রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বাস্তবতায় শিক্ষা by সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

দেখতে যা-ই মনে হোক, কোনো কাজই নীতিবিবর্জিত নয়; শিক্ষারও একটা নীতি আছে, সেটা লিখিতভাবে থাকুক আর নাই থাকুক। এই নীতিটা যেমন রাষ্ট্রীয় তেমনি সামাজিকও। দুয়ের ভেতর সব সময় যে বিরোধ থাকে তা-ও সত্য নয়, প্রায়ই তারা একসঙ্গেই চলে।


নিয়ম এই যে রাষ্ট্র চায় না শিক্ষার ব্যাপক বিস্তার ঘটুক, অর্থাৎ সাধারণ মানুষ চক্ষুষ্মান হয়ে গিয়ে শাসক শ্রেণীর জন্য বিপদ ডেকে আনুক। ব্রিটিশের রাষ্ট্রের পক্ষে শিক্ষার বিস্তার চাওয়ার কথা ছিল না, পাকিস্তানি রাষ্ট্রের পক্ষেও নয়; তারা চেয়েছে শিক্ষা সংকুচিতই থাকুক এবং যেটুকু বিতরণ করা হবে তা-ও সারবস্তুর দিক থেকে দুর্বলই রয়ে যায়, সবল না হয়ে। রাষ্ট্র সমাজকে নিয়ন্ত্রণ করে; সমাজের বাস্তবতা রাষ্ট্রের ভেতর সরাসরি প্রতিফলিত হয়, রাষ্ট্রের যাঁরা শাসক, তাঁদের আদর্শ ও উদ্দেশ্যের দ্বারাই সমাজ নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।
স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ফলে স্বভাবতই রাষ্ট্রের ওপর চাপ পড়েছিল শিক্ষা বিস্তারে সর্বজনীন ও সারবস্তুতে যথার্থ করে তোলার। তারই ফলে কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষা কমিশন গঠিত হয় এবং সেই শিক্ষা কমিশন একটি অভিন্ন, ইহজাগতিক ও বিজ্ঞানমনস্ক শিক্ষানীতির সুপারিশ প্রণয়ন করে। দুঃখের বিষয়, সে শিক্ষানীতিটি কার্যকর করা সম্ভব হয়নি। কেন হয়নি তা-ও আমরা জানি। মূল কারণ রাষ্ট্রনৈতিক। রাষ্ট্র যে এসব ক্ষেত্রে কতটা কার্যকরভাবে হস্তক্ষেপ ঘটাতে পারে, কুদরাত-এ-খুদা শিক্ষানীতির বাস্তবায়ন না হওয়াটাই তার প্রমাণ। ওই শিক্ষানীতি যেসব দিক থেকেই আদর্শস্থানীয় ছিল তা নয়, অসম্পূর্ণতা সেখানেও ছিল। যেমন শিক্ষাকে একটি সামাজিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখানো হয়েছিল; অথচ নতুন রাষ্ট্রের কাছ থেকে এটাই বরং প্রত্যাশিত ছিল যে নাগরিকদের শিক্ষার ব্যবস্থা করাকে রাষ্ট্রীয় কর্তব্য বলে গণ্য করা হবে।
ওদিকে রাষ্ট্র যে শাসক শ্রেণীর করতলগত হয়ে পড়ল, তারা কিন্তু তাদের নিজস্ব কর্তব্য পালনের ব্যাপারে অবহেলা প্রদর্শন করেনি। এই শাসকদের বেলায় অন্য ক্ষেত্রে যতই ব্যবধান, এমনকি শত্রুতাই থাকুক না কেন, এক ব্যাপারে তাদের একের সঙ্গে অপরের গভীর আত্মীয়তার সম্পর্ক বিদ্যমান, সেটা হলো এই যে তারা সবাই পুঁজিবাদী আদর্শে দীক্ষিত। এই আদর্শের মূল বিষয়টি হলো ব্যক্তিস্বার্থ। ব্যক্তি তার নিজের স্বার্থ দেখবে, সেই স্বার্থ যতভাবে পারা যায় পরিপুষ্ট করে তুলবে। ফল দাঁড়াবে এই, সমষ্টির স্বার্থ ভূলুণ্ঠিত