কথা সামান্যই-দক্ষিণ আফ্রিকায় আবার রক্তগঙ্গা by ফজলুল আলম

আগস্ট মাস কি রক্তগঙ্গার মাসে পরিণত হচ্ছে? আমাদের দেশে দুই-দুইটা সুপরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড ঘটে গেছে এই মাসে। ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হলো, ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় ২৪ জন নিহত হলেন, আর এ বছর ১৬ আগস্ট আমাদের দেশ থেকে বহু দূরে দক্ষিণ আফ্রিকায় একটি প্লাটিনাম খনির ৪৪ জন শ্রমিককে ঠাণ্ডা মাথায়


খুন করা হলো। আরো কতজন (সরকারি ঘোষণায় মাত্র ৭৮ জন আহত হয়েছে) যে সেখানে জখম হয়ে মৃত্যুর সময় গুনছে, কে জানে! অনেক শ্রমিকের তো হদিসই মেলেনি। এবারের আগস্টে ঈদের সময়টাতেও মুসলমান অধ্যুষিত আফগানিস্তান, সিরিয়াসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে চলমান সংঘাতে অসংখ্য মানুষ হতাহত হয়েছে। মানুষের- ছোট মানুষ বা বড় মানুষ- জীবন এখন মূল্যহীন। সোয়েটানের এক পত্রিকায় লিখেছে, 'আফ্রিকায় আফ্রিকানদের জীবন আগে যেমন সস্তা বলে গণ্য হতো, এখনো তা-ই হচ্ছে।'
নেলসন ম্যান্ডেলা জেল থেকে ছাড়া পেয়ে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছিলেন, 'সাদা বা কালো যাঁরাই দক্ষিণ আফ্রিকায় বসবাস করছেন, দক্ষিণ আফ্রিকা তাঁদেরই দেশ ...' (১৯৯১)। সে সময় এত স্যাটেলাইট চ্যানেল ছিল না; কিন্তু ইউরোপ-আমেরিকাজুড়ে বিবিসি এই কথাগুলো বারবার প্রচার করে নিশ্চিত করে যে শ্বেতাঙ্গদের দক্ষিণ আফ্রিকা থেকে তাড়ানো যাবে না- তারা ম্যান্ডেলার ম্যান্ডেট পেয়ে গেছে। শ্ব্বেতাঙ্গ শাসকগোষ্ঠী ইতিমধ্যে অ্যাপার্থি আইনসহ আরো অনেক বৈষম্যপূর্ণ আইন বাতিল করেছে, ফলে বিশ্বে তাদের বিরুদ্ধে আর কোনো আন্দোলন গড়ে উঠল না। ম্যান্ডেলার মুক্তির জন্য পাশ্চাত্যের সাম্রাজ্যবাদী দেশগুলোর ছাত্রছাত্রী ও অনেক রাজনীতিবিদ অনেক দিন ধরেই আন্দোলন করছিল, এবার তারাও ঠাণ্ডা হলো। ম্যান্ডেলা দক্ষিণ আফ্রিকার শ্বেতাঙ্গ শাসকগোষ্ঠীর প্রিয়ভাজন তো হলেনই, নোবেল পুরস্কারও জুটল (১৯৯৩) এবং স্বাধীন দক্ষিণ আফ্রিকা ইউনিয়নের প্রেসিডেন্ট পদে নিয়োগও পেলেন (১৯৯৪-১৯৯৯)। ১৯৬০ সালে শার্পভিল হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে ম্যান্ডেলা, সিসুলু ও লুথুলি আন্দোলন করেছিলেন। সে সময় কৃষ্ণাঙ্গদের ওপর 'পাস' আইন বহাল করার প্রতিবাদে সেই আন্দোলন হয়েছিল। শার্পভিলে একটি থানার চারদিকে কৃষ্ণাঙ্গরা জমা হয়েছিল- তাদের দেখে থানা পুলিশ এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে ৭০ জনকে হত্যা করে। পরে দেখা গেছে, যাদের পিঠে গুলি লেগেছিল অর্থাৎ তারা থানা আক্রমণ করেনি।
