জনগণ কি এবার গণতান্ত্রিক সংবিধান পাবে?

নেপালে একটি ভোটকেন্দ্রে অপেক্ষমাণ ভোটার
পাশের দেশ নেপালে ১৯ নভেম্বর গণপরিষদের নির্বাচন হলো। জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে পার্লামেন্টারি ধাঁচের সরকারব্যবস্থা নেপালে কয়েক দশক ধরে চালু থাকলেও দেশটিতে এখন পর্যন্ত সংবিধান চালু করা যায়নি। পাঁচ বছরের ব্যবধানে এটা দ্বিতীয় গণপরিষদ নির্বাচন। ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত প্রথম গণপরিষদের মেয়াদ ছিল দুই বছর। ওই সময়ের মধ্যে সংবিধান তৈরি করা যায়নি। গণপরিষদ তার মেয়াদ বাড়িয়েছিল আরও দুই বছর।
এর মধ্যে সরকার বদল হয়েছে পাঁচবার। চারজন প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন। কিন্তু সংবিধান লেখা হয়নি। এবার অনুষ্ঠিত হলো দ্বিতীয় গণপরিষদ নির্বাচন। অন্তর্বর্তী সংবিধান অনুযায়ী নবনির্বাচিত গণপরিষদকে এক বছরের মধ্যে সংবিধান তৈরি করতে হবে। তারপর গণপরিষদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আইনসভায় রূপান্তরিত হবে। নেপালের রাজনৈতিক ব্যবস্থা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের চেয়ে আলাদা। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা এখানে হোঁচট খেয়েছে বারবার। শত শত বছর ধরে চলে এসেছিল নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র। কখনো রানা পরিবার, কখনো বা শাহ পরিবারের বংশানুক্রমিক শাসন। বহুদলীয় ব্যবস্থায় প্রথম সাধারণ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হয় রাজা মহেন্দ্রর আমলে, ১৯৫৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি। ১০৯টি আসনের মধ্যে নেপালি কংগ্রেস পেয়েছিল ৭৪টি, গোর্খা পরিষদ ১৯টি এবং কমিউনিস্ট পার্টি নয়টি। নেপালি কংগ্রেসের নেতা বি বি কৈরালা প্রধানমন্ত্রী নিযুক্ত হন। নির্বাচনের আগে রাজা নিজেই একটি সংবিধান জারি করেছিলেন।
সেই সংবিধানে দেওয়া ক্ষমতাবলে তিনি দুই বছর পার না হতেই কৈরালার সরকার বাতিল করে দেন। এরপর রাজা স্থানীয় সরকারভিত্তিক পঞ্চায়েতব্যবস্থা চালু করেন। বহুদলীয় ব্যবস্থা লোপ পায়। সেই থেকেই নেপালে বহুদলীয় গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন চলছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে যখন মুক্তিযুদ্ধ চলছে, নেপালে তখন দলীয় রাজনীতি নিষিদ্ধ। ভারতীয় কর্তৃপক্ষের দেওয়া একটি অস্ত্রের চালান তখন নেপালি কংগ্রেসের মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে আসে। মুক্তিযুদ্ধে নেপালের জনগণের অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে কিছুদিন আগে নেপালের কয়েকজন বিশিষ্ট রাজনীতিককে মুক্তিযুদ্ধ সম্মাননা দিয়ে বাংলাদেশ সরকার কৃতজ্ঞতা জানিয়েছে। এটা নেপালি জনগণের প্রাপ্য ছিল। ১৯৯০ সালে নেপালে বহুদলীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা পুনরুদ্ধারের জন্য জোরদার গণ-আন্দোলন হয়। বীরেন্দ্র বিক্রম শাহ তখন রাজা। আন্দোলনের মুখে ১৯৯০ সালের ১৫ এপ্রিল পঞ্চায়েতরাজ শেষ হয়। একটা অন্তর্বর্তী সংবিধান চালু হয়, প্রবর্তিত হয় সাংবিধানিক রাজতন্ত্র। সাধারণ নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হয় দুবার। ২০০১ সালে রাজা বীরেন্দ্র রহস্যজনকভাবে সপরিবারে নিহত হলে তাঁর সহোদর জ্ঞানেন্দ্র সিংহাসনে বসেন। এর আগেই, অর্থাৎ ১৯৯৬ সালেই নেপালের কমিউনিস্ট পার্টিতে ভাঙন ধরেছিল এবং পুষ্পকমল দহলের নেতৃত্বে একদল তরুণ রাজতন্ত্রের পুরোপুরি উচ্ছেদসহ নানা দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করেছিলেন। দহল ‘প্রচণ্ড’ নামেই পরিচিত। ২০০৬ সালের ৭ নভেম্বর প্রচণ্ডর নেতৃত্বাধীন মাওবাদী কমিউনিস্ট পার্টি এবং অন্য সাতটি রাজনৈতিক দলের মধ্যে ছয় দফা সমঝোতা হয়। গণ-আন্দোলনে রাজা জ্ঞানেন্দ্র পিছু হটতে বাধ্য হন।