হবে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানি শাসকরা যে পুঁজিবাদী আদর্শেই পরিপূর্ণরূপে দীক্ষিত ছিল তাতে তো বিন্দুমাত্রও সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের পেছনে সাধারণ মানুষের যে স্বপ্নটা কাজ করেছে তা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন চরিত্রের। মানুষ আশা করেছিল, এই রাষ্ট্র সাধারণ মানুষকে মুক্তি দেবে। অর্থাৎ কি না পুঁজিবাদী আদর্শ পরিত্যক্ত হয়ে সেখানে একটি গণতান্ত্রিক আদর্শ প্রতিষ্ঠিত হবে। গণতান্ত্রিক আদর্শের কেন্দ্রে থাকে এই প্রতিশ্রুতি যেসব নাগরিকের ভেতর অধিকার ও সুযোগের সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে, সেখানে কোনো বৈষম্য থাকবে না। কিন্তু স্বাধীনতার পর গত ৪১ বছরে আমাদের অভিজ্ঞতা কী বলে? এ কথা বলে কি যে দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? নাকি উল্টো ঘটনা ঘটেছে? গণতন্ত্র যে আসেনি তার বহু প্রমাণ চারদিকে জ্বল জ্বল করছে; কিন্তু অন্তরে রয়েছে যে প্রধান সত্য, তা হলো এই যে সাম্য তো আসেইনি, বরং বৈষম্য আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বৃদ্ধি পেয়েছে। অর্থাৎ জয় হয়েছে পুঁজিবাদের। স্বাধীনতাযুদ্ধ জনগণকে মুক্তি দেয়নি, যা ঘটিয়েছে তা হলো পুঁজিবাদের বিকাশের জন্য পথের প্রশস্তকরণ। ৪১ বছর ধরে বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে যার মুক্তি ঘটেছে সেটি অন্য কিছুর নয়, পুঁজিবাদের জট। রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার এবং ইসলামী জঙ্গি তৎপরতার যে বৃদ্ধি, তা পুঁজিবাদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ের দরুনই সম্ভবপর হয়েছে, নইলে হতো না। পুঁজিবাদের প্রধান শত্রু হচ্ছে সমাজতন্ত্র (যাকে যথার্থ গণতন্ত্রও বলা যায়, কমিউনিজম নামেও অভিহিত করা হয়ে থাকে)। সেই সমাজতন্ত্র যাতে প্রতিষ্ঠিত না হয় তার লক্ষ্যেই মাদ্রাসা শিক্ষা এবং রাজনীতিতে ধর্মের ব্যবহার উৎসাহিত করা হয়েছে। নির্দেশটি এসেছে বিশ্ব পুঁজিবাদের কেন্দ্র আমেরিকা থেকেই। আমেরিকার শাসক শ্রেণী বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের ব্যাপারে অতটা বৈরী স্বভাবের ছিল তার কারণ তো এটাই যে তাদের আশঙ্কা ছিল জনসংগ্রামের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যদি সত্যি সত্যি স্বাধীন হয়ে যায়, তাহলে এখানে সমাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠা প্রতিহত করা সম্ভব হবে না। কিন্তু স্বাধীনতার পর তারা এটা নিশ্চিত করতে পেরেছে যে বাংলাদেশের শাসক শ্রেণী আর যা-ই করুক পুঁজিবাদের পথ থেকে বিচ্যুত হবে না। উল্টো ওই পথেই প্রতিযোগিতামূলকভাবে অগ্রসর হবে। সেই প্রতিযোগিতায় কখনো এ জিতবে, কখনো ও; কিন্তু যে-ই জিতুক, পুঁজিবাদী আদর্শ থেকে বিচ্যুত হবে না।
