বীর মুক্তিযোদ্ধা- তোমাদের এ ঋণ শোধ হবে না

৫০১ স্বাধীনতার চার দশক উপলক্ষে খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে ধারাবাহিক এই আয়োজন। মো. নাজিম উদ্দিন, বীর প্রতীক দুই পাকিস্তানি সেনাকে আটক করেন রাতের প্রথম প্রহর থেকে শুরু হয়েছে বৃষ্টি। মধ্যরাতেও বৃষ্টি ঝরছে। কোনো বিরাম বা ছেদ নেই। অবিরাম ঝরছেই। চারদিক বৃষ্টির পানিতে টইটম্বুর।


এর মধ্যেই বেরিয়ে পড়েন মো. নাজিম উদ্দিনসহ একদল দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা। সংখ্যায় তাঁরা মোট ১৫ জন। তাঁদের দলনেতা তিনি নিজেই। সবার পরনে লুঙ্গি।
তাঁদের অস্ত্র বলতে দু-তিনটি মাত্র রাইফেল আর বাকি সব রামদা ও লাঠি। তাই সম্বল করে তাঁরা বৃষ্টিভেজা রাতে এগিয়ে যান। রাতের শেষ প্রহরে অতর্কিতে আক্রমণ চালান থানায়। তাঁদের আক্রমণে হতভম্ব হয়ে পড়েন থানার ওসিসহ পুলিশ সদস্যরা। পাল্টা আক্রমণ বা প্রতিরোধ দূরের কথা, অস্ত্র ফেলে ওসি ও পুলিশরা সব পালিয়ে যান। মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে ১৫টি রাইফেল ও বেশ কিছু গুলি। এরপর মো. নাজিম উদ্দিন ও তাঁর সহযোদ্ধারা দ্রুত থানা থেকে বেরিয়ে চলে যান নিজেদের গোপন অবস্থানে। এ ঘটনা ১৯৭১ সালের মে মাসের তৃতীয় সপ্তাহে কোনো একদিন। সুনামগঞ্জ জেলার (তখন মহকুমা) ধরমপাশা থানায়। এর অবস্থান জেলা সদর থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমে। ধরমপাশার পশ্চিমে নেত্রকোনা জেলার সীমানা। তাঁরা যখন আক্রমণ করেন, তখন সেখানে পাকিস্তানি সেনা ছিল না। থানায় নিয়োজিত পুলিশদের মধ্যে ওসিসহ কয়েকজন ছিল অবাঙালি।
মো. নাজিম উদ্দিন চাকরি করতেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে। ১৯৭১ সালে কর্মরত ছিলেন অষ্টম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টে। এর অবস্থান ছিল চট্টগ্রামের ষোলশহরে। তখন তাঁর পদবি ছিল হাবিলদার। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ঝাঁপিয়ে পড়েন যুদ্ধে। প্রতিরোধযুদ্ধ চলাকালে তাঁরা কয়েকজন এপ্রিল মাসের প্রথমার্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে অবস্থানরত চতুর্থ ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে যোগ দেন। এরপর তাঁরা আশুগঞ্জে প্রতিরক্ষা অবস্থান নেন।
পাকিস্তান বিমানবাহিনী এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি (১৪-১৬) তাঁদের প্রতিরক্ষা অবস্থানে বেশ কয়েকবার হামলা চালায়। এই হামলায় কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা শহীদ ও আহত হন। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে তাঁরা সাহসিকতার সঙ্গে যুদ্ধ করেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তাঁদের প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে। তাঁরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান। এরপর তিনি কয়েক দিন নিজ এলাকায় অবস্থান করে ভারতে চলে যান।
এই সময় মো. নাজিম উদ্দিন ধরমপাশা থানায় গেরিলা আক্রমণ চালান। সফল এই আক্রমণ পরিচালনার পর তিনি পুনরায় ভারতের তেলঢালায় অষ্টম ইস্ট বেঙ্গলের সঙ্গে যোগ দেন। সেখানে তিনি কিছুদিন একটি ক্যাম্পে প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন। পরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্য থেকে বাছাই করে একটি ইয়ুথ কোম্পানি (১২০ সদস্য) গঠন করা হয়। এই কোম্পানি পরিচালনা ও নেতৃত্বের দায়িত্ব পান তিনি।
নাজিম উদ্দিন নভেম্বর মাসের প্রথমার্ধে সীমান্ত অতিক্রম করে স্বল্প প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সহযোদ্ধাদের নিয়ে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় যান। সেখানে কমলপুরে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর প্রতিরক্ষা। কয়েক দিন পর তাঁরা সেখানে আক্রমণ করেন। তাঁদের সাঁড়াশি আক্রমণে পাকিস্তানি প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে। আট-নয়জন পাকিস্তানি সেনা তাঁদের হাতে নিহত হয়। দুজনকে তাঁরা জীবিত অবস্থায় আটক করেন। এরপর তিনি তাঁর দল নিয়ে দেশ স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত সেখানেই অবস্থান করেন।
মুক্তিযুদ্ধে সাহস ও বীরত্বের জন্য মো. নাজিম উদ্দিনকে বীর প্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। ১৯৭৩ সালের গেজেট অনুযায়ী তাঁর বীরত্বভূষণ নম্বর ৬৮।
মো. নাজিম উদ্দিন স্বাধীনতার পর পর্যায়ক্রমে অনারারি ক্যাপ্টেন পদে উন্নীত হয়ে ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী থেকে অবসর নেন। তাঁর পৈতৃক বাড়ি কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার উসমানপুর ইউনিয়নের চৌহদ্দী গ্রামে। বর্তমানে তিনি এখানেই বসবাস করেন। তিনি অবসর ভাতা ও মুক্তিযোদ্ধা ভাতা পান। তাঁর বাবার নাম আরব আলী, মা মিশ্রি বেগম। স্ত্রী খালেদা বেগম। তাঁদের দুই মেয়ে।
সূত্র: মো. নাজিম উদ্দিন বীর প্রতীকের সাক্ষাৎকার নিয়েছেন প্রথম আলোর কিশোরগঞ্জের নিজস্ব প্রতিবেদক সাইফুল হক মোল্লা এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ সেক্টরভিত্তিক ইতিহাস, সেক্টর ৫।
গ্রন্থনা: রাশেদুর রহমান
trrashed@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.