শ্রীকাইলে নতুন গ্যাসক্ষেত্র-সুষম জ্বালানি নীতি চাই

কুমিল্লার মুরাদনগরের শ্রীকাইলে গ্যাস পেয়েছে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রডাকশন কোম্পানি লিমিটেড বা বাপেক্স। এ গ্যাস বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলন করা লাভজনক হবে কিনা, সেটা জানার কাজ শুরু হয়েছে। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান জানিয়েছেন, 'বাণিজ্যিকভাবে উত্তোলনযোগ্য' প্রমাণিত হলে শ্রীকাইল থেকে দিনে ১৬-১৭ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে জোগান দেওয়া সম্ভব হবে।


এ নতুন গ্যাসক্ষেত্র প্রত্যাশা পূরণ করুক, এটাই আশা করব। ২০০৪ সালে এই শ্রীকাইলেই গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কারের ঘোষণা দেওয়া হলেও পরে জানা যায়, বাণিজ্যিক উত্তোলন লাভজনক হবে না। পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যানের প্রত্যাশা পুরোপুরি পূরণ হলেও শ্রীকাইল থেকে যে গ্যাস মিলবে তা কিন্তু চাহিদার সামান্য অংশই পূরণ করবে। বর্তমানে প্রতিদিন গ্যাসের চাহিদা মোটামুটি দুই হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট। সার ও বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে শুরু করে শিল্প-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান এবং ঘরে ঘরে রান্নার চুলা_ সর্বত্রই গ্যাসের জন্য জোরালো দাবি। বর্তমানে ৫টি বড় রাসায়নিক সার কারখানায় উৎপাদন বন্ধ রেখে অপরিহার্য প্রয়োজন মেটাতে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। শ্রীকাইলের মতো আরও কয়েকটি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং তা থেকে বাণিজ্যিকভাবে সরবরাহ শুরু হলেও পরিস্থিতির লক্ষণীয় উন্নতি ঘটবে না। এ কারণে জ্বালানির ক্রমবর্ধমান চাহিদা মেটাতে দুটি বিষয়ের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে। এক. দেশের স্থলভাগ ও সমুদ্রে গ্যাস অনুসন্ধান পরিচালনা। সুনামগঞ্জ-নেত্রকোনা এলাকা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম এ ক্ষেত্রে সম্ভাবনাপূর্ণ এলাকা। বঙ্গোপসাগরে যে বিপুল জলভাগ আন্তর্জাতিক আদালতের রায়ে বাংলাদেশের অধিকারে এসেছে সেখানে কিছু এলাকায় ইতিমধ্যে বিদেশি কোম্পানি অনুসন্ধান কাজ শুরু করেছে। নতুন ব্লক বরাদ্দের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ যথাযথভাবে যেন সংরক্ষণ করা হয়, সে বিষয়ে সর্বোচ্চ সতর্কতা কাম্য। এর সঙ্গে জ্বালানির মূল্য শুধুু নয়, সামগ্রিক অর্থনীতি ব্যবস্থাপনাও নির্ভর করে। দুই. বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য গ্যাস ছাড়াও কয়লা, ডিজেল, ফার্নেস অয়েল প্রভৃতি জ্বালানির ব্যবহার। অনেক বছর কেবল গ্যাসের ওপর নির্ভর করেই নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে এবং এ জন্য যে গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছে তার দামও ধরা হয়ে থাকে নামমাত্র। এটা জানা যে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ কোম্পানিগুলো সৌদি আরবের চেয়েও কম দামে গ্যাসের সরবরাহ পেয়ে থাকে। এ কারণে বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয় বিকল্প জ্বালানি ব্যবহারকে মোটেই গুরুত্ব দেয়নি। কয়েক বছর ধরে গ্যাসের সংকট শুরু হওয়ায় চারদিকে হাহাকার পড়ে গেছে এবং তুলনামূলক ব্যয়বহুল জ্বালানির ব্যবহারও মনোযোগ পেতে শুরু করেছে। অন্যদিকে, গ্যাস ও বিদ্যুতের গ্রাহকরা সস্তায় সরবরাহ পেয়ে অভ্যস্ত হয়ে পড়ায় সরকারের মূল্যবৃদ্ধির পদক্ষেপকে তারা রীতিমতো জুলুম মনে করছে। নতুন নতুন গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার এবং তা থেকে উত্তোলন শুরু হলেও দেশের শিল্প-বাণিজ্য ও গৃহস্থালি কাজে চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হবে_ এমন ধারণার কারণ নেই। অতএব, নীতিনির্ধারকদের বিকল্প ভাবতেই হবে। ঘরে ঘরে রান্নার কাজেও পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ করার ব্যবস্থায় ক্রমে পরিবর্তন আনা চাই। এর পরিবর্তে সিলিন্ডারে গ্যাস সরবরাহ সার্বিক অর্থনীতির স্বার্থেই অপরিহার্য বিকল্প। গ্যাসের প্রাচুর্য রয়েছে যেসব দেশে সেখানেও কিন্তু এ ব্যবস্থা জনপ্রিয় এবং আমরা তা উপেক্ষা করে চলতে পারি না।
 

No comments

Powered by Blogger.