ইতিউতি-দুর্নীতির ধারা ঝরে অবিরল by আতাউস সামাদ

ইংরেজিভাষীদের মধ্যে যখন কেউ 'I said so' বলেন, তখন যাঁকে লক্ষ্য করে বলা হলো তিনি সাধারণত রেগে যান। ব্যাপারটা প্রথমদিকে খানিকটা ভাবাত। কথাটা তো তেমন কিছু নয়। একজন কেবল বলছেন, 'আমি তো বলেছিলাম।' একটু সংক্ষেপে 'বলেছিলাম তো' অথবা 'কইছিলাম না'


কথাটা তো আমরা প্রায়ই উচ্চারণ করি বা প্রতিদিনই কাউকে না কাউকে বলতে শুনি। এর কারণ হলো, কেউ যখন কোনো কাজ করেন, আর তাতে যদি ভুল করার বা বিপদ ডেকে আনার সম্ভাবনা থাকে, তখন হয়তো বা তাঁর শুভানুধ্যায়ী কেউ অথবা হতে পারে তাঁর কোনো সমালোচক তাঁকে কাজটি করতে মানা করেন অথবা বিরত করার উদ্দেশ্যে সতর্ক করে দেন। কিন্তু প্রথম ব্যক্তি কোনো নিষেধ না শুনে কাজটি করে ফেলার পর তাতে ক্ষতি হলে বা বিপদ দেখা দিলে যাঁরা হুঁশিয়ারি দিয়েছিলেন তাঁরা কেউ কেউ মন্তব্য করে ফেলেন, 'বলেছিলাম তো' অথবা 'কইছিলাম না'। এর মধ্যে অস্বাভাবিকতা বা দোষের কিছু নেই। তবে ইংরেজিভাষীদের সমাজে প্রায়ই দেখা যায়, যাঁকে লক্ষ্য করে 'I said so' অথবা 'we told you' বলা হলো তিনি এতে বেশ ক্ষিপ্ত হয়ে যান। কারণ তিনি মনে করেন, কথাটার মধ্যে ব্যঙ্গ বা শ্লেষ বা রাগ প্রকাশ করা হচ্ছে। এসবকে তিনি কাটা ঘায়ে নুনের ছিটা পড়ার মতো বিবেচনা করেন। মজার ব্যাপার হলো, অথবা দুঃখের বিষয়ও বলতে পারেন, ওই ব্যক্তির কর্মফলের দরুন অন্যরাও যে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন এবং সে জন্যই তাঁরা ক্ষোভ অথবা দুঃখ প্রকাশ করছেন, সে কথাটা তিনি ভেবে দেখতে চান না। আমাদের সমাজে একবার দুইবার 'কইছিলাম তো' বললে অতটা বিরূপ প্রতিক্রিয়া হয় না, তবে বারবার বললে অন্যপক্ষ রেগে যান বৈকি!
