দুই দু’গুণে পাঁচ-শাস্তির স্বরূপ by আতাউর রহমান

নব্বইয়ের দশকের প্রারম্ভে আমি যখন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অন্যতম পরিচালকের দায়িত্ব পালনে রত, সে সময়কার একটি ঘটনার উল্লেখ করে এবারের ‘দুই দুগুণে পাঁচ’ শুরু করতে চাই। সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় থেকে প্রধানমন্ত্রীর অনুমোদনার্থে সবুজ বর্ণের কাগজে সংশ্লিষ্ট সচিব ও মন্ত্রীর সহি-স্বাক্ষরসমেত যেসব সারসংক্ষেপ প্রেরিত হয়, সেগুলো


পরীক্ষান্তে হ্যাঁ-নাসূচক মন্তব্য সহকারে সংশ্লিষ্ট মহাপরিচালক ও মুখ্য সচিব হয়ে প্রধানমন্ত্রীর বরাবরে পেশ করাটাই ওখানকার পরিচালকদের প্রধান কাজ।
সেবার সংস্থাপন মন্ত্রণালয় থেকে একটি সারসংক্ষেপ এল—‘বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারভুক্ত একজন ইউএনও তথা উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাঁর উপজেলায় এসএসসি ফাইনাল পরীক্ষা পরিচালনার সার্বিক দায়িত্বে থাকাকালে নিজের এক ছেলের সব খাতা বদলিয়ে তাকে বোর্ডে দ্বিতীয় এবং অপর ছেলেকে সিক বেডে আলাদা কক্ষে পরীক্ষা দিইয়ে দশম স্থান অধিকার করিয়েছেন। পরে নিরপেক্ষ তদন্তে সেটা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিতও হয়েছে, অতএব শাস্তিস্বরূপ তাঁর বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি দুই বছরের জন্য স্থগিত করা হোক।’ সবাই জানেন, সরকারের শাস্তি হচ্ছে দুই ধরনের—লঘুদণ্ড ও গুরুদণ্ড। সতর্কীকরণ, বেতন বৃদ্ধি স্থগিতকরণ ইত্যাদি হচ্ছে লঘুদণ্ড; আর পদাবনতি, চাকরিচ্যুতি ইত্যাদি হচ্ছে গুরুদণ্ড।
বাংলা ভাষায় একটা কথা আছে, জাতের পাশ গাধায়ও টানে, আর সংস্থাপন মন্ত্রণালয়ে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের প্রাবল্য সব সময়ই পরিলক্ষিত হয়; বোধকরি সে কারণেই এমন একটি জঘন্য অপরাধের বিপরীতে লঘুদণ্ডের প্রস্তাব করা হয়ে থাকবে। কিন্তু বিবেকের তাড়নায় আমি সেদিন নথিতে লিখতে বাধ্য হয়েছিলাম, ‘রক্ষক যেখানে ভক্ষক সাজেন, সেখানে অনুকম্পা দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। তাঁর ওপর দায়িত্ব ছিল পুরো উপজেলায় যেন পরীক্ষাটা সুষ্ঠুভাবে সম্পাদিত হয়, কাজেই অন্য কেউ হলেও হয়তো কথা ছিল, কিন্তু তাঁকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়া দরকার। আমার বিবেচনায় নিদেনপক্ষে তাঁর শাস্তি হওয়া উচিত চাকরিচ্যুতি।’ এবং সেটাই শেষমেশ অনুমোদিত হয়েছিল। ঘটনাটা আমি গত ফেব্রুয়ারির বইমেলায় প্রকাশিত আমার আত্মজীবনীমূলক জীবনস্মৃতি ও জীবনরঙ্গ গ্রন্থেও অপরাপর বিষয়ের সঙ্গে বর্ণনা করেছি; কৌতূহলী পাঠক সেটা পড়ে দেখতে পারেন।
ঘটনাটা প্রথমেই উল্লেখ করার কারণ হচ্ছে এই যে, সম্প্রতি পত্রিকায় বেরিয়েছে, একজন পুলিশ অফিসারকে দৃশ্যত বেআইনি কাজের জন্য সাময়িকভাবে বরখাস্ত করার পরই সেটা তুলে নেওয়া হয়েছে এবং বরখাস্তের সময়কে ডিউটি বলেও গণ্য করা হয়েছে। পত্রিকায় প্রতিবেদনের শেষ বাক্যটি ছিল, ‘তিনি একটি বিশেষ জেলার বাসিন্দা।’ ইঙ্গিতটা নিঃসন্দেহে অর্থবহ, এর অধিক আমি কিছুই বলতে চাই না। কেননা আমি একজন রম্যলেখক, মানুষকে বিমল আনন্দ দেওয়াটাই আমার মূল লক্ষ্য থাকে। কিন্তু সমাজ-সচেতনতাহেতু মাঝেমধ্যে একটু ‘সুগার কোটেড কুইনাইন’ পরিবেশন করতে হয়, তবে কুইনাইনের পরিমাণ বেশি হয়ে গেলে সমূহ ক্ষতির আশঙ্কা—সেটা আমার দিক থেকে যেমন, পত্রিকার প্রকাশকদের দিক থেকেও তেমন। অতএব, ‘সাধু সাবধান’ হতে হয় বৈকি!
