বলেও এ মুহূর্তে জানা নেই।
তিন. সরকারি এই আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালক হিসেবে যারা রয়েছেন তাদের অনেকের পেশাগত ব্যাংকিংয়ের পূর্ব কোনো অভিজ্ঞতা নেই বললেই চলে, রাজনৈতিক পরিচয়ই মুখ্য। এটাও লক্ষণীয় যে, যখন সরকারি-বেসরকারি ব্যাংকগুলো ঋণ তহবিলের জন্য অর্থ সংকটে ভুগছে সেখানে নতুন করে কোন বিবেচনায় কয়েকটি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেওয়া হলো। এর পেছনে দৃঢ় অর্থনৈতিক যুক্তি মেলে না। যুক্তি মিলত যদি এসব ব্যাংক এমন কোনো খাতের জন্য নির্দিষ্ট থাকত কিংবা নতুন কোনো ফিন্যান্সিয়াল প্রডাক্ট বাজারে আনত_ যেমন : ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য ঋণ, আদিবাসী, চর এলাকা কিংবা স্থানীয় সরকারের জন্য অর্থায়ন। অতীতে বেশিরভাগ বেসরকারি ব্যাংক কোনো না কোনো রাজনৈতিক কানেকশনে অনুমতি পেয়েছে, এটা বড় করে দেখতে চাই না। কিন্তু দক্ষতার প্রশ্ন তো তোলা উচিত।
বাজেট আলোচনায় গরিবদের নিরাপত্তা বেষ্টনীর প্রসঙ্গ থাকেই। ধরে নেওয়া হবে, প্রবৃদ্ধির মাধ্যমে যতটা কর্মসংস্থান হবে তার বাইরে যারা থাকবে তাদের এ বেষ্টনীর মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হবে। নব্বইয়ের দশকে বাজেটে এ বাবদ জিডিপির ০.৫ শতাংশ বরাদ্দ থাকত (বাজেটের ৫ শতাংশ)। এখন তা জিডিপির ২ শতাংশে উন্নীত হয়েছে (মোট সরকারি ব্যয়ের ১৬-১৮ শতাংশ)। আপাতদৃষ্টিতে এটাকে উইন উইন কৌশল মনে হতে পারে। কিন্তু কার্যত কি তাই? এখানেও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে। এর তিনটি কারণ তুলে ধরব। এক. এসব কর্মসূচিতে যে পরিমাণ মাসিক সুবিধা দেওয়া হয় তা অতি নগণ্য। ৩০০-৫০০ টাকার বিধবা ভাতা কিংবা অন্য কোনো হেডে সহায়তার পরিমাণ এক বা দেড় দিনের কৃষি মজুরির সমান। এতে দরিদ্রের পক্ষে মই ধরে ওপরে ওঠার সুযোগ নেই। দ্বিতীয় হচ্ছে, এ ধরনের কর্মসূচি, বিশেষ করে খাদ্যভিত্তিক প্রকল্পগুলোতে অনিয়ম-দুর্নীতির ঘটনা ঘটে, যার পরিমাণ ১৫ থেকে ৩০ শতাংশ। অনেক এলাকায় অবহেলিত জনগোষ্ঠী এসব কর্মসূচির আওতায় আসতে পারে না। তৃতীয় সমস্যা যা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ_ বাজেট মানেই গরিবমুখীনতা, এ ধারণা থেকে বের হয়ে আসতে না পারা। আর্থিক বরাদ্দ না বাড়িয়েও অনেক উপায়ে দারিদ্র্য নিরসন করা সম্ভব। যেমন খাস জমি বিতরণ। যে খাস জমি সরকারের হাতে রয়েছে তা নিয়ম অনুযায়ী ভূমিহীনদের মধ্যে বিতরণ করা চাই। অনেক গবেষণায় প্রমাণিত, পশ্চিমবঙ্গ ও কেরালায় এ ব্যবস্থায় অনেক পরিবার উপকৃত হয়েছে। এ বিষয়টি আমাদের বাজেট আলোচনায় যেমন অনুপস্থিত তেমনি মধ্যবিত্ত-শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর মধ্যেও এ নিয়ে তাগিদ দেখা যায় না। অথচ মাত্র দুই দশক আগে আমাদের বাবা-দাদারাই তো কৃষি কাজে নিযুক্ত ছিলেন! এ ধরনের শ্রেণী বিস্মৃতি সত্যিই বিস্ময়কর। তাছাড়া শহর ও গ্রামের মধ্যেও রয়েছে বিস্মৃতি। শহরের দরিদ্ররা যেন দরিদ্র নয়, তারা যেন অনুপ্রবেশকারী। গ্রামের দরিদ্রদের জন্য যা কিছু ব্যবস্থা সেসব শহরের দরিদ্রদের জন্য বন্ধ। দিনবদলের এবং সামাজিক ন্যায়বিচারের সরকারের কাছে এটা আশা করিনি।