দেশের এই শাসক শ্রেণী শিক্ষাকে অভিন্ন ধারায় প্রবাহিত করবে, তাকে ইহজাগতিক, বৈজ্ঞানিক ও সর্বজনীন করে তুলবে- এমনটা আশা করা মোটেই বাস্তববুদ্ধিসম্মত নয়। তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা আগের কালেও ছিল; কিন্তু এ কালে যে তা থাকবে- এটা তো আশঙ্কা করা যায়নি। কেননা আমরা তো আগের সেই পরাধীনতার কালকে পেছনে ফেলে স্বাধীনতার কালে চলে এসেছি। বাস্তবতা হলো এই যে নতুন রাষ্ট্রে অনেক কিছুই বদলেছে; কিন্তু রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক আদর্শ বদলাবে কী উপরন্তু অধিকতর বেগবান হয়েছে।
সেই সঙ্গে তিন ধারার শিক্ষাব্যবস্থা আগের চেয়ে অনেক বেশি ব্যাপকতা ও গভীরতা লাভ করেছে। অভিন্ন না হয়ে শিক্ষা যে তিন ধারায় প্রবাহিত হচ্ছে তার কারণ হচ্ছে শ্রেণী বিভাজন। তিন শ্রেণী, তিনটি ভিন্ন ধারায় তাদের সন্তানদের পাঠায়। শ্রেণীর এই বিভাজন আগেও ছিল; কিন্তু সেটা যে কমানোর বদলে বাড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হলো তার কারণ পুঁজিবাদের ওই অপ্রতিহত অগ্রগতি। উন্নতি হয়েছে; কিন্তু যত উন্নতি তত বৈষম্য বৃদ্ধি। বস্তুত বস্তুগত উন্নতির যেসব দেদীপ্যমান চিহ্ন চোখ ধাঁধিয়ে দিয়েছে এবং প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনাসহ বিভিন্ন ধরনের উৎপাত ঘটিয়ে চলেছে, তার ফলে বৈষম্য অপ্রতিরোধ্য গতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং পেয়ে চলেছে। সেই বৈষম্য বৃদ্ধিই শ্রেণী বিভাজনকে অলঙ্ঘনীয় করে তুলেছে, যার প্রতিফলন শিক্ষার তিন বিভিন্ন ধারায় দেখতে পাই। কথা ছিল মুক্তিযুদ্ধ আমাদের বিজয় এমন একটি সামাজিক বিপ্লব ঘটাবে যার দরুন সমাজে ও রাষ্ট্রে গণতান্ত্রিক অর্থাৎ সাম্যভিত্তিক পরিবর্তন আসবে। আসেনি। পুঁজিবাদের বিকাশ সেই সম্ভাবনাকে নাকচ করে দিয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থা একাধারে বৈষম্যকে ধারণ করছে এবং তাকে বৃদ্ধি করছে। শিক্ষার মধ্য দিয়ে জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলবে কী, ঐক্যের সম্ভাবনাকে প্রতিনিয়ত নাকচ করে দিয়ে শ্রেণী গঠনকে শক্ত করছে। ব্রিটিশ ও পাকিস্তানের শাসনকালে জাতি গঠনের কথা বিস্তর শুনেছি; কিন্তু বাস্তবে যা ঘটেছে তা জাতি গঠন নয়, শ্রেণী গঠন। বাংলাদেশেও সেই কাজই চলেছে। এখানে ধনিক শ্রেণী রাষ্ট্রক্ষমতা করায়ত্ত করে ফেলেছে এবং পুঁজিবাদী পন্থায় তারা মুনাফা করছে। লুণ্ঠনে দ্বিধা করছে না, ব্যক্তিগত স্বার্থকে চূড়ান্ত নিরিখ করে তুলছে এবং দেশের সম্পদ বিদেশে অবাধে পাচার করে দিচ্ছে। ভোগবাদিতাকে চরমে তুলেছে।
