গোধূলির ছায়াপথে-লক্ষেৗর সার্ক সাহিত্য সম্মেলনে by মুস্তাফা জামান আব্বাসী

সেদিনই ফিরছি ‘সার্ক সাহিত্য উৎসব’ সমাপন শেষে। কলকাতার নিউ কেনিলওয়ার্থ হোটেলে ঢুকতেই বাংলাদেশের সমর্থনে উচ্চকিত সমর্থন। সেটা ছিল শ্রীলঙ্কার বিরুদ্ধে বাংলার ব্যাঘ্রদের ক্রিকেট অভিযান। পশ্চিম বাংলায় সুন্দরবনের অংশ, ব্যাঘ্রদের হুংকার সেখানেও। এ হোটেলেও বাঙালিরা সোচ্চার।


লক্ষেৗ যাইনি কোনো দিন। জানি, কোনো দিন খুঁজে পাব না বন্ধু তালাত মাহমুদকে। পাব না এই শহরে গান শিখতে এসেছিলেন যাঁরা, পাহাড়ি সান্যাল, মোহাম্মদ হোসেন খসরু—শতাব্দীর সেরা লক্ষেৗর মরিস কলেজে। বর্তমান নাম ভাতখণ্ডে সংগীত বিশ্ববিদ্যালয়। ভাইস চ্যান্সেলর মহিলা। প্রফেসর শান্তি সাদালিকার কাটকার জানালেন, আপনাকে আসতে হবে এখানে বাংলার লোকসংগীত শেখাতে, ছেলেমেয়েরা উদ্গ্রীব।
তিন দিনব্যাপী এই উৎসবে কবি-সাহিত্যিকেরা এসেছেন সাতটি দেশ থেকে। কত সহজ ও পরিষ্কার উচ্চারিত হলো মূল কথা: আসুন, এই অঞ্চলকে করে তুলি আরও মধুময় বিভেদ ভুলে; পরিবেশকে করি উন্নততর। কবিরা কবিতায় জানালেন, আমরা ভালোবাসার পতাকা উড়িয়ে দেব, যারা বিভেদ চায়, তাদের মুখে ছুড়ে দিই কাদা।
সন্ধ্যাবেলায় নতুন লক্ষেৗ, নতুন নতুন প্রাসাদ ও বাগান যেখানে। বিগত পাঁচ বছরে দৃষ্টিনন্দন পথরাজি, মোড়ে মোড়ে পাথরের মূর্তি, ফুলে ফুলে ছাওয়া চারদিক, শিল্প-সৌন্দর্য গড়ে তুলেছেন যে মায়াবতী; রূপবতী লক্ষেৗ গড়তে গিয়ে জনতার রোষে তিনি এবার পরাজিত, ভীষণভাবে। সম্রাট শাহজাহান তাজমহল গড়েছিলেন, যা ডেকে এনেছিল মোগল সাম্রাজ্যের পতন। ভূ-ভারতের সাধারণ মানুষ কিছু পাননি তাজমহল থেকে, ছিলেন তাঁরা দারিদ্র্যের ডাল-রুটিতে। কবিকুলের কান্না তবু এর জন্যই। রবিঠাকুর গেয়ে ওঠেন: ‘কালের কপোলতলে শুভ্র সমুজ্জ্বল, তাজমহল’। এক শ বছর পরে ‘সতরঞ্জ কি খিলাড়ি’ ওয়াজেদ আলী শাহের ফেলে যাওয়া ইমামবারা যেমন দেখতে যাই আমরা, নবাবেরা মানুষের জন্য করেছেন সামান্যই। বিলাস-বসন, দাদরা-ঠুমরি, কত্থক ও কবিতায় সময় কেটে গেছে তাঁদের। আজ সেখানে মায়াবতীর মায়াকানন শত হস্তীর বিচরণ যেখানে পাথরের কারুকার্যে। সাধারণ মানুষের কাজে আসেনি এ মর্মরপ্রস্তর—মুসলমান নবাবদের আমলে যেমনি হতদরিদ্র, ইংরেজ রাজত্বেও। আজও সেই পুরোনো অলিগলি, বিস্মৃত পঙ্কিল দারিদ্র্যের নিষ্পেষণ, মাঝেমধ্যে আতরের খুশবু, ভেসে আসা আজানের সুললিত ধ্বনি।
কবিদের সঙ্গে কথা বললে মন ভালো হয়ে যায়। কত কিছু শেখার। একজন কবি, বয়স ৮৩। উড়িয়া ভাষার শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিক, নাম, মহাপাত্র। বিনয় দেখে অবাক হই। নিজ কাব্যের প্রতি প্রগাঢ় আস্থা, অথচ বিনয়ে যেন গলে যাচ্ছেন। বললেন, কিছুই লিখতে পারিনি, কিছুই শিখতে পারিনি, কোথাও গিয়ে কবিতা পড়লে এখনো বুক কাঁপে। আরেক কবি, নাম মনমোহন, বয়স ৭০। এককালে পাইলট, এখন কবিতার পাইলট। কালিদাসের মতো আকাশে আকাশে ঘুরে মেঘেদের সঙ্গে মিতালি। যেমন তাঁর