প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা ও ভাষা আন্দোলন by সরদার সিরাজুল ইসলাম

১৯৪৭ সালের ১২ ডিসেম্বর রাতে ঢাকায় একদল যুবক বাসে করে ‘রাষ্ট্র ভাষা উর্দু হউক’ প্রচার চালাতে থাকলে পলাশী ব্যারাকের সামনে সংঘর্ষ হয়, এতে ২০ জনেরও বেশি লোক আহত হয়।
এছাড়া ঐদিন শহরের বিভিন্ন স্থানে উর্দু ও বাংলার সমর্থকদের মধ্যে কয়েকবার সংঘর্ষ হয়, যার ফলে ছাত্রনেতা নঈমুদ্দিনসহ অনেকে আহত হন। ১৩ ডিসেম্বর বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে রমনা সেক্রেটারিয়েট এলাকায় বিরাট একদল জনতা বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। একই দিন সেক্রেটারিয়েট কর্মচারীরা তাদের বিভিন্ন দাবির স্বপক্ষে হরতাল পালন করে। তাদের অন্যতম দাবি ছিল বাংলাকে “অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করা।” রাষ্ট্্র ভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এটিই প্রথম সংগ্রাম পরিষদ। এর আহ্বায়ক ছিলেন অধ্যাপক নুরুল হক ভুইয়া। অন্য যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক আবুল কাসেম, মোহাম্মদ তোয়াহা, নঈমুদ্দিন আহম্মদ, জনাব শওকত, ফরিদ আহম্মদ, আখলাকুর রহমান, আব্দুল মতিন খাঁন চৌধুরী, আজিজ আহম্মদ, শামসুল আলম, আবুল খায়ের, আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী, অলি আহাদ, সলিমুলাহ মুসলিম হলের সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সরদার ফজলুল করিম প্রমুখ।
১৯৪৭ সালের ডিসেম্বর মাসের শেষ দিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক ও বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে ‘রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ’ নামে একটি কমিটি করা হয়। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য এটিই প্রথম সংগ্রাম পরিষদ। এর আহ্বায়ক ছিলেন অধ্যাপক নুরুল হক ভূইয়া। অন্য যাঁরা ছিলেন তাঁদের মধ্যে অধ্যাপক আবুল কাসেম, মোহাম্মদ তোয়াহা, নঈমুদ্দিন আহম্মদ, জনাব শওকত, ফরিদ আহম্মদ, আখলাকুর রহমান, আব্দুল মতিন খাঁন চৌধুরী, আজিজ আহম্মদ, শামসুল আলম, আবুল খায়ের, আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী, অলি আহাদ, সলিমুলাহ মুসলিম হলের সহ-সভাপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সরদার ফজলুল করিম প্রমুখ।
দেশ বিভাগের সময় ঢাকায় একটি ছাত্র সংগঠন ছিল ছাত্র ফেডারেশন। কমিউনিস্ট পার্টির এই সংগঠনের কোন প্রকাশ্য তৎপরতা ছিল না। কলকতায় নিখিল বঙ্গ মুসলিম ছাত্র লীগের নেতৃবৃন্দ ১৯৪৭ সালেই ঢাকায় আসেন। তবে কলকতায় এই সংগঠনটি দু’টি উপদলে বিভক্ত ছিল। একটিতে ছিলেন সোহরাওয়ার্দীর সমর্থক শেখ মুজিবুর রহমান, অপরটিতে ছিলেন খাজা নাজিমুদ্দিনের অনুসারী শাহ আজিজুর রহমান। ঢাকায় এসে শাহ আজিজ সরকার সমর্থক হন অপরদিকে শেখ মুজিবুর অনুসারীরা ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ফজলুল হক হল মিলনায়তনে এক কর্মী সভায় পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্র লীগ নাম নিয়ে সংগঠনটি পুনর্গঠিত করেন। এর আহ্বায়ক নির্বাচিত হন নঈমুদ্দিন আহম্মদ। অন্য সদস্যরা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান, আবদুর রহমান চৌধুরী (বরিশাল), শেখ আব্দুল আজিজ (খুলনা), অলি আহাদ (কুমিলা), আজিজ আহম্মদ (নোয়াখালী), আব্দুল মতিন (পাবনা), দবিরুল ইসলাম (দিনাজপুর), মফিজুর রহমান (রংপুর), নওয়াব আলী (ঢাকা), নুরুল কবির (ঢাকা সিটি), আব্দুল আজিজ (কুষ্টিয়া), সৈয়দ নুরুল আলম (ময়মনসিংহ) ও আব্দুল কুদ্দুস চৌধুরী (চট্টগ্রাম)। ১৯৪৯ সালের সেপ্টেম্বর মাসে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের প্রথম কাউন্সিল অধিবেশনে দবিরুল ইসলামকে সভাপতি ও খালেক নেওয়াজ খানকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত করা হয়। অবশ্য দবিরুল ইসলামের পরে ১৯৫৩ সাল পর্যন্ত সহ-সভাপতি সামসুল হক চৌধুরী ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন করেন। ছাত্রলীগ শুধু ভাষা আন্দোলন নয়, পূর্ব বাংলার প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধে চরম ত্যাগের বিনিময়ে স্বাধীনতা অর্জনে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। গঠনের ৪ দিন পরে ৮ জানুয়ারি ১৯৪৮ ছাত্রলীগের একটি প্রতিনিধি দল মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিনের সঙ্গে ছাত্রদের বিভিন্ন সমস্যা, মাতৃভাষা বাংলার দাবি নিয়ে সাক্ষাত করেন। ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে ৬ মার্চ ১৯৪৮ পর্যন্ত কলকাতায় আহূত দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া যুব সম্মেলনে ছাত্রলীগ নেতা আবদুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বে পাকিস্তান থেকে একটি যুবদল যোগদান করে। এর অন্য সদস্যরা ছিলেন শামসুল হক, শহীদুল্লা কায়সার, লিলি খান, বিলকিস বানু ও লায়লা আরজুমান্দ বানু।
১৯৪৮ সালের ১১ জানুয়ারি পাকিস্তানের যোগাযোগমন্ত্রী আবদুর রব নিস্তার সিলেট সফরে গেলে আব্দুস সামাদের নেতৃত্বে একটি ছাত্র প্রতিনিধি দল তার সঙ্গে সাক্ষাত করে পূর্ব বাংলায় শিক্ষার মাধ্যম ও আদালতের ভাষা হিসেবে বাংলাকে ব্যবহারের দাবি জানায়, ১ ফেব্রুয়ারি আবুল কাসেম ও রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের কয়েকজন সদস্য কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ফজলুর রহমানের সঙ্গে সাক্ষাত করে পাবলিক সার্ভিস কমিশনের বিষয় তালিকা থেকে বাংলাকে বাদ দেয়া, নৌবাহিনীতে লোক নিয়োগ ক্ষেত্রে উর্দু ও ইংরেজী পরীক্ষা নেয়া এবং মুদ্রা ও ডাক টিকেট ইত্যাদিতে বাংলা ভাষা স্থান না পাওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। ২ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় ভিক্টোরিয়া পার্কে মওলানা আকরম খাঁর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জনসভায় শিক্ষামন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্র দফতরের ভারপ্রাপ্ত মন্ত্রী ফজলুর রহমান তাঁর বক্তৃতায় সুদূর ভবিষ্যতে ধর্মশিক্ষা বাধ্যতামূলক করার আভাস দেন। ফেব্রুয়ারি মাসেই সংগ্রাম পরিষদ বাংলা ভাষার পক্ষে কয়েক হাজার স্বাক্ষর সংগ্রহ করে। ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৪৮ অনুষ্ঠিতব্য গণপরিষদের বৈঠক যোগদানের জন্য পূর্ব বাংলার সদস্যরা করাচী যাত্রার পূর্বে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ, সংগ্রাম পরিষদ ও তমুদ্দুন মজলিসের একটি প্রতিনিধি দল ১৯৪৮ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি প্রাদেশিক মন্ত্রী নুরুল আমিন ও হাবিবুল্লাহ বাহার এবং অপর একজন সদস্য গিয়াসুদ্দিন পাঠানের সঙ্গে সাক্ষাত করেন। ২১ ফেব্রুয়ারি সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে নুরুল হক ভূইয়া, সরদার ফজলুল করিম, অলি আহাদ, আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী, রেয়াত খান ও শামসুল ইসলাম এক আবেদন প্রচার করেন। এতে বলা হয়: “বাংলাভাষা আন্দোলন আজ এক বিশেষ পর্যায়ে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। একদিনে যেমন উপর হইতে অন্যায় ও অগণতান্ত্রিক উপায়ে আমাদের ওপর অন্যভাষা চাপাইয়া দেওয়ার চেষ্টা হইতেছে অন্যদিকে তেমন দেশের জনগণকে বাংলা বিরোধী করিয়া তুলিবার জন্য নানা রূপ অপচেষ্টা হইতেছে। এতে অনিয়মতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বন করিতেও আমরা দ্বিধা বোধ করিব না।”