নতুন শিক্ষানীতির কাছে এটা প্রত্যাশিত ছিল, তিন ধারার শিক্ষাকে অভিন্ন ধারায় নিয়ে আসবে। আনতে হলে মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষার ব্যবস্থা অত্যাবশ্যকীয় করা দরকার ছিল। কিন্তু সেটা তো করা সম্ভব নয়। ইংরেজি মাধ্যম, বাংলা মাধ্যম এবং আরবি মাধ্যম- এই যে তিন ধারা, এরা তো শ্রেণী বিভাজনের কঠিন ও অনড় ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে আছে। যে সামাজিক বিপ্লবের স্বপ্ন আমরা দেখেছিলাম সেটা যদি ঘটত, সমাজে যদি শ্রেণী বিভাজন হ্রাস পেত তাহলেই শুধু আশা করা যেত যে তিন ধারা একটি অভিন্ন ধারায় পরিণত হবে। কিন্তু ঘটনাটা তো ঘটেছে সম্পূর্ণ উল্টো। শ্রেণী দূরত্ব বৃদ্ধি পেয়েছে। তিন ধারা তাই রয়েই গেল এবং নিশ্চিত করে বলা যায়, সামাজিক বিপ্লব সংঘটিত হবে। বর্তমান সরকার নতুন শিক্ষানীতি প্রণয়ন করেছে, তার কারণ তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ধারণ করে বলে ঘোষণা করেছে এবং তদ্দরুন চাপের মুখে পড়েছে। শিক্ষা সংস্কার কমিটি যা সুপারিশ করতে পেয়েছে তা হলো সংস্কার, বিপ্লব নয়। তারা চেয়েছে তিন ধারাকে যতদূর পারা যায় কাছাকাছি নিয়ে আসতে। এই চেষ্টা পর্যাপ্ত নয় যদিও, তবু অবশ্যই অভিনন্দনযোগ্য।
অভিন্ন করতে হলে মাতৃভাষার মাধ্যমে সর্বস্তরে শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। কিন্তু সেটা কি সম্ভব? রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বাস্তবতা কি তা ঘটতে দেবে? মোটেই না। বরং অসম্ভব করে তুলবে। বিত্তবানরা তাঁদের ছেলেমেয়েদের ইংরেজি মাধ্যম থেকে ছাড়িয়ে এনে বাংলা মাধ্যমের স্কুলে ভর্তি করতে রাজি হবেন না। যাঁরা আপত্তি নেই বলবেন তাঁরা দেখবেন, ভালো বাংলা স্কুল নেই। যে কয়টি ভালো বাংলা স্কুল আছে, সেখানে ২০ হাজার ভর্তি হতে চায়, ভর্তি হতে পারে দুই হাজার। চাকরি পাওয়ার চেয়ে সহজ নয় ভালো বাংলা স্কুলে ভর্তি হওয়া। যে জন্য গত দুই বছর প্রথম শ্রেণীতে ভর্তির জন্য শিশুদের নিয়ে লটারি খেলতে হয়েছে, যাতে বহু শিশু বাদ পড়েছে এবং ভীষণ রকমের দুঃখে জর্জর হয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার কাছে একটা বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে পর্যাপ্তসংখ্যক ভালো স্কুল প্রতিষ্ঠা করা। বাস্তবতা এখানেও এ রকমের যে মাদ্রাসা, মক্তব, এতিমখানা খুলতে বরং উৎসাহ দেখা যায়; কিন্তু মাধ্যমিক স্কুল খুলতে মানুষের বড়ই অনীহা। কলেজও খোলা হয়, কেননা কলেজ স্থাপন বিদ্যালয় স্থাপনের চেয়ে সহজতর। সরকারি অনুদান পাওয়া যায় এবং উচ্চশিক্ষিত নিরুপায়, বেকাররা অধ্যাপক হওয়ার জন্য উৎকোচ প্রদানেও দ্বিধা করে না। অন্যদিকে মাদ্রাসা-মক্তব খোলা তো খুবই সহজ। খরচ সামান্য। জায়গা-জমি পাওয়া যায়। ইহকালে সম্মান এবং পরকালে পুণ্য সঞ্চয় নিশ্চিত হয়।
