গৃহশ্রমিকদের বিড়ম্বনা

আইন সবার জন্য সমান_এটি একটি বহুল প্রচলিত বাক্য। রাষ্ট্রের কিংবা প্রশাসনের নীতিনির্ধারক-পরিচালকরা এমনটি অহরহই উচ্চারণ করে থাকেন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও বাস্তবতা এর থেকে ভিন্ন। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তির প্রত্যাশা সবারই।


যখন এর ব্যত্যয় ঘটে তখনই সমাজে দেখা দেয় নানা রকম অসন্তোষ ও অসংগতি, যার ফল হয় তিক্ত। গত ১০ এপ্রিল সহযোগী একটি দৈনিকে প্রকাশ, প্রায় ২০ লাখ গৃহশ্রমিক শ্রম আইনের সুবিধাবঞ্চিত রয়েছে। কারণ 'শ্রম আইন-২০০৬'-এ গৃহশ্রমিকদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। সম্প্রতি গৃহশ্রমিকদের জন্য 'গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা-২০১০' মন্ত্রিসভায় পাস হলেও গৃহশ্রমিকরা এর কোনো সুফল পাচ্ছে না। নানা বয়সের বিপুলসংখ্যক গৃহশ্রমিকের মধ্যে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা প্রায় ১০ লাখ।
শিশুশ্রম এমনিতেই নিষিদ্ধ। শিশু গৃহশ্রমিকরা নানা রকম বঞ্চনা-লাঞ্ছনার শিকার। গৃহকর্তা বা গৃহকর্ত্রীর হাতে শিশুশ্রমিক নির্যাতনের চিত্রটি কম উদ্বেগজনক নয়। তা ছাড়া এসব শিশু সারাক্ষণ কাজের মধ্যে থেকে প্রাথমিক শিক্ষা থেকে বঞ্চিত এবং বৈষম্য ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হয়ে মানসিক ভারসাম্যহীনতার এক অনিশ্চিত জীবন নিয়ে বেড়ে উঠছে। এর বিরূপ প্রভাব পড়ছে মানবসম্পদের ওপর। গৃহশ্রমিকদের নিয়োগসংক্রান্ত কোনো বিধিও নেই এবং এরও নেতিবাচক প্রভাবে তারা আক্রান্ত। তাদের অভিযোগ দায়েরের ক্ষেত্রও খুব সংকুচিত। নিয়োগপত্র না থাকায় তারা শিকার হচ্ছে প্রতারণার এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ন্যায্য প্রাপ্তি থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। তাদের নেই কোনো সাপ্তাহিক ছুটি কিংবা বিশ্রামের অবকাশ।
অভিযোগ আছে, গৃহশ্রমিকদের দায়ের করা মামলার কোনো ভবিষ্যৎ খুঁজে পাওয়া যায় না। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এসব মামলা হারিয়ে যায়_এমন নজিরও আছে। তাদের নেই ট্রেড ইউনিয়ন করার বিধান এবং এর জন্য তারা সবচেয়ে বেশি অধিকারবঞ্চিত। এত বিপুলসংখ্যক শ্রমিকের ভাগ্যবিড়ম্বনার এই চিত্র অত্যন্ত মর্মন্তুদ। কেন তারা শ্রম আইনের আওতাভুক্ত নয়_মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। 'গৃহকর্মী সুরক্ষা ও কল্যাণ নীতিমালা-২০১০' আইনে পরিণত হওয়ার আগে নীতিই আইন হিসেবে কার্যকর হবে উল্লেখ থাকলেও বাস্তবে এর কোনো কার্যকারিতা নেই। আমরা মনে করি, মানবাধিকার রক্ষাসহ মানুষের অধিকারের প্রশ্নে এ বিষয়গুলো নিশ্চিত হওয়া জরুরি। রাষ্ট্রের নাগরিকসমাজের কেউ আইনি সুবিধা বা নীতিমালার মধ্যে থেকে সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবে, আর কেউ থেকে যাবে এর বাইরে_এমনটি কোনোভাবেই কাম্য নয়। আশা করি, সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এদিকে বিশেষ দৃষ্টি দেবে।

No comments

Powered by Blogger.