কালের পুরাণ- শেখ হাসিনার সম্প্রসারিত ‘নবরত্নসভা’ by সোহরাব হাসান

শেখ হাসিনার সরকারের ব্যর্থতার পাল্লা যত ভারী হচ্ছে, মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর সংখ্যাও তত বাড়ছে। গত বৃহস্পতিবার নতুন সাতজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। তাঁরা কি কোনো কাজে সাফল্য দেখাতে পারবেন? এঁদের মধ্যে একজন ছাড়া সবাই অনভিজ্ঞ, প্রায় অপরিচিত।


বলতে গেলে অভিজ্ঞতাও নেই। দলের কর্মীরাও তাঁদের চেনেন না, প্রধানমন্ত্রী চেনেন, এটাই একমাত্র যোগ্যতা।
সরকারের অদক্ষতা, অব্যবস্থা ও দুর্নীতির বিষয়টি যখন সর্বমহলে আলোচিত ও সমালোচিত, তখন ধারণা করা হয়েছিল, পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রধানমন্ত্রী শক্ত পদক্ষেপ নেবেন। অন্তত অদক্ষ, বিতর্কিত ও দুর্নীতির দায়ে অভিযুক্ত মন্ত্রীদের মন্ত্রিসভা থেকে বিদায় করবেন। বিতর্কিত উপদেষ্টাদের উপদেশ নেওয়া থেকে বিরত থাকবেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, তিনি মোটেই কঠোর হতে পারলেন না; কেলেঙ্কারির হোতা ও সহযোগীদের স্বপদেই রাখলেন।
হলমার্ক কেলেঙ্কারির সঙ্গে স্বাস্থ্য উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলীর নাম এসেছে। বিশ্বব্যাংক সাফ জানিয়ে দিয়েছে, অর্থ উপদেষ্টা মসিউর রহমানকে ছুটিতে না পাঠালে তারা পদ্মা সেতুতে অর্থায়ন করবে না। আর বিশ্বব্যাংক অর্থায়ন না করলে এডিবি ও জাইকার অর্থও পাওয়া যাবে না। ২১ সেপ্টেম্বর জাইকার চুক্তির বর্ধিত সময় শেষ হয়ে যাবে। এরপর কী হবে? প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে কোনো সুখবর শোনাতে পারেননি। সম্প্রতি সংসদে বলেছেন, বাইরের অর্থ না পাওয়া গেলে রেলপথ ছাড়াই পদ্মা সেতু হবে। সেটি কি দেশের জন্য ভালো হবে?
কার বা কাদের জন্য বিশ্বব্যাংক মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে, কোন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ঘুষ চাওয়া হয়েছিল, সেসব জানার অধিকার দেশের মানুষের আছে। কাদের যোগসাজশে হলমার্ক নামের একটি অখ্যাত কোম্পানি সোনালী ব্যাংক থেকে ২৬০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিল? কেবল উল্লিখিত কয়েকজন নন, আরও একাধিক মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী ও উপদেষ্টার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অনিয়ম ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ আছে। চাঁদাবাজি-উৎকোচ নেওয়ার অভিযোগ আছে সরকারি দলের বহু সাংসদের বিরুদ্ধে। প্রধানমন্ত্রী শুরু থেকে এসব অভিযোগ আমলে নিলে, দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিলে পরিস্থিতি এতটা নাজুক হতো না। যেই বিরোধী দলকে প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির চ্যাম্পিয়ন বলে গালমন্দ করতেন, সেই দলের নেতারাই এখন জোর গলায় বলছেন, ‘এই সরকারে টপ টু বটম দুর্নীতিতে নিমজ্জিত।’ এর জবাবে কী বলবেন আওয়ামী লীগের নেতারা? কয়েক দিন আগেও তাঁরা বক্তৃতা-বিবৃতিতে বিরোধী দলকে কঠোর ভাষায় আক্রমণ করতেন। এখন সবাই আত্মরক্ষায় ব্যস্ত, বিরোধী দলের অভিযোগের জবাব দিতে দিতে ক্লান্ত। সরকারের বাকপটু নেতারাও ক্ষীণকণ্ঠ হয়ে পড়েছেন। আসলে বড় গলায় বলার মতো অবস্থান সরকারের নেই।

