জনসংখ্যা-‘দিনে দিনে যত বাড়িয়াছে দেনা...’ by অলোক বসু

পত্রিকার পাতায় কিংবা টেলিভিশনের পর্দায় জাতীয় সমস্যার নানা চিত্র আমরা প্রায় প্রতিদিন দেখতে পাই। এসব সমস্যার সমাধান নিয়ে বড় বড় চিন্তাবিদ, পরিকল্পনাবিদ, বুদ্ধিজীবী এবং সরকারের ওপর মহলের লোকজনের নানা ভাবনা-চিন্তার কথাও জানতে পারি।


যানজট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ-সংকট, গ্যাস-জ্বালানির সংকট, পানীয় জলের সংকট, পরিবেশদূষণ, জনসংখ্যার বিস্ফোরণ—কোন সংকট নেই এখানে? এসব সংকটের কোনো কোনোটা নিয়ে প্রতিদিনই সেমিনার-সিম্পোজিয়াম, মতবিনিময়, গোলটেবিল বৈঠক হচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকেও দেওয়া হচ্ছে নানা সময়ে নানা রকম সমাধানের আশ্বাস। কোনো কোনো ক্ষেত্রে কাজও শুরু হয়ে গেছে বলে জানা যায়। তবে ঢাকা কিংবা গোটা বাংলাদেশের সমস্যা সমাধানে যেসব পরিকল্পনার কথা শুনতে বা জানতে পারি, সেগুলো জুুতসই মনে হয় না। আশান্বিত হওয়ার মতো কিছু দেখতে পাই না।
আমাদের বড় সমস্যা কী? যানজট, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, বিদ্যুৎ-সংকট, পরিবেশদূষণ নাকি জনসংখ্যা? কোনটাকে প্রাধান্য দিয়ে আমরা সংকট নিরসনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করব? আসল সংকট কোথায়?
অনেকেই যানজট সমস্যাকে এক নম্বর সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে এর ত্বরিত সমাধানে সরকারকে এগিয়ে আসার কথা বলছেন। এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে হবে নাকি মাটির নিচ দিয়ে সাবওয়ে হবে—এ নিয়েও বিতর্কের শেষ নেই। অনেকে আবার যে রাস্তাগুলো আছে, তা আরও বড় করার কথা বলছেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, একটি শহরের জন্য ন্যূনতম ২০ শতাংশ পরিমাণ জায়গা থাকতে হয় রাস্তার জন্য। ঢাকায় নাকি আছে মাত্র ৮ শতাংশ। অতএব ঢাকার যানজট সমস্যার সমধানে আরও ১২ শতাংশ জমি দরকার। ধরা যাক, সরকার জাদুবলে রাতারাতি বাড়িঘর ভেঙে আরও ১২ শতাংশ জমি বের করে রাস্তা প্রশস্ত করে দিল। তাহলেই কি আমরা যানজটমুক্ত ঢাকায় সুখে-শান্তিতে বসবাস শুরু করতে পারব? সেই সুখ কত দিন আমাদের কপালে সইবে?
