‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ রাষ্ট্রীয়ভাবে পালন করতে বাধা কোথায় by শাহরিয়ার কবির

১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধের সময় বাংলাদেশ সমগ্র বিশ্বের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিল তিনটি প্রধান কারণে- ১. গাঙ্গেয় অববাহিকার এই ভূখ-ের মানুষ সাড়ে তেইশ বছরের প্রায় ঔপনিবেশক শাসন-শোষণ-পীড়নের বিরুদ্ধে স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র যুদ্ধে নিয়োজিত ছিল, যার প্রতিপক্ষ বিশ্বের অন্যতম নৃশংস সামরিক বাহিনী।


২. শতকরা ৮৫ ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত তৃতীয় বিশ্বের একটি পশ্চাৎপদ মানুষ লড়ছিল ধর্মনিরপেক্ষ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য এবং ৩. বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতার এই আকাক্সক্ষা নিশ্চিহ্ন করবার জন্য পাকিস্তানী সামরিক জান্তা নৃশংসতম গণহত্যার চরমপন্থা অবলম্বন করেছিল।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধকে আন্তর্জাতিক আইনে বৈধতা প্রদান করেছিল ১০ এপ্রিল ১৯৭১ সালে মুজিবনগর থেকে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিগণ কর্তৃক অনুমোদিত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’। এতে বাংলাদেশের জনগণের অবিসংবাদী নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কর্তৃক ঘোষিত ২৬ মার্চের স্বাধীনতার ঘোষণা ‘দৃঢ়ভাবে সমর্থন ও অনুমোদন’ করার পাশাপাশি ‘বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচার’ নিশ্চিত করা হয়েছে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্রের ভিত্তিতে ’৭২-এর ৪ নবেম্বর অনুমোদিত হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সংবিধান এবং এই সংবিধান গৃহীত হওয়ার পূর্ব পর্যন্ত ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ ছিল কার্যত বাংলাদেশের অস্থায়ী সংবিধান।
’৭২-এর সংবিধানকে বিভিন্ন কারণে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সংবিধান বলা হয়। তবে এর একটি বড় ত্রুটি ছিল বাংলাদেশের নাগরিক হিসেবে বাঙালী ছাড়াও আরও যেসব ক্ষুদ্র জাতিসত্তার মানুষ রয়েছে, যারা নিজেদের আদিবাসী বলে, যারা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বাঙালীদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে যুদ্ধ করেছে, তাদের পৃথক জাতিসত্তার স্বীকৃতি, অধিকার ও মর্যাদার বিষয়টি উপেক্ষা করা। ১৯৭৫-এ বঙ্গবন্ধুর নৃশংস হত্যাকা-ের পর অবৈধভাবে ক্ষমতাদখলকারী জেনারেল জিয়াউর রহমানের সামরিক জান্তা ’৭২-এর সংবিধানে ‘বিসমিল্লাহ ...’, ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর উপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস ...’ ইত্যাদি সংযোজন এবং রাষ্ট্রীয় মূলনীতি থেকে ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ খারিজ করে স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে বর্ণিত বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের অঙ্গীকার আঁস্তাকুড়ে নিক্ষেপ করেছিল। শুধু তাই নয়, জিয়া সরকার পাকিস্তানী ঔপনিবেশিক সরকারের নীতি অনুযায়ী পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকায় সমতলের বাঙালীদের জমির প্রলোভন দেখিয়ে বসবাসের ব্যবস্থা করে এবং সেনাবাহিনী লেলিয়ে দিয়ে আদিবাসী নির্মূলীকরণ নীতি কঠোরভাবে অনুসরণ করেছিল। এর প্রতিক্রিয়া হিসেবে পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা প্রভৃতি জাতিসত্তার সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ সরকার ও সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র প্রতিরোধের পথ বেছে নিয়েছিল।
পার্বত্য চট্টগ্রামে সামরিক অভিযান বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ম্লান করেছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে শুধু সরকার নয়, সাধারণভাবে বাঙালীদেরও তখন চরম বিব্রতকর পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়েছে। ১৯৯৭ সালের ডিসেম্বরে শেখ হাসিনার সরকারের সঙ্গে সংক্ষুব্ধ পাহাড়ী সম্প্রদায়ের শান্তিচুক্তি পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তির বাতাবরণ সৃষ্টি করেছে, বিদ্রোহী পাহাড়ী জনগোষ্ঠী অস্ত্রসমর্পণ করেছে, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে।
জেনারেল জিয়ার দল বিএনপি এবং তাদের প্রধান দোসর স্বাধীনতাবিরোধী, মৌলবাদী, সাম্প্রদায়িক জামায়াতে ইসলামী পার্বত্য শান্তিচুক্তি স্বাক্ষরের আগে থেকেই সমালোচনা করেছে। এর ফলে বাংলাদেশের এক-দশমাংশ ভূখ- নাকি ভারতের অংশ হয়ে যাবে। একইভাবে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি চুক্তিতে স্বাক্ষরপ্রদানকারী সন্তু লারমার বিরোধী একটি গ্রুপ বলেছিল পার্বত্য শান্তি চুক্তিতে পাহাড়ী আদিবাসীদের সব দাবি মানা হয়নি। আন্তর্জাতিক মহলে তখন এর প্রশংসা করে বলা হয়েছিল?এথনিক সংঘর্ষকবলিত দেশসমূহের জন্য এই চুক্তি অনুসরণযোগ্য দৃষ্টান্ত হতে পারে। পৃথিবীর বহু দেশে বিভিন্ন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ওপর রাষ্ট্রীয় নির্যাতন ও বিরোধ যৌক্তিক কারণেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য উদ্বেগজনক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে এ সব বিরোধ থেকে উদ্ভুত সমস্যা উপদ্রুত দেশের রাষ্ট্রীয় সীমানার ভেতর আবদ্ধ থাকে না।
২০১০ সালে বিএনপি-জামায়াতের নেতৃত্বধীন স্বাধীনতাবিরোধী-যুদ্ধাপরাধী-মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক অপশক্তি অধ্যুষিত চারদলীয় জোট ক্ষমতায় এসে শান্তি চুক্তি বাস্তবায়ন স্থগিত রেখে পার্বত্য চট্টগ্রামে পাহাড়ী-বাঙালী বিরোধ উস্কে দিয়ে আবার সেনাঅভিযানের ক্ষেত্র তৈরি করেছিল। আদিবাসীদের গোটা গ্রাম পুড়িয়ে দেয়ার ঘটনাও তখন ঘটেছিল। ২০০৮-এর নির্বাচনে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন মহাজোটের অন্যতম অঙ্গীকার ছিল পার্বত্য শান্তি চুক্তির বাস্তবায়ন এবং আদিবাসীদের সম অধিকার ও মর্যাদার স্বীকৃতি।