প্রথম আলো গোলটেবিল বৈঠক-টিপাইমুখ বাঁধ নিয়েশঙ্কা

গত ২৯ জানুয়ারি প্রথম আলোর উদ্যোগে ‘টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে শঙ্কা’ শীর্ষক গোলটেবিল বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এতে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা আলোচনায় অংশ নেন। তাঁদের বক্তব্য সংক্ষিপ্ত আকারে ছাপা হলো।


যাঁরা অংশ নিলেন
ড. গওহর রিজভী
প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা
ড. আকবর আলি খান
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা
আইনুন নিশাত
উপাচার্য, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
মীর সাজ্জাদ হোসেন
যৌথ নদী কমিশনের সদস্য
এম ইনামুল হক
চেয়ারম্যান জল-পরিবেশ ইনস্টিটিউট
এম এ কাশেম
চেয়ারম্যান, জাতীয়দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা উপদেষ্টা পরিষদ
আসিফ নজরুল
অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
এম এ আরাফাত
অধ্যাপক, আইইউবি

সঞ্চালক
আব্দুল কাইয়ুম: যুগ্ম সম্পাদক, প্রথম আলো
মতিউর রহমান: সম্পাদক, প্রথম আলো

আলোচনা
মতিউর রহমান
ড. গওহর রিজভীর ইচ্ছা, বিষয়টি নিয়ে খোলামেলা আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক হোক, যা থেকে একটি সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়া যায়। আমরা জানি, বাংলাদেশ-ভারত ছাড়া অন্যান্য দেশেও টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ভারত বলছে, বাংলাদেশের ক্ষতি হয়, এমন কাজ তারা করবে না। এর পক্ষে-বিপক্ষে অনেক যুক্তি রয়েছে। আমরা জানি, বর্তমান সরকার ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। ব্যবসা-বাণিজ্যসহ কিছু স্পর্শকাতর বিষয়, যেগুলোর আলোচনা অতীতে ছিল না, তারও আলোচনা হয়েছে। আমাদের চারপাশে ভারত; যে কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-অর্থনীতি—সব ক্ষেত্রে ভারতের সহযোগিতার প্রয়োজন রয়েছে। মনমোহন সিংয়ের ঢাকা সফর থেকে বাংলাদেশ যতটুকু আশা করেছিল, সেটা পায়নি। তিস্তা চুক্তি আটকে আছে। টিপাইমুখ বাঁধের ক্ষেত্রে ভারত আশ্বাস দিয়েছে, এটা শুধু বিদ্যুৎ প্রকল্প; সেচ প্রকল্প নয়। তার পরও বাংলাদেশের মানুষ বন্যা, ভূমিকম্পসহ এর নানা ক্ষতিকর দিক নিয়ে শঙ্কিত। ভারত, বাংলাদেশ মিলে একটি যৌথ সমীক্ষার ব্যবস্থা করলে অনেক সন্দেহ-অবিশ্বাস দূর হতে পারে। এই বিষয়ের ওপর আলোচনার জন্য ড. গওহর রিজভীকে অনুরোধ করছি।

ড. গওহর রিজভী
এই বিষয়ের সব উত্তর সরকারের কাছেও নেই। আরেকটি বিষয় হলো, ঘটনাটি আসলে কী, সেটি আমরা অনেকেই জানি না, যে কারণে এ ক্ষেত্রে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাচ্ছে না। এ বিষয়ে এখনো আনেক কিছু জানার আছে। টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে আমরা বিভিন্ন রকম আশঙ্কা করছি। এই আশঙ্কা যদি সত্যি হয়, তাহলে বাংলাদেশের অনেক ক্ষতি হবে। কিন্তু আমরা জানি না, এই আশঙ্কা, এই ভয় কতটুকু সত্যি। আমি মনে করি, টিপাইমুখ বাঁধের ক্ষেত্রে একটি যৌথ সমীক্ষা হওয়া দরকার এবং অচিরেই সেটি হবে। যৌথ সমীক্ষার বিষয়টি দিল্লিতে আমরা উপস্থাপন করি। সঙ্গে সঙ্গে সেটি ভারত সরকার মেনে নেয়, এবং এ বিষয়ে তাদের যত তথ্য-উপাত্ত আছে, সবকিছু দিয়ে সহযোগিতা করার কথা বলে।