আসনসংখ্যা সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অত্যন্ত সীমিত। তাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে উঠেছে। অনেক ক্ষেত্রেই যে এসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পেছনে ব্যবসায়িক মনোভাব কাজ করে, তাতে সন্দেহ করার কোনো কারণ নেই। বিশ্ববিদ্যালয় গড়তে হলে যে ধরনের অবকাঠামো, বিশেষ করে জমির দরকার পড়ে, সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয়েরই তা নেই। কিন্তু শহরের ভেতর পর্যাপ্ত জমি তারা পাবে কোথায়, সেই বিরাট সমস্যা তো রয়েই গেছে। জমির পরিবর্তে ফ্লোর স্পেস নির্দিষ্ট করে দেওয়া যায় কি না সে কথা উঠেছে। সবচেয়ে বড় কথাটা হলো এই যে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো বিকল্প নয়। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থান নেই, হাজার হাজার ছেলেমেয়ে সেখানে প্রবেশের সুযোগ পায় না, বাধ্য হয়েই তাদের প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বারস্থ হতে হয়, অভিভাবকরা সবাই যে অবস্থাপন্ন তা নয়; কিন্তু তাঁরাও নিরুপায় হয়েই অর্থের জোগান দেন। কারণ ছেলেমেয়েদের কোথায় পাঠাবেন তা তাঁরা জানেন না। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো না থাকলে তাঁরা অনেকেই বাধ্য হতেন সন্তানদের অন্তত ভারতে পাঠাতে, অতীতে যেমন পাঠাতেন। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলো তাই একটি সামাজিক চাহিদা মেটাচ্ছে বটে।
এই সঙ্গে দুটি বিষয় স্মরণীয়। একটি হচ্ছে প্রাইভেট শিক্ষা ও কোচিং সেন্টার, অপরটি হলো ছেলেমেয়েদের ঝরে পড়া। মা-বাবা প্রাইভেট শিক্ষা ও কোচিং সেন্টারের ওপর নির্ভরশীল হন কেন? প্রয়োজনের তাগিদে তাঁরা বাধ্য হন স্কুলের বাইরে অতিরিক্ত শিক্ষা লাভের সুযোগ কোথায় আছে সন্তানদের জন্য সেসব জায়গার খোঁজ করতে। কারণ ক্লাসরুমে যথাযথ পাঠদান ঘটে না। শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ ঘটে গেছে, ব্যাপারটা আগে যে ছিল না তা নয়, তবে এখন এটা ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। স্কুলের বাইরে প্রাইভেট পড়াটা একসময় ছাত্রছাত্রীদের জন্য মোটেই সম্মানজনক ছিল না। ভালো ছাত্র বলে পরিচিতরা ও-পথ মাড়াতে চাইত না। কিন্তু এখন ব্যাপারটা দাঁড়িয়েছে সম্পূর্ণ উল্টো। এখন কে কতজন টিউটর নিযুক্ত করতে পারে, সেটাই হলো গৌরবের বিষয়। আর এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা যেটা চলে সেটা মোটেই সামান্য নয়। আর যারা পড়তে আসে, তাদের মধ্যে বিপুলসংখ্যক যে অকালে ঝরে পড়ে সেটাও একটা মর্মান্তিক সত্য। টিকে থাকতে না পারার একটা কারণ, সেটাই বড় কারণ আসলে, তা হলো অর্থনৈতিক। মা-বাবার পক্ষে খরচ জোগানো সম্ভব হয় না। মেয়েদের