ধর্ম-রোজাদারের সবচেয়ে খুশির মুহূর্ত ইফতার by আবদুস সবুর খান

রোজাদার ব্যক্তির সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত হচ্ছে ইফতারের মুহূর্ত। শেষ রাতে সেহির খাওয়ার মাধ্যমে রোজাদার সারা দিন রোজা রাখার যে নিয়ত করেন, দিনের শেষে সূর্যাস্তের পর ইফতারের মাধ্যমে সেই রোজা পূর্ণতা পায়। প্রকৃতপক্ষে রোজাদার ব্যক্তি সারা দিন এ মুহূর্তটিরই যেন অপেক্ষা করেন।


পরিবারের অন্য সদস্যদের সঙ্গে একসঙ্গে বসে ইফতার করার উদ্দেশ্যে বিকেলে কর্মস্থল থেকে একটু আগেভাগেই রোজাদার ব্যক্তিরা ঘরমুখো রওনা হন। সারা দিনের সিয়াম সাধনা শেষে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে একসঙ্গে ইফতার করার এক স্বর্গীয় আনন্দ উপভোগ করেন। এই আনন্দে শিশুরাও শরিক হয়, যাদের ওপর এখনো রোজা ফরজ হয়নি।
রোজাদারের জন্য ইফতারের এই স্বর্গীয় আনন্দ মহান আল্লাহই নেয়ামত হিসেবে দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘রোজাদারের জন্য দুটি খুশি, একটি খুশি হলো তার ইফতারের সময় আর অপরটি হলো আল্লাহর সঙ্গে তার সাক্ষাতের সময়।’ (বুখারি, মুসলিম)
সেহির খাওয়ার সময় যত দূর সম্ভব দেরিতে সেহির খাওয়াই উত্তম। তবে ইফতারের বেলায় ঠিক তার উল্টো। দ্রুত ইফতার করাতেই অধিকতর কল্যাণ নিহিত। এ সম্পর্কে রাসুল (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘তোমরা ইফতারের সময় হওয়া মাত্র ইফতার করে নাও, এতটুকু বিলম্ব কোরো না।’ অন্য এক হাদিসে তিনি এরশাদ করেন, ‘মানুষ তত দিন কল্যাণের মধ্যে থাকবে, যত দিন তারা ইফতারের সময় হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ইফতার করবে।’ (বুখারি, মুসলিম) রাসুলে পাক (সা.) আরও এরশাদ করেন, ‘আমি ওই ব্যক্তিকে সর্বাধিক ভালোবাসি, যে ইফতারের সময় হওয়া মাত্র ইফতার করে নেয়।’ (তিরমিজি) হাদিসে কুদসিতে মহান রাব্বুল আলামিন বলেন, ‘আমার বান্দাদের মধ্যে যারা দ্রুত ইফতার করবে, তারাই আমার কাছে অধিকতর প্রিয়।’
রোজাদারের ইফতার করার মুহূর্তটি অত্যন্ত বরকতময়। কারণ, এই সময় মহান আল্লাহ রোজাদারের দোয়া কবুল করে থাকেন। এ প্রসঙ্গে রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘রোজাদারের ইফতারের সময় তার দোয়া কবুল হয়ে থাকে।’ (আবুদাউদ) তবে আমাদের লক্ষ রাখতে হবে, ইফতারের সামগ্রী যেন হালাল উপার্জনের হয়, পাক-পবিত্র হয়। কারণ, পাক-পবিত্র হালাল রিজিক দ্বারা ইফতার করার জন্য রাসুল (সা.) বিশেষভাবে তাগিদ দিয়েছেন। তিনি এরশাদ করেন, ‘তোমাদের মধ্যে কেউ যখন রোজা থেকে ইফতার করে, তখন তার খুরমা-খেজুর দিয়ে ইফতার করা উচিত। যদি তা না পায়, তবে পানি দিয়ে ইফতার করবে। কারণ, পানি হচ্ছে পাক-পবিত্র।’ (আবুদাউদ, তিরমিজি)
তবে ইফতারের সময় আমাদের লক্ষ রাখতে হবে, রোজার মূল উদ্দেশ্য যে সংযম, তা যেন ইফতারের আয়োজনের বাহুল্যে কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়। সারা দিনের ক্ষুধা-তৃষ্ণার কষ্ট ইফতারের সময় পুষিয়ে নেওয়ার লক্ষ্যে আমরা যদি ইফতারে অতিভোজনের আয়োজন করি, তাহলে তা হবে সংযমের পরিপন্থী, যা রোজার মূল উদ্দেশ্যবিরোধী। আমাদের দেশে ইফতারের জন্য আমরা নানা রকম মুখরোচক খাদ্যসামগ্রীর আয়োজন করে থাকি। এগুলোর মধ্যে ভাজাপোড়া-জাতীয় খাদ্যদ্রব্যই বেশি। অথচ এই জাতীয় খাদ্যদ্রব্য দিয়ে ইফতার করাকে রাসুল (সা.) অপছন্দনীয় বলেছেন।
ইফতার করা যেমন সওয়াবের কাজ, তেমনি কোনো রোজাদারকে ইফতার করানোও অধিকতর সওয়াবের। রাসুল (সা.) এরশাদ করেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো রোজাদারকে ইফতার করাবে, তা তার জন্য গুনাহ মাফ ও জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তির কারণ হবে এবং সে ওই রোজাদারের সমান সওয়াবের অংশীদার হবে। অথচ ওই রোজাদারের সওয়াবের মধ্যে কোনো কম করা হবে না। সাহাবায়ে কিরাম আরজ করলেন, ‘ইয়া রাসুলুল্লাহ (সা.), আমাদের সবারই তো এমন সামর্থ্য নেই যে রোজাদারকে ইফতার করাব।’ রাসুল (সা.) বললেন, ‘এই সওয়াব তো আল্লাহ তাআলা একটি খেজুর দিয়ে অথবা এক ঢোক পানি দিয়ে অথবা এক চুমুক দুধ দিয়ে ইফতার করালেও দান করবেন। যে ব্যক্তি রোজাদারকে পানি পান করাবে, আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন হাউজে কাউসার থেকে এমন পানি পান করাবেন, যার পর বেহেশতে প্রবেশ করার আগ পর্যন্ত তার আর পিপাসা হবে না।’ (বাইহাকি, ইবনে খুজাইমা)
এই হাদিস দ্বারা প্রতীয়মান হয়, রাসুল (সা.) রোজাদারদের অন্য রোজাদারদের প্রতি দয়ালু, দানশীল, সহমর্মী ও সহানুভূতিশীল হতে উদ্বুদ্ধ করেছেন। আমরা যারা প্রতিদিন হরেক পদের ইফতারি দিয়ে ইফতারের টেবিল সাজিয়ে ইফতারের আনন্দ উপভোগ করছি, তাদের এই আয়োজন কমিয়ে প্রকৃত অভাবী-অনাহারী রোজাদারদের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়া উচিত। লক্ষ্য করলে দেখব, আমার পাশেই হয়তো এমন অনেক রোজাদার রয়েছেন, যাঁদের সেহিরও যেমন ভাগ্যে জোটেনি, তেমনি ইফতারির জন্যও পানি ছাড়া মুখে দেওয়ার আর কিছুই নেই। আমরা কি আমাদের ইফতারির এতগুলো পদ থেকে একটি-দুটি পদ এসব রোজাদারের জন্য দান করতে পারি না?
ড. আবদুস সবুর খান: সহযোগী অধ্যাপক, ফারসি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

No comments

Powered by Blogger.