স্মরণ-অধ্যাপক নোমান : তাঁর কথা ভাবলে কৌতূহল হয় by খান সারওয়ার মুরশিদ

লি্লশের দশকের শেষের দিকে যে কজন যুবক মানুষ গড়ার কারখানায় যোগ দেওয়ার জন্য নিজেদের তৈরি করেছিলেন এবং পরবর্তী জীবনে এ কাজে সফল ও খ্যাত হয়েছিলেন, তাঁদের মধ্যে প্রয়াত অধ্যাপক নোমান বিশিষ্ট। সে সময় প্রায় সব মেধাবী তরুণ সিভিল সার্ভিসে যেতে চাইতেন এবং যেতেনও। কিন্তু কেউ কেউ স্বেচ্ছায় স্বল্প আয়ের পেশা শিক্ষকতাকে বেছে নিতেন।


আবার কেউ কেউ সিভিল সার্ভিসের বাছাই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়ে শিক্ষকতা এবং অন্যান্য পেশায় যেতেন। আমি যত দূর জানি, নোমান সাহেব অন্যত্র ব্যর্থ হয়ে নয়, সোজা শিক্ষকতায় এসেছিলেন পেশাটিকে ভালোবেসে ও জেনেশুনে। এ কথাটা ভাবতে আমার খুব ভালো লাগে।
নোমান সাহেবের সঙ্গে আমার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দেখা হয়েছে ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি বেশি দিন শিক্ষকতা করেননি, যোগ দেওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই সরকারি কলেজে চলে যান। হয়তো বিশ্ববিদ্যালয়ের চেয়ে সরকারি উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থায় নিরাপত্তা ছিল বেশি। এখনকার মতো তরুণ শিক্ষকদের চাকরির নিরাপত্তা ও পদোন্নতি বিশ্ববিদ্যালয়ে এতটা নিশ্চিত ছিল না। বিভিন্ন সরকারি কলেজের অধ্যাপক, অধ্যক্ষ অবশেষে অবসর গ্রহণের পর জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ ও উপাচার্যের পদে কাজ করে নোমান সাহেব উচ্চশিক্ষা এবং শিক্ষা প্রশাসনের নানা দিক সম্পর্কে বিচিত্র অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ হয়েছিলেন। কিন্তু একজন শিক্ষকের সবচেয়ে যা কাম্য, ছাত্র ও সহকর্মীর শ্রদ্ধা_তা তিনি পেয়েছিলেন প্রচুর।
তাঁর চরিত্রে একটি বিস্ময় ছিল_আমার জানার মধ্যে (আরো হয়তো ছিল, যা আমার জানা নেই, কেননা মানুষের মধ্যে কি শুধু একটি বিস্ময় থাকে?) নোমান সাহেব খুব স্বল্পবাক ছিলেন, মনে হতে পারত, মানুষটি ভেতর থেকে বন্ধ, অনধিগম্য। তবুও তিনি ছাত্রছাত্রী, সহকর্মী, পরিজনদের এত কাছে আসতে পারতেন কী করে! তিনি সাহিত্য পড়াতেন, শব্দ তো তাঁকে ব্যবহার করতেই হতো পেশাগত প্রয়োজনে। মনের দরজা কতখানি খুলে তিনি বোধের আলো ছড়িয়ে দিতেন, যুক্তিকে কল্পনায় অভিষিক্ত করে কত কম কথায় তিনি ছাত্রছাত্রীদের কাছে পেঁৗছে যেতে পারতেন, এটা জানার জন্য আমার কৌতূহল হয় তাঁর কথা ভাবলে। সে যা হোক, এই আপাত দূরস্থিত মানুষটি ছাত্রছাত্রীর খুব নৈকট্য অর্জন করেছিলেন এবং সহকর্মীদের একজন আস্থাভাজন সুহৃদ হতে পেরেছিলেন। নিশ্চয় তিনি সহৃদয় ধৈর্যশীল শ্রোতা ছিলেন, মিতবাক, সংবেদনশীল, ধীর এবং সুবিবেচক একজন মানুষ হিসেবে তাদের কাজে লাগতে পেরেছিলেন। তাঁর প্রজ্ঞাকে তিনি সহজে বহন করতেন, এ কথা তাঁর তরুণ সহকর্মীদের কাছ থেকে আমি জেনেছি।
নোমানের অতি গুরুগম্ভীর ভাবটি খুব দৃষ্টি আকর্ষণ করত বিশ্ববিদ্যালয়ে, কী জানি হয়তো সে কারণেই একদিন আমার একজন সহজ প্রকাশে স্বচ্ছন্দ, মৃদু কৌতুকপ্রবণ, মেধাবী ছাত্রীর মন জয় করে, সবাইকে না হোক আমাকে তো অবশ্যই, বিস্মিত করে দিয়েছিলেন তিনি। আমি এখন বিশ্বাস করি, মৃত্যুর পর মানুষ একেবারে হারিয়ে যায় না। আসন্ন নিশ্চিত অন্ধকারের মুখোমুখি একজন হিসেবে আমার এ কথার নিজের কিঞ্চিত স্বার্থ আছে এ স্বীকার করি। তবুও বলি, নিজের জীবনেই উপলব্ধি করেছি, কোনো কোনো হারানো মানুষ অন্যের জীবনে কেমন করে, কী গভীরভাবে বেঁচে থাকেন। আর সে বেঁচে থাকা যদি সুকৃতির সুষম হয়ে কারো সত্তায় মিশে যায়, সে কী চমৎকার অমরতা। নোমান সাহেব বেঁচে থাকবেন অনেকের মধ্যে, বিশেষ করে তাঁর ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে, যাদের জীবন তিনি স্পর্শ করেছেন প্রজন্ম পরম্পরায়। শিক্ষক ও শিক্ষকতার পেশার বড় দুঃসময়ে নোমান সাহেব চলে গেলেন। বর্তমান অবস্থায় শিকড় পর্যন্ত শিক্ষা একটা খুব বড় ও গভীর পরিবর্তন দাবি করে। বেঁচে থাকলে তিনি এ দাবি মেটানোয় মূল্যবান অবদান রাখতে পারতেন। একটি সৎ, সুন্দর ও কল্যাণপ্রসূ জীবনের অবসান বেদনার।
খান সারওয়ার মুরশিদ

No comments

Powered by Blogger.