প্রচলিত বিচারব্যবস্থা থেকে আলাদা করুন-দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল

২০০২ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার আইনশৃঙ্খলা বিঘ্নকারী অপরাধ (দ্রুত বিচার) আইন পাস করার উদ্যোগ নিলে আওয়ামী লীগ এর তীব্র বিরোধিতা করেছিল। তাদের অভিযোগ ছিল, এই আইন বিরোধী দলের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হবে। পরিহাস হলো, এবার বিএনপিও একই অভিযোগ তুলতে পারে।


জোট সরকার দুই দফায় এর মেয়াদ বাড়ানোর পর বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারও দুই দফায় মেয়াদ বাড়ানোর অভিন্ন রেকর্ড স্থাপন করতে চলেছে। কিন্তু উদ্দেশ্য কী? গত এক দশকে আমরা যে ফল দেখেছি, তা স্বস্তিদায়ক নয়।
আগামী দুই সপ্তাহের মধ্যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটি বিলের ওপর প্রতিবেদন দেবে। কিন্তু এতে উত্তম কিছু থাকার সম্ভাবনা নেই। সুতরাং, ধারণা করা যায়, একটি গতানুগতিক সংশোধনী বিল পাস হতে যাচ্ছে। বিএনপি এই আইন করে একটি চমক সৃষ্টি করেছিল। বাংলাদেশের সংবিধানেও ‘দ্রুত বিচার’ নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। কিন্তু বিচার বিভাগকে সরকার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা না করতে দুই প্রধান দলই ফৌজদারি বিচারব্যবস্থায় এমন কোনো সংস্কার আনতে চায় না, যাতে তাদের কোটারি স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সরকার আরও দুই বছর এ ব্যবস্থা রাখার পক্ষে দুটি কারণ দেখিয়েছে। ছিনতাই, চাঁদাবাজি ও ত্রাস সৃষ্টিকারী অপরাধগুলো কার্যকরভাবে মোকাবিলা এবং এই আইনের অধীনে তদন্তাধীন ও বিচারাধীন দুই হাজার ২৬৯টি মামলা নিষ্পত্তি করা। এখানে একটি শুভংকরের ফাঁকি আছে। ১২০ দিনের মধ্যে বিচার শেষ করার লক্ষ্য কেন অর্জন করা যায়নি, তা নিয়ে সংসদে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন।
সরকারি দল আমাদের স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে ‘যানবাহন চলাচলে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি, যানবাহনের ক্ষতিসাধন, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বিনষ্ট করা, ভয়ভীতি প্রদর্শন’ ইত্যাদি গুরুতর অপরাধের দ্রুত বিচারের লক্ষ্যে ২০০২ সালে আইনটি প্রণয়ন ও জারি করা হয়েছিল। ১২ মার্চ বিরোধী দলের সমাবেশের প্রেক্ষাপটে কেউ কেউ শঙ্কিত হতে পারেন যে আইনটি দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করা হতে পারে। সরকারদলীয় যেসব কর্মী টেন্ডার-সন্ত্রাসসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কাজে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে দ্রুত বিচার আইন প্রয়োগ করা হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই।
আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনাল কার্যকর করার সুযোগ আছে। এ জন্য একে বিদ্যমান রুগ্ণ ফৌজদারি ব্যবস্থার বাইরে নিয়ে আসতে হবে। এটি যে একটি বিশেষ ব্যবস্থা, তা সর্বতোভাবে নিশ্চিত করতে হবে। এক সাবেক প্রধান বিচারপতির ভাষায়, এ আইন সরকারের কাছে ‘ব্রাহ্মণের গরু’ হয়ে উঠেছে। জমি চাষাবাদ, তেলের ঘানি টানা ও গরুগাড়ি চালানো—সবই এক বলদ দিয়ে করার মতো একটা অবস্থা চলছে। এই মানসিকতা থেকে সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে। সেই সঙ্গে কারও বিরুদ্ধে আইনের উদ্দেশ্যমূলক ব্যবহারও বন্ধ করতে হবে।
অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজ কিংবা জেলা আইনজীবী সমিতির জ্যেষ্ঠ সদস্যদের মধ্য থেকে সততার সঙ্গে বিচারক নিয়োগ দিয়ে এই ট্রাইব্যুনাল চালানো হলে সুফল পাওয়া যেতে পারে।

No comments

Powered by Blogger.