ঘাসফড়িং ও প্রজাপতি

ড়িং আর প্রজাপতি দুজনে বসেছে ফুল গাছের ডালে। ফড়িং একটা ফুল গাছে, প্রজাপতি আর একটা ফুল গাছে। আজ এখন পর্যন্ত ওদের ঝগড়া লাগেনি। প্রতিদিন ওদের ঝগড়া লাগবে। ঝগড়া না লাগলে যেন ওদের শান্তি হয় না। প্রতিদিনের ঝগড়া মীমাংসা করে ওদের বন্ধু ঘাস।ফুল বাগানে মনুষ্যজাতের একজন এসেছে। এই লোক সাংবাদিক নতুবা প্রকৃতি প্রেমিক।
লোকটি ফুলের বাগানে ঘুরতে ঘুরতে প্রজাপতি আর ফড়িংকে দেখে সেই গাছ দুটোর কাছে আসে। প্রজাপতি আর ফড়িং ভয় পেয়ে যায়। ওরা শুনেছে, মনুষ্যজাত নাকি খুব খারাপ জাত! এরা ছোট প্রাণীগুলোকে অতি তুচ্ছ মনে করে। প্রাণ নিয়ে ছিনিমিনি খেলে। তাই ভয়ে ওরা ফুল গাছের এ ডাল থেকে ও ডাল, ও ডাল থেকে এ ডাল ওড়াউড়ি করে। স্থির থাকে না।
লোকটি ক্যামেরা জাতীয় কিছু বের করে। এরপর ফড়িং একটু স্থির হতেই একটা ফটো তুলে ফেলে। প্রজাপতি একটা ফুলের মাঝখানে বসে থাকে দূরে। লোকটি প্রজাপতিকে ক্যামেরায় বন্দি করে তিন তিনবার। ফড়িং ও প্রজাপতি দুজনে টের পায় ওদের দুজনের ফটো তুলেছে লোকটি।
লোকটি চলে যেতেই ওরা আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে।
ফড়িং বলে, 'বল তো, মনুষ্যজাতের প্রাণীটি যন্ত্র দিয়ে কী করলো?'
প্রজাপতি বলে, 'ফালতু প্রশ্ন করিস কেন? ভেবেছিস বলতে পারবো না? ফটো তুললো।'
ফড়িং বলে, 'ফটোগুলো কী করবে?'
প্রজাপতি বলে, 'পেপারে ছাপাবে।'
'পেপারে ছাপালে তো আমরা বিখ্যাত হয়ে যাবো। তাই না?'
'আমাদের জাতে তো কেউ পেপার নেয় না। কোথায় দেখা যাবে?'
ফড়িং বলে, 'কেন আমরা অন্যের বাসায় উড়ে গিয়ে দেখে আসবো।'
'ঠিক বলেছিস। জানিস আমার তিনটা ফটো ছাপানো হবে।'
'কেন?'
'কারণ আমার তিনটা ফটো তুলেছে। তোর তুলেছে একটা।'
'তোমারও একটা ছাপানো হবে, আমারও একটা ছাপানো হবে।'
'না, আমার তিনটা ছাপা হবে, তোর একটা।'
'তোমার তিনটা ফটো তুলেছে ঠিকই, কিন্তু ছাপানো হবে একটা।'
'তুই তর্ক করিস কেন? একটা ছাপলে আমার তিনটা ফটো তুলতো না।'
'তিনটা ছবি তুলেছে, কারণ তোমার পোজ দেওয়া ভালো হয়নি। আর আমার একটাতেই চমৎকার পোজ দেয়া হয়েছে।'
'জি না। আমি সুন্দর বলে আমার তিনটা ফটো তুলেছে।'
'আমি কি অসুন্দর?'
'তা তো বলতে পারবো না। তবে, আমার শরীরে নানান রঙের বাহার আছে।'
ফড়িং পাখা দুলিয়ে বলে, 'আমার, বা কম কিসে?'
'তোর তো ইয়া মোটা মাথা। মটকু ফড়িং তুই একটা!'
'তুমি তো বজ্জাত!'
'চুপ! বাজে কথা বলবি তো তোর হাড্ডি ভেঙে দেবো।'
ফড়িং রেগে বলে, 'তুমি কিন্তু তখন থেকে আমাকে তুই তোকারি করছো! এটা কিন্তু ঠিক করছো না।'
প্রজাপতি বলে, 'আমার ইচ্ছে আমি করছি। তাতে তোর কী?'