বাংলাদেশ-ভারত যৌথ সমীক্ষায় কখনো যদি বিদেশি বিশেষজ্ঞের প্রয়োজন হয়, সে ক্ষেত্রেও তাদের আপত্তি নেই। ভারত ভবিষ্যতে কী করবে, তা আমরা কেউ জানি না। তবে তাদের পক্ষ থেকে আমাদের কতগুলো নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। তার মধ্যে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী আমাদের বারবার বলেছেন, বাংলাদেশের ক্ষতি হয়, এমন কোনো সিদ্ধান্ত ভারত সরকার নেবে না। তখন আমরা বললাম, ক্ষতি অনেক ধরনের হয়, যেমন: পরিবেশগত, অর্থনৈতিক, পরিবেশদূষণ-সংক্রান্ত, কৃষি, জীবিকা ইত্যাদি। তারা আমাদের সঙ্গে একমত পোষণ করল এবং বলল যে সমীক্ষা করে দেখবে, দুই দেশের লাভ না ক্ষতি হয়। বাংলাদেশের ক্ষতি হলে তারা এ কাজ করবে না। আমরা একটা বিষয় জানার চেষ্টা করেছি, টিপাইমুখে ব্যারাজ হবে কি না। এ বিষয়ে তারা নিশ্চিত করে কিছু বলেনি। কিন্তু আলোচনার মধ্য দিয়ে আমরা বুঝতে পারলাম, সীমানার কাছে ফুলেরতলায় ব্যারাজ করার একটি পরিকল্পনা ছিল। এই প্রকল্প তারা অনেক আগেই বাদ দিয়েছে। তারপর আমরা জানতে পারলাম, তারা সেখানে বর্ষার পানি ধরে রাখার জন্য জলাধার বা ড্যাম তৈরি করবে। এখান থেকে জলবিদ্যুৎ উৎপাদনই হবে তাদের মূল লক্ষ্য।
প্রবহমান জলধারা হতে হলে সারা বছর একই পরিমাণ পানি ছাড়তে হবে। তারা বলল, জলাধারের দুটি ভালো সম্ভাবনা আছে। এক. এর ফলে বর্ষা ঋতুতে বন্যানিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। দুই. জলবিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য যে পানি ধরে রাখতে হবে, শীতে সে পানি ছাড়তেই হবে। ফলে আমাদের নদীতে পানির সরবরাহ বাড়বে। হাওরের ওপর কী প্রভাব ফেলবে, সে জরিপটি আমাদের এখনো করা হয়নি।
ভারতকে বলা হয়েছিল, উঁচু জলাধারের কারণে ভূমিকম্প হলে কী হবে? এ ক্ষেত্রে তারা দুটো বিষয়ের কথা বলল। এক. আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে ভূমিকম্পের ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখবে, কত রিখটার স্কেল পর্যন্ত এই অঞ্চলে ভূমিকম্প হয়েছে। তারা তার চেয়ে বেশি প্রস্তুতি নেবে। সম্ভবত টিপাইমুখ থেকে আমাদের সীমানার দূরত্ব ১৪০ কিলোমিটার। তারা বলল, টিপাইমুখে তাদের তিনটি রাজ্য মণিপুর, মিজোরাম ও আসাম ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব। তাহলে তাদের জন্যই তাদের ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা নিতে হবে। চূড়ান্তভাবে তারা আমাদের বলল, যে পরিমাণ বিদ্যুৎ এখান থেকে উৎপাদিত হবে, তার ১০ থেকে ৫০ শতাংশের যেকোনো পরিমাণ আমরা ইচ্ছা করলে নিতে পারব। ভারতের প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশে এসে আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও বিরোধীদলীয় নেত্রীকে একই কথা বলেছেন। এত কিছুর পরও আমি সবাইকে একটি ধারণা দিতে পারি, যতক্ষণ আমরা দুই পক্ষ যৌথ সমীক্ষা করে একটি সিদ্ধান্তে আসতে না পারি, ততক্ষণ পর্যন্ত কিছুই হবে না। টিপাইমুখ নিয়ে বিরোধিতা শুধু যে বাংলাদেশে আছে তা নয়, ভারতেও প্রবল বিরোধিতা আছে। আমার শেষ কথা হলো, আমরা যদি বিদ্যুতের অংশ পাই, শুষ্ক মৌসুমে পানি পাই, বন্যানিয়ন্ত্রণ সম্ভব হয়, তাহলে অবশ্যই আমরা উপকৃত হব। আমি যে লেখাটি লিখেছিলাম, সেখানে নিজের কোনো মতামত দিইনি, সবকিছু আপনাদের ওপর ছেড়ে দিয়েছি।