বাক্যালাপ, তেমনি পঙিক্তমালা। কিছুদিন থাকলে সিমলার পাহাড় চেনা যাবে, চেনা যাবে পাখপাখালি, পরিচয় নিবিড় হবে কাব্যরসের সঙ্গে। মুহাম্মদ নূরুল হুদা—যেমন অবয়বে, তেমনি শব্দচয়নে। প্রতিটি তরুণ কবির সঙ্গে তাঁর সখ্য—হোক নেপালের, শ্রীলঙ্কার বা পাকিস্তানের। আনন্দ দিয়েছেন নেপালের তরুণেরা। তাঁরা সমুদ্র দেখতে চান, বাংলাদেশে আসতে চান, বাংলাদেশকে প্রাণ দিয়ে ভালোবাসেন তাঁরা। মিয়ানমারের একমাত্র প্রতিনিধি টিনটিন বলল, ভীষণ ইচ্ছা টেকনাফ পেরিয়ে তোমাদের দেশে ঢুকে পড়ি। জানি, বাংলাদেশ পৃথিবীর সবচেয়ে সবুজ দেশ, এখানকার মানুষের মন সবচেয়ে নরম।
নামকরা ব্যক্তিদের মধ্যে এসেছেন ড. আবিদ হোসেন, যাঁর বক্তৃতা মনে রাখার মতো। বললেন, আমরা অনেক কিছু আবিষ্কার করেছি, কিন্তু ছোট ছোট আবিষ্কারের আনন্দ থেকে নিজেদের করেছি বঞ্চিত। এক হলো, নিজের ভাইকে আবিষ্কার, নিজের প্রতিবেশীকে আবিষ্কার, তাদের জীবনে খানিকটা আনন্দ ছড়িয়ে দেওয়া। যাদের সঙ্গে দেখা হবে বলে ফেস্টিভ্যালের টিকিট কিনেছিলাম, যেমন খুশবন্ত সিং, মহাশ্বেতা দেবী, গুলজার—ওঁরা কেউ আসেননি। যাঁরা এসেছেন, তাঁরাও কম নন। যেমন—ড. নিহাল রোদ্রিগো, প্রফেসর ওভি সুবেদি, প্রসেফর টিসা করিয়া ওয়াসাম প্রমুখ। আফগানিস্তান ৯, বাংলাদেশ ১৬, ভারত ৮০, মালদ্বীপ ৪, নেপাল ১১, পাকিস্তান ৩৫, শ্রীলঙ্কা ১০, মিয়ানমার ১। যার যার টিকিট তার তার, খাওয়া-থাকা অর্গানাইজারদের আওতায়।
বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্ব চোখে পড়ার মতো: আনোয়ারা সৈয়দ হক, আসমা আব্বাসী, ড. ফখরুল আলম, ঝর্ণা রহমান, কামরুল হাসান, খন্দকার আশরাফ হোসেন, মার্জিয়া আখতার লিপি, মুহাম্মদ নূরুল হুদা, পাপড়ি রহমান, পাভেল পার্থ, পারভীন সুলতানা, ড. রুবানা হক, শফি আহমেদ, রায়হান রায়েন, ওবায়েদ আকাশ, ড. সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম ও সৈয়দ শামসুল হক। সবচেয়ে সুন্দর বক্তৃতা পারফেক্ট ইংরেজিতে সৈয়দ শামসুল হকের। ১৭ মার্চ বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনকে স্মরণ করলেন বিদেশের মাটিতে, আর জানালেন তিস্তার প্রতি, পদ্মার প্রতি তাঁর সুগভীর কমিটমেন্ট। ভুটান ও পশ্চিম বাংলা অনুপস্থিত। পাকিস্তান থেকে এসেছেন বিখ্যাত সুফি গায়ক মুহাম্মদ ইকবাল বাহু। পাঞ্জাবি সুফি সাধক সুলতান বাহুর গানগুলো অপূর্বভাবে পরিবেশন করে থাকেন। কোচবিহার থেকে এসেছেন পার্বতী বাউল—এককথায় অপূর্ব। পার্বতী প্যারিস, জেনেভা ও জাপান সফর করে এসেছেন। তার শখ বাংলাদেশে গান গাওয়া। পাকিস্তান থেকে এসেছে সুফি নৃত্যের বিরাট দল। বাংলাদেশের সংস্কৃতি দল অনুপস্থিত। পেপার পড়েছেন মোট ৪০ জন। তাঁদের মধ্যে একজন অনুরুদ্ধ হয়ে ভাওয়াইয়া গেয়ে শোনালেন চার লাইন: ‘কি ও বন্ধু কাজল ভোমরা রে’। ওটুকুতেই সমবেত ২৫০ জন অনুভব করলেন বাংলা গানের জাদু।
মুস্তাফা জামান আব্বাসী: সাহিত্য-সংগীত ব্যক্তিত্ব।
mabbasi@dhaka.net

No comments

Powered by Blogger.