ফড়িং বিনয়ী ভংগিতে বলে, 'তুমি আমাকে তুমি তোমরা করে বলো।'
প্রজাপতি রেগে গিয়ে বলে, 'এ্যাই মটকু ফড়িং, তোকে কিছুই বলতে চাই না। এই আমি তোর সঙ্গে কথা বন্ধ করলাম।'
ফড়িং বলে, 'কী কাণ্ড! আমি তোমাকে কথা বলা বন্ধ করতে বললাম নাকি?'
প্রজাপতি কিছু বলে না। সে উড়ে গিয়ে দূরে কলাবতী ফুলের গাছে বসে। ফড়িংয়ের মন খারাপ হয়। ও কখনোই চায় না প্রজাপতির সঙ্গে ঝগড়া করতে। কিন্তু কিভাবে যেন লেগে যায়।
ওরা দুজন এমনিতে সব সময় একসঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। আর সন্ধ্যা হলেই ওদের আরেক বন্ধু ঘাসের কাছে বসে আড্ডা মারে। নিজেদের অভিযোগও তুলে ধরে ঘাসের কাছে। ঘাস কী সুন্দরভাবে তা সমাধান করে দেয়!
ঘাস থাকে এই বাগানের পিছনে বাড়ির কাছে একটা মাঠ আছে_ সেটাতে। ঘাসের বন্দি জীবন। সে তো সারাক্ষণ একা একা থাকে। প্রজাপতি আর ফড়িংয়ের মতো উড়ে বেড়াতে পারে না। চলতেও পারে না। তবুও ওর সময় ভালোই কাটে।
ফড়িং দূরে কলাবতী গাছে প্রজাপতির কাছে যায়। কাছে গিয়ে সন্ধ্যামালতি গাছে বসে পড়ে। কিছুক্ষণ নীরব থাকে। এরপর বলে, 'প্রজাপতি ভাই, তোমার কি মন খারাপ?'
'বলছি না, তোর সঙ্গে কথা বলবো না?' _অভিমান করে বলে প্রজাপতি।
ফড়িং বলে, 'এই তো তুমি কথা বললে। হি-হি-হি...!'
প্রজাপতি ভাবে, 'তাই তো!'
প্রজাপতি আবার ঝগড়া লাগার সূত্র খোঁজে। ফড়িংয়ের সঙ্গে সে আর কথা বলতে চায় না। তার সঙ্গ একদিনও মেলে না। ঝগড়া লাগিয়ে কথা বন্ধ করতে হবে।
প্রজাপতি বলে, 'আকাশের বন্ধু কে জানিস?'
ফড়িং বলে, 'জানি।'
'কে?'
'আমি, তুমি।'
'আমি আকাশের অন্ধকার!' _প্রজাপতি বলে।
'আর আমি আকাশের আলো।'
'আমি মন খারাপ করলে আকাশ আঁধার হয়ে যায়। বৃষ্টিও নামে।'
'আমি তখন আকাশে রঙধনুকে উঠতে বলি।'
'আকাশ আমার খুব প্রিয় বন্ধু। তোর নয়।' _প্রজাপতি বলে।
ফড়িং বলে, 'আমারও প্রিয় বন্ধু।'
'হয়ে যাক পরীক্ষা?'
'হয়ে যাক।'
ওদের আবার ঝগড়া শুরু হয়। প্রজাপতি এবার তুমি করে বলে ফড়িংকে। সে নিজে যা পারে, সেটা করতে বলে, 'বন্ধু তুমি আকাশ আঁধার করে দাও। ঝম্ ঝম্ করে বৃষ্টি নামিয়ে দাও।'
আকাশ আঁধার হয়ে আসে। ঝম্ঝম্ করে বৃষ্টি নেমে আসে।
ফড়িংও কম যায় না। বলে, 'বন্ধু তুমি রঙধনুর ঝিলিক দাও। রোদ দাও চনচনে।'
আকাশে রঙধনু ঝিলিক মেরে ডুবে যায়। বৃষ্টি থামে। সূর্য দেখা দেয়। চনচনে রোদ ওঠে।
এভাবে বারবার ওদের খেলা চলে।
প্রজাপতি বলে, 'আমি আমার ঘাসবন্ধুকে বলে দেবো, তুমি সব সময় আমার সঙ্গে ঝগড়া করো।'
ফড়িং বলে, 'তুমিই ইচ্ছে করে ঝগড়া লাগাচ্ছো। আমিই ঘাসবন্ধুকে বলে দেবো। আরও বলে দেবো, তুমি আমাকে তুই তুই করে বলেছো।'