তখন দেশে অবৈধ শ্ব্বেতাঙ্গ শাসন চলছিল, সারা বিশ্ব শার্পভিল হত্যাকাণ্ডের জন্য সাউথ আফ্রিকাকে একঘরে করার প্রস্তাব দেয়। পাশ্চাত্যের অনেক দেশ সাউথ আফ্রিকার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, কূটনৈতিক সম্পর্ক ও খেলাধুলা- সব বন্ধ করে দেয়। অবশেষে ১৯৯১ সালে শ্বেতাঙ্গদের সাউথ আফ্রিকায় বসবাস করাকে সমর্থন জানিয়ে ম্যান্ডেলা নতুন সাউথ আফ্রিকার সূচনা করেন। কিন্তু আজ? শ্বেতাঙ্গ শাসন শেষ হয়েছে প্রায় দুই যুগ আগে, অথচ আজও শ্বেতাঙ্গরা অর্থনৈতিক ক্ষমতা দিয়ে সেখানে সব লাভজনক প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করছে। গণতান্ত্রিক সরকারে সেখানে অশ্বেতাঙ্গদের সংখ্যাধিক্য থাকলেও রিপাবলিক অব সাউথ আফ্রিকার আসল নিয়ন্ত্রণ শ্বেতাঙ্গদের হাতে সুদৃঢ়ভাবে রয়ে গেছে। প্রেসিডেন্ট থেকে শুরু করে প্রায় সব সংসদ সদস্য অশ্বেতাঙ্গ হলেও তাঁদের ক্ষমতা শ্বেতাঙ্গনিয়ন্ত্রিত অর্থনীতির চাপে নেই বললেও চলে। ব্যাংক, ফিন্যান্সিয়াল ইনস্টিটিউট, আমদানি-রপ্তানি ব্যুরো, জনশক্তি নিয়ন্ত্রণ, এমনকি পুলিশ ও অন্যান্য আইনপ্রয়োগকারী বাহিনীর প্রায় সব কর্মকর্তাই শ্বেতাঙ্গ।
এবারকার হত্যাযজ্ঞে সাদা-কালো দুই বর্ণের পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল; কিন্তু এই পুলিশ অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া হয়েছিল ফিয়েগা নামের একজন সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তাকে। পুলিশের ইন্সপেক্টর থাকতে এ রকম একজনকে কেন নেতৃত্ব দেওয়া হলো, সে প্রশ্নের উত্তর এখনো মেলেনি। ফিয়েগার আদেশেই গুলি চালানো হয়। আরো কথা আছে, সেটা হচ্ছে যে মারিকানা প্লাটিনাম খনির শ্রমিকদের আন্দোলন আইনসম্মত ছিল। অ্যাসোসিয়েশন অব মাইনওয়ার্কারস অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন ইউনিয়ন কর্তৃপক্ষকে আগে জানিয়েই আন্দোলনের সূচনা করে। অর্থাৎ ট্রেড ইউনিয়ন আইনে কর্তৃপক্ষ এই ধর্মঘট অগ্রাহ্য করার অধিকার রাখে না। তারা এখন রটাচ্ছে যে শ্রমিকরা পুলিশদের লাঠিসোঁটা, দা, ম্যাচেট নিয়ে আক্রমণ করে বিধায় পুলিশ আত্মরক্ষার্থে গুলি চালায়। শ্রমিকরা তাদের মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে জড়ো হয়েছিল ইউনিয়নের ডাকে। মারিকানা প্লাটিনাম খনি 'লোনমিন' নামের এক কম্পানির মালিকানায় চলছে, এই কম্পানির মালিকানা ইংল্যান্ডের লন্ডনে রেজিস্ট্রি করা। এখন শোনা যাচ্ছে, 'লোনমিন' কম্পানি দক্ষিণ আফ্রিকার পুলিশকে এই শ্রমিক বিদ্রোহ দমনে সর্বশক্তি প্রয়োগ করতে নির্দেশ দিয়েছিল। আগেই বলেছি, দক্ষিণ আফ্রিকার সরকার ম্যান্ডেলার সময় থেকেই