ঢাকার জনসংখ্যা এখন দেড় কোটির মতো। ১০ বছর পর ঢাকার জনসংখ্যা কত হবে? ধরা যাক, দুই কোটি। তখনো কি আবার যানজট হবে না? আরও ৫ শতাংশ রাস্তা বাড়ানোর প্রয়োজন পড়বে না? আরও ১০ বছর পরের কথা ভাবুন। আবারও যানজট হবে, আবারও রাস্তা বাড়াতে হবে। রাস্তা বাড়াতে বাড়াতে বাড়িঘর, ফসলি জমি কমতে থাকবে, একসময় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। বাংলাদেশ বলতে থাকবে, তখন এক লাখ ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের এক বিশাল রাস্তা। পুরো জাতি রাস্তায় বসে যাওয়ার আগেই রাষ্ট্রের, সরকার-প্রশাসনের শীর্ষ ব্যক্তি তথা দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে যাঁরা ভাবেন, তাঁদের অনুরোধ করব, জুতসই কিছু পরিকল্পনা গ্রহণ করুন, যাতে এই জাতি, এই দেশ সুখে-সমৃদ্ধিতে বাঁচতে পারে।
বর্তমান ১৬ কোটি মানুষের সংকট নিরসনে সরকার হয়তো কিছু উদ্যোগ নেবে কিন্তু পাঁচ বছর পরে দেশ তো আবারও একই সংকটে পড়বে। যেসব সমস্যা ৫-১০ বছর পরে আবারও প্রকট আকার ধারণ করবে, তা নিয়ে এখনই ভাবিত হওয়া দরকার। এবং নজর দেওয়া দরকার জনসংখ্যা বিস্ফোরণের মূলে।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি রোধ করা না গেলে সমস্যাগুলো দিন দিন আরও প্রকট আকার ধারণ করবে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির কারণে বাড়তি বাড়িঘরের দরকার পড়ছে, ফলে চাপ বাড়ছে আবাদি জমির ওপর। কমে যাচ্ছে ফসলি জমি, কমে যাচ্ছে উৎপাদনের পরিমাণ। উৎপাদন কমে যাওয়ার সঙ্গে তাল মিলিয়ে জনসংখ্যা বাড়লে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি বাড়তেই থাকবে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে সব ধরনের সংকটই বাড়তে থাকবে। কবির কথায়, ‘দিনে দিনে যত বাড়িয়াছে দেনা, শুধিতে হইবে ঋণ।’
আজ থেকে ৪০ বছর আগে এ দেশের জনসংখ্যা ছিল সাড়ে সাত কোটি। আজ সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৬ কোটিতে। জনসংখ্যা বৃদ্ধির বর্তমান হার অব্যাহত থাকলে আগামী ৪০ বছর পর এ দেশের জনসংখ্যা কত হবে? কম করে হলেও আনুমানিক ৫০ কোটি। তখনকার বাংলাদেশ কেমন হবে? অনেকেই জনসংখ্যাকে সম্পদে রূপান্তরের কথা বলবেন। তাঁরা কি একবার ভেবে দেখবেন, এত সম্পদই বা তখন কোথায় রাখবেন, এই এক লাখ ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলে? সেটা তখন তো একটা বিশাল রাস্তা হয়ে উঠবে। আমার নিজস্ব একটা প্রস্তাব আমি এই সুযোগে পেশ করতে চাই।
আমার প্রস্তাব হলো—যত দ্রুত সম্ভব জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার শূন্য শতাংশে নামিয়ে আনতে হবে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করতে হবে। দুটি সন্তানের বেশি নয়, একটি হলে ভালো হয়—সরকারের ঢিলেঢালা এই প্রচারণায় এ পর্যন্ত খুব ভালো ফল পাওয়া যায়নি। এটি বাস্তবায়নের জন্য কঠোর আইন করতে হবে, যাতে কেউ একটির বেশি সন্তান গ্রহণ না করে। একটি সন্তান গ্রহণ করলে সেই সন্তানের চিকিৎসা, পড়াশোনার ক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে সহযোগিতা থাকতে হবে। আর দুই বা অধিক সন্তান হলে মা-বাবা নিজ দায়িত্বে, নিজ খরচে প্রতিপালন করবেন। প্রয়োজনে চীনের মতো একাধিক সন্তান ধারণের দায়ে শাস্তির বিধান করতে হবে। হয়তো মানবাধিকারকর্মীরা এটা মানতে চাইবেন না, মৌলবাদীরা তেড়ে আসবেন। তার পরও বলছি, বিকল্প কী? যেকোনো মূল্যে আমাদের জনবিস্ফোরণ রোধ করতে হবে।
অলোক বসু: নাট্যকার, সংস্কৃতিকর্মী।
alokbasu71@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.