খাদ্যনিরাপত্তা-খাদ্য উৎপাদনের বাধাগুলো দূর করতে হবে by ফরিদা আখতার

গতকাল ছিল বিশ্ব খাদ্য দিবস। প্রতিবছরের মতো এবারও জাতিসংঘ খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (FAO) উদ্যোগে বিশ্ব খাদ্য দিবসের প্রতিপাদ্য ঠিক করা হয়েছে ক্ষুধার বিরুদ্ধে ঐক্য (United against hunger)। এটা খুবই জরুরি, কিন্তু কীভাবে এই ঐক্য সম্ভব? কাদের ঐক্য? খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO) এবং বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (WFP) যৌথ প্রকাশনায়


‘State of Food Insecurity in the World 2010’ এসব দেশের খাদ্য ও ক্ষুধা কিংবা পুষ্টিহীনতার পরিস্থিতির বিশদ বর্ণনা দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল অন্যান্য দেশের তুলনায় প্রোট্রেক্টেড অঞ্চলে অপুষ্টির অবস্থা তিন গুণ বেশি। এই ২২টি দেশের মধ্যে ১৬টি দেশই আফ্রিকার। বাকিগুলো হচ্ছে—আফগানিস্তান, ইরাক, দক্ষিণ কোরিয়া, হাইতি, তাজিকিস্তান ইত্যাদি। বলা বাহুল্য, এসব দেশই দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধ কিংবা সংঘাতের মধ্যে রয়েছে। এখানে খাদ্যঘাটতি হওয়া অস্বাভাবিক নয়। এখানে ক্ষুধার্থ মানুষের সংখ্যা ১৬ কোটি ৬০ লাখ। প্রতিবেদনে ক্ষুধার্থ ও পুষ্টিহীনতার শিকার—এই দুটি কথাকে সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। পর্যাপ্ত খাদ্য না জুটলে পুষ্টিহীনতা হবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু পেট ভরে খাবার জুটলেও পুষ্টির অভাব হতে পারে—এমন পরিস্থিতিও সৃষ্টি হচ্ছে, কারণ খাদ্যের মান কমে যাচ্ছে। বেশি খাদ্য উৎপাদন পুষ্টিমান নিশ্চিত করেনি। প্রতিবেদনে খাদ্য উৎপাদন নিয়ে খুব আলোচনা হয়নি, বরং বেশি মনোযোগ দেওয়া হয়েছে খাদ্যসাহায্য অর্থাৎ বিদেশ থেকে আমদানি করা খাদ্যের ওপর।
খাদ্য ও কৃষি সংস্থার মতে, সাধারণভাবে উন্নয়নশীল দেশেই পুষ্টিহীনতার শিকার মানুষের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। মাত্র সাতটি দেশে বিশ্বের দুই-তৃতীয়াংশ অপুষ্টির শিকার মানুষের বাস। এই সাতটি দেশের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, চীন, ইন্দোনেশিয়া, কঙ্গো, ইথিওপিয়া ও বাংলাদেশ রয়েছে। যেসব দেশের কথা বলা হচ্ছে, এগুলো খাদ্য উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণ দেশ ছিল। এই দেশগুলো খাদ্য রপ্তানিও করত। তাহলে কেন বিশ্বের এত দেশে ক্ষুধা ও অপুষ্টি বিরাজ করছে। এর কোনো ব্যাখ্যা প্রতিবেদনে নেই এবং খাদ্য উৎপাদনের অবস্থাও বর্ণনা করা হয়নি।
তাই বিশ্ব খাদ্য দিবসে আমরা জনগণের দিক থেকে দেখতে চাই, খাদ্যসংকট কেন হচ্ছে। অন্তত বাংলাদেশে আমরা বিগত কয়েক বছরে খাদ্যসংকটের পর্যালোচনা করলেই এই সংকটের কারণ চিহ্নিত করা যেতে পারে। শুধু পরিমাণের দিক থেকেই সংকট নয়, খাদ্যমানের দিক থেকেও ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
বাংলাদেশে সবুজ বিপ্লব নামে আধুনিক কৃষির প্রবর্তন করা হয়েছে, দীর্ঘ অর্ধশত বছর ধরে। আমাদের কথায় কথায় উচ্চফলনশীল জাতের ধান, সবজি ও অন্যান্য খাদ্য-ফসলের কথা বলা হয়। সরকারি পর্যায়ে খাদ্যসংকট বা ঘাটতির কথা উঠলেই উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারের সঙ্গে ব্যাপকভাবে রাসায়নিক সার-কীটনাশক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় এবং এ কারণে মাটির উর্বরাশক্তি নষ্ট হচ্ছে, পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে এবং মানুষের স্বাস্থ্যের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