মাওবাদীরা ১০ বছরের সশস্ত্র লড়াই থেকে সরে আসেন। ২০০৮ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি সাধারণ নির্বাচনের মাধ্যমে প্রথম গণপরিষদের অভ্যুদয় ঘটে। গণপরিষদ প্রথমেই রাজতন্ত্রের অবসান ঘটায়। রাজপ্রাসাদকে জাদুঘর বানিয়ে দেয় এবং ক্ষমতাচ্যুত রাজাকে আয়কর দিতে বাধ্য করে। এরপর নেপালে আসে আরও বড় পরিবর্তন। ‘হিন্দু রাজ্য’ থেকে নেপাল রূপান্তরিত হয় একটা সেক্যুলার ফেডারেল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়। নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে প্রচণ্ডের নেতৃত্বে সরকার প্রতিষ্ঠিত হলেও দলগুলোর মধ্যে আড়াআড়ি লেগেই ছিল। অন্তর্বর্তী সংবিধানে বলা ছিল, সবকিছুই হবে ঐকমত্যের ভিত্তিতে। প্রচণ্ডের প্রস্তাব অনুযায়ী দুই-তৃতীয়াংশ গণপরিষদ সদস্যের ভোটে সংবিধান পাস করার নিয়ম গৃহীত হয়। তার পরও সংবিধানের ব্যাপারে একমত হওয়া যায়নি। ফলে গণপরিষদ ভেঙে দেওয়া হয় বছর খানেক আগে। নতুন গণপরিষদ তৈরি হতে যাচ্ছে। দেখা যাক, এবার সংবিধান তৈরি হয় কি না। ৬০১ সদস্যবিশিষ্ট নেপালের গণপরিষদে প্রত্যক্ষ ভোটের মাধ্যমে ২৪০ জন নির্বাচিত হন। এ ছাড়া নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলগুলো প্রদত্ত ভোটের সমানুপাতিক হারে প্রতিনিধিত্ব পায়। এ রকম প্রতিনিধির সংখ্যা ৩৩৫। নির্বাচিত গণপরিষদ নাগরিক সমাজের মধ্যে থেকে বাকি ২৬ জনকে মনোনীত করে। দলগুলোকে আগে থেকেই প্রতিনিধিদের তালিকা জমা দিতে হয়।
সমানুপাতিক প্রতিনিধিদের মধ্যে নির্দিষ্টসংখ্যক মহিলা, বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ও নিম্নবর্ণের মানুষের প্রতিনিধি থাকতে হয়। দলগুলো যে তালিকা জমা দেয়, তার মধ্য থেকেই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে প্রতিনিধি মনোনীত হন। সুতরাং প্রত্যক্ষ ভোটে কোনো দল যদি একটি আসনও না পায়, সমানুপাতিক ভোটের পদ্ধতিতে তারাও কিছু আসন পেতে পারে। এ জন্য দুটো পৃথক ব্যালট ব্যবহার করা হয়, একটা প্রত্যক্ষ নির্বাচনের জন্য এবং অন্যটা সমানুপাতিক পদ্ধতিতে দলের জন্য। নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের সংখ্যা ১২৪। নির্বাচনের প্রাথমিক ফলাফলে দেখা যায়, ২৪০ আসনের মধ্যে নেপাল কংগ্রেস পেয়েছে ১০৫টি, কমিউনিস্ট পার্টি-মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী (ইউএমএল নামেই পরিচিত) ৯১টি এবং মাওবাদীরা ২৬টি। অন্য সব দল মিলে পেয়েছে ১৮টি। মাওবাদীরা ২০০৮ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও এবার তাদের বিপর্যয় হয়েছে। এর প্রধান কারণ, দলের বিভক্তি। এর আগে ৯৪ জন গণপরিষদ সদস্য নিয়ে মাওবাদী নেতা মোহন বৈদ্য আলাদা হয়ে যান। সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে একটি আমলানির্ভর কেয়ারটেকার সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। মোহন বৈদ্যের দল এবং আরও ৩২টি ছোট ছোট দলের একটা মোর্চা নির্বাচন বর্জন করে।