সে যাকগে, এবারে মূল লক্ষ্যে মনোনিবেশন করি। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ‘শাস্তি’ শীর্ষক গল্পে তাঁর নিজস্ব অনবদ্য গদ্যশৈলীতে কী সুন্দর দেখিয়েছেন, দিনমজুর ছিদামের যুবতী স্ত্রী চন্দরা অনেকটা স্বামীর প্রতি অভিমানবশেই ভাসুর দুখিরামের স্ত্রী-হত্যার দায় নিজের কাঁধে তুলে নিয়ে চরম তথা ফাঁসির যূপকাষ্ঠে দাঁড়াতে কুণ্ঠাবোধ করেনি। আর ‘দণ্ড’ শব্দটা নিয়ে তিনি যে একবার রগড় করেছিলেন, সেটাই বা কম চিত্তাকর্ষক কিসে! শান্তিনিকেতনের আম্রকুঞ্জে ভক্তবৃন্দ পরিবেশিত হয়ে রবীন্দ্রনাথ বসে আছেন এবং প্রত্যেকের কুশলাদি জিজ্ঞেস করছেন। হঠাৎ তিনি গম্ভীর হয়ে বললেন, ‘ও, নেপাল বাবু আছেন দেখছি! আজকাল আপনার খুব ভুল হচ্ছে, এ জন্য আপনাকে দণ্ড পেতে হবে।’ এই বলে কবিগুরু গম্ভীর মুখে আসর ত্যাগ করলেন। তখন শুধু নেপালচন্দ্রই নন, উপস্থিত সবাই সচকিত হয়ে উঠলেন। কবিগুরু যে এভাবে কাউকে সরাসরি শাস্তি দেওয়ার কথা বলতে পারেন, এটা ছিল তাঁদের ধারণার অতীত। নেপালবাবুকে সবাই ‘কী ঘটেছিল’ প্রশ্ন করতে লাগলেন, আর তিনি অসহায়ের মতো কেবলই ঘাড় নাড়াতে থাকলেন। হঠাৎ রবীন্দ্রনাথকে একটি লাঠি হাতে নিয়ে আসতে দেখে সব গুঞ্জন থেমে গেল। রবীন্দ্রনাথ ধীর অথচ দৃঢ় পদক্ষেপে নেপালচন্দ্রের কাছে এসে বললেন, ‘গতকাল আপনি ভুলে ফেলে গিয়েছিলেন, এই নিন আপনার দণ্ড।’ বলাই বাহুল্য, ‘লাঠি’ শব্দের প্রতিশব্দও হচ্ছে ‘দণ্ড’।
অবশ্য দণ্ডের রকমফেরও আছে: স্বামী-স্ত্রীতে খোশগল্প হচ্ছিল। একপর্যায়ে স্বামী বললেন, ‘কেউ চুরি করে কিছু করলে তাকে একদিন না একদিন শাস্তি পেতেই হয়।’ শুনে স্ত্রী ফোঁড়ন কাটলেন, ‘তা তুমি যে বিয়ের আগে চুরি করে আমার হাতে চুমু খেতে, তার বেলায়?’