১ অক্টোবর বাংলাদেশ ধান গবেষণাকেন্দ্র (ব্রি) ৪০ বছর পূর্তি পালন করেছে। কেক কেটে জন্মদিন পালন করলেও তারা বাংলাদেশের কমপক্ষে ১৫ হাজার জাতের বৈচিত্র্যপূর্ণ ধানের বিপরীতে ঢাকঢোল পিটিয়ে কেবল ৫৭টি জাতের ধান প্রবর্তন করেছে। এগুলোকে তারা উচ্চফলনশীল জাত বলতেই ব্যস্ত। তবে উচ্চফলনশীল করতে গিয়ে উচ্চমাত্রায় সার-কীটনাশক ব্যবহার করতে হচ্ছে, তুলতে হচ্ছে মাটির তলার পানি—এ কথা বলছে না। নিউ এজ পত্রিকার (অক্টোবর ১, ২০১০) একটি প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, দেশের ৪০ শতাংশ জমির জৈব পদার্থের ঘাটতি এবং পুষ্টির অভাব দেখা দিয়েছে। কৃষককে একই পর্যায়ের ফলন ধরে রাখতে হলে আরও বেশি পরিমাণ সার ব্যবহার করতে হয়। ব্রি উদ্ভাবিত ধানের ফলন বেশি হলেও কৃষকের লাভ নেই, কারণ এতে সার-কীটনাশকের ব্যবহার বেশি করতে হয়। একজন কৃষক উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, এক বিঘা জমিতে বিআর-২৯ করতে হলে তাঁকে ৮০ কেজি ইউরিয়া, ২০ কেজি টিএসপি এবং ৪০ কেজি অন্য সার দিতে হয়। অথচ দেশীয় শাইল ধান করতে গিয়ে তাঁকে এর অর্ধেক পরিমাণ ব্যবহার করতে হয়। আসলে কোনো রাসায়নিক সার ব্যবহার না করলেও চলে।
এদিকে Xinhua News Agency গত ২২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ ধান গবেষণাকেন্দ্রের (ব্রি) একটি গবেষণা প্রতিবেদন উল্লেখ করে বলেছে যে গত ১০ বছরে কীটনাশক ব্যবহারের পরিমাণ ৩২৮ শতাংশ বেড়েছে, যা স্বাস্থ্যঝুঁকির সৃষ্টি করেছে। ১৯৯৭ সালে কীটনাশক ব্যবহারের পরিমাণ ছিল আট হাজার টন, ২০০৮ সালে তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ৪৮ হাজার ৬৯০ টন। কীটনাশকের এই ব্যাপক ব্যবহার প্রধানত হয়েছে সবজি চাষে, যার কারণে বিদেশে বাংলাদেশের সবজির চাহিদা কমে গেছে। আমরা বুঝতে পারি না, ব্রি নিজেই এমন ধানের জাত কেন কৃষকের জন্য উদ্ভাবন করে, যা সার-কীটনাশকনির্ভর। এখন ব্রির গবেষকেরা বহুজাতিক কোম্পানির সহযোগিতায় জিএম ধান প্রবর্তন করার প্রস্তাব করছে, যা হবে এ দেশের খাদ্য উৎপাদনের জন্য এক মারাত্মক হুমকি। কারণ এখানে কৃষকের ভূমিকা গৌণ হয়ে যাবে, বেড়ে যাবে কোম্পানির প্যাটেন্ট করা প্রযুক্তিনির্ভরতা, যা আমাদের দেশের জন্য মোটেও উপযুক্ত নয়। বাংলাদেশের কৃষকেরা কীভাবে বাংলাদেশের পরিবেশ ও আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে খাদ্য-ফসল উৎপাদন করতে পারেন, এর জন্য কোনো পরিকল্পনা নেই। জলবায়ু পরিবর্তনের হুমকির সঙ্গে আমাদের প্রতিনিয়ত প্রযুক্তিনির্ভর করার জন্য যে চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে, তা জলবায়ু পরিবর্তনের চেয়েও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে। আমাদের বুঝতে হবে, খাদ্য উৎপাদন করাই যথেষ্ট নয়, কোন খাদ্য উৎপাদন করা হচ্ছে এবং কী প্রক্রিয়ায় উৎপাদন করা হচ্ছে, তা বিবেচনা করা দরকার।