২.
শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ ওরফে মহাজোটের সরকারের মেয়াদ তিন বছর নয় মাস পার হয়েছে। পরিবর্তিত সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হলে সরকারের হাতে সময় আছে ১২ থেকে ১৫ মাস। এই সময়ে সরকার অলৌকিক কিছু করে ফেলবে, তা সাধারণ মানুষ তো বটেই, ক্ষমতাসীন দলটির নেতা-কর্মীরাও বিশ্বাস করেন না। বহুদিন ধরেই বিভিন্ন মহল থেকে দাবি উঠেছিল, মন্ত্রিসভা থেকে বিতর্কিত, অযোগ্য ও দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীদের বাদ দেওয়া হোক এবং যাঁদের প্রতি এখনো মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস আছে, তাঁদের মন্ত্রিসভায় অন্তর্ভুক্ত করে সরকারের কাজে গতি আনা হোক। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এক কথার মানুষ। কারও কথা শোনেন না।
বুধবার রাতে যখন টিভি চ্যানেলগুলো সম্ভাব্য সাতজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীর নাম প্রচার করছিল, তখন অনেকেই ভেবেছিলেন, প্রধানমন্ত্রী মন্ত্রিসভায় কিছুটা হলেও অর্থবহ পরিবর্তন আনবেন। বিশেষ করে, এই তালিকায় আওয়ামী লীগের প্রবীণ নেতা তোফায়েল আহমেদ ও ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননের নাম দেখে। সেই সঙ্গে তাঁরা এও ভেবেছিলেন যে বিতর্কিত, অদক্ষ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রীরা বাদ পড়বেন। না, কেউ বাদ পড়েননি। পরদিন দুপুরের মধ্যে সারা দেশে এই খবর চাউর হয়ে গেল যে তালিকার শীর্ষে থাকা তোফায়েল ও মেনন মন্ত্রী হচ্ছেন না। তাঁরা প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাব নাকচ করে দিয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে মন্ত্রীদের শপথ নিয়ে এ ধরনের ওলটপালট ঘটনার দ্বিতীয় নজির নেই।
কাকে মন্ত্রী করা হবে, না হবে, সেই ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার মালিক প্রধানমন্ত্রী। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সরকারপ্রধান যাঁদের মন্ত্রী করতে চান, তাঁদের সঙ্গে নিজে আলাপ করেন, তাঁদের সম্মতি নেন। অতঃপর মন্ত্রিপরিষদ সচিবের কাছে নাম পাঠান। এবং তিনি আনুষ্ঠানিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শপথ নেওয়ার জন্য আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানান। কিন্তু আমাদের দেশে এসব মানা হয় না। সরকারপ্রধানেরা মানার প্রয়োজন বোধ করেন না। বঙ্গভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘তিনি তো তোফায়েল আহমেদকে টেলিফোন করেননি (অনেকেই মনে করেন, তিনি টেলিফোনটি করলে হয়তো তোফায়েল আহমেদ সরাসরি তাঁকে না করতে পারতেন না। আর তোফায়েল আহমেদ মন্ত্রী হলে রাশেদ খান মেননও দায়িত্ব নিতেন)। রাষ্ট্রীয় পুরস্কার দেওয়ার সময়ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির মতামত নেওয়া হয়, তিনি পুরস্কার নেবেন কি না? কিন্তু মন্ত্রী হওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ ঘটনায় তাঁদের মতামত নেওয়া হবে না কেন?
এ ঘটনার মধ্য দিয়ে কেবল দল ও জোট নয়, সরকারের ভেতরকার দুর্বলতা ও সমন্বয়হীনতা প্রকট হয়ে উঠেছে। যে কারণে বৃহস্পতিবার কারা মন্ত্রী হবেন, সেটি বড় খবর হলো না; বড় খবর হলো, তোফায়েল আহমেদ ও রাশেদ খান মেননের মন্ত্রিত্ব না নেওয়ার খবরটি। ১৯৯৬-২০০১ সালে তাঁর জন্য বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছিল দল, এবার দল ও সরকার—দুটোই। শেখ হাসিনার সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভা গুণ-মানে মোটেই সমৃদ্ধ হয়নি, সংখ্যায় বেড়েছে মাত্র।
শেখ হাসিনা ২০০৯ সালের জানুয়ারিতে যখন অপেক্ষাকৃত নবীন ও অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের নিয়ে মন্ত্রিসভা গঠন করলেন, তখনই নানা মহল থেকে প্রশ্ন উঠেছিল, এঁরা কি পারবেন? আবার কয়েকজনকে এমন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দিয়েছিলেন, যাঁদের সেই গুরুভার বহন করার ক্ষমতাই ছিল না। প্রধানমন্ত্রী বরাবরই তাঁর অনভিজ্ঞ ও অদক্ষ মন্ত্রীদের পক্ষে সাফাই গেয়ে গেছেন। এতে তাঁরই বেশি ক্ষতি হয়েছে। তিনি একবার বলেছিলেন, তাঁরা স্যুটেট-বুটেট না হলেও কাজে দক্ষ ও সৎ। কিন্তু পৌনে চার বছর পর এসে দেখা গেল, তাঁদের অধিকাংশের দক্ষতা, সামর্থ্য ও সততায় ঘাটতি আছে। সাবেক মার্কিন রাষ্ট্রদূত জেমস মরিয়ার্টি সৈয়দ আবুল হোসেনকে ‘লেস দ্যান আ অনেস্ট’ বলে যে মন্তব্য করেছিলেন, তা এখন প্রায় প্রবাদবাক্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে দক্ষ ব্যক্তিদের হাতে দায়িত্ব পড়লে তাঁরা যে পরিবর্তন আনতে পারেন, তার প্রমাণও প্রধানমন্ত্রী হাতেনাতে পেয়েছেন। তিনি কৃষি ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব যাঁদের হাতে দিয়েছেন, তা নিয়ে তো কেউ প্রশ্ন করেন না।