১৯৪৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের অধিবেশন শুরু হয়। সে সময় গণপরিষদে উর্দু অথবা ইংরেজী বক্তৃতা করার বিধান ছিল। এই আইনের বিরোধিতা করে কংগ্রেস দলীয় সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ দত্ত একটি সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপন করে “বাংলা ভাষাকে গণপরিষদের সরকারী ভাষা” করার দাবি জানান। তিনি আরো বলেন, “প্রাদেশিকতারূ মনোভাব নিয়ে তিনি এ প্রস্তাব করেননি। পাকিস্তানের ৬ কোটি ৯০ লক্ষ অধিবাসীর মধ্যে ৪ কোটি ৪০ লক্ষ বাংলাভাষী। সংখ্যাগরিষ্ঠের কথিত ভাষাই রাষ্ট্রের ভাষা হওয়া উচিত। তাই বাংলাই পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত। এই প্রস্তাবের সমর্থনে এগিয়ে আসেন কংগ্রেস দলের অস্থায়ী নেতা শ্রীশচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, সেক্রেটারি রাজকুমার চক্রবর্তী। কিন্তু এই সংশোধনীর বিরোধিতা করেন পরিষদের নেতা প্রধানমন্ত্রী লিয়াকত আলী খান, পূর্ব বাংলার মুখ্যমন্ত্রী খাজা নাজিমুদ্দিন, কেন্দ্রীয় মন্ত্রী গজনফর আলী খান, সিন্ধুর এম, এইচ সরদার প্রমুখ। লিয়াকত আলী খান বলেন, “পাকিস্তান মুসলিম রাষ্ট্র। তাই পাকিস্তানের ভাষা মুসলিম রাষ্ট্রের ভাষাই হওয়া উচিত ...। পাকিস্তানের মানুষের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করা একটি সাধারণ ভাষার (বাংলা) দ্বারা ঐক্যসূত্র স্থাপনের প্রচেষ্টা থেকে মুসলমানদের বিচ্ছিন্ন করাই এ প্রস্তাবের উদ্দেশ্য।” খাজা নাজিমুদ্দিন বলেন, “উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হতে পারে বলে পূর্ব বঙ্গের অধিকাংশ লোকের অভিমত।” গজনফর আলী খান বলেন, “পাকিস্তানে একটি মাত্র সাধারণ ভাষা থাকবে এবং সে ভাষা হচ্ছে উর্দু। অচিরেই সমস্ত পাকিস্তানবাসী উর্দু ভালভাবে শিক্ষা করে উর্দুতে কথাবার্তা বলতে সক্ষম হবে। উর্দু কোন প্রদেশের ভাষা নয়, তা হচ্ছে মুসলিম সংস্কৃতির ভাষা।” এম, এইচ, সরদার বলেন, প্রস্তাবটি বাইরে থেকে নির্দোষ মনে হলেও পাকিস্তানের পক্ষে বিপজ্জনক। তিনদিন প্রস্তাবটির ওপর আলোচনা শেষে ২৫ ফেব্রুয়ারি গণপরিষদের সহ-সভাপতি তমিজুদ্দিন খান বাংলাকে গণপরিষদের ভাগ হিসেবে উত্থাপিত প্রস্তাব অগ্রাহ্য করেন।
গণপরিষদে বাংলা ভাষাকে অগ্রাহ্য করার খবরে ঢাকায় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। পরদিন ২৬ ফেব্রুয়ারি ঢাকায় সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র ধর্মঘট পালিত হয়। অপরাহ্নে বিশ্ববিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তমুদ্দুন মজলিশের সম্পাদক আবুল কাসেমের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত ছাত্র জনসভায় ছাত্রলীগের আহ্বায়ক নঈমুদ্দিন আহম্মদ ও ফজলুল হক হলের সহ-সভাপতি মোহাম্মদ তোয়াহা বক্তব্য রাখেন। গণপরিষদে মুসলিম লীগ দলীয় সদস্যদের উক্তিসমূহের তীব্র নিন্দা করা হয়। এছাড়া ঢাকা বেতারে মিথ্যা ও পক্ষপাতমূলক সংবাদ প্রচারের প্রতিবাদ জানানো হয়।
(ক্রমশ.)

No comments

Powered by Blogger.