একটি সাবেকী মত হচ্ছে প্রবৃদ্ধি আবশ্যকীয়, কিন্তু পর্যাপ্ত শর্ত নয়। এখন মত বদল হচ্ছে। যে প্রবৃদ্ধি পরিবেশ ধ্বংস করে, প্রাকৃতিক সম্পদ অবক্ষয় করে সে প্রবৃদ্ধি যেমন স্থায়িত্বশীল হয় না, তেমনি তা হয় বৈষম্যবর্ধক ও জনকল্যাণ বিরোধী। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, তুরাগ নদ ভরাট করে নির্মাণ শিল্পের বিকাশ। হাইপোথেটিক্যালি বলা যায়, বুড়িগঙ্গা ভরাট করে শিল্প নগরী করা হলে সেটা কি মেনে নেব? বিদেশি বিনিয়োগ অবাধ হলে প্রবৃদ্ধি চীনের মতো ১০-১১ শতাংশ হতে পারে। কিন্তু প্রবৃদ্ধি বাড়লেও সমাজের অকল্যাণ হতে পারে, পরিবেশের সর্বনাশ হতে পারে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাজেটের কোথাও পরিবেশসম্মত উন্নয়নের বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বলা নেই। বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোতে পরিবেশ সহনশীল প্রবৃদ্ধির কৌশল বাস্তবায়ন সহজ নয়। এ জন্য যেমন কর প্রশাসনে গ্রিন ট্যাক্স বড় ভূমিকা পালন করবে, তেমনি পরিবেশ দূষণকারী সব নির্মাণ ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিকভাবে বন্ধ করা হবে। এ ক্ষেত্রে সংস্কার ছাড়া জলবায়ু বিপন্ন এ দেশে দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্বশীল জনকল্যাণমুখী প্রবৃদ্ধি প্রায় অসম্ভব।
আমাদের জন্য দুঃখের বিষয় যে একটি রাজনৈতিক সরকার উন্নয়নকে কেবল ৫ বছরের মেয়াদেই সীমিত দেখতে চায়। ফলে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের যতটা সুযোগ প্রথম বছরে থাকে, নির্বাচনের আগে দুই বছরে সে তাগিদ ফুরিয়ে যায়। বর্তমান সরকার প্রথম দুই বছরে মন দিয়েছে শেয়ারবাজারে কৃত্রিম তেজীভাব সৃষ্টি করে চটজলদি কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কুইক রেন্টাল পদ্ধতিতে বিদ্যুৎ উৎপাদনের তড়িঘড়ি সমাধানের প্রতি। যেসব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার তুলে ধরা জরুরি ছিল, তাদের অগ্রাধিকারের তালিকায় চলে যায় পেছনের সারিতে। শেয়ারবাজার ও কুইক রেন্টাল সরকারকে বিপদে ফেলেছে। তবে খেলায় এখন হাফ টাইমের বিরতি চলছে। এখনও সময় আছে, যেসব প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কথা এতক্ষণ তুলে ধরলাম সেদিকে মনোযোগ দিলে সরকার হয়তো ক্রমশ লুপ্ত জনপ্রিয়তা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা করতে পারে।


ড. বিনায়ক সেন : অর্থনীতিবিদ ও প্রাবন্ধিক এবং গবেষণা পরিচালক, বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান বা বিআইডিএস
অজয় দাশগুপ্ত : সাংবাদিক

No comments

Powered by Blogger.