আয়ারল্যান্ড সিরিজের অভাবিত উপহার by উৎপল শুভ্র

ফিল সিমন্সের দাবিটা ঠিকই আছে। ৩-০ ব্যবধানে সিরিজের আসল রূপটা ঠিক প্রতিফলিত নয়। আয়ারল্যান্ডের ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান কোচ অবশ্য সিরিজে বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠত্ব নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন না। বরং সাত বছর আগে জিম্বাবুয়ের কোচের ভূমিকায় বাংলাদেশ দলকে যখন প্রথম দেখেছিলেন, সেই তুলনায় ‘অনেক-অনেক উন্নতি’ই দেখছেন।


তবে এটা তো তিনি মনে করিয়ে দিতেই পারেন যে, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ম্যাচে একটু এদিক-ওদিক হলেই বদলে যেতে পারত জয়ী দলের নাম।
মুশফিকুর রহিমের কাছে আবার এটাকেই মনে হচ্ছে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার প্রমাণ। ‘বড় দল খারাপ পরিস্থিতি থেকে ফিরে এসে ম্যাচ শেষ করতে পারে, শেষ দুই ম্যাচে আমরা তা-ই করেছি’—গত পরশু সহজ ম্যাচটা কঠিন করে জেতার পর বললেন বাংলাদেশ অধিনায়ক।
তামিম ইকবালও দেখা গেল একই রকম ভাবছেন। তাঁর চোখে এই সিরিজ থেকে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি ‘জয়ের অভ্যাস’। তৃতীয় ম্যাচের পর বললেন, ‘২০০৭ বিশ্বকাপের আগে আমাদের এই জয়ের অভ্যাসটা হয়েছিল। এখন আবার হচ্ছে। এ কারণেই আজ জিতেছি। অন্য সময় হলে এই ম্যাচ আমরা ৫০ রানে হারতাম!’
আয়ারল্যান্ডকে নিয়ে বাংলাদেশের জ্বালা আছে। ‘আছে’ না বলে এখন কি ‘ছিল’ লেখা উচিত! ওদের দেশে এসে ওদের ধবলধোলাই তো জ্বালা-জুড়ানিয়াই। মূল্যটা অবশ্য কম দিতে হয়নি এ জন্য। ‘মূল্য’ কথাটা আক্ষরিক অর্থেই। এই সফরটা হবে কি হবে না করতে করতে শেষ পর্যন্ত হয়েছে। আয়ারল্যান্ড নামেই আতিথ্য দিয়েছে, খরচপাতি সব বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের। বিসিবি সভাপতির আনুমানিক হিসাবমতে, অঙ্কটা প্রায় তিন কোটি টাকা। প্রতিটি জয়ের দাম তাহলে এক কোটি টাকা পড়ল!
এই সিরিজ টি-টোয়েন্টি র‌্যাঙ্কিংয়ে যে তেলেসমাতি খেল দেখাল, তাতে অবশ্য এ নিয়ে বিন্দুমাত্র আফসোস থাকার কথা নয়। সিরিজের আগে বাংলাদেশ র‌্যাঙ্কিংয়েই ছিল না। আর আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে তিনটা ম্যাচ জিতেই চার নম্বরে! অস্ট্রেলিয়া-পাকিস্তান-ভারত-নিউজিল্যান্ড—সব বাংলাদেশের নিচে! অথচ টি-টোয়েন্টিতে এদের বিপক্ষে বাংলাদেশের একটিও জয় নেই।