আমাদের দেশে খাদ্যসংকটের পেছনে আরও একটি বড় কারণ হচ্ছে, খাদ্য-ফসলের জমিতে অখাদ্য ফসলের ব্যাপক ও নিয়ন্ত্রণহীন চাষ। গত কয়েক বছরে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তামাক চাষ যেভাবে সম্প্রসারিত হচ্ছে, তা খাদ্য উৎপাদনের জন্য একটি হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তামাক চাষ একনাগাড়ে একই জমিতে করলে জমির উর্বরাশক্তি নষ্ট হয়, তাই তারা নতুন নতুন এলাকার দিকে ছোটে। রংপুর, কুষ্টিয়া হয়ে এখন পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান জেলায় ব্যাপক চাষ হচ্ছে। শীতকালীন ফসলের মৌসুমে খাদ্য-ফসলের পরিবর্তে তামাক চাষ করে ব্যাপক খাদ্যঘাটতি সৃষ্টি হচ্ছে। ২০০৯ সালে প্রায় ৭৪ হাজার হেক্টর জমিতে তামাক চাষ হয়েছে, অথচ এই জমিতে আলু, ডাল, ধান, মরিচ, ধনিয়া, সরিষা, শীতকালীন সবজি, পেঁয়াজ, রসুন, ছোলাসহ সব ধরনের খাদ্য-ফসল উৎপাদন করা যেত। কুষ্টিয়া কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ থেকে পাওয়া তথ্য থেকে জানা গেছে, ২০০৯-১০ সালে এক লাখ ১৫ হাজার ৯৭৮ হেক্টর চাষের জমির মাত্র ৪৭ হাজার ৭৬৭ হেক্টর জমিতে বোরো, সরিষা, ও সবজির আবাদ হয়েছে। বাকি জমি তামাক কোম্পানি তামাক চাষের জন্য আগেই নিয়ে রেখে দিয়েছে (চিন্তা, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১০)। বান্দরবানের লামা উপজেলায় উবিনীগের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, পাঁচ হাজার ৩৯৯ একর জমিতে তামাক চাষ হওয়ায় ১১ কোটি টাকার সমপরিমাণের খাদ্য-ফসলের ক্ষতি হয়েছে। এখন সেসব এলাকায় খাদ্য অন্য এলাকা থেকে আমদানি করতে হয়। কুষ্টিয়ার দৌলতপুরে ২০ হাজার একর জমিতে তামাক চাষের কারণে খাদ্য-ফসলের ক্ষতির পরিমাণ ১৪ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এগুলো নেহাতই কৃষকদের হিসাব। জাতীয় পর্যায়ে হিসাব কষলে ক্ষতির পরিমাণ শতগুণ বাড়বে সন্দেহ নেই। সম্প্রতি বান্দরবান জেলার আদালতে একটি মামলা হয়েছে এবং বান্দরবান জেলা যুগ্ম বিচারক সামস উদ্দিন খালেদ বান্দরবান জেলায় তামাক চাষ বন্ধের আদেশ দিয়েছেন। এ আদেশের কারণে কৃষকদের মধ্যে আশার সঞ্চার হয়েছে এবং আদালতের আদেশের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে যদি কোম্পানি তামাক চাষের কার্যক্রম বন্ধ করে, তাহলে মাতামুহুরী নদীর তীরে যেসব খাদ্য-ফসল উৎপাদন হবে, তার সুফল আমরা পাব।
আশার কথা, ইতিমধ্যে কৃষি মন্ত্রণালয় তামাক চাষে সারের ভর্তুকি না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, বাংলাদেশ ব্যাংক ঋণ সহযোগিতা না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে জাতীয় বাজেটে তামাকপাতা রপ্তানির ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক ধার্য করেছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, সরকার বিষয়টি আমলে নিয়েছে। তবে এর ফলাফল বোঝা যাবে এ বছর তামাক চাষের অবস্থা দেখে। আশা করছি, খাদ্য-ফসলের জমিতে অন্তত তামাক চাষের সম্প্রসারণ ঘটবে না। সরকার আরও একটি পদক্ষেপ নিয়েছে, যা বাস্তবায়ন করা জরুরি। খাদ্য উৎপাদন বৃদ্ধির মাধ্যমে খাদ্যনিরাপত্তা ও ভূমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে ‘কৃষি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন, ২০১০’-এর খসড়া তৈরি শেষ করেছে ভূমি মন্ত্রণালয় (বিডিনিউজটোয়েন্টিফোর ডটকম, ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১০)। তামাক চাষকেও এই আইনের আওতায় এনে অনুমতি নেওয়ার নিয়ম করতে হবে।
আমাদের দাবি, খাদ্য উৎপাদনের বাধাগুলো দূর করা হোক—এ দেশে খাদ্যঘাটতি অবশ্যই দূর করা সম্ভব হবে।
 ফরিদা আখতার: নারীনেত্রী, উন্নয়নকর্মী।

No comments

Powered by Blogger.