বহদ্দারহাট উড়ালসড়ক-গার্ডারটি ভেঙে পড়ল কেন? by হামিদ উল্লাহ

ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং যথাযথ নিয়ম মেনে কাজ না করায় বহদ্দারহাট উড়ালসড়কের গার্ডারটি ভেঙে পড়েছে। গত ২৮ জুন গার্ডারটি ভেঙে পড়ায় এ ধরনের দুর্ঘটনা আরও ঘটতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, উড়ালসড়কটির নির্মাণকাজ শুরু থেকেই বিশেষজ্ঞদের মতামত এবং তাঁদের সংশ্লিষ্ট থাকার


প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উপেক্ষা করেছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (চউক)। ফলে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।
ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাবেক সভাপতি ও নগর পরিকল্পনাবিদ আলী আশরাফ প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, গার্ডারের নির্মাণে ত্রুটি আছে। তা না হলে এটি খাড়াভাবে পড়ার কথা। কিন্তু পড়েছেচেপ্টাভাবে। এমনিতেই এগুলো বাইরে তৈরি করে এনে লাগাতে হয়। হয়তো ১০০ টন ওজনের বলে তারা (নির্মাণ কর্তৃপক্ষ) সেটা করতে চায়নি। কিন্তু গার্ডারটি নির্মাণের পর তাতে ব্যবহূত সামগ্রী সরানোর সময় যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি বলে আমার মনে হয়েছে। এমনিতে এ ধরনের গার্ডার পড়ার কোনো সুযোগ নেই। তাই বিষয়গুলো নিয়ে আমাদের ভাবতে হচ্ছে।’
গার্ডারটি ভাঙার ব্যাপারে এখনই বিস্তারিত কিছু বলতে চাননি চউক চেয়ারম্যান আবদুচ ছালাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আমার মনে হয় কমিটির প্রতিবেদন দেওয়া পর্যন্ত আমাদের অপেক্ষা করা উচিত।’ আবদুচ ছালাম বলেন, ‘আমি অনেক কিছুই জানি। বেশির ভাগ সময় মাঠেই থাকি। কিন্তু এখন যদি এসব বলি তাহলে সেটা হবে বিচারের আগেই রায় দিয়ে দেওয়া।’
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রথম আলোকে বলেন, ‘বহদ্দারহাট উড়ালসড়ক নির্মাণের শুরু থেকেই কোনো বিষয়ে আমরা জানি না। আমার কাছে কদমতলী উড়ালসড়কের ব্যাপারে কিছু কাগজপত্র পাঠানো হয়েছিল। আমি তাতে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি ধরিয়ে দিয়েছি। কাজেই বহদ্দারহাটের উড়ালসড়কে কী ধরনের ত্রুটি ছিল, তা এখন অনুমানের ভিত্তিতে বলা অসম্ভব। তবে প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, ভূমিকম্প নিরোধক এখানে স্থাপন করা হয়নি। কিছু থাকলেও তা পর্যাপ্ত নয়।’
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, ১০৬ কোটি টাকার এ উড়ালসড়কের পুরো কাজটি করা হচ্ছে সনাতনী পদ্ধতিতে। গার্ডারের নিচে দুই পাশে রাবারের বিয়ারিং ব্যবহার করা হয়নি। গার্ডারগুলো কেবল তৈরি করে তা পিলারের ওপর ফেলে রাখা হয়েছে। এ অবস্থায় একটি গার্ডার হঠাৎ পড়ে যাওয়ায় আগামী সময়ে বিয়ারিং বসানোসহ অন্য আনুষঙ্গিক কাজ করতে গিয়েও এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (চউক) চলমান প্রকল্পের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত এবং বিতর্কিত প্রকল্প হচ্ছে বহদ্দারহাট মোড়ে উড়ালসড়ক নির্মাণ। গত বছরের জানুয়ারিতে উড়ালসড়কটির নির্মাণকাজ শুরুর পর থেকে এ নিয়ে সমালোচনার শেষ নেই। সর্বশেষ গত ২৮ জুন একটি গার্ডার ভেঙে পড়ায় এ প্রকল্প নিয়ে সমালোচনার নতুন ক্ষেত্র তৈরি হয়েছে। অনেকের প্রশ্ন, কেন এবং কীভাবে গার্ডারটি ভেঙে গেল?
চউকসহ চট্টগ্রামে নির্মাণকাজে নিয়োজিত একাধিক প্রকৌশলী ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গার্ডারটি ভেঙে যাওয়ার ক্ষেত্রে দুটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একটি হচ্ছে গার্ডারটি নির্মাণের পর এর আশপাশ থেকে নির্মাণসামগ্রী সরানোর ব্যাপারে যথেষ্ট সতর্কতা অবলম্বন করা হয়নি। ফলে সেটি নিজ জায়গা থেকে সরে গেছে। এরপর সেটি একসময় পড়ে গেছে।
দ্বিতীয়টি হচ্ছে, ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণসামগ্রীর ব্যবহার। ফলে গার্ডারটি নিচে পড়ার পর দেখা যায়, একটি স্থান ভেঙে গেছে। নিয়ম অনুযায়ী কাজ হলে গার্ডারের কোথাও এ ধরনের ফাটল হওয়ার সুযোগ নেই।

No comments

Powered by Blogger.