লন্ডন যখন পুড়ছিল by জামান সরদার

রোম যখন পুড়ছিল, সম্রাট নিরো তখন নাকি বাঁশিতে সুর তুলছিলেন। আর লন্ডনে যখন ভাংচুর, অগি্নসংযোগ ও লুটপাট চলছিল ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন তখন সপরিবারে অবকাশযাপন করছিলেন ইতালির তুসকান হিলস এলাকায়। গত বছর ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে প্রবেশ করার পর এটাই ছিল ক্যামেরন-সামান্থা জুটির প্রথম অবকাশযাপন।


বস্তুত গ্রীষ্মের পক্ষকাল কোথায় কাটাবেন, সে নিয়ে কয়েক মাস আগে থেকেই পরিকল্পনা করছিলেন তারা। একান্ত ব্যক্তিগত এই সফরের খবর বিশ্ব জেনেছিল তুসকানের একটি রেস্টুরেন্টের নারীকর্মীর কল্যাণে। ক্যামেরন দম্পতি তাকে কফি পরিবেশনের অনুরোধ জানালেও ব্যস্ততা দেখিয়ে ওই কর্মী ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীকে প্রত্যাখ্যান করেন। বলাবাহুল্য, ওয়েটার ক্যামেরনকে চিনতে পারেননি। আর প্রধানমন্ত্রীও তখন তাকে টিপস না দিয়েই চলে আসেন। পরে অবশ্য সেখানে আরেক দফা খেতে গিয়ে যথারীতি টিপস দিয়েছেন। পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীচিত আপ্যায়নও। ওয়েটারসহ অন্যরা ঘটা করে তার সঙ্গে ছবি তুলেছে।
কেবল টিপস কাণ্ড নয়; ওই অবকাশযাপনে ক্যামেরন পরিবার কী করেছেন, কোথায় কোথায় গেছেন, তাদের রিসোর্টের ভাড়া কত, সবই মিডিয়ায় এসেছে। ছোট ও সাধারণ ঘটনার সবই যখন গগন বিস্তারি খবরে পরিণত হচ্ছিল, ক্যামেরনের 'ভাগ্যের নির্মম পরিহাস'ই বলতে হবে, তখন লন্ডনে তৈরি হচ্ছিল প্রকৃত অঘটন। উত্তর লন্ডনের টটেনহ্যাম এলাকায় পুলিশি তৎপরতায় একজনের মৃত্যু নিয়ে রাজধানীর বাইরেও কয়েকটি শহরে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভের আগুন। চলে লুটপাট ও মারপিট। যদিও পুলিশই ছিল অন্যতম প্রধান প্রতিপক্ষ, এ ধরনের অঘটনে উন্নত বিশ্বে পুলিশকেই সবার আগে এগিয়ে আসতে হয়। তবে সাধারণ নাগরিকের প্রত্যাশা থাকে যে, তাদের নির্বাচিত নেতারাও অন্তত টেলিভিশন ক্যামেরার সামনে হলেও অভয় নিয়ে এগিয়ে আসবেন। হায়! যার এগিয়ে আসার কথা, সেই ডেভিড ক্যামেরন তখন নিজেই টেলিভিশনের দর্শক। বিপদের মাত্রা বুঝে পরে অবশ্য ক্যামেরন অবকাশযাপন সংক্ষেপ করে লন্ডনে ফিরেছেন। কিন্তু ততক্ষণে তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের যা ক্ষতি হওয়ার তা হয়ে গেছে। বিরোধী দল তো বটেই, নিজ দলের ভেতরেও সমালোচনা। সমালোচনায় সুর মিলিয়েছে সংবাদমাধ্যম ও নাগরিক সমাজ। সবাই বলছে, ক্যামেরনের উচিত ছিল শুরুতেই চলে আসা এবং পরিস্থিতি সামলানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়ে নেওয়া।
ক্যামেরনের এমন বিপাকের মধ্য দিয়ে আরেকটি বিষয় বের হয়ে এসেছে। গার্ডিয়ানের একটি নিবন্ধে হিসাব করে দেখানো হয়েছে যে, গত ৩০ বছরে ব্রিটেনে যতবারই সংকট তৈরি হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীদের কেউই স্টেশনে ছিলেন না। তাতে করে অবশ্য ক্যামেরনের রেহাই মিলছে না। বিশ্লেষকরা বলছেন, গত কয়েক দিনের অস্থিরতায় লন্ডনের যে ক্ষতি হয়েছে, তা হয়তো পরবর্তী কিছুদিনে কাটিয়ে ওঠা যাবে; কিন্তু ডেভিড ক্যামেরনের জন্য ওই সময় অনুপস্থিত থাকার জের বহু দূর
গড়াতে পারে।
 

No comments

Powered by Blogger.