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার সোয়া দুই বছর আগে ক্ষমতা গ্রহণ করার মুহূর্তেই অনেকে বলতে শুরু করেছিলেন যে এবার প্রকৃতপক্ষেই পরিবর্তন এল দেশে। যাদের কাছ থেকে সরকারের দায়িত্ব বুঝে নিলেন শেখ হাসিনা ও তাঁর দল, সেই তথাকথিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অগণতান্ত্রিক, নিপীড়ক ও স্বেচ্ছাচারী শাসন শেষ হলো। বিদায় নিল ছদ্মবেশী সেনা-শাসন। গণতন্ত্র এল, আর ন্যায়বিচার তো আসবেই। দেশের যা কিছু আছে তার ব্যবহার করে যে সুফল পাওয়া যাবে তা সবার মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হবে। রাতের ঘুম নিশ্চিন্ত এবং নিশ্চিত হবে। একই সঙ্গে আরো জোর দিয়ে তাঁরা বললেন, বিগত চারদলীয় জোট সরকার তথা বিএনপি-জামায়াতে ইসলামী শাসনামলের পর্বত-প্রমাণ দুর্নীতি, দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার, দস্যুতা এবং জঙ্গিবাদ তোষণ চিরতরে বিদায় হবে। ধরতে গেলে এর কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আশাবাদীরা কেউ কেউ বললেন, 'ওসব দুরাচার-দুষ্কর্ম তো এখন অতীতের ব্যাপার। বর্তমানের বিষয় হলো ওই দুর্নীতিবাজ, জুলুমবাজ ও জঙ্গিদের শাস্তি দেওয়া।' তবে যাঁরা একটু রয়ে-সয়ে চলতে চান, যাঁরা উপলব্ধি করেন যে বলা যত সহজ করা তত সোজা নয়, তাঁরা নিচু গলায় এবং সন্তর্পণে অতি-উৎসাহীদের পরামর্শ দিতেন আর কটা দিন সবুর করতে। তাঁরা যে খারাপ কিছু ঘটবেই এ আশঙ্কায় বা কারো অমঙ্গল কামনা করে অন্যদের অনাগত দিনের চেহারা দেখার জন্য ধৈর্য ধরতে উপদেশ দিতেন, তা নয়। সেই সময় ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ঢাকা থেকে শুরু করে দূর গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত নানা রকম নিন্দনীয়, অনৈতিক ও বেআইনি কাজে রত হয়েছিলেন, এ দেখেই তাঁরা ভবিষ্যতে আসলে কী যে হয় তা দেখতে অনুরোধ করেছিলেন। ভালোর দিকে দিনবদল হয়ে গেছে_এমন দাবি করা একটা ফাঁপা আগাম ঘোষণা হয়ে যেতে পারে, সেই আশঙ্কায় শঙ্কিত হয়েই তা করেছিলেন। এর ফলে তাঁদের কারো কারো তিক্ত অভিজ্ঞতা হয়েছে_তাঁদের মধ্যে কারো কারাবাস হয়েছে, বেশ কয়েকজন প্রহৃত হয়েছেন, কর্মস্থল থেকে বিতাড়িত হয়েছেন কেউ, আর সমালোচনা বা গালমন্দ তো শুনেছেন অনেকেই।
এভাবে বর্তমান সরকারের প্রথম বছর পূর্ণ হলে যখন দেখা গেল আওয়ামী লীগের সদস্য বা দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত বেশ কিছু লোক চাঁদাবাজি, দখলবাজি, টেন্ডারবাজি ইত্যাদি কর্ম সম্পাদন করছেন সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাপ প্রয়োগ করে; প্রয়োজনে আগ্নেয়াস্ত্র, চাপাতি, রাম দা, রড, হাতুড়ি ও লাঠিসোটা নিয়ে প্রকাশ্যে হামলা করছেন প্রতিদ্বন্দ্বী, প্রতিপক্ষ বা বিরোধী মতাবলম্বীদের ওপর এবং এসবই বৈষয়িক লাভের জন্য অর্থাৎ এক কথায় তাঁরা দুর্নীতিতে লিপ্ত হয়েছেন_তখন সরকারের উচ্চ মহল থেকে নিম্নপর্যায় পর্যন্ত এ কথা জোর দিয়ে বলা হতে থাকল, 'ক্ষমতাসীন দলের কিছু সমর্থক বা বিএনপি-জামায়াত থেকে অনুপ্রবেশকারীরা কিছু দুষ্কর্ম করলেও এই এক বছরে মন্ত্রিসভার কোনো সদস্য সম্পর্কে কেউ ঘুষ খাওয়া বা দুর্নীতির অভিযোগ তুলতে পারেনি। এ জায়গাটা ঠিক আছে।' তখনো সেই নিরাশবাদী বা ভবিষ্যৎ নিয়ে শঙ্কিতরা মৃদু গলায় বলেছিলেন, 'লক্ষণগুলো তো ভালো মনে হচ্ছে না, আর কয়টা দিন দেখা দরকার।' দুঃখের বিষয় হলো, এই ভীতুদের ভয়টাই ঠিক হয়ে গেল।