শিক্ষার ক্ষেত্রে বেশ একটা উৎসাহের ঘটনা ঘটেছে। বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ এ ব্যাপারে সহায়ক হয়েছে। এমনও দেখা গেছে যে বিদ্যালয়ে ছেলে ও মেয়েদের সংখ্যা প্রথমে সমান সমান থাকে। পরে ছেলেদের সংখ্যা বরং কমে যায়, কেননা তারা জীবিকার কাজে লেগে যায়, কেউ কেউ বখাটে হয়ে পড়ে। কিন্তু কিছুদিন হলো দেখা যাচ্ছে মেয়েদের সংখ্যাও কমে যাচ্ছে। কারণ হলো যৌন হয়রানি। এই ব্যাধি আগেও ছিল; কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এটা বেড়েছে, এর দরুন মেয়েদের আত্মহত্যা থেকে শুরু করে বিদ্যালয়ে যাওয়া বন্ধ হওয়ার ঘটনা- সব কিছুই বেড়েছে। বাল্যবিবাহের প্রবণতাও দেখা দিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে যেতে উৎসাহ হারানোর আরেকটি কারণ হলো প্রাতিষ্ঠানিক আনন্দহীনতা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের হওয়ার কথা আনন্দের জীবন্ত অঙ্গন। সেখানে নানা ধরনের সাংস্কৃতিক কাজ, খেলাধুলা, ছোটাছুটি থাকবে। থাকবে গ্রন্থাগার। অনুষ্ঠান হবে বার্ষিক নির্বাচনের। সেসব দেখা যায় না, উল্টো শিক্ষালয়গুলো হয়ে দাঁড়িয়েছে আমলাতান্ত্রিক কারখানাবিশেষ; যেখানে টিকে থাকতে ছেলেমেয়েরা প্রাণের ভেতর থেকে কোনো তাগিদ অনুভব করে না। বিদ্যালয় হবে পরিবারের পরিপূরক। এখন পরিবারে আনন্দ নেই, সেখানে স্থানাভাব। বিদ্যালয়েরও একই দশা। বিশেষ করে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বার্ষিক তো নয়ই, বছরের পর বছর ধরে ছাত্র সংসদের নির্বাচন হয় না। ফলে ছেলেমেয়েরা যে সাংস্কৃতিক জীবন গড়ে তুলবে, তারা যে খেলাধুলায় ব্যস্ত হবে, ভবিষ্যতে নেতৃত্বদানের জন্য প্রস্তুতি নেবে, সেসবের কিছুই সম্ভব হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষিত লোকদের বস্তির মতো, এখানে বহুজন থাকে, তারা কলহ করে, নয়তো নিশ্চুপ হয়ে রয়ে যায়, মেধার বিকাশ ঘটে না, ক্ষোভ-বিক্ষোভের যে সুস্থ প্রকাশ ঘটবে, তেমনটাও সম্ভব হয় না। সাংস্কৃতিক মান অধোগামী হয়ে পড়ে।
আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল সংকটটি হচ্ছে তিন ধারায় এর বিস্তার। শিক্ষাকে এক ও অভিন্ন ধারায় না আনতে পারা রাষ্ট্রের জন্য একটি দুঃখজনক ব্যর্থতা। সমাজে বিদ্যমান শ্রেণীবিভাজন শিক্ষার তিন ধারায় বিস্তারের মধ্য দিয়ে আরো গভীর হচ্ছে। নতুন শিক্ষানীতি এই তিন ধারাকে মূল ধারার কাছাকাছি নিয়ে আসার চেষ্টা করেছে বটে। কিন্তু সে চেষ্টা পরিবর্তনের নয়, সংস্কারমূলক। তাতে তিন ধারা এক ধারায় পরিণত হবে না। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি ত্রুটি হচ্ছে, ইতিহাসের পাঠকে গুরুত্ব না দেওয়া। ইতিহাস বিকৃতি নিয়ে অনেক তর্ক-বির্তক হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ইতিহাসের পাঠদানে উৎসাহ দেখা যায় না। এটা অত্যন্ত ক্ষতিকর। কেননা ইতিহাসের জ্ঞান না থাকলে আত্মপরিচয়বোধ বিপদগ্রস্ত হয়। অতীতকে বোঝা, বর্তমানকে জানা এবং ভবিষ্যতের পথানুসন্ধান- সব কিছুতেই ইতিহাসের জ্ঞান প্রয়োজন।
