গল্প- গাশশির রাত by বদরুন নাহার

আশ্বিন মাসের শেষ দিনের উৎসব হয় রাতের। কিন্তু মিয়াবাড়ির উঠোনে দুপুর রোদে গোবর-মাটির প্রলেপে গোল চক্রাকৃতির মসৃণতা তৈরি করে ময়না। চারটা কলাগাছের খুঁটি চারদিকে মাটি খুঁড়ে বসিয়ে দেয় সিরাজ, ফেদু, জরি আর মমেনা।
সবই গাশিশর আয়োজন। এই সব জোগাড় না হলে গাশিশর রাত আর গাশিশর রাত হয়ে ওঠে না, জমে ওঠে না সবার অপেক্ষার আসর। অনেকে মনে করে গভীর রাতেই উৎসবের শুরু। কিন্তু সন্ধ্যা রাতের চক্রটা আরও বড়, সারা বাড়িজুড়ে, এমনকি বাড়ির সামনে হালট ধরে নদীর পাড় পর্যন্ত।

আয়োজনের নেতৃত্বে ময়না। সেঝো মিয়ার মেয়ে সে, গ্রামের হিসাবে বিয়ের বয়স পার হয়ে যায়। বাড়ির ছোটদের নিয়ে দৌড়ঝাঁপে জোগাড়যন্ত্র সেরেছে। এবার আলা মিয়া বাড়িতে থাকায় সবাই খুশি। সে থাকলে আসর জমে। দু-মাস পর বাড়ি ফিরেছে সে। কৃষক ঘরের বিবাগী মানুষ আলা। চাষে মন নাই, কখনো যাত্রা দলের সঙ্গে কখনো বা জারি গানের দলের সঙ্গে নিরুদ্দেশ হয়। ফিরে আসে ভিনদেশি গল্প নিয়ে।

চক্র সাজানো হয়েছে নকশি কুলা-ডালায়, তাতে পাটের আঁশ, পিপলের পাতা, কাঁচা হলুদ, হলুদের ফুল, তুলসীপাতা, নিমপাতা, বেতের ডগা, দূর্বা, নারকেলসহ নানা লতাপাতার জোগাড়। মিয়াবাড়ির রাখাল জয়েদ আলী জমিয়ে রাখা তালের আঁটি কেটে ভেতরের শাঁস বের করেছে। বাড়ির সব ছেলেরা বসে আড্ডা-গান আর পাশা খেলবে, এমনকি নারীরাও কেউ কেউ জমায়েত হয়। সারা রাত পাহারা দিতে হবে, আজ বাড়িতে যেন চুরি না হয়।

চোরদের চুরির কারবারির ভূতভবিষ্যৎও আজকের ওপর নির্ভর করে, তাই রাতজাগা এই আসর। চোররা আজ কবরের মাটি চুরি করবে। সে মাটি সিঁধ কাটার আগে যদি গেরস্থের টিনের চালে ছিটিয়ে দেওয়া যায়, তবে নিশ্চিত কবরের লাশের মতো নিশ্চুপ ঘুমে রাত পার করবে গেরস্থ। এসব গল্প গ্রামের কে না জানে। প্রতিবছরই তারা এই আশ্বিনের রাতে আসর জমায়, জোলাভাতি করে। আশ্বিনের রান্না খাবার কার্তিকের সকালে খেয়ে রোগবালাই দূর করে ফলবান হয়ে উঠবে কৃষক। এটাই গাশিশর নিয়ম।

রাত হতেই ছেলেপেলেদের সঙ্গে কুলা হাতে বেরিয়েছে ময়না। তার কালো গায়ে লাল ডোরা দাগের শাড়ি, হাতে মনোহারির লাল বালা। কানে সোনালি রঙের বাউটি। কালো তাগার সঙ্গে একটি মাত্র সোনার ধান তাবিজে পূর্ণিমার আলোয় ঝকমক করে কণ্ঠার হার। আজকে তাকে হেমিলিনের বাঁশিওয়ালার মতো লাগে। সারা বাড়ির সে চক্করে তার সঙ্গে ফেদু, লাইলি, মমেনা, আক্তার ও সিরাজরা। তাদের হাতে নানা অনুষঙ্গ, বাচ্চারা কলাপাতার বাঁশিতে ফুঁ দিতে থাকে। কুলা পেটাতে পেটাতে সুর তোলে—

ভূত আমার পুত,

পেতনি আমার ঝি।

বুকে আছে আল্লা-নবী,

ভূতে করব কী?