বাংলাদেশে দ্বিতীয় দফা শেয়ার কেলেঙ্কারি হলো। দ্বিতীয়টা অর্থাৎ এবারেরটা শুধু কেলেঙ্কারি নয়, এটা মহা কেলেঙ্কারি। এই কেলেঙ্কারি নিয়ে ইব্রাহীম খালেদ তদন্ত কমিটির রিপোর্ট অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এটা সম্পাদনা করে প্রকাশ করা হবে_প্রথমে এমন আশ্বাস দেওয়ার পর এখন তিনি বলছেন যে দেরি হবে, সময় লাগবে, বেশ কিছু বিবেচনা করতে হবে। বিরোধী দল বিএনপি বলেছে, রিপোর্টটি তাদের জানামতে অসম্পূর্ণ, এতে অর্থ মন্ত্রণালয় ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যর্থতা, অদক্ষতা ও অকর্মণ্যতাকে আড়াল করা হয়েছে। তারা বলছে, ওই রিপোর্টে এমন দু-চারজন ব্যবসায়ীর নাম আছে, যাঁরা রাজনৈতিক পরিচয়ে বিরোধীদলীয়। তারা দাবি করেছে যে এটা সরকারি দলের হোমরা-চোমরাদের বাঁচানোর জন্য করা হয়েছে। তবে তারা এ-ও বলেছে যে বিরোধীদলীয় কেউ শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারিতে জড়িত থাকলে তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অন্যদিকে অর্থমন্ত্রী নিজেই তদন্ত কমিটির রিপোর্ট হাতে পাওয়ার পর সাংবাদিকদের বলেছিলেন, এতে প্রভাবশালী অনেকের নাম আছে। তাই তাঁদের নাম প্রকাশ করার আগে ভেবে দেখতে হবে। অর্থমন্ত্রীর মন্তব্যের ফলে সবাই বিশ্বাস করছেন যে বর্তমান ক্ষমতাসীন দলের বেশ কিছু ব্যক্তি এবারের শেয়ারবাজার লুটপাটের বড় বখরাদার। ইতিমধ্যে বিভিন্ন পত্রপত্রিকা প্রকাশ্যে পাওয়া যায় এমন সব তথ্য ও প্রমাণ দিয়ে খবর দিয়েছে যে একজন মন্ত্রীর পারিবারিক দুটি কম্পানিকে শেয়ার অতি মূল্যায়িত করার বিশেষ সুযোগ দেওয়া হয়েছিল এবং এর জন্য সরকারের অনুমোদন ছিল। জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত স্থায়ী কমিটির চেয়ারম্যানের একটি কম্পানিকেও শেয়ার অতি মূল্যায়িত করতে দেওয়া হয় এবং প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি বিনিয়োগবিষয়ক উপদেষ্টার কয়েকটি কম্পানির শেয়ারের দাম অযৌক্তিকভাবে বাড়াতে দেওয়া হয়। জনাব ইব্রাহীম খালেদ সম্ভবত এদের সম্পর্কেই বলেছেন, 'কেউ কেউ এমন সব কাজ করেছেন, যা আইন রক্ষা করে করাহয়েছে কিন্তু আসলে অনৈতিক।' কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নানা সিদ্ধান্ত ও কাজ যে শেয়ার কেলেঙ্কারি ঘটাতে সরাসরি সাহায্য করেছে, সে সম্পর্কে তিনি বলেছেন, 'শেয়ারবাজার ঠিক রাখার দায়িত্ব ছিল এসইসির কিন্তু সেই কর্তব্য পালন করতে তারা ব্যর্থ হয়েছে আর সেই বিষয়টি থেকে যাতে দৃষ্টি অন্যত্র চলে না যায়, সে জন্য তিনি তাঁর রিপোর্টে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের বিষয়টি আনেননি।' এদিকে দৈনিক যুগান্তর পত্রিকায় কিছু নামধামসহ জানানো হয়েছে, ওই তদন্ত কমিটির রিপোর্টে শেয়ার কেলেঙ্কারিতে কয়েকজন শীর্ষ ব্যবসায়ীর নাম উল্লেখ থাকলেও তাঁদের বিরুদ্ধে অধিকতর তদন্ত করা বা কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়নি। এসবের ফলে এখন কথা উঠেছে, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ দ্বিতীয় দফায় ক্ষমতায় আসার তিন মাসের ভেতরেই বাংলাদেশে প্রথম যে শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি হয় সেটা যেমন বলতে গেলে বিনা বিচারে হজম হয়ে গেছে, এবারের মহাকেলেঙ্কারিটাও সেভাবেই ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টি দিয়ে দেখা হবে।