'ঘাস আমার প্রিয় বন্ধু। ও আমার কথা শুনবে।'
'ঘাস আমার কথা শুনবে। ও আমার প্রিয় বন্ধু।'
ওরা উড়ে যেতে শুরু করে ঘাসের কাছে। আর যেতে যেতে বলতে থাকে, 'আমার প্রিয় বন্ধু।'
'নাহ্, আমার প্রিয় বন্ধু।'
ওরা ঝগড়া করতে করতে ঘাসের সামনে এসে পড়ে। ঘাস বুঝতে পারে না ঘটনা কী। ঘাস পিট পিট করে হাসে। ফড়িং আর প্রজাপতি দুজনে এসে ঘাসের ডগায় বসে। দুজনে সব বলে ঘাসকে।
শুনে ঘাস বলে, 'আমি তোমাদের দুজনের প্রিয় বন্ধু। কিন্তু তোমরা এভাবে ঝগড়া করলে তো আমার ভালো লাগে না। মাঝে মধ্যে তোমরা আমাকে কষ্ট দাও, তবুও ভালো লাগে; কিন্তু তোমাদের ঝগড়া ভালো লাগে না।'
ঘাসবন্ধুর কথা শুনে প্রজাপতি আর ফড়িং দুজনে অবাক হয়ে একসঙ্গে বলে ওঠে, 'আমরা তোমাকে কষ্ট দেই?'
'হ্যাঁ দাও।' _ঘাস বলে।
'কীভাবে?' _দুজনেই জানতে চায়।
ঘাস বলে, 'এই যে দুজনে এসে আমার ডগায় বসে তোমরা আমাকে দোলাচ্ছো, আমার বুঝি ব্যথা লাগছে না? খুব লাগছে। তোমরা বন্ধু বলে সহ্য করি। আবার ভালোও লাগে।'
ঘাসের কথা শুনে ডগা থেকে উঠে দুজনে উড়ে বেড়াতে লাগল ঘাসের আশে পাশে। ঘাস তখন বলে, 'ছিঃ ছিঃ! তোমরা আমার ডগা থেকে উঠলে কেন?'
'তোমাকে যে কষ্ট দিতে চাই না।'
'আমার কষ্ট লাগবে না। তোমরা শুধু ঝগড়া বন্ধ করো, তাহলেই আমি খুশি। তোমাদের ঝগড়া আমাকে বেশি কষ্ট দেয়। সামান্য ব্যাপার নিয়ে ঝগড়া করা ঠিক নয়।'
একটু বিরতি নিয়ে ঘাস আবার বলে, 'মনুষ্যজাত আজ তোমাদের ফটো তুলেছে শখ করে। তা নিয়ে তোমরা ঝগড়া করলে। অথচ জানো, মনুষ্যজাত তোমার ছবিগুলো একবার দেখে ফেলে দেবে? মনুষ্যজাত খুবই খারাপ! এরা আমাদের একদম দাম দেয় না! তোমরা আকাশের আলো-আঁধার নিয়ে ঝগড়া করলে। জানো, দুপুরে যেমন আলো দরকার, তেমনি রাতে দরকার অন্ধকার। একটি ছাড়া অন্যটি থাকলে সেটা ম্লান দেখায়। কাজেই দুটোই সমান প্রয়োজন। আবার আমাকে নিয়ে ঝগড়া করলে। তোমরা দুজনেই তো আমার ডগায় এসে বসো। কখনও কাউকে মানা করেছি? করিনি। দুজনকেই সমান চোখে দেখি আমি। তোমরা দুজনেই আমার প্রিয় বন্ধু। বুঝতে পেরেছো?'
'হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি।' _দুজনে বলে।
ঘাস বলে, 'প্রজাপতি বন্ধু, তুমি আর কখনও ফড়িংকে তুই তুই করে কথা বলবে না।'
প্রজাপতি বলে, 'বলবো না। আর ঝগড়াও করবো না।'
ঘাস বলে, 'তোমরা একসঙ্গে আমার ডগায় এসে বসো। চলো, আমরা কোলাকুলি করি।'
ঘাসের একটি ডগায় দুজন এসে বসে গা ঘেঁষে। ঘাসের ডগাটি দুলতে থাকে খুব জোরে। ঘাসের খুব কষ্ট হচ্ছে। অথচ একটুও টের পাচ্ছে না। তিন বন্ধু আনন্দে মিলিত হয়েছে। যেন আকাশ হাতে পাওয়ার মতো আনন্দ ভর করেছে ওদেরকে।

No comments

Powered by Blogger.