ভূত তাড়ানো শেষে হলে হালট ধরে নদীর পাড়ে যেতে যেতে আবার কুলা-ডালায় বাড়ি পড়ে। সম্মিলিত সুরে চলে ছড়া—

গাশিশ জাগো জাগো

ভ্যালা কইরা জাগো

ইঁচার গুদা, ফলসির গুদা

ঢোল বাজাও গ্যা

দক্ষিণ মুরা।

ডুম ডুম করে কুলা-ডালা বাজিয়ে তারা বাড়ির আম-কাঁঠাল-নারকেলগাছের কাছে যায়। যেসব গাছে ফল হয় না তার গোড়ায় পাটের আঁশ বাঁধে। আথালের গাছে পাট বাঁধা শেষ করে দাঁড়াতেই বলাই মাঝির বউকে দেখতে পায় ময়না। বলাইয়ের বউ হাসতে হাসতে বলে, ‘আইলো ময়না, আইজ তোর ঠ্যাঙ্গেও পাট বাইন্ধা দিই। আর বছর গাশিশ আওনের আগে যাতে তোর বিয়ার ফুল ফোটে।’

ময়নার কালো মুখে যে উৎসবের আলো জ্বলে উঠেছিল সেটি সহসা নিভে যায়। ফেদু তা দেখে বলে, ‘জমলা দাদি তুমার এত ঠ্যাহা ক্যান? হেই কি তোমারডা খায় না পরে?’

জমিলা বিদ্রূপের হাসি হাসে, ‘ওলো মাগি, তুই তো দেহি ডাগর হইয়া গ্যাছোস। টরটর কইরা কথা কস।’

মমিনা জমিলাকে প্রায় ধাক্কা দিয়ে বলে, ‘যাও তো তুমি, পোলাপানের পিছনে তোমার এত কী কাম।’

তারা সবাই জমিলাকে পাত্তা না দিয়ে নিজেদের চক্কর শেষ করে। জোলাবাতির রান্নাও শেষ। বাড়ির সব ঘর থেকে মুষ্টির চাল জোগাড় করে তারা জোলাবাতির রান্নায় জরিনাকে বসিয়ে গিয়েছিল। কাল সকালে সবাই এই রান্না খাবে। কিন্তু ময়নার মুখটা সেই থেকে থমথমে।



এবাড়ি-ওবাড়ি ভিন্ন ঘর ভিন্ন চুলা হলেও পূর্ণিমা রাতে চাঁদের আসরের কোনো দ্বিভাজিত আল নেই। উঠোনের একপাশে দাঁড়িয়ে থাকা খড়ের গাদাও শরিক আলো-আঁধারির আসরে। ইতিমধ্যে লোকজন গোল হয়ে বসে যায়, গোল আরও হয়—গোল হয় পূর্ণ বয়স্ক চাঁদ। ময়না দেখে মেঝো মিয়ার বাড়ির লজিং মাস্টার লিয়াকত আসরের কোণে বসা। কয়েক মাস হলো আক্তারকে পড়াতে এ বাড়িতে ঠাঁই করে নিয়েছে সে। ময়না তাকে নদীর ঘাটে নাইতে দেখেছে, কাছারিতে বসে বই পড়তে দেখেছে। চোখাচোখি হলেও কখনো কথা হয় নাই।

সবাই আলা মিয়ার মুখের দিকে চেয়ে। সে চোখ বন্ধ করে বিড়িতে দীর্ঘ টানের জমা ধোঁয়া সমবেত সবার উদ্দেশ্যে ছড়িয়ে গেয়ে ওঠে—

জ্যৈষ্ঠ মাসের বিষুদবারে

বাজানে না আইল...

লাল ভিটার নয়া কাঁঠাল

জামাইয়ে না খাইল...

ও সখী বাজানে না আইল



গান থামিয়ে আলা মিয়া সবার দিকে তাকায়। লিয়াকত আড়ে-আড়ে ময়নাকে দ্যাখে, কালো দেহে সোনার তাবিজ চাঁদের আলোয় ঝকমক করে। আলা খানিক দম নিয়ে বলে, ‘বিষুদবারের পর বিষুদবার যায়...।’ সে এবার গানের রেশ ধরে আখ্যানে ঢোকে, ‘বিষুদবারের পর বিষুদবার যায়, নয়া বউ বেড়ার ফাঁক দিয়ে দ্যাখে বৈঠার টানে একে একে সব কেরাই নাও হঁইটা চইলা যায়। ঘাটে ভেড়ে না। কন্যার মন সারা দিন আইটাই আইটাই করে...এই বুঝি একখান নাও ভেড়ে। কিন্তু না, কোনো নাও সে ঘাটে ভেড়ে না।’