এ তো গেল বড় বড় লোকদের কথা। তাঁরা আরামে থাকার জন্য বড়লোক হয়েছেন, তাই তাঁরা আরামেই থাকবেন। আমরা বাংলাদেশে উচ্চ মহল থেকে 'জিরো টলারেন্স' কথাটা প্রথম শুনেছিলাম অসাংবিধানিক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দীন আহমেদের মুখে। তিনি তাঁর প্রথম ভাষণে বলেছিলেন, তাঁর সরকার দুর্নীতির প্রতি 'জিরো টলারেন্স' দেখাবে অর্থাৎ দুর্নীতি মোটেই সহ্য করবে না। তার পরই দেখা গেল, বিএনপির নেতাদের লাইন ধরে এবং আওয়ামী লীগেরও বেশ কয়েকজন নেতাকে, আর শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা ও খালেদা জিয়াকেও দুর্নীতির অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হলো। তাঁদের কয়েকজনকে বিশেষ জজ আদালতে ৩০-৩২ বছর করে জেলও দেওয়া হলো। ইদানীং দেখা যাচ্ছে যে এসব সাজা আপিল হয়ে হাই কোর্ট কর্তৃক খারিজ হয়ে যাচ্ছে। এতে কি সংশ্লিষ্ট বিশেষ জজ আদালতগুলো সম্পর্কে মানুষের মনে নেতিবাচক ধারণা জন্মায়নি? সবিনয়ে বলি, আমরা সেই ২০০৭ ও ২০০৮ সালেই বারবার বলেছিলাম যে সেনা-চালিত সেই সরকার যেভাবে দুর্নীতি দমন কমিশনকে ব্যবহার করছে, তাতে ওই প্রতিষ্ঠানটির দুর্নীতি দমনের কাজে কোনোই ভূমিকা থাকবে না। ওটা হয়ে যাবে অত্যাচারের যন্ত্র।
তবে দুর্নীতির ব্যাপারে সর্বশেষ যে মন্তব্যে সত্যিই নিরাশ হয়ে পড়েছি, তা এসেছে পরিকল্পনামন্ত্রী এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খোন্দকারের কাছ থেকে। তিনি গত মঙ্গলবার অর্থনীতিবিষয়ক সাংবাদিক ও ভাষ্যকারদের সংগঠন ইআরএফের আলোচনা সভায় বলেছেন, 'বিভিন্ন উন্নয়নমুখী প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সব প্রকল্পই ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। তবে দুর্নীতির কারণে সত্যিকার উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না।' (সূত্র : আমার দেশ)। সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে দেশজুড়ে যেসব উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয় সেগুলোর ভাগ্যে কী ঘটছে বা সেসব কতখানি কাজে আসছে সে কথা খোঁজখবর নিয়ে বলতে পারেন পরিকল্পনামন্ত্রীই। তিনিই জানালেন দুর্নীতির জন্য প্রকৃত উন্নয়ন সম্ভব হচ্ছে না। অর্থাৎ দুর্নীতি হচ্ছে ব্যাপকভাবে।
শুরুতেই লিখেছি, 'I said so' বললে অনেক ইংরেজিভাষী খেপে যান। বাংলাদেশে আমরা ভাগ্যবান এই অর্থে যে অনেক বাধা ও ভয়ভীতি সত্ত্বেও আমরা বহুবার ক্ষমতাসীনদের দুর্নীতির কথা তুলেছি। এগুলো সত্য প্রমাণিত হচ্ছে। আর সে জন্যই ভয় হয়, এখন দুর্নীতির কথা বললে তাদের মেজাজ না জানি কেমন হয়।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট

No comments

Powered by Blogger.