তারা বোমাবাজিও করে। নির্বাচনের আগে থেকেই তারা হরতাল ডাকে। কিন্তু নেপালের বিপুলসংখ্যক নাগরিক হরতাল উপেক্ষা করে নির্বাচন কেন্দ্রে উপস্থিত হয়ে ভোট দেন। ভোট প্রদানের হার ছিল ৭০ শতাংশের ওপর। নির্বাচনে বিপর্যয়ের পর মাওবাদী নেতা প্রচণ্ড সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচনে ‘আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র’ ও ‘ভোট কারচুপি’র অভিযোগ তোলেন এবং ভোট গণনা থেকে তাঁর দলের প্রতিনিধিদের প্রত্যাহার করে নেন। এটা সম্ভবত এই অঞ্চলের নষ্ট রাজনৈতিক সংস্কৃতি। জিতে গেলে সবই ঠিক, আর হেরে গেলে কারচুপির অভিযোগ। প্রচণ্ডের অভিযোগ কেউ পাত্তা দেননি। নির্বাচন উপলক্ষে নেপালে বিদেশ থেকে অনেক পর্যবেক্ষক এসেছিলেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কার্টার সেন্টার, এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশন এবং নেপাল ইলেকশন অবজারভেশন কমিটির আমন্ত্রণে আসা পর্যবেক্ষকদের দল। সবাই বলেছে, নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ, সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। জিমি কার্টার স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন। তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, এবারের নির্বাচন আগের নির্বাচনের চেয়েও নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ হয়েছে। এর পরপরই প্রচণ্ড কার্টারের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর সুর নরম হয়ে পড়ে। তিনি দাবি তোলেন, দুই-তৃতীয়াংশ ভোটে সংবিধান তৈরি ও সরকার গঠনের অন্তর্বর্তী সংবিধানের ধারাটি বাতিল করে ঐকমত্যের ভিত্তিতে সব সিদ্ধান্ত নেওয়ার ধারাটি পুনর্বহাল করতে হবে। তিনি আরও বলেন, তিনি পুনর্নির্বাচন চাচ্ছেন না, এটি সুষ্ঠু পর্যালোচনা ও তদন্ত হতে হবে।
প্রচণ্ড দুটো আসনে দাঁড়িয়েছিলেন, একটিতে হেরে যান। অন্যটিতে তিনি মাত্র ৯০০ ভোটের ব্যবধানে জয় পান। মাওবাদীরা নির্বাচনে কম আসন পেলেও তারা নেপালের রাজনীতিতে অনেকগুলো নতুন বিষয় নিয়ে এসেছিল এবং প্রচলিত ধারার রাজনীতিকে চ্যালেঞ্জ করে অনেক আশার সঞ্চার করতে সক্ষম হয়েছিল। বিশেষ করে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, নিম্নবর্ণের মানুষ, অবহেলিত অঞ্চল এবং মহিলাদের প্রতিনিধিত্বের ব্যাপারে তাদের ভূমিকা ছিল জোরালো। সমানুপাতিক ভোটের গণনা এখনো চলছে। এখানেও নেপালি কংগ্রেস এগিয়ে। তারপর ইউএমএল এবং অনেক পেছনে মাওবাদীরা। কংগ্রেস ছোট ছোট দক্ষিণপন্থী দল নিয়ে সরকার গঠন করতে পারে অথবা টেকসই সরকারব্যবস্থার জন্য কংগ্রেস এবং ইউএমএলের জোট সরকারও হতে পারে। এখনই নিশ্চিত করে কিছু বলা যাচ্ছে না। নেপালের বড় দলগুলোতে গোষ্ঠীগত কোন্দল ব্যাপক। কংগ্রেস নেতা সুশীল কৈরালা ও শের বাহাদুর দেউবার মধ্যে প্রধানমন্ত্রিত্বের পদ নিয়ে বিরোধ আছে। ইউএমএলের মধ্যে প্রধানমন্ত্রিত্বের দাবিদার তিনজন: জালানাথ খানাল, মাধব কুমার নেপাল ও কেপি ওলি। দেখা যাক, শেষমেশ ঘটনা কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়। তবে নির্বাচনে জনগণের অংশগ্রহণের যে ব্যাপকতা ও আগ্রহ দেখা গেছে, তাতে গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থার ওপর তাঁদের আস্থাই প্রমাণ করে। রাজনৈতিক নেতৃত্ব সেই আস্থার প্রতি সম্মান দেখাবেন, সবাই এটাই আশা করেন।
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক। নেপালের নির্বাচনে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
mohi2005@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.