এই পর্যন্ত বলে আলা মিয়া সোজা চেয়ে থাকে আকাশে চাঁদের দিকে।

উপস্থিত সবার চোখে তখন মাটিলেপা উঠান পেরিয়ে বাঁশের বেড়ার ফাঁকে বিষাদগ্রস্ত নয়া বউ ভাসে। আনমনা ময়না দ্যাখে, লজিং মাস্টারের চোখ দুটো তার মুখে কী যেন খুঁজে ফিরছে। কেউ বা ঘোমটার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা বিষাদময় ছবি দেখতে পায়—আলা মিয়ার চিবুকের দিকে তাকিয়ে, জয়েদ আলীর দাড়ির দিকে তাকিয়ে কিংবা খড়ের গাদার আড়ালে, এমনকি চাঁদের দিকে তাকিয়ে কেউ দেখে বিষাদ মুখ!

আসরে বসা ছবির মুন্সি গলা খাঁকারি দেয়—‘আহা রে...।’ তারপর মসৃণ হুঁকো গুড়গুড় শব্দে টানে। হুঁকোর মাথায় আগুন জ্বলে উঠলে সেই আলোয় সবার চোখে ধরা পড়ে আকাশে চাঁদের মুখেও বিষাদের ছায়া, নাওয়ের দুলুনি।

আলা মিয়া সে বিষাদকে বাড়াতেই যেন বউয়ের পরিচয়টা আরও খোলাসা করতে চায়, ‘এক জোষ্টিও যায়নাইকা, কইন্যার বিয়া হইচ্ছে। গ্যাছে বছরও সখীগো লগে নিয়া লাল ভিটায় আম কুড়াইছে, সিঁদুরে আম, কাঁচামিঠ্যা আর গুটিপোকা আম। কইন্যা নিশ্চিত এই বছর লাল ভিডায় কাঁডাল ধরছেই। তার নিজে হাতে লাগানো গাছখান...।’—বলতে বলতে আলা মিয়া সুদূরে তাকায়। তাকে লক্ষ করে সবাই চেয়ে থাকে সুদূরের দিকে। কতক্ষণ...। সবাই কেমন অস্থির হয়ে ওঠে। বাসু মাঝির তর সয় না, বলে, ‘নয়া বিবির তারপর কী হইল?’

লজিং মাস্টার লিয়াকতের চোখ আবার ময়নার চোখে পড়লে মাথা নামিয়ে মাটিতে আঁকিবুঁকি কাটে ময়না। তার মনে হয়, নয়া বউয়ের কষ্টকে সে আঁকড়ে ধরতে পারত! সে ভাবে, ভিন গাঁয়ে বউ হয়ে যাওয়ার সময় আঁচল ভরে মায়া নিয়ে যাবে, নয়া বউয়ের মতো দুঃখে ভাসবে। অস্ফুট স্বরে বলে, ‘আ দুইখঃ!’

আলা মিয়া বলে, ‘নয়া বিবির চোখে জল। বাজানে না আসে। মাচায় বিরাট কোলায় বাদা ধানের হুড়ুম ভরা, কাঁডাল আইলে না মিয়ারে দিবো খাইতে। নয়া বিবির কেবল কাঁডালের হাউস না, হাউসের মইধ্যে হাউস থাকে। আহা রে বাবা-মার আদোইরা কইন্যা...।’—শেষ কথাটার মধ্যে হাহাকারের সুর রেখে, চোখেমুখে প্রচণ্ড কষ্টরেখা এঁকে সবার দিকে তাকায় সে। অনেকের কণ্ঠে তখন অস্ফুট স্বর, ‘আহা রে...।’

দীর্ঘশ্বাসের মতো বিড়িতে টান দিতে দিতে আলা মিয়া বলে, ‘আদোইরা কইন্যা, সবে বিয়া হইচ্ছে, বছরও ঘুরে নাই। কইন্যার মাইরে দেখবার মন চায়, ভাইরে দেখবার মন চায়, সইয়ের লগে গপ্পো করবার মন চায়। মনডা তার আনচান। আহা রে জীবন...।’