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট ক্ষমতায় আসার পর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার এবং পার্বত্য শান্তি চুক্তি বাস্তবায়নের উদ্যোগ গ্রহণ করে প্রশংসিত হয়েছে। একইভাবে পঞ্চদশ সংশোধনীর দ্বারা সংবিধানে চার মূলনীতি পুনঃস্থাপিত হয়েছে, যা ছিল নাগরিক সমাজের দীর্ঘদিনের দাবি। তবে এই সংশোধনীতে জেনারেল জিয়া ও জেনারেল এরশাদের ৫ম ও ৮ম সংশোধনীর কতগুলো সাম্প্রদায়িক ও মানবাধিকারের পরিপন্থী ধারা রেখে দেয়া হয়েছে এবং আদিবাসীদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি দেয়া হয়নি, যা সচেতন নাগরিক সমাজকে ক্ষুব্ধ করেছে।
সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীতে নতুন সংযুক্ত ২৩ক অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘রাষ্ট্র বিভিন্ন উপজাতি, ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও সম্প্রদায়ের অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আঞ্চলিক সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্য সংরক্ষণ, উন্নয়ন ও বিকাশের ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।’ এই অনুচ্ছেদে ‘আদিবাসী’ শব্দটি যুক্ত করলে কোন মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে যেত না।
যে আওয়ামী লীগ মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দিয়েছে, যে দলের নির্বাচিত নেতৃবৃন্দের ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র’ জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক সুবিচারের অঙ্গীকার করেছে, যে দল ’৭২-এর সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও শোষিতের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে, পার্বত্য শান্তি চুক্তির মাধ্যমে সংঘাতকবলিত পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি নিশ্চিত করেছে, সেই আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের আদিবাসীবিরোধী বর্তমান অবস্থান আমাদের যারপরনাই হতাশ করেছে।
গত ১১ মার্চ ২০১২ তারিখে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় থেকে ‘বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপন প্রসঙ্গে’ একটি নির্দেশ পাঠানো হয়েছে পার্বত্য চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনের কাছে। এতে বলা হয়েছে, আদিবাসী দিবস সরকারীভাবে পালন করা যাবে না, যারা করবে তাদের সরকারী পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করা হবে না এবং সরকারের কেউ যেন এ দিনের কোন অনুষ্ঠানে সরকারের নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক বক্তব্য প্রদান না করেন। যার সরল অর্থ হচ্ছে, কেউ যদি আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস পালন করেও ‘আদিবাসী’ শব্দটি উচ্চারণ করা যাবে না।