মতিউর রহমান
টিপাইমুখ বাঁধ নিয়ে এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, ড. গওহর রিজভীর আলোচনা থেকে আমরা তার একটি ধারণা পেলাম। এবার আইনুন নিশাতকে অনুরোধ করছি এ বিষয়ে বলার জন্য।

আইনুন নিশাত
বিশ্ব পানি অংশীদারি সংস্থা প্রতি তিন বছর পরপর বিশ্ব পানি সম্মেলনের আয়োজন করে। প্রতিটি সম্মেলনে বাংলাদেশের তিন-চারজন মন্ত্রী যান। পরবর্তী সম্মেলন হবে ফ্রান্সে। এই সম্মেলনের উদ্দেশ্য হচ্ছে, পানি নিয়ে যারা সিদ্ধান্ত নেয়, তাদের একত্র করা। বাংলাদেশ থেকে যারা এই সম্মেলনের প্রতিনিধিত্ব করবেন, তাঁদের এই বিষয়ের কৌশলগত দিকগুলো জেনে নিতে হবে। বাংলাদেশে ৫৪টি নদী আছে। এর মধ্যে ৫১টি নদী ভারত থেকে শুরু হয়ে বাংলাদেশে আসে। তিনটি বাংলাদেশ থেকে শুরু হয়ে ভারত ও বাংলাদেশে যাওয়া-আসা করে। আমাদের চিন্তা হবে, সব নদীকে একটি একক ধরে সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ করা। সারা বছরের পানিকে একটা ব্যবস্থাপনার মধ্যে আনা।
আমাদের দেশে বর্ষা মৌসুমে বেশি পানি, শুকনো মৌসুমে কম পানি। বেশি-কম পানি সমন্বয় করার জন্য পাহাড়ি এলাকায় পানি ধরে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে আমরা কাপ্তাইয়ের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারি। ড. গওহর রিজভী জলাধার থেকে বন্যানিয়ন্ত্রণ এবং শুকনো মৌসুমে যে পানি পাওয়ার কথা বললেন, এ বিষয়টিতে আমার দ্বিমত রয়েছে। কারণ, যে নকশা বা রূপরেখার ভিত্তিতে এই জলাধার করা হয়েছে, তা থেকে বন্যানিয়ন্ত্রণ এবং শুকনো মৌসুমে পানি প্রাপ্তির সুবিধা পাওয়া যাবে না। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ-ভারত যৌথ নদী কমিশন গঠিত হয়েছিল। আমি যদি স্মরণ করতে পারি, ওই কমিশন যেদিন বলল যে পানির ব্যাপারে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার প্রয়োজন, তার পরের দিনই যৌথ নদী কমিশনের প্রথম সভা অনুষ্ঠিত হয়। তার কিছুদিন পর দ্বিতীয় সভা। তৃতীয় অথবা চতুর্থ সভায় একটি চুক্তি সই হয়। সিলেট অঞ্চলের বন্যানিয়ন্ত্রণের জন্য উজানে কিছু করার পরিকল্পনা ছিল প্রথম এবং দ্বিতীয় সভার উদ্দেশ্য। তাহলে আমরা দেখছি, ১৯৭২-৭৩ সালে পানি ব্যবস্থাপনার মধ্যে একমাত্র ভাবনা ছিল বন্যা ব্যবস্থাপনা। সেচব্যবস্থা এসেছে ১৯৭৪-৭৫ সালের দিকে। এর আগে আমাদের দেশে বোরো ধান ছিল না। সে সময় প্রধান ফসল ছিল আউশ-আমন। এখন বোরো প্রধান ফসল। যে কারণে শুকনো মৌসুমের চিন্তা করতে হয়।
ভারত থেকে যে পরিমাণ পানি উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ঢুকছে, সেটা ভবিষ্যতে পরিবর্তিত হবে কি না—এই প্রশ্নের জবাবে আমরা বললাম, তারা যদি টিপাইমুখে জলাধার নির্মাণ করে, তাহলে পরিবর্তিত হতে পারে। তখন পরিবেশগত প্রভাব নিরূপণের জন্য অবশ্যই তাদের এই তথ্য দরকার ছিল। যদি কোনো বছর বর্ষার শেষের দিকে বৃষ্টি হয়, তখন বাড়তি পানি নির্গমনের পথ (স্পিলওয়ে) দিয়ে পানি ছাড়তে হবে, যেটা কাপ্তাইয়েও ছাড়তে হয়। আগস্ট, সেপ্টেম্বর মাসে জলাধার পূর্ণ থাকার পর বৃষ্টি হলে পানির স্রোত এত তীব্র হয় যে চট্টগ্রাম বন্দরের জাহাজ শিকল ছিঁড়ে সমুদ্রে চলে গেছে, এমন ঘটনাও আছে।
তাহলে প্রকাশিত তথ্য থেকে দেখা যাচ্ছে, বন্যার সময় পানির উচ্চতা কমে যাবে, আর শুকনো মৌসুমে পানির উচ্চতা বেড়ে যাবে। ফলে নদীগুলোর পানির স্তর অনেকটা বেড়ে যাবে। এটাই হচ্ছে গঙ্গাসহ বাকি সব নদীর অবস্থা। এখন জলাধার বানাতে হবে, বর্ষার পানি ধরে রাখতে হবে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হবে।
১৯৭২-৮৫ সাল পর্যন্ত বন্যা-সম্পর্কিত পরিকল্পনার যে রূপরেখা ছিল, তা আজ কার্যকর কি না, আমি জানি না। তবে আমার ধারণা, এখন তারা জলাধারের উচ্চতা অনেক বাড়িয়েছে। এই জলাধারের সম্ভাব্য প্রভাব হলো:
এক. উজানের জলাধারটি পানিতে পূর্ণ করতে হবে। এটা পূর্ণ করতে দেড়-দুই বছরের বেশি সময় লাগবে না। ভারতে যে চেঁচামেচি-হইচই হচ্ছে, সেটা ওই জলাধারের বিরুদ্ধে। এই জলাধারের কারণে তাদের অনেক লোক উচ্ছেদ হয়ে যাবে।
দুই. শুধু যদি জলাধার নির্মিত হয়, বন্যানিয়ন্ত্রণ হতে পারে। টিপাইমুখের কার্যক্রম পরিচালনা (অপারেশনাল) পদ্ধতি আমরা জানি না। ধরে নিলাম সর্বোচ্চ মাত্রায় জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করবে। তাহলে প্রথমে তারা এটা পূর্ণ করে ফেলবে। এ ক্ষেত্রে বর্ষার শেষে যদি বৃষ্টি হয়, তাহলে ভাটির দিকে বেশি ক্ষতি হবে। কারণ, তখন পানি ছেড়ে দিতে হবে। ফলে বন্যার আশঙ্কা থেকে যায়।
ভারত সরকার বলছে, তারা ব্যারাজ করবে না। তাদের এ ধরনের আশ্বাসের কোনো যৌক্তিকতা আছে বলে মনে হয় না। কারণ, আমরা দেখেছি, গঙ্গাসহ অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সেগুলো রক্ষা করেনি। তাদের মৌখিক আশ্বাসের কোনো ভিত্তি নেই। এ বিষয়ে লিখিত চুক্তি হতে হবে। এখন প্রধান কাজ হলো, দুই দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি পর্যবেক্ষণ দল গঠন করে জলাধারের লাভ-ক্ষতি সবকিছু বিবেচনায় এনে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। আমি মনে করি, জলাধারের বিরোধিতা মানে অবশিষ্ট ৫৩টি নদীর জন্য বিপদ ডেকে আনা। বরং এই জলাধারকে কেন্দ্র করে বর্তমান এবং ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে কীভাবে সহযোগিতামূলক কর্মপরিকল্পনা করা যায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।

মতিউর রহমান
আইনুন নিশাত ঐতিহাসিক পটভূমিতে বিষয়টি আলোচনা করলেন। তাঁর আলোচনা থেকে কিছু বিষয় উঠে এসেছে। এখন বলবেন মীর সাজ্জাদ হোসেন।