শিক্ষার ক্ষেত্রে ব্যয় বরাদ্দ বৃদ্ধি অবশ্যই চাই; কিন্তু সেটাই যে পর্যাপ্ত প্রতিশ্রুতি তা নয়। দেখতে হবে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে কী ঘটছে; সেখানে পঠন-পাঠন কেমন চলছে, গ্রন্থাগার ও ল্যাবরেটরির কী দশা, দেখা চাই আমলাতান্ত্রিক জায়গার গণতান্ত্রিকতার প্রতিষ্ঠা ঘটছে কি না, ছেলেমেয়েরা কতটা আনন্দ-ফুর্তি করতে পারছে। নজরদারিটা যে কেবল সরকারি হবে তা নয়, হওয়া চাই সামাজিক। অভিভাবকরা চোখ রাখবেন স্কুল-কলেজে কী হচ্ছে না হচ্ছে সেদিকে, প্রয়োজনে এগিয়ে আসবেন সাহায্য করতে, যেমন কার্পণ্য করবেন না সমালোচনার ব্যাপারেও। সত্য এটা যে বিদ্যালয় কোনো দোকান নয়, কারখানাও নয়; বিদ্যালয় হচ্ছে একটা সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যেখানে ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবক- সবারই উপস্থিতি আবশ্যক নানাভাবে এবং বিভিন্ন মাত্রায়। বিদ্যালয় দেবে যেমন, তেমনটি নেবেও। কিন্তু বাংলাদেশের সমাজবাস্তবতা এখন এমনই যে এখানে নেওয়াতেই উৎসাহ, দেওয়াতে নয়।
শিক্ষকদের দায়িত্ব পালন বিষয়ে অভিযোগ রয়েছে। সেসব অভিযোগ যে ভিত্তিহীন, তা কেউ বলবে না। শিক্ষায় বাণিজ্য প্রবেশ করেছে, এটা খুবই সত্য কথা। শিক্ষকদের ভেতর যদি দোকানদারির মানসিকতা কার্যকর থাকে, তবে সেটা সমাজ থেকেই আসে, অন্য কোথাও থেকে অবতীর্ণ হয় না। অনেকেই আছেন, শিক্ষক হয়েছেন নিতান্ত নিরুপায় হয়ে। তাঁরা অন্য পেশায় যেতে পারলে খুশি হতেন, পারেননি; তাই অগত্যা শিক্ষকতায় এসেছেন, যে আসাটা সহজ হয়নি, তার জন্য বিস্তর কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে বৈকি। শিক্ষায়তনে শিক্ষক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা খুবই অপ্রতুল, ফলে শিক্ষকেরও যে শিক্ষিত হওয়া প্রয়োজন, সে সত্যটা অস্বীকৃত অবস্থায়ই রয়ে যায়। সর্বোপরি শিক্ষকদের সামাজিক মর্যাদা বৃদ্ধি একেবারেই অত্যাবশ্যকীয়। এই মর্যাদাটা আগের দিনে যতটুকু ছিল, এখন সেটা বৃদ্ধি পাওয়া দূরের কথা, হ্রাস পেয়েছে যে তাতে সন্দেহ নেই। সমাজ টাকা চেনে, টাকা ক্ষমতা দেয় এবং সম্মান টাকা ও ক্ষমতার পেছনে পেছনে ছোটে। শিক্ষকরাও তাই শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে সম্মান অর্জন করতে পারবেন- এ বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেন না। ওদিকে আবার পারিবারিক চাপও থাকে অর্থোপার্জনের জন্য। ফলে শিক্ষকের পক্ষে যথার্থ শিক্ষক থাকাটা কঠিন হয়ে পড়ে, তাঁকেও অর্থোপার্জনের বাজারে গিয়ে হাজিরা দিতে হয়। ব্যতিক্রম নিশ্চয়ই আছে, আমরা সাধারণ নিয়মের কথা বলছি। শিক্ষককে যদি শিক্ষক হিসেবে সামাজিকভাবে মর্যাদাবান করে তোলা অসম্ভব হয়, তাহলে শিক্ষা ক্ষেত্রে বড় রকমের পরিবর্তন আনা সম্ভব হবে- এমনটা আশা করা পণ্ডশ্রম ভিন্ন অন্য কিছু নয়।