সরকারের মন্ত্রী ও পরামর্শদাতারা বিভিন্ন সভা-সেমিনারে গত দু’বছর যাবৎ বলছেন বাংলাদেশে নাকি কোন আদিবাসী নেই, আছে ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, নৃ-গোষ্ঠী ও উপজাতি। কেউ কেউ এমন কথাও বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রামের চাকমা ও মারমারা দক্ষিণপূর্ব এশিয়া থেকে এ দেশে এসেছে, বাঙালীরা হচ্ছে বাংলাদেশের আদিবাসী। এটি ঠিক যে আদিবাসী শব্দের সর্বজনস্বীকৃত কোন সংজ্ঞা নেই, জাতিসংঘের বিভিন্ন দলিলে ‘ওহফরমবহড়ঁং চবড়ঢ়ষব’ ও ‘অনড়ৎরমরহব’ দুটো শব্দ আছেজ্জযার বাংলা প্রতিশব্দ আদিবাসী। অনড়ৎরমরহব বলতে আমরা অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও ল্যাটিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশের আদি বাসিন্দাদের বুঝি, যাদের বহিরাগত শ্বেতাঙ্গরা হত্যা করে এসব ভূখ-ে তাদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছে। অনড়ৎরমরহব অর্থে বাংলাদেশে আদিবাসী নেই বললেই চলে, তবে ‘ওহফরমবহড়ঁং’ অর্থে অবশ্যই বাংলাদেশে আদিবাসী আছে। এরা পার্বত্য চট্টগ্রামে আছে, সমতলেও আছে। সরকার যাদের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা বা নৃ-গোষ্ঠী বলছে তারাই নিজেদের আদিবাসী বা ওহফরমবহড়ঁং চবড়ঢ়ষব মনে করে। এদের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে ওখঙ বলেছে, যে সব ট্রাইবাল জাতিগোষ্ঠীর সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা জাতীয় জনগোষ্ঠীর অন্য অংশ থেকে স্বতন্ত্র এবং যাদের ভাষা, সংস্কৃতি, জীবনযাপন পদ্ধতির কোন পরিবর্তন ঘটেনি তারাই ওহফরমবহড়ঁং চবড়ঢ়ষব বা আদিবাসী। স্থায়ী আবাসহীন ‘জিপসি’, ‘নোম্যাড’ বা যাযাবররাও ওহফরমবহড়ঁং অর্থে আদিবাসী। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে আদিবাসীরা সামাজিক বৈষম্য ও লাঞ্ছনা পরিহারের জন্য স্বতন্ত্র জাতিসত্তার পরিচয় দিতে চায় না, নিজেদের তারা মূলধারার জাতিগোষ্ঠীর অংশ মনে করে।
মহাজোট সরকারকে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা এমনটি বুঝিয়েছে যে, আদিবাসীদের সাংবিধানিক স্বীকৃতি দিলে তারা প্রথমে স্বায়ত্তশাসন এবং পরে স্বাধীনতার দাবি তুলবে এবং পার্বত্য চট্টগ্রাম বাংলাদেশের হাতছাড়া হয়ে যাবে। বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থায় যারা এ ধারণা পোষণ করেন তাদের কাঁধে সওয়ার রয়েছে বিএনপি জামায়াতের মৌলবাদী-সাম্প্রদায়িক ও আদিবাসীবিরোধী ভূত।
বর্তমানে বিশ্বের ৭০টি দেশে ৩৭ কোটিরও বেশি আদিবাসী আছে যাদের ভাষা, সংস্কৃতি, নৃতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য, সমাজব্যবস্থা ও রীতিনীতি সে দেশের প্রধান জনগোষ্ঠীর চেয়ে স্বতন্ত্র। জাতিগত পরিচয়ের বাইরে এরা কোথাও আদিবাসী, গিরিজন, বনবাসী; কোথাও জনজাতি, কোথাও ট্রাইবাল, কোথাও এ্যাবরিজিনাল, কোথাও ইন্ডিজিনাস, কোথাও এথনিক মাইনরিটি বা সংখ্যালঘু নৃ-গোষ্ঠী, কোথাও ন্যাশনাল মাইনরিটি বা সংখ্যালঘু জাতিসত্তা। বাংলাদেশের সংবিধানে এদের ক্ষুদ্র জাতিসত্তা ও নৃ-গোষ্ঠী বলা হয়েছে। এই অভিধা বাংলাদেশের সকল সংখ্যালঘু জাতিসত্তার প্রতি প্রযোজ্য, যারা নিজেদের আদিবাসী বলতে চান ‘এ্যাবরিজিনাল’ নয়, ‘ইন্ডিজিনাস’ অর্থে। তাদের পক্ষে স্বায়ত্তশাসন বা স্বাধীনতার দাবি তোলার ধারণার কোন বাস্তব ভিত্তি নেই। অবশ্যই তারা সংখ্যালঘু জাতি হিসেবে বিশেষ সুযোগ ও মর্যাদার অধিকারী। এই অধিকারের স্বীকৃতি বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানেই আছে, যে কারণে পার্বত্য শান্তিচুক্তির বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতের অপপ্রচার হালে পানি পায়নি।