‘সে জন্য এখন তো শাস্তি ভোগ করছিই’, স্বামী একগাল হেসে প্রত্যুত্তর করলেন।
আমার বাবা প্রায়শই বলতেন, ‘শাস্তি দুই ধরনের—মাল্-ই ও বদন্-ই।’ ‘মাল’ হচ্ছে ফারসি শব্দ, যেটার অর্থ ধনসম্পদ এবং বাংলা ভাষায়ও শব্দটা আমরা একই অর্থে ব্যবহার করে থাকি; ‘বদন’ শব্দটাও ফারসি, যেটার অর্থ হচ্ছে ‘শরীর’। তার মানে, অপরাধের শাস্তি দুই ধরনের হতে পারে—আর্থিক ও শারীরিক। আর একসঙ্গে উভয় প্রকার শাস্তি দেওয়া বাঞ্ছনীয় নয়। বোধকরি এ কারণেই হাকিম সাহেবরা রায় দিয়ে থাকেন—‘এত টাকা জরিমানা, অনাদায়ে এত মাসের কারাদণ্ড।’
একজন লোকের কারাদণ্ড হয়েছে। সে কারাগারে পৌঁছানোর পর অপরাপর কয়েদিরা তাকে সাদর অভ্যর্থনা জানিয়ে বলতে লাগল, ‘আশা করি তোমার নিকটাত্মীয়রা তোমাকে দেখতে এখানে আসবেন।’ ‘সেটার প্রয়োজন পড়বে না।’ লোকটি তড়িঘড়ি জবাব দিল, ‘ওরা আগে থেকেই এখানে আছে।’
এক্ষণে তাহলে মুসলিম সাহিত্যভান্ডার থেকে এ সম্পর্কিত দুটো মজার উপাখ্যান উপস্থাপন করি: এক. হরমুজান নামে একজন ঘোরতর অপরাধী গভর্নরকে ইসলামের দ্বিতীয় খলিফা হজরত ওমর (রা)-এর সামনে বন্দী হিসেবে নিয়ে আসা হলে তিনি তাঁকে কতল (হত্যা) করার আদেশ দিলেন। দণ্ড বাস্তবায়নের প্রাক্কালে হরমুজান পানি পান করতে চাইলে তাঁকে একটি পাত্রে পানি দেওয়া হলো। কিন্তু তিনি আসন্ন মৃত্যুভয়ে থরথর করে কাঁপছিলেন বিধায় পাত্রটি ভালোভাবে আঁকড়ে ধরে পানি পান করতে পারছিলেন না, এটা লক্ষ করে খলিফা তাঁকে আশ্বস্ত করলেন যে, সে পাত্রের পানি খাওয়া সম্পন্ন না করা পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করা হবে না। হরমুজান সঙ্গে সঙ্গে কাপের সমস্ত পানি মাটিতে ফেলে দিয়ে খলিফাকে উদ্দেশ করে বললেন, ‘আমিরুল মুমিনিন, আপনি এখন আপনার প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ না করে আমাকে কতল বলতে পারবেন না।’ খলিফা ওমর (রা) ফাঁদে পড়ে তাঁকে মুক্তি দিতে বাধ্য হলেন।
দুই. পারস্য সম্রাট নওশেরওয়া একদিন যখন রাতের খাবার খাচ্ছিলেন, তখন খাবার পরিবেশনরত জনৈক দাস ভুলক্রমে খানিকটা ঝোল তাঁর মহামূল্যবান পোশাকের ওপর ফেলে দিয়েছিল। সম্রাট রোষকষায়িত নয়নে তাকাতেই দাসটি মাংসের ঝোলসমেত পুরো ডিশটাই সম্রাটের পোশাকের ওপর উপুড় করে ফেলে দিল। বিস্ময় ও ক্রোধের ঘোর কাটার পর নওশেরওয়া দাসটিকে এবংবিধ আচরণের কারণ জিজ্ঞেস করলে প্রত্যুত্তরে সে যা বলল, তাতে তো সম্রাটের হতবিহ্বল হয়ে যাওয়ার অবস্থা।
দাস বলতে লাগল, ‘মহান বাদশাহ, আপনার রক্তচক্ষু দেখে আমি বুঝতে পারছিলাম, আপনি আমার অপরাধের জন্য শূলে চড়াবেনই। কিন্তু আমি ভাবলাম, লোকে মনে মনে আপনাকে অবিচারের জন্য অভিযুক্ত করবে, বলবে যে পোশাকে ভুলক্রমে সামান্য ঝোল ফেলার অপরাধে আপনি একজন ভৃত্যকে শূলে চড়ালেন। এ জন্য আমি ইচ্ছাকৃতভাবে পরবর্তী সময় বেয