৩.
বৃহস্পতিবার নতুন সাতজন মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী শপথ নিয়েছেন। আগে ছিলেন ৪৬ জন। এঁরা কী করবেন? সংসদীয় সরকারব্যবস্থায় মন্ত্রিসভা জাতীয় সংসদ বা জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থাকার কথা। কিন্তু আমাদের সংবিধান মন্ত্রিসভাকে দায়বদ্ধ করেনি। দায়বদ্ধ করেছে এককভাবে প্রধানমন্ত্রীকে। অর্থাৎ সরকার মানেই প্রধানমন্ত্রী। তিনি তাঁর কাজ পরিচালনার জন্য কিছু মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী নেন, যাঁরা শতভাগ তাঁর প্রতি বিশ্বস্ত থাকবেন। এখানে যৌথ নেতৃত্বের বা সম্মিলিত সিদ্ধান্তের কোনো সুযোগ নেই। সরকারের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তের কথা মন্ত্রিসভার বৈঠকের আগমুহূর্তেও মন্ত্রীরা জানতে পারেন না। মন্ত্রিসভার সদস্যরা হয়েছেন হুকুমবরদার।
লেখার শিরোনাম নিয়ে অনেকে প্রশ্ন করতে পারেন, কেন ‘সম্প্রসারিত নবরত্নসভা’? মধ্যযুগে মোগল সম্রাট আকবর বুদ্ধি-পরামর্শের জন্য নয়জন পণ্ডিতকে নিয়েছিলেন। যার জন্য নাম হয়েছিল নবরত্নসভা। রাষ্ট্র পরিচালনার কাজটি সম্রাট এককভাবেই করতেন। কাউকে শরিক করতেন না। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীরাও এ যুগের সম্রাট। তাঁরা বুদ্ধি-পরামর্শের জন্য কিছু রত্ন নেন বটে; কিন্তু দেশ পরিচালনায় তাঁদের পরামর্শ নেন না। দেশটা পরিচালনা করেন নিজের মতো করেই। শেখ হাসিনার সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভা বা রত্নসভা দেশবাসীকে ভালো কিছু উপহার দিতে পারবে কি না, তা সময়ই বলে দেবে।
তাঁর সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভা নিয়ে আরও একটি প্রশ্ন উঠেছে। বিরোধী দলহীন জাতীয় সংসদে শতকরা ৯০ ভাগ সাংসদ নেত্রী-বন্দনায় ব্যস্ত থাকেন। সেই সঙ্গে বিরোধী দলের নেত্রীকে গালাগাল না করলে তাঁদের ঘুম আসে না। কিন্তু সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও যে কজন সাংসদ সরকারের বিভিন্ন কাজের সমালোচনা করেছেন, তাঁদের মধ্যে প্রথম সারিতে ছিলেন তোফায়েল আহমেদ, রাশেদ খান মেনন, হাসানুল হক ইনু, সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও ওবায়দুল কাদের। শেখ হাসিনা গত বছর নভেম্বরে সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত ও ওবায়দুল কাদেরকে মন্ত্রী করে তাঁদের মুখ বন্ধ করেছিলেন। এবার কি তিনি তোফায়েল ও মেননকে মন্ত্রী করে তাঁদের সমালোচনাও বন্ধ করতে চেয়েছিলেন? যদি সেটি সত্য হয়ে থাকে, তাঁরা না গিয়ে ভালোই করেছেন। কেননা, তাতে সংসদ হয়ে যেত পুরোপুরি দলীয় ফোরাম। বন্দনা ও স্তুতি ছাড়া সেখানে কোনো বাক্য উচ্চারিত হতো না।
সবশেষে প্রধানমন্ত্রীকে একটি কথা স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, সমালোচনা বন্ধ হওয়ার পথ বড় ভয়ংকর। আমাদের দেশে যে সরকারই বিরোধী দলের, এমনকি দলের ভেতরে বিরোধী কণ্ঠ স্তব্ধ করতে চেয়েছে, তাদের পরিণাম কখনোই ভালো হয়নি।
 সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab03@dhaka.net

No comments

Powered by Blogger.