মীর সাজ্জাদ হোসেন
একটি প্রশ্ন প্রতিনিয়ত শোনা যায়, ব্যারাজ হবে কি না। এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক বিবৃতি আছে কি না। এ ক্ষেত্রে ভারত সরকার বাংলাদেশ সরকারকে লিখিতভাবে জানিয়েছে যে ব্যারাজ হবে না। এটা হবে শুধু বিদ্যুৎ প্রকল্প। এই লিখিত বিবৃতি আমাদের কাছেও আছে। এ বিষয়ে অনেকবার বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে। কিন্তু তার পরও কারও কারও ধারণা, এ ব্যাপারে ভারত সরকারের কাছ থেকে লিখিত কিছু নেই।
আরেকটি প্রশ্ন আসে, ‘ফ্লাড স্পেস’ থাকবে কি না। ভারত সরকার যেসব তথ্য আমাদের দিয়েছে, সেখানে স্পষ্ট বলা আছে, ২ দশমিক ৫ মিটার ‘ফ্লাড স্পেস’ থাকবে। ১০ হাজার বছরের ভারী বৃষ্টিপাতের হিসাব ধরে পানি নির্গমন পথের (স্পিলওয়ে) উচ্চতা ধরা হয়েছে ১৭৮ মিটার।
১৯৭২ সালে যৌথ নদী কমিশন (জেআরসি) গঠনের একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। ১৯২৯ সালে আসাম অঞ্চলে একটি বড় বন্যা হয়। তখন এই বন্যা নিয়ন্ত্রণের উপায় খুঁজে বের করার জন্য আসাম সরকার একটি গবেষণা চালায়। আসাম সরকারের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরবর্তী সময় ভারত সরকারের কেন্দ্রীয় পানি ব্যবস্থাপনা সংস্থা আরেকটি গবেষণা পরিচালনা করে। এই গবেষণার পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৬০ সালে তারা ভূপেন্দর নামের একটি জায়গা নির্ধারণ করে। এই জায়গাটি ছিল টিপাইমুখ বাঁধের ৫০ কিলোমিটার নিচের দিকে। এখানে একটি আড়াআড়ি বাঁধ (ড্যাম) নির্মাণ করে তারা আসাম ও সিলেট অঞ্চলের বন্যা নিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করে। ১৯৭২ সালে এই পরিকল্পনা ভারত সরকার জেআরসিতে উপস্থাপন করে। এ বিষয়ে কাজ করার জন্য সিলেট এবং ভারতের শীলচরে দুই দেশের কার্যালয় স্থাপন করা হয়। তখন দুই দেশের কর্মকর্তারা ১৯৭২-৭৫ পর্যন্ত ভূপেন্দর অঞ্চলটি পরিদর্শন করেন। তাঁদের জরিপের ফলাফল হলো, এখানে ড্যাম নির্মাণ করে বন্যানিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এর ফলে ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত ভূপেন্দর অঞ্চলের ওপরের দিকের কোনো জায়গায় ড্যাম করা যায় কি না, তা নিয়ে আবার দুই দেশের জরিপ শুরু হয়।
১৯৭৫ সাল পর্যন্ত জেআরসির ১৩টি অধিবেশন অনুষ্ঠিত হয়। এর মধ্যে ১০টিতে টিপাইমুখ নিয়ে আলোচনা হয়। কিছুদিন বন্ধ থাকার পর ১৯৭৮ সালে আবার টিপাইমুখ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। ১৯৮১-৯১ সাল পর্যন্ত ১১টি অধিবেশনে টিপাইমুখ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। ১৯৯১-৯৬ পর্যন্ত জেআরসির কোনো অধিবেশন হয়নি। ২০০১-০৬ পর্যন্ত টিপাইমুখ নিয়ে ভারত সরকার সবচেয়ে বেশি কাজ করেছে। ২০০৬ সালে জেআরসি অধিবেশনে তারা আমাদের জানায়, ফুলেরতলে ব্যারাজ হবে না।
আমরা ধারণাপ্রসূত অনেক মন্তব্য করছি। এ জন্য দুই দেশের যৌথ পর্যবেক্ষণ ব্যাহত হতে পারে। ১৯৭২ সালে দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে আলোচনার ভিত্তিতে যৌথ নদী কমিশন গঠিত হয়। দুই দেশের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট নদীগুলো ব্যবহার করে কীভাবে সর্বোচ্চ সুবিধা পাওয়া যায়, সেটি নিশ্চিত করাই ছিল যৌথ নদী কমিশনের উদ্দেশ্য। এর মধ্যে বন্যানিয়ন্ত্রণ এবং যৌথ প্রকল্প গ্রহণের বিষয়টি ছিল। অনেকে গঙ্গা চুক্তির ৯ নম্বর ধারা উল্লেখ করে বলেন, ওই চুক্তি অনুযায়ী, ভারত টিপাইমুখে কোনো অবকাঠামো নির্মাণ করতে পারে না। অথচ ৯ নম্বর ধারায় বলা হয়েছে, সমতা, ন্যায়নীতি এবং অন্যের ক্ষতি না করে অন্যান্য নদীর পানি বণ্টনের বিষয়ে দুই সরকার একমত হয়েছে। টিপাইমুখের ক্ষেত্রে পানি বণ্টনের প্রশ্ন উঠছে না। কারণ, তারা সেচ প্রকল্প করছে না, করছে বিদ্যুৎ প্রকল্প। এর ফলে কোনো পানি প্রত্যাহার হচ্ছে না। এ জন্য গঙ্গা চুক্তির ৯ নম্বর ধারা টিপাইয়ের সঙ্গে যুক্ত করা উচিত নয়। তিনটি বড় নদীর কথা বলছি। ভারত হয়ে গঙ্গোত্রী থেকে এসেছে গঙ্গা, তিব্বত থেকে এসেছে ব্রহ্মপুত্র এবং উত্তর-পূর্বাঞ্চলে এসেছে মেঘনা। গঙ্গার ব্যাপারে দুই সরকার অনেক আগে একমত হয়েছে যে দুই দেশের প্রয়োজনের তুলনায় গঙ্গার পানি পর্যাপ্ত নয়। সেচ থেকে বিদ্যুৎ আমাদের বেশি প্রয়োজন। কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জটিলতার কারণে জলবিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল হতে হবে।
সে ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা করে সামগ্রিকভাবে বর্ষার পানি ধরে রেখে জলবিদ্যুতের এই সুযোগ আমরা নিতে পারি। সঙ্গে সঙ্গে উত্তর-পূর্বাঞ্চলের বিশাল এলাকা, যেখানে প্রায় ৫০ লাখ টন বোরো ধান উৎপাদিত হয়, জলাধারের মাধ্যমে এই বিশাল অঞ্চল বন্যার হাত থেকে রক্ষা পাবে।

আব্দুল কাইয়ুম
মীর সাজ্জাদ হোসেনের কাছ থেকে কিছু বিষয় জানা গেল। এগুলো নিয়ে অন্য আলোচকেরাও কথা বলবেন। এ পর্যায়ে আন্তর্জাতিক আইনের বিষয়গুলো নিয়ে আসিফ নজরুল আলোচনা করবেন।

আসিফ নজরুল
ভারত টিপাইমুখ নিয়ে আমাদের বলেছে, টিপাইমুখ প্রকল্পের মধ্যে পানি প্রত্যাহার করার কোনো অংশ নেই। এটা থাকার কথা নয়। কারণ, পানি প্রত্যাহার করা হবে অনেক ভাটিতে। এটা হবে পরবর্তীকালে বা পৃথক কোনো প্রকল্প যদি হয়। টিপাইমুখ প্রকল্পে বিকল্প পথে পানি অপসারণের কোনো ব্যবস্থা নেই। এর মানে এই নয়, ভবিষ্যতে ভাটিতে পানি প্রত্যাহার খাল করা হবে না। কাজেই ভারতের এ কথা আমাদের নিশ্চয়তা দেয় না যে ভবিষ্যতে অন্য কোনো প্রকল্পের মাধ্যমে ভারত পানি প্রত্যাহার করবে না।
২০০৫ সালে যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক হয়েছিল। সেখানে ভারতীয় প্রতিনিধিদের প্রশ্ন করা হয়েছিল, আপনারা ফুলেরতলায় ব্যারাজ করবেন, নাকি অন্য কোথাও? তাদের উত্তর ছিল, পরে জানাব। তারপর কয়েকটি যৌথ নদী কমিশনের বৈঠক হয়েছে। তারা তা জানায়নি।
যখন একটি আন্তরাষ্ট্রীয় সম্পর্ক হয়, তখন সংক্ষিপ্ত বিবরণী (নোট ভারবাল) হচ্ছে ভিয়েনা কনভেনশন অনুযায়ী, সবচেয়ে নিম্নস্তরের প্রতিশ্রুতি। আর সবচেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি হচ্ছে মতৈক্য। তার চেয়ে বড় প্রতিশ্রুতি হচ্ছে চুক্তি, যেখানে আমাদের সঙ্গে ভারতের গঙ্গার পানি চুক্তি আছে। এটা একটা মতৈক্যের সর্বোচ্চ রূপ এবং আন্তর্জাতিক আইনের সর্বোচ্চ রূপ। যেখানে সম্পাদিত আইনের ৯ নম্বর ধারা বলছে, যৌথ নদীর ক্ষেত্রে পানি বণ্টন প্রশ্নে, ন্যায়পরায়ণতা, ক্ষতি না করা এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে চুক্তি করব। পানি বণ্টনের ব্যবস্থায় যদি জলবিদ্যুৎ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়, তাহলে পানি প্রাপ্তির তারতম্য ঘটবে। আর তারতম্য যদি আসে, তাহলে সেটাই হলো পানি বণ্টনের প্রশ্ন।
যখন একটা বড় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ভারত হাতে নেবে আর তাতে পানি বণ্টন প্রশ্ন প্রভাবিত হবে, তখনো যদি কেউ বলেন ৯ নম্বর ধারা এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য না, তাহলে ভারত আমাদের কোনো কথাই শুনবে না। তাই বরং ওই ধারা যে এ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তার পক্ষে সর্বোচ্চ যুক্তি তুলে ধরা উচিত।
ভারতের সঙ্গে বড় প্রতিকূলতা সৃষ্টির স্বপ্ন যাঁরা দেখেন, তাঁরা তা রাজনৈতিক কারণে দেখেন। এতে কোনো লাভ নেই। কারণ আমরা আমাদের প্রতিবেশী পরিবর্তন করতে পারব না।
পানি মজুদ করা হলে এর ভেতরের বিভিন্ন উপাদান পরিবর্তিত হয়, যা জীববৈচিত্র্যের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। এই ক্ষতিকর প্রভাবের বিষয়গুলো যদি আমরা ভারতের কাছে তুলে ধরি, এতে কিন্তু আমাদের আন্তর্জাতিক ফোরামের কাছে যেতে হবে না। আমরা বলতে পারি, আমাদের জীববৈচিত্র্যের ক্ষতি তোমরা করতে পারো না।
আমাদের চাওয়া-পাওয়ার বিষয়গুলো সরকারি পক্ষ ভারতীয় পক্ষের কাছে সঠিকভাবে তুলতে পারে না। ঐতিহাসিকভাবে দেখা যায়, তাদের সঙ্গে আমাদের অনেক চুক্তি হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশ তা বাস্তবায়ন করলেও ভারতীয় পক্ষ বাস্তবায়ন করেনি। অতএব আমরা আশ্বাসে বিশ্বাস করতে পারি না।
বাংলাদেশ যেহেতু এখনো প্রকল্প সম্পর্কে, পরিবেশ সম্পর্কে পূর্ণাঙ্গ তথ্য পায়নি, তাই শক্তভাবে ভারতকে বলা উচিত এই প্রকল্প নিয়ে না এগোনোর জন্য।

এম এ কাশেম
টিপাইমুখ নিয়ে যে আলোচনা হচ্ছে, তার অধিকাংশই হচ্ছে আশঙ্কাতাড়িত এবং অনুমাননির্ভর। অনুমাননির্ভর আলোচনার কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
বন্যা কার্যক্রম কর্মসূচি প্রণয়নের (ফ্যাপ স্টাডি) সময় বা পরবর্তীকালে টিপাইমুখে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়টি আলোচনায় ছিল না, আলোচ্য বিষয় ছিল ফুলেরতলে ব্যারাজ হবে কি না, পানি প্রত্যাহার করা হবে কি না। অনেকে বলেন, বিশ্ব ড্যাম কমিশন (ওয়ার্ল্ড কমিশন অব ড্যাম) ড্যাম নির্মাণের বিরোধিতা করেছে। এটা সম্পূর্ণ ভুল। কমিশন ড্যামের উপকারিতা, নেতিবাচক-ইতিবাচক প্রভাব, নির্মাণ-জটিলতা এবং নির্মাণ বিষয়ে সাতটি নীতি দিয়েছে।
কুশিয়ারার মতো নিম্নভূমি এলাকায় হাকালুকি হাওর হচ্ছে সব থেকে নিচে। এই হাওরে পানি বাড়ার ফলে যে পরিমাণ জমি পানির তলে যায়, তাতে ক্ষতি কত হয়, সেখানে মাছ চাষ হলে লাভ কত হয়—এটা অবিশ্বাস্য রকম ইতিবাচক।
টিপাইমুখ নিয়ে সাধারণের মধ্যে একধরনের ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে, যার জন্য বর্তমান সরকারের অনেক মন্ত্রীও দায়ী। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘আমাদের ক্ষতি হয় ভারত এমন কিছু করবে না।’ এটা পরিষ্কার কথা নয়। সাধারণের কাছে বিষয়টা পরিষ্কার করতে হবে। এটা নিয়ে আমাদের জরুরি গবেষণা করা উচিত, আমরা কতটা প্রভাবিত হচ্ছি এটা থেকে। সেটা ইতিবাচক অথবা নেতিবাচক, যা-ই হোক। ভারত এটা গ্রহণ করুক আর না করুক, আমাদের স্বার্থে এটা করা উচিত। আর যৌথ গবেষণা তো হবেই।

এম এ আরাফাত
আমরা যদি সরাসরি ড্যামের বিপক্ষে চলে যাই, তাহলে যৌথ নদীগুলোর পানিবর্ধনের ক্ষেত্রে আমাদের দাবিগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। আমাদের অন্যান্য নদীর পানিবর্ধনের বিষয়টি বাদ দিলেও, যদি ড্যামের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নিই, তাহলে অন্য আরেকভাবে আমরা ক্ষতিগ্রস্ত হব।
ড্যামের মাধ্যমে জলবিদ্যুৎ করার যে সম্ভাব্য পরিসংখ্যান দেখা যায়, ইউরোপ ও আমেরিকা এই সম্ভাব্যতার ৭০ শতাংশ কাজে লাগিয়েছে। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়া এই সম্ভাব্যতার মাত্র ৮ শতাংশ কাজে লাগাতে পেরেছে। বাকি ৯২ শতাংশ অব্যবহূত।
২০০৩ সালে ৩৫তম যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকের আলোচনা থেকে জানা যায়, বাংলাদেশ পক্ষ বলেছিল, ফুলেরতলে সেচবাঁধ নির্মাণ টিপাইমুখ প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত। ভারত নিশ্চয়তা দিয়েছিল, এ ধরনের সিদ্ধান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে নেওয়া হবে। বাংলাদেশ আরও নিশ্চয়তা চেয়েছিল, ফুলেরতল বা বরাক নদের অন্য কোথাও সেচের জন্য বাঁধ নির্মাণ করা হবে না।
৩৬তম যৌথ নদী কমিশনের বৈঠকে তারা বলে, ফুলেরতলে তারা একটা ব্যারাজ করবে কি না, তা পরবর্তী বৈঠকে উত্থাপন করা হবে। পরে তারা বলেছে, টিপাইমুখে কোনো সেচ প্রকল্প নেই, এটা বন্যানিয়ন্ত্রণ ও বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রকল্প। কিন্তু ফুলের তল টিপাইমুখ থেকে ১০০ কিলোমিটার ভাটিতে হলেও তা এই প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত।

এম ইনামুল হক
টিপাইমুখ বিষয়টা রাজনীতিকীকরণ করা হয়েছে। আর সরকার ও বিরোধী দুই দলই যেহেতু রাজনৈতিক দল, সেখানে দেখার বিষয়, সরকারি দল বিষয়টাকে কীভাবে সমন্বয় করে।
পুরো মেঘনা অববাহিকায় টিপাইমুখ আট ভাগের এক ভাগ। আর মেঘনা নদী দিয়ে যে নদীগুলো আছে তা যেহেতু আমাদের মোহনায়, তার ওপর লবণাক্ততার প্রভাব মাত্র ১ দশমিক ৫ শতাংশ। এ আলোচনায় আরেকটা বিষয় আসে, তা হলো ভূমিকম্প। এটা তো সম্ভাবনার বিষয়, যা ১০০ বছরে একবার হতে পারে। আর ভারত যখন ড্যাম করবে, তারা ভূমিকম্পের সম্ভাব্যতা মাথায় রেখেই করবে।
এখানে বরাক নদের পানি ভাগাভাগির কথা এসেছে, ভাগাভাগির কথা তখনই আসবে যখন পানির গতি পরিবর্তন করে অন্যত্র নিয়ে যাওয়া হয়। বরাক নদের পানির গতি পরিবর্তন করে অন্য কোথাও নেওয়ার কায়দা নেই। যেমনটি তিস্তার পানি বিহারে নেওয়া হচ্ছে, ফারাক্কার পানি ভাগীরথী নদীতে। অতএব বরাক প্রশ্নে ভাগাভাগির কথা আসা উচিত নয়। আমরা এর ব্যবস্থাপনা কী হচ্ছে, তা দেখব।
টিপাইমুখ ও কাপ্তাইয়ের পানি ধারণ এলাকা (ক্যাচম্যান্ট এরিয়া) সমান। টিপাইমুখ থেকে ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হলে পাঁচ বছর ধরে পানি ধরে রাখতে হবে। এক বছর সুবিধা পাওয়ার পর আবার পাঁচ বছর বন্ধ রাখতে হবে।
অতএব টিপাইমুখ থেকে ৪৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব নয়। টিপাইমুখের ধারণ এলাকায় বৃষ্টিপাত হয় এক হাজার ৫০০ মিলিমিটার, যেখানে কাপ্তাইয়ে গড় বৃষ্টিপাত দুই হাজার ৭০০ মিলিমিটার।
বন্যানিয়ন্ত্রণের জন্য ড্যাম দরকার। এ রকম বিভিন্ন কাজের ড্যাম হতে পারে। তবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বন্যানিয়ন্ত্রণ একসঙ্গে করা যাবে না। কারণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে হলে ইচ্ছামতো পানি ছাড়া যাবে না।
সুনামগঞ্জের ৮০ ভাগ হাওর হওয়ার কারণে আগাম বন্যার জন্য প্রভাবিত হয় এ জেলা। এখন বোরো ধান চাষ হচ্ছে, বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠের মাঝামাঝি সময় যার ফসল আসে। এতে করে এর অর্থনীতি বোরোনির্ভর হয়ে পড়েছে। তাহলে কীভাবে সেটা মাছভিত্তিক করব? রাতারাতি তাদের জেলে বানানো সম্ভব নয়। ভারত যেহেতু যৌথ পর্যবেক্ষণের কথা বলেছে, এই সুযোগটা আমাদের নেওয়া উচিত। আমাদের যে যৌথ দল হবে, তাদের জানা উচিত ড্যামের আকৃতি কী হবে, ড্যামের কার্যক্রম তালিকা কী হচ্ছে, সময় ও তারিখ অর্থাৎ কোন কোন সময় তারা পানি ছাড়বে কী পরিমাণে।
ভারত যেহেতু সহযোগিতার হাত বাড়িয়েছে, সেটা বাংলাদেশের কাজে লাগানো উচিত।

আব্দুল কাইয়ুম
আসলে ড্যাম নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে অনেক বেশি বিভ্রান্তি আছে। এখন ড. আকবর আলি খান আলোচনা করবেন।

আকবর আলি খান
টিপাইমুখ নিয়ে বাংলাদেশে কথা বলার অনেকে আছেন, কিন্তু গবেষণা করে লেখালেখি খুব কম। এ বিষয়ে জানতে বাধ্য হয়ে ভারতীয় কাগজপত্র পড়তে হয়। আমি দুঃখের সঙ্গে বলছি, আমাদের দেশে যথেষ্ট গবেষণামূলক কাগজপত্র নেই। আমি ভারতের দেশপ্রেমিক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে একমত। কারণ এক পক্ষ বলছে, টিপাইমুখ বাঁধ হলে মরুভূমি হয়ে যাবে। বাংলাদেশ কাপ্তাই বাঁধ করেছে, তাতে কি মরুভূমি হয়ে গেছে, নাকি ভারত বাধা দিয়েছিল?
অনেকে বলেছেন, ভারত যদি সেচ প্রকল্প না করে, তাহলে ঠিক আছে। তাহলে আমরা কি টিপাইমুখ প্রশ্নে সব আপত্তি প্রত্যাহার করব? এটা তো কোনো কথা হলো না। আরেক পক্ষ বলছে, আমাদের উপকার হবে। ভারত যেখানে এ বিষয়ে উপকারের কথা লেখে না, আমরা কোথা থেকে উপকারের কথা লিখছি?
টিপাইমুখের মতো ঘটনা তো বাংলাদেশে আছে। গোমতী নদীর ওপর ১৯৭৬ সালে ২৬ বর্গমাইল এলাকাজুড়ে বাঁধ দিয়ে ভারত বিদ্যুৎ উৎপাদনকেন্দ্র করেছে। তাতে কী লাভ হয়েছে, এবং যেটা দেখা যায়, নদীতে মাছের উৎপাদন কমেছে, এর শাখা নদী ও উপনদী মরে গেছে। এখন তিতাস নিয়ে কথা হচ্ছে, সেই ’৭৬ সাল থেকে তিতাসের এই অবক্ষয় শুরু হয়েছে। ভারত কেন আমাদের সঙ্গে অংশীদারি বিদ্যুৎকেন্দ্র করবে? তারা যত সস্তায় বিদ্যুৎ পায়, তাদের তো অংশীদার হওয়ার দরকার নেই। খাতির করে একটা অথবা দুইটা করতে পারে, কিন্তু এ দিয়ে যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হবে, তা বলা যাবে না। টিপাইমুখ নিয়ে আলোচনায় তিন ধরনের প্রশ্নের উদ্ভব হয়। এগুলো হলো—স্বল্পমেয়াদি, মধ্যমেয়াদি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রশ্ন।
স্বল্পমেয়াদি প্রশ্নে, নদীতে মাছের চাষ করে মাছের পরিমাণ বাড়ানো যেতে পারে। কিন্তু পণ্ডিতদের মতে, নদীতে মাছের পরিমাণ কমে যাবে। সুতরাং নদীতে মাছ বাড়াতে হলে প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। সে ক্ষেত্রে ভারতের কাছে দাবি করতে হবে, বাংলাদেশের মৎস্যক্ষেত্রে বিনিয়োগে সহযোগিতা দিতে হবে। দ্বিতীয়ত, এর ফলে নদীতে পলি জমে যাবে। এতে নদী খননের প্রয়োজন হবে।
টিপাইমুখ নিয়ে আলোচনা করাটাই অন্যায়। অন্যায় এই জন্য যে টিপাইমুখ হলো একটা বড় সমস্যার অন্তর্ভুক্ত ছোট সমস্যা। বড় সমস্যা হলো, ভারত বিদ্যুৎ উৎপাদন করার জন্য উত্তর-পূর্ব ভারতে প্রায় দেড় লাখ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে চায়। তখন এর জন্য যে জলবিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করা হবে তার সামগ্রিক প্রভাব বাংলাদেশের ওপর কী পড়বে। সুতরাং শুধু টিপাইমুখ নিয়ে আলোচনা করা মোটেই সংগত হবে না। আলোচনা করতে হবে উত্তর-পূর্ব ভারতের যতগুলো জলবিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে তার ওপরে। এর ওপর যৌথ নদী কমিশনের বাংলাদেশ পক্ষের কাছে পর্যাপ্ত তথ্য আছে কি না তা নিয়ে সন্দেহ আছে। অতএব ভারতের সঙ্গে কী নিয়ে কথা বলা হবে, তা নির্ধারণ করতে হবে আগে।
মধ্যমেয়াদি প্রশ্ন হলো পরিবেশ নিয়ে। এ বিষয়ে ভূমিকম্পের কথা বলা হয়েছে। ভারত সরকার বলেছে, তারা এমন বাঁধ করবে, যা ভূমিকম্প-প্রতিরোধী হবে। টাইটানিক করার সময় কিন্তু বলা হয়েছিল, এটা ডুববে না। এর পরিণতি আমরা জানি।
সুবানসিড়ি বাঁধ নিয়ে ভারতের তিনটি বিশ্ববিদ্যালয় গবেষণা করে পরামর্শ দিয়েছে। ওই পরামর্শ অনুযায়ী, টিপাইমুখ বাঁধ যে স্থানে হচ্ছে সেখানে এত বড় বাঁধ করা যুক্তিযুক্ত নয়। কারণ তা ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান। অতএব এটাই বাংলাদেশের বক্তব্য হওয়া উচিত যে তারা বাঁধ করতে চাইলে করবে, তবে এত অতিকায় বাঁধ করা যাবে না। বাংলাদেশ ভারতের কাছে সেই ব্যবহার প্রত্যাশা করে, ভারত চীনের কাছে যে ব্যবহার প্রত্যাশা করে।
চীন ব্রহ্মপুত্রের ওপর জলবিদ্যুৎকেন্দ্র করছে, যা নিয়ে ভারতীয় সংসদে অনেক হইচই হয়েছে। সংসদে বিবৃতি দিয়ে মনমোহন সিং বলেছেন, চীন তাদের আশ্বস্ত করেছে, এটা ছোট বিদ্যুৎকেন্দ্র হচ্ছে এবং এটা হচ্ছে নদীপ্রবাহ অব্যাহত রেখেই (রান অব দ্য রিভার)।
রান অব দ্য রিভারের সংজ্ঞা হলো, সকাল থেকে নদীর পানি আটকে রেখে সন্ধ্যায় ছেড়ে দেবে, দিনেরটা দিনে। সে অনুযায়ী টিপাইমুখ ‘রান অব দ্য রিভার’ নয়। অতএব ভারতের কাছে বাংলাদেশের বক্তব্য হলো: ১. রান অব দ্য রিভার হতে হবে, ২. ড্যাম ছোট হতে হবে, ৩. বেশি পানি জমিয়ে রাখা যাবে না। এই তিনটি শর্ত মেনে নিলে এ বাঁধ নিয়ে বাংলাদেশের হয়তো আপত্তির কারণ থাকবে না।

মতিউর রহমান
আকবর আলি খান অনেক যৌক্তিক তথ্যসম্পন্ন বক্তব্য রেখেছেন। এখন সংক্ষিপ্তভাবে আলোচকেরা নতুন কিছু কথা যুক্ত করতে পারেন।

আইনুন নিশাত
ভারত কেন বাংলাদেশের সঙ্গে অংশীদারি বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করবে এই প্রশ্নে বলা যায়, ভারতের কেন্দ্রে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে। সে লক্ষ্যে বাংলাদেশ কাজ করছে। বাংলাদেশ স্বতন্ত্র গবেষণা করলেও ভারতের সহযোগিতা প্রয়োজন হবে তথ্য-উপাত্তের জন্য। এ ক্ষেত্রে সরকারকে সিদ্ধান্ত নিয়ে যৌথ গবেষণার কাজটি তাড়াতাড়ি করতে হবে। অন্য একটি কথা হলো, এই বিষয়টা যেন রাজনৈতিক নেতা মোকাবিলা করেন, যেন আমলাতান্ত্রিক না হয়।

মীর সাজ্জাদ হোসেন
টিপাইমুখ নিয়ে দ্বিতীয়বার আলোচনার পর ভারত সরকারের কাছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে প্রস্তাব গেছে যৌথ গবেষণা করার জন্য। ওয়ার্ল্ড ওয়াটার ফোরামে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ করার কথা। গত পঞ্চম সম্মেলনে ওই ফোরাম থেকে পরিষ্কার বলা আছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে পানিপ্রবাহে ভিন্নতা দেখা যাবে। অর্থাৎ সারা বছর পানির প্রাপ্যতা ওঠা-নামা করবে। বর্ষার সময় অতিবৃষ্টি হবে আর শুকনো মৌসুমে পানির স্বল্পতা বাড়বে। অতএব এখন অধিক পানি সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে, যাতে করে বর্ষার সময় সংরক্ষিত পানির বহুমাত্রিক ব্যবহার করা যায়।

আসিফ নজরুল
অতিকায় ড্যামকে আমাদের ‘না’ বলতে হবে। ভারতকে এই নিশ্চয়তা দিতে হবে, তারা ভবিষ্যতেও টিপাইমুখ প্রকল্পে পানির গতি পরিবর্তন করে অন্যত্র নেবে না। গোমতী নদীতে প্রথমে কিন্তু পানির গতি পরিবর্তনের কথা ছিল না। তা তারা করেছে।
আর গঙ্গাচুক্তির ৯ ধারার যতটা সম্ভব বাংলাদেশের পক্ষে সর্বোত্তম ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে হবে। যৌথ গবেষক দলে বাংলাদেশ থেকে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন লোকদের নিতে হবে।

আকবর আলি খান
টিপাইমুখ প্রশ্নে সব থেকে বড় উদাহরণ গোমতীতে বাঁধ। ভারত সরকারের যে বাধ্যবাধকতা আছে, সেগুলো আমাদের বুঝতে হবে। তারা তেহেরি বাঁধের ব্যাপারে কারও কথা শোনেনি, সুবানসিড়ির ওপরে শোনেনি। সেখানে তারা জোরজবরদস্তি করছে। আমাদের এই আপত্তি শুনবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। তার পরও আমাদের এই আপত্তি করতে হবে। আমাদের সমস্যা সম্পর্কে জানতে হবে এবং নিজেদেরও সমাধান করার কথা চিন্তা করতে হবে।
ভারত আজ হয়তো এ বিষয়ে কিছু অনুধাবন করছে না। কিন্তু ভবিষ্যতে তারা ভাবতে বাধ্য হবে। এ জন্য ভাবনার বিষয়গুলো বারবার ভারতের সামনে উপস্থাপন করতে হবে।

মতিউর রহমান
সমাপনী বক্তব্য দেওয়ার জন্য গওহর রিজভীকে অনুরোধ করছি।

গওহর রিজভী
আমাদের অনেক প্রশ্নে ভিন্নতা আছে, কিন্তু আমাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য কী, আমাদের প্রকৃত লক্ষ্য কী, কীভাবে আমরা আমাদের দেশের জন্য সর্বোচ্চ সুবিধা পাব—এই প্রশ্নগুলোতে কিন্তু আমাদের মতভিন্নতা খুব বেশি নেই।
যৌথ গবেষণা শুরু করতে সরকার অনেক দূর এগিয়েছে। কিছু নির্বাচনের ব্যস্ততার জন্য একটু দেরি হচ্ছে। যদিও এ ব্যাপারে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্ত নেবে। তারপর বন্ধুভাবাপন্ন দুই দেশের সরকার এমন একটি ফল প্রাপ্তি সামনে রেখে কাজ করবে, যা সবাই গ্রহণ করবে।

No comments

Powered by Blogger.