সহ-উপাচার্যকে সরানোর সিদ্ধান্ত

আন্দোলনের মুখে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) সহ-উপাচার্য হাবিবুর রহমানকে সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একই সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা মামলাও দ্রুত প্রত্যাহার করা হবে।গতকাল সোমবার মধ্যরাতে বুয়েট শিক্ষক সমিতির নেতারা শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদের মিন্টো রোডের সরকারি


বাসভবনে গিয়ে বৈঠক করেন। সেখানে এসব সিদ্ধান্ত হয়। রাত দেড়টার দিকে বৈঠক শেষ হয়।
বৈঠক শেষে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘বৈঠকে বুয়েটের সার্বিক বিষয়গুলো পর্যালোচনা করে সহ-উপাচার্যকে প্রত্যাহার করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। মামলাও দ্রুত প্রত্যাহার করা হবে।’ তিনি বলেন, অন্য অভিযোগগুলোর বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বুয়েটের আন্দোলনরত শিক্ষকেরা এ সিদ্ধান্তের ব্যাপারে আশ্বস্ত হয়েছেন। তাঁরা বলেছেন, দ্রুত তাঁরা শিক্ষা কার্যক্রমে ফিরে যাবেন।
শিক্ষাসচিব কামাল আবদুল নাসের চৌধুরী বলেন, বৈঠকে সিদ্ধান্তের বিষয়ে আজ (মঙ্গলবার) সকালে শিক্ষক নেতারা অন্য শিক্ষকদের অবহিত করবেন। আর উপাচার্যের বিষয়ে পরে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
যোগাযোগ করা হলে বুয়েট শিক্ষক সমিতির সভাপতি মুজিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বৈঠকের সিদ্ধান্তে আমরা আশ্বস্ত হয়েছি। আজ বিষয়টি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের জানাব। আশা করছি, দ্রুতই স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করতে পারব। তবে শিক্ষা কার্যক্রম শুরুর জন্য কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের বিষয় আছে।’
এর আগে গতকাল উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে বুয়েটের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা স্বেচ্ছায় শরীর থেকে রক্ত বের করে অভিনব প্রতিবাদ জানান। তাঁরা সিরিঞ্জের মাধ্যমে নিজেদের হাত থেকে রক্ত নিয়ে তা বোতলে ভরে প্রশাসনিক ভবনের সিঁড়িতে ঢেলে দেন। ওই ভবনেই রয়েছে উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যের কার্যালয়।
এরপর বিকেল থেকেই সমঝোতার চেষ্টা নতুনভাবে শুরু হয়। এর অংশ হিসেবে আন্দোলনকারী কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে বৈঠক করেন শিক্ষাসচিব। এই বৈঠকের আগে সচিবের আশ্বাসে আজ বেলা ১১টা পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিত করেন আন্দোলনকারীরা।
সূত্রমতে, সচিবের সঙ্গে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সরকারের পক্ষ থেকে শুধু সহ-উপাচার্য হাবিবুর রহমানকে সরিয়ে দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। এই প্রস্তাবে রাজি হলে মামলা প্রত্যাহারসহ অন্যান্য সমস্যাগুলোও সমাধানের আশ্বাস দেওয়া হয়। এর আগে দুপুরে সচিবালয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠক শেষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে বুয়েট-সংকট নিয়ে কথা বলেন শিক্ষামন্ত্রী ও শিক্ষাসচিব।
শিক্ষাসচিবের সঙ্গে বৈঠকের পর রাতে বুয়েট শিক্ষক সমিতির জরুরি সাধারণ সভা হয়। রাত পৌনে ১১টায় সভা শেষ করে বেশ কয়েকজন শিক্ষক নেতা শিক্ষামন্ত্রীর বাসায় যান। এ বৈঠকে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান এ কে আজাদ চৌধুরীও উপস্থিত ছিলেন।