নতুন শিক্ষানীতিতে মাদ্রাসা শিক্ষাকে কিছু পরিমার্জন করা হলেও আধুনিক করার অঙ্গীকার করা হয়েছে। তাতেই রাজনৈতিক ধর্মব্যবসায়ীরা আপত্তি করা শুরু করে দিয়েছে। এই ধর্মব্যবসায়ীদের ভেতর যারা উচ্চস্তরে প্রতিষ্ঠিত, তাদের ছেলেমেয়েরা কেউই মাদ্রাসায় পড়ে না; অথচ মাদ্রাসা শিক্ষায় হস্তক্ষেপ ঘটলে এরা জান দেবে বলে ঘোষণা দিয়ে বসে; কিন্তু মাদ্রাসার ছাত্রদেরও অনেকে এখন বোধ হয় বুঝে ফেলেছে যে ওই শিক্ষা তাদের মুক্তি তো দেবেই না; বরং আরো বেশি গরিব করে তুলবে।
প্রাথমিক শিক্ষা এখন ক্লাস এইটে শেষ হবে। এটা একটা ভালো সংস্কার। এর পরে যারা কারিগরি শিক্ষায় যেতে চায় তারা যেতে পারবে। কারিগরি শিক্ষাকে আরো আকর্ষণীয় ও পূর্ণাঙ্গ করে তোলা দরকার, যাতে মেধাবী ছাত্ররা সেখানে যেতে উৎসাহী হয়। বিজ্ঞান শিক্ষা এখন বেশ অবহেলিত। এটা মোটেই ভালো লক্ষণ নয়। তবে কেবল বিজ্ঞানের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা তো নয়, প্রয়োজন বিজ্ঞানমনস্কতার শিক্ষাও। সেই শিক্ষাটাও নামছে। যার দরুন কার্যকারণ সম্পর্কে এবং সমাজে বিদ্যমান দ্বন্দ্বগুলো সম্পর্কে শিক্ষার্থীরা তো বটেই, শিক্ষকরাও অনেক ক্ষেত্রে অসচেতন থাকেন। আমরা নতুন সমাজ ও সংস্কৃতির জন্য লড়ছি। সে ক্ষেত্রে শিক্ষা একটা বড় সহায়ক হওয়ার কথা। কিন্তু বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বাস্তবতায় সেটা ঘটছে না, বিপরীত ব্যাপারই বরং দেখতে পাচ্ছি। একটা মূল প্রশ্ন থেকেই যায়। সেটা এই যে শিক্ষার মধ্য দিয়ে আমরা কোন ধরনের মানুষ তৈরি করতে চাই। ভালো মানুষ তো অবশ্যই; কিন্তু ভালো মানুষের সংজ্ঞাটি কী? সে কি কেবল মেধাবান, বুদ্ধিমান ও সৎ মানুষ, নাকি তার চেয়েও মহৎ কিছু।
আমরা সামাজিক মানুষ চাই, যারা বুঝবে বর্তমান সমাজ মনুষ্য বসবাসের জন্য উপযুক্ত নয় এবং এর আশু পরিবর্তন মানুষের দায়িত্ব। শিক্ষা ওই সামাজিক মানুষ সৃষ্টি করবে- এটাই আমরা চাইব। এর বিপরীতে এখন যা তৈরি হচ্ছে তা হলো- স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক ও ভোগবাদী প্রাণী, এরা যতই উচ্চশিক্ষিত হোক না কেন, এদের দ্বারা সমাজের যে পরিবর্তন প্রয়োজন তা ঘটানো কিছুতেই সম্ভব হবে না।
লেখক : শিক্ষাবিদ, ইমেরিটাস অধ্যাপক
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

No comments

Powered by Blogger.