র‌্যাঙ্কিংয়ের এ ব্যাপারটা বাংলাদেশ দলের যথেষ্ট আমোদিত করছে। কাগজে-কলমে বিশ্বের চতুর্থ সেরা টি-টোয়েন্টি দল, এর আগে কোনো ধরনের ক্রিকেটেই যে ‘স্বীকৃতি’ মেলেনি। আমোদিত হওয়ার মতোই ব্যাপার। তবে প্রসঙ্গটা উঠতেই ক্রিকেটাররা হেসে ফেলছেন। মুখে তো আর ‘হাস্যকর’ বলতে পারেন না, তবে র‌্যাঙ্কিংয়ের অবাস্তবতা তাদেরও হাসাচ্ছে। তামিম ইকবাল যদিও তা মানতেই রাজি নন, ‘আমরা যখন র‌্যাঙ্কিংয়ে ছিলাম না, তখন অনেকে বলেছে, তোমরা কেমন টিম, আফগানিস্তান পর্যন্ত র‌্যাঙ্কিংয়ে আছে আর তোমরা নেই! তখন তো র‌্যাঙ্কিংকে সবাই ঠিকই গুরুত্ব দিয়েছে। এখন আমরা চার নম্বর বলে র‌্যাঙ্কিংকে ফালতু প্রমাণ করার চেষ্টা করলে হবে না। আমার খুব ভালো লাগছে—এক দিনের জন্য হলেও তো দেখলাম, বাংলাদেশ ওই সব দেশের ওপরে।’ কিন্তু তামিম কি সত্যিই বিশ্বাস করেন, বাংলাদেশ বিশ্বের চতুর্থ সেরা টি-টোয়েন্টি দল? এবার তাঁর মুখে দুষ্টুমির হাসি, ‘আমাকে কিছু বলতে হবে কেন, র‌্যাঙ্কিংই তো বলছে!’
ব্যাপারটাতে সবচেয়ে বেশি আমোদ পেয়েছেন বলে মনে হলো সাকিব আল হাসান। ‘ধুর, র‌্যাঙ্কিং ভুয়া’ বলার পর অবশ্য একটু কূটনৈতিক হওয়ার প্রয়োজন দেখলেন, ‘দেশের মানুষ এতে খুশি, তাই আমরাও খুশি।’ মাশরাফি বিন মুর্তজা এমনিতে র‌্যাঙ্কিংকে কোনো গুরুত্বই দেন না জানিয়ে হেসে ফেললেন, ‘তবে চার নম্বরে যখন আছি, র‌্যাঙ্কিং জিনিসটা খারাপ কী!’
আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে দ্বিতীয় ম্যাচ জেতার পর র‌্যাঙ্কিংয়ে ছয় নম্বরে উঠে যাওয়ার ব্যাপারটি জানতেন অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম। তবে তাঁর ধারণা ছিল, ইউরোপ সফরের বাকি তিনটি ম্যাচ জিতলে তবেই ৪ নম্বরে। গত পরশু ম্যাচের পর রাত পর্যন্ত জানতেন না, বাংলাদেশ যে ৪ নম্বরে উঠে গেছে। তৃতীয় ম্যাচে হেরে গেলে বাংলাদেশ ৯ নম্বরে নেমে যেত—এটিও না। ব্যাপারটার অবাস্তবতা তিনিও অস্বীকার করছেন না, তবে অধিনায়ক হিসেবে এটিকে কাজে লাগাতে চাইছেন প্রেরণা হিসেবে, ‘কোনো ধরনের ক্রিকেটেই আমরা র‌্যাঙ্কিংয়ে এত ওপরে উঠিনি। দীর্ঘমেয়াদি একটা লক্ষ্য হয়তো আমাদের আছে, তবে এ মুহূর্তে এমন কিছু কারও কল্পনাতেও ছিল না। তবে ৪ নম্বরে যখন উঠেই গেছি, এটাকে ধরে রাখার চেষ্টা করতে হবে।’
বেলফাস্ট থেকে কাল সকালে লন্ডন হয়ে হল্যান্ডে উড়ে গেছে বাংলাদেশ দল। সেখানে আগামীকাল স্কটল্যান্ড, পরদিন হল্যান্ডের সঙ্গে খেলা। এই দুটি ম্যাচে কোনো অঘটন না ঘটলে হয়তো দেখা যাবে, বাংলাদেশ আগামী সেপ্টেম্বরে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ শুরু করছে র‌্যাঙ্কিংমতে বিশ্বের চতুর্থ সেরা টি-টোয়েন্টি দল হিসেবে।
নাহ্, র‌্যাঙ্কিং জিনিসটা মন্দ নয়!

No comments

Powered by Blogger.