যে কথা আমরা গত তিন বছর ধরে বলছিÑমহাজোট সরকার ও প্রশাসনের রন্ধ্রে রন্ধ্রে বিএনপি-জামায়াতের ভূতপ্রেতরা কিলবিল করছে, সুযোগ পেলেই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ও চেতনার পক্ষের যাবতীয় ইতিবাচক কার্যক্রম বানচাল করে দিচ্ছে। ৯ আগস্ট জাতিসংঘ কর্তৃক ঘোষিত ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ পালন না করা জাতিসংঘের ঘোষণার প্রতি অনাস্থাজ্ঞাপন, মানবাধিকার ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থীÑ যা কার্যত বিএনপি-জামায়াতী নীতির সমার্থক।
বর্তমান বাংলাদেশে ৪৫টি আদিবাসী বা সংখ্যালঘু জাতিসত্তার অধিবাসী বাস করে, যার মোট জনসংখ্যা প্রায় ২০ লাখ। এদের ভেতর উল্লেখযোগ্য চারটি আদিবাসী হচ্ছে সাঁওতাল (২ লাখ), চাকমা (১ লাখ ৯৫ হাজার), মারমা (৬৬ হাজার) ও মান্ডি (৬০ হাজার)। আদিবাসী গবেষক অধ্যাপক মেসবাহ কামাল বাংলাদেশে ৭৬টি নৃ-জনগোষ্ঠীর তালিকা প্রস্তুত করেছেন, যাদের উল্লেখযোগ্য অংশ হয় দেশান্তরিত হয়েছে কিংবা মূল জনগোষ্ঠীর ভেতর হারিয়ে গেছে। বর্তমানে সমগ্র বিশ্বে আদিবাসী বিলুপ্তিকরণ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই উদ্বেগ থেকেই জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা আদিবাসীদের রক্ষার জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
১৯৯৪-এর ২৩ ডিসেম্বর জাতিসঙ্ঘের সাধারণ পরিষদে এই মর্মে এক সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে, প্রতিবছর ৯ আগস্ট ‘বিশ্বের আদিবাসীদের আন্তর্জাতিক দিবস’ (ওহঃবৎহধঃরড়হধষ উধু ড়ভ ঃযব ডড়ৎষফ’ং ওহফরমবহড়ঁং চবড়ঢ়ষব) হিসেবে পালিত হবে। বাংলায় আমরা সংক্ষেপে বলি ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’। বিভিন্ন দেশে আদিবাসীরা সংস্কৃতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও আবাসনসহ মানবাধিকার সংক্রান্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে কিভাবে বঞ্চিত হচ্ছে, এই বঞ্চনা কিভাবে দূর করা যেতে পারে, লুপ্তপ্রায় আদিবাসীদের অস্তিত্ব কিভাবে রক্ষা করা যেতে পারে, এ সব বিষয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের করণীয় নির্ধারণের জন্যই জাতিসঙ্ঘের এই উদ্যোগ। আদিবাসীদের প্রতি জাতিসংঘের দায়বদ্ধতা থেকে এরপর সাধারণ পরিষদে ২০০৭-এর ১৩ সেপ্টেম্বর গৃহীত হয়েছে ‘আদিবাসীদের অধিকার সংক্রান্ত ঘোষণা।’ (উবপষধৎধঃরড়হ ড়হ ঃযব জরমযঃং ড়ভ ওহফরমবহড়ঁং ঢ়বড়ঢ়ষব)
আদিবাসীদের অবস্থান পৃথিবীর সর্বত্র। যে সব অঞ্চল মানব সভ্যতার উৎপত্তিস্থল হিসেবে বিবেচিত সেসব অঞ্চলে আদিবাসীদের সংখ্যা বেশি। এই আদিবাসীদের স্বতন্ত্র নৃতাত্ত্বিক পরিচয় রয়েছে, তাদের ভাষা ও সংস্কৃতিও স্বতন্ত্র। আধুনিক সভ্যতার বিকাশ, শক্তিশালী জাতির সাম্রাজ্যলিপ্সা ও জাত্যাভিমান আদিবাসীদের অস্তিত্ব ক্রমশ বিপন্ন করে তুলছে। ইউনেস্কোর হিসেবে বর্তমানে পৃথিবীতে পাঁচ হাজারেরও বেশি ভাষার অস্তিত্ব বিপন্ন। যুক্তরাষ্ট্রের বিশিষ্ট ভাষাবিদ ডেভিড হ্যারিসনের মতে, প্রতি দুই সপ্তাহে পৃথিবী থেকে একটি ভাষা হারিয়ে যাচ্ছে। ‘প্রাভদা’য় প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, আগামী