মমেনার চোখ টলমল করে, জয়েদ আলীর মুখে গড়িয়ে পড়ে পানি—সবার চোখে জীবন তখন হাহাকারময়। আলা মিয়ার দীর্ঘ উচ্চারণের উপস্থিত সবার চোখে নির্মম বেদনা হয়ে ভেসে বেড়ায় জীবন। ময়নার মনে হয়, আহা রে কী কষ্ট! আলা মিয়া সবার জীবনকে ভাসিয়ে দিয়ে ফিরে যায় নয়া বউয়ের জীবনে।

—‘বাপে না আইলেও বিষুদবারের হাট থিকা নয়া বউয়ের লিগা বাতাসা কিইনা সোয়ামি ঘরে ফিরে।’ মুখে দুষ্টু হাসি টেনে আলা বলে, ‘বউ তখন স্বামী-সোহাগী।’ গেয়ে ওঠে—

আরে না দেইহ্যা ছিলাম ভালো

দেইহ্যা আমার কুল গেল।

‘নয়া বউ সোয়ামিরে দেইখা কুলচিন্তা হারায়। কিন্তু আদর-সোহাগ শ্যাষেও কন্যার চোহে ঘুম নাই। পাশে সোয়ামি নাক ডাইকা ঘুমায়...। হের তহন আবার বাজানের কথা মন হয়।’

এমন বিষাদমাখা নয়া বউয়ের গল্প জমে উঠলেও বাচ্চারা কেউ কেউ ঘুমিয়ে পড়ে। বড়দের কেউ গল্পের বাকি অংশ হয়তো শোনেও না, নিজের দুঃখের ভেলায় ভাসে। কেউ আবার লজ্জায় লাল, কাহিনিতে সোহাগী স্বামীর আগমনে। ময়নার কোলের মধ্যে আক্তার ঘুমিয়ে পড়েছে, তাকে ঘরে দিতে যাবে; কিন্তু নয়া বউয়ের গল্প থেকে উঠতে পারে না। তার পা অবশ হয়ে আসে।

আলা মিয়া বলে, ‘জইষ্টো মাসে শেষদিন বাজানে তার আইলো। নয়া বউয়ের সোয়ামির তখন মাঠের খ্যাত-খামারির কামে রাত-দিন এক কইরা ফ্যালাইছে। মিয়ায় কয়, হেই বর্ষার কালে যাইবো। কন্যার তখন সোয়ামি ছাইড়া একা বাজানের লগে যাইবার মন চায় না, শাশুড়ি-ননদ বুঝাইয়া তারে নাওয়ে তুইলা দেয়।’

ময়না আক্তারকে ঘরে নিয়ে যায়। ফিরতি পথে ভাইজানের ঘরের পাশে মেঝো মিয়ার ঘর। দুই ঘরের মাঝখানে যে ফান্দি, তার মধ্যে দিয়ে উঠানে আসতেই কার যেন ছায়া—ছায়া দেখা যায়। ময়নার ভয় ভয় লাগে, চোর না তো! ভীত কণ্ঠে সে বলে, ‘ক্যাডা?’

ছায়া কাছে আসে, ময়না দু-পা পেছায়। ছায়া বলে, ‘চমকাইছোনি? আমি, আমি...লিকত।’

ময়না চিনতে পারে লজিং মাস্টারকে। লিয়াকত হাসতে হাসতে বলে, ‘নয়া বউয়ের দুঃখ সইবার পারবা?’

লজ্জায় মাথা নত করে ময়না। কানের কাছে মুখ নিয়ে লিয়াকত ফিসফিস করে, ‘আমাগো বাড়ির নয়া বউ হইবা?’

ময়না দৌড়ে পালায়। সে আসরে ফেরে না। ঘরে এসে বিছানায় শুয়ে পড়ে। তার মা শুয়েছিল, তখনো ঘুমায়নি, আসর না ভাঙতেই ময়নাকে ফিরতে দেখে আবাক হয় সে! বলে, ‘ফাত কইরা হাইডা আইলি? কী হইছে?’

—‘আলা ভাই নয়া বউয়ের কষ্টের কথা হুনাইলো।’

—‘ধুর পাগলি, হেইয়া তো গপ্পো।’

ময়না কিছু বলে না, তার ইচ্ছা করে আকাশে উড়াল দিতে। জানালার আর্শিতে দেখে পূর্ণিমার চাঁদের বুকে লিয়াকতের মুখ। সে চোখ বোজে, কানে বাজে—নয়া বউয়ের দুঃখ সইবার পারবা?

No comments

Powered by Blogger.