শ্বেতাঙ্গদের হাতের পুতুল, এবারও তা-ই দেখা যাচ্ছে। শ্রমিক হত্যার পর তাদের দাবি-দাওয়া মানা তো দূরের কথা, শ্রমিকদের ইউনিয়নের সঙ্গেও কম্পানি আলোচনা করতে রাজি হয়নি। উল্টো কম্পানির কর্তৃপক্ষ ঘোষণা দিয়েছে, সব শ্রমিক যেন কাজে ফিরে যায়; যারা যাবে না, তাদের চাকরি থাকবে না। শোনা যাচ্ছে, খুব কমসংখ্যক শ্রমিকই কর্তৃপক্ষের ডাকে সাড়া দিয়েছে।
ঘটনা এখন যেদিকেই গড়াক না কেন, এই হত্যাকাণ্ড থেকে বিশ্বের কাছে পরিষ্কার হলো যে মারিকানা প্লাটিনাম খনি, অন্যান্য দামি খনিজ পদার্থ উত্তোলনের খনি এবং অন্যান্য কলকারখানায় অশ্বেতাঙ্গদের ওপর বৈষম্য ও অত্যাচার নির্বিচারে চলছে। তারা মানবেতর জীবন যাপন করছে, স্বাধীনতা তাদের অবস্থার কোনো উন্নতিই করতে পারেনি।
আফ্রিকানদের শোষণ করছে বলে শুধু শ্বেতাঙ্গদের দোষারোপ করে বসে থাকলেই চলবে না। আফ্রিকান অভিজাত অশ্বেতাঙ্গদের সমর্থন আছে বলেই শ্বেতাঙ্গরা এত সাহস পায়। আফ্রিকার অনেক 'ট্রাইব' শ্বেতাঙ্গদের মতোই সুযোগ-সুবিধা পায় এবং তারাও শ্বেতাঙ্গদের মতোই আফ্রিকানদের সঙ্গে বৈষম্যপূর্ণ আচরণ করে। দক্ষিণ আফ্রিকায় আফ্রিকানদের মধ্যে শ্রেণীবিভাজনকে শ্বেতাঙ্গরা ভালোভাবেই ব্যবহার করে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধার করে।
বিশ্বের শক্তিশালী দেশগুলো দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য না করে পারে না। এখানে মূল্যবান সব খনিজ পদার্থের বিশাল মজুদ আছে এবং এখানে শ্রমিক সস্তা। ফলে এখানে লাভ বেশি। পুঁজিবাদী দেশের সব উপকরণই এখানে আছে। অতীতে অশ্বেতাঙ্গদের সমাজবাদী আন্দোলনকে নস্যাৎ করে দিয়েছে শ্বেতাঙ্গ শাসকরা। সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের সমাজতন্ত্র ত্যাগ করার পর, অর্থাৎ তাদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের 'শীতল যুদ্ধ' শেষ হলে এ দেশেও সমাজবাদী আন্দোলন প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এক অভিজাত 'ট্রাইবে'র চিফ ম্যান্ডেলার ম্যান্ডেটে তাদের আর কিছুই অবশিষ্ট থাকে না, শ্বেতাঙ্গরা এখানে থাকার ও ক্ষমতার বৈধতা পায়। সুতরাং শ্রমিক আন্দোলন যে কঠোর বা নিষ্ঠুর হাতে দমন করা হবে, সেটাই এ দেশে স্বাভাবিক। এ অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে উপনিবেশকাল থেকেই এবং স্বাধীনতাকালে অশ্বেতাঙ্গ নেতাদের সহযোগিতায় সেটা এখনো বলবৎ আছে। কবে, কিভাবে ও কোন পথে যাদের দেশ সেই আফ্রিকানদের জীবনে স্বাধীনতার সুফল ও অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে, কে বলবে?

লেখক : কথাসাহিত্যিক ও সংস্কৃতিবিষয়ক গবেষক

No comments

Powered by Blogger.