একশ’ বছরে পৃথিবী থেকে অন্ততপক্ষে দুই হাজার ভাষা হারিয়ে যাবে। (প্রাভদা, ৬ আগস্ট ২০০৯) বর্তমানে পৃথিবীর ভাষার সংখ্যা সাত হাজার। এর ভেতর সাড়ে তিন হাজার ভাষায় কথা বলে পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার শতকরা মাত্র দুই ভাগ মানুষ। একটি ভাষার মৃত্যুর অর্থ হচ্ছে সেই নৃ-গোষ্ঠীর ইতিহাস, জ্ঞান ও সংস্কৃতির বিলুপ্তিকরণ, যা মানব সভ্যতার জন্য এক বেদনাবহ অভিজ্ঞতা।
শেখ হাসিনার মহাজোট সরকার আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করে এশিয়ার লুপ্তপ্রায় ভাষাসমূহ সংরক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করে প্রশংসিত হয়েছে। আমরা আশা করব ক্ষমতাসীন মহাজোট প্রতিবছর যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে ‘আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস’ পালন এবং আদিবাসীদের স্বতন্ত্র জাতিসত্তার সাংবিধানিক স্বীকৃতি প্রদান করে জাতিসংঘের ঘোষণা এবং মানবাধিকারের প্রতি দায়বদ্ধতার অনুকরণযোগ্য দৃষ্টান্ত অনুসরণ করবে। আদিবাসী সমস্যা প্রতিবেশী বার্মা, ভারত, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড, চীন ও পাকিস্তানে আরও জটিল। অথচ এসব দেশ ২০০৭ সালে গৃহীত জাতিসংঘের ‘আদিবাসী অধিকার’ ঘোষণায় স্বাক্ষর করেছে। এই ঘোষণার পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৪৭টি দেশ, বিপক্ষে ভোট দিয়েছে ৪টি দেশ (যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড) এবং ভোটদানে বিরত থেকেছে বাংলাদেশসহ ১১টি দেশ। যারা জাতিসংঘের এই ঘোষণার বিরুদ্ধে ভোট দিয়েছে বা ভোটদানে বিরত থেকেছে তাদের ভেতর অর্থনৈতিকভাবে অগ্রসর ও অনগ্রসর উভয় ধরনের দেশ রয়েছে। আদিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা সম্পর্কে এসব দেশের ভূমিকা বিভিন্ন সময়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সমালোচিত হয়েছে। আদিবাসীদের অধিকারের বিষয়টি বাংলাদেশসহ সমগ্র দক্ষিণ এশিয়ায় ব্রিটিশ ঔপনিবেশিককাল থেকে স্বীকৃত। এই স্বীকৃতি একটি রাষ্ট্রকে বিশেষ মর্যাদা প্রদান করে। আমাদের সংবিধানে আদিবাসীদের অধিকার ও মর্যাদা স্থানলাভ করলে বাংলাদেশ ও বাঙালী জাতির মর্যাদা বৃদ্ধি পাবে। ২০১৪-এর নির্বাচনের আগে বিএনপি-জামায়াত জোট সারা দেশে অস্থিরতা সৃষ্টির জন্য বহুমাত্রিক ষড়যন্ত্র করছে, যার অন্যতম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট। গত ৪ আগস্ট দিনাজপুরের চিরির বন্দরে জামায়াত-শিবিরের সন্ত্রাসী কর্তৃক হিন্দু সম্প্রদায়ের ওপর সুপরিকল্পিত হামলা এই ষড়যন্ত্রেরই অন্তর্গত। পার্বত্য চট্টগ্রামকে আবার অশান্ত করাও এই ষড়যন্ত্রের বাইরে নয়। পার্বত্য চট্টগ্রামে জঙ্গী মৌলবাদীদের নেটওয়ার্ক সম্পর্কে গোয়েন্দা বিভাগ কিছু জানে না এটা আমরা মানতে রাজি নই। এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে জামায়াত যুক্ত, আদিবাসীরা নয়। এ বিষয়ে মহাজোটের নেতৃবৃন্দ সতর্ক না হলে দেশ ও জাতির জন্য সমূহ বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।

No comments

Powered by Blogger.