রক্ত ঢেলে প্রতিবাদ: আন্দোলনকারীরা গতকাল বেলা ১১টার দিকে পুরকৌশল ভবনের সামনে জড়ো হন। তাঁরা লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের শরীর থেকে সিরিঞ্জ দিয়ে রক্ত সংগ্রহ করেন। এরপর তা দুটি বোতলে জমা করেন। কয়েকজন শিক্ষকও এ সময় রক্ত দেন।
রক্ত সংগ্রহের পর শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে ক্যাম্পাস প্রদক্ষিণ করেন। প্রশাসনিক ভবনের সামনে গেলে পুলিশ তাঁদের ঢুকতে বাধা দেয়। উপাচার্য ও সহ-উপাচার্য তখন কার্যালয়ে ছিলেন না। এ সময় শিক্ষার্থীরা দুই বোতল রক্ত ভবনের বারান্দায় ওঠার সিঁড়িতে ঢেলে দিয়ে প্রতিবাদ জানান।
শিক্ষার্থীরা বলছেন, এটা ‘প্রতীকী রক্তপাত’ কর্মসূচি। কয়েকজন শিক্ষক ও শিক্ষার্থী বলেন, ‘বুয়েটের বর্তমান উপাচার্য এস এম নজরুল ইসলাম গত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য থাকাকালে সেখানে রক্তপাতের ঘটনায় চলে আসতে বাধ্য হন। আমরা আশঙ্কা করছি, মিথ্যা মামলা ও সন্ত্রাসী দিয়ে হামলা চালিয়ে বুয়েটেও তিনি রক্তপাত ঘটাতে পারেন। তাই আমরা আগেই স্বেচ্ছায় রক্ত দিয়ে উপাচার্যকে বলতে চাই, আমাদের রক্ত নিন, তবু আপনি বিদায় হোন।’
রক্ত ঢালার পর আন্দোলনকারীরা মিছিল নিয়ে পলাশী মোড়ে গিয়ে অবস্থান নেন। শিক্ষকেরাও সেখানে যান। এ সময় শিক্ষার্থীরা সড়কে প্রতিবাদী আলপনা এঁকে উপাচার্য ও সহ-উপাচার্যের পদত্যাগ দাবি করেন। আলপনায় লেখা হয়, ‘সেভ বুয়েট, রিমোভ ভিসি-প্রোভিসি’। এ সময় পলাশী মোড় দিয়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়।
বেলা পৌনে তিনটার দিকে আন্দোলনকারীরা আজ মঙ্গলবার বেলা ১১টা পর্যন্ত কর্মসূচি স্থগিতের ঘোষণা দেন। শিক্ষাসচিব শিক্ষকদের টেলিফোনে আশ্বাস দিয়ে বলেন, রোববার রাতে করা মামলায় শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের হয়রানি করা হবে না। বুয়েটের পরিস্থিতি শান্তিপূর্ণ সমাধান করা হবে।
পদত্যাগের বিষয়ে গতকাল জানতে চাইলে উপাচার্য এস এম নজরুল ইসলাম আগের কথাই মনে করিয়ে দিয়েছেন। বলেন, সরকার না চাইলে তিনি নিজে থেকে পদত্যাগ করবেন না।
মামলায় ক্ষোভ ও নিন্দা: আগের দিন রাতে বুয়েট কর্তৃপক্ষ শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নামে দুটি মামলা করে। সেখানে উপাচার্যের কার্যালয় থেকে চুরির অভিযোগও করা হয়। গতকাল দুপুরে বুয়েট শিক্ষক সমিতির নেতারা তাৎক্ষণিক সংবাদ ব্রিফিং করে এ ঘটনার নিন্দা ও ধিক্কার জানান। পুরকৌশল ভবনের দোতলায় অনুষ্ঠিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে সমিতির সাধারণ সম্পাদক আশরাফুল ইসলাম নিন্দা ও ধিক্কার জানিয়ে অবিলম্বে মামলা প্রত্যাহার করার দাবি জানান। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এই সংবাদ ব্রিফিং আন্দোলন কর্মসূচির অংশ নয়।
বুয়েটের শিক্ষক এ বি এম বদরুজ্জামান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বুয়েটের শিক্ষকেরা সততার জন্য বিখ্যাত, তাঁরা এই সততার শিক্ষাই শিক্ষার্থীদের দিয়ে থাকেন। কিন্তু সেখানে বুয়েটের সর্বোচ্চ পদধারী দুই ব্যক্তির নির্দেশে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে চুরির মতো হাস্যকর মামলা দেওয়া হয়েছে, যা অবমাননাকর।’
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের (জাসদ) সভাপতি হাসানুল হক ইনু ও সাধারণ সম্পাদক শরীফ নুরুল আম্বিয়া এক বিবৃতিতে বুয়েটের চলমান অবস্থায় উদ্বেগ এবং শিক্ষকদের বিরুদ্ধে চুরির মামলা করায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

No comments

Powered by Blogger.