গুচ্ছ সুপারিশ আইসিবির by আবুল কাশেম

শেয়ারবাজারে ব্যাপক দরপতনের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া বিনিয়োগকারীদের পুনর্বাসনের লক্ষ্যে একটি উপযুক্ত স্কিম অনুমোদন করা যেতে পারে। প্রয়োজনে মার্চেন্ট ব্যাংক ও ব্রোকারেজ হাউসের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের সহজ শর্তে ঋণ দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া অতীতে যেসব কম্পানি ও উদ্যোক্তা পরিচালক উচ্চদরে প্রিমিয়ামসহ শেয়ার বিক্রি করেছেন, তাঁদের যৌক্তিক দরে ওই শেয়ারের অন্তত ২৫ থেকে ৫০ ভাগ আবারও কিনতে (বাই-ব্যাক) বাধ্য করা


যায়। বিধ্বস্ত শেয়ারবাজারকে পুনর্গঠিত করতে এ ধরনের ১৪টি সুপারিশ করেছে ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)।
গত বুধবার সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর প্রধানদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার যে বৈঠক হয়, তাতে সুপারিশগুলো লিখিত আকারে পেশ করা হয়। গতকাল শুক্রবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছেও এর কপি দেওয়া হয়েছে। জানা গেছে, শেয়ারবাজারের বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এঙ্চেঞ্জ কমিশন (এসইসি), জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এবং বীমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষও বেশ কিছু প্রস্তাব করেছে।
আইসিবির লিখিত প্রস্তাবে বলা হয়েছে, পুঁজিবাজারে ব্যাংকের অংশগ্রহণের কারণে শেয়ারবাজার চাঙ্গা হয়েছিল। পরে ব্যাংকের অংশগ্রহণ কমে যাওয়ায় এবং লাভের ৯ হাজার ৭০০ কোটি টাকা পুঁজিবাজার থেকে অর্থবাজারে চলে যাওয়ায় বাজারে মন্দা নেমে এসেছে। তাই পুঁজিবাজার চাঙ্গা করতে আবারও ব্যাংকের ভূমিকা বাড়াতে হবে। প্রচলিত নিয়মে ব্যাংকের মোট দায়ের ১০ শতাংশ পর্যন্ত শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করার বিধান রয়েছে। প্রতিটি ব্যাংক যাতে কমপক্ষে ৫ শতাংশ বিনিয়োগ করে সে বিষয়টিও বাংলাদেশ ব্যাংককে নিশ্চিত করতে হবে। এ ছাড়া শেয়ারবাজার স্থিতিশীল না হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান শেয়ার ক্রয় অব্যাহত রাখতে পারে।
শেয়ারবাজারের অব্যাহত দরপতন ঠেকাতে পাঁচ হাজার কোটি টাকার বাংলাদেশ ফান্ড দ্রুত অনুমোদনের সুপারিশ করেছে আইসিবি। দেশি-প্রবাসী বিনিয়োগকারীদের এই তহবিলে অবদান রাখার জন্য উৎসাহিত করতে সরকারের কাছে আট ধরনের প্রণোদনার প্রস্তাব করেছে আইসিবি। এর মাধ্যমে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ বাড়বে উল্লেখ করে আইসিবি বলছে, নতুন কোনো তহবিল সৃষ্টি না করে ব্যাংক ও ইনস্যুরেন্স কম্পানিসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ ফান্ডেই বিনিয়োগ করতে পারে। আইসিবি মনে করে, বাংলাদেশ ফান্ডে প্রবাসীদের বিনিয়োগ আকর্ষণের মাধ্যমে রেমিট্যান্স-প্রবাহ বৃদ্ধি ও সঞ্চয় সংগ্রহ সম্ভব।
বাংলাদেশ ফান্ডে দেশি ও প্রবাসীদের বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে আট ধরনের প্রণোদনার সুপারিশ করেছে আইসিবি। এর মধ্যে রয়েছে_সরকারি প্রতিষ্ঠানের শেয়ার অফলোড করার সময় ১০ শতাংশ শেয়ার অভিহিত মূল্যে বরাদ্দ রাখতে হবে; ফান্ডের মুনাফা সম্পূর্ণ করমুক্ত রাখতে হবে; বাংলাদেশ অবকাঠামো তহবিলের মতো বাংলাদেশ ফান্ডেও কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দিতে হবে; ফান্ডের বড় অংশ মুদ্রাবাজারে বিনিয়োগ হবে বিধায় পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ওপর আরোপিত বিধিনিষেধ এ ফান্ডের ক্ষেত্রে শিথিল করতে হবে। প্রণোদনার মধ্যে আরো আছে_বাংলাদেশ ব্যাংককে প্রস্তাবিত ফান্ডের ইউনিট সার্টিফিকেটকে অনুমোদিত সিকিউরিটিজ হিসেবে বিবেচনা করা; বাংলাদেশ ফান্ডের সংগৃহীত অর্থের ৫০ ভাগ পুঁজিবাজারে ও ৫০ ভাগ অর্থবাজারে বিনিয়োগের অনুমোদনদান; এসইসির বার্ষিক ফি এক লাখ টাকা নির্ধারণ ও ভবিষ্যতে ইস্যু হবে এমন সব আইপিওর কমপক্ষে ৫ শতাংশ শেয়ার বাংলাদেশ ফান্ডের অনুকূলে বরাদ্দ রাখা।
আইসিবি বলছে, শেয়ারবাজারে তারল্যপ্রবাহ বজায় রাখার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক একটি পুনরর্থায়ন তহবিল গঠন করতে পারে। ব্যাংক, মার্চেন্ট ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান সহজ শর্তে ওই তহবিল থেকে ঋণ নিয়ে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে পারে। পুঁজিবাজারে কর্মচাঞ্চল্য ফিরিয়ে এনে নতুন আইপিও আনা, বেকার যুবকদের কর্মসংস্থান, রাজস্ব আদায় ও রপ্তানি বৃদ্ধির স্বার্থে মুদ্রানীতি কিছুটা নমনীয় করা যায় কি না তা পর্যালোচনার সুপারিশও করেছে আইসিবি।
সংস্থাটি বলছে, বাংলাদেশ ব্যাংক আইসিবিকে ৬০০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছিল। তা আবার ৯০ দিনের মধ্যে ফেরত দিতে হয়েছে বলে আইসিবি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি মালিকানাধীন বিনিয়োগ-প্রতিষ্ঠান হিসেবে আইসিবিকে কমপক্ষে তিন হাজার কোটি টাকা তিন বছর মেয়াদে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া আইসিবির রাইট শেয়ারের অনুমোদন দেওয়া যেতে পারে।
এসইসিকে আরো বেশি ক্ষমতা দেওয়ার সুপারিশ করে আইসিবি বলেছে, নবগঠিত এসইসি অনেক গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছে। পুঁজিবাজার-সংশ্লিষ্ট যেকোনো সিদ্ধান্ত, যেমন_নতুন ট্যাঙ্, ভ্যাট আরোপ, অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগসহ সংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে অবশ্যই এসইসির সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকে ক্যাপিটাল মার্কেট-সংক্রান্ত একটি বিভাগ থাকা দরকার বলে মনে করে আইসিবি। ওই বিভাগের দায়িত্ব দিতে হবে অভিজ্ঞ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাকে, যিনি এসইসিসহ সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে যোগাযোগ ও পরামর্শ করে যথাযথ পদক্ষেপ নেবেন।
আইসিবি বলছে, পুঁজিবাজারে যুক্তিসংগত মূল্যে শেয়ার ইস্যুর শর্তে নতুন কম্পানিকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও চলতি মূলধনের জোগান দেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া পিপিপির আওতা গঠিত কম্পানিগুলোর শেয়ারের একটা অংশ শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ নিশ্চিত করা যেতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পুঁজিবাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে বাংলাদেশ ব্যাংকের সিআরআর, এসএলআরকে আগের অবস্থায় নামিয়ে আনা, ব্যাংকের নিজস্ব সাবসিডিয়ারি প্রতিষ্ঠানকে বিনিয়োগসীমা থেকে বাদ দেওয়া ও কম্পানিগুলোকে দুই বছর সিঙ্গেল পার্টি এঙ্পোজার লিমিটের আওতার বাইরে রাখা, বিনিয়োগ হওয়া কালো টাকার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন না করা, বিদেশি ও প্রবাসী বিনিয়োগের মুনাফার ওপর ১০ শতাংশ কর প্রত্যাহার করা এবং মার্জিন ঋণের ওপর সুদ আরোপে নিষেধাজ্ঞা জারি করার সুপারিশ করেছে বিভিন্ন সংস্থা। তবে কালো টাকার উৎস সম্পর্কে কোনো রকম প্রশ্ন না তোলার বিষয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) বলছে, এটি হলে বাংলাদেশের এডমন্ড গ্রুপের সদস্যপদ পাওয়ার বিষয়টি আটকে যেতে পারে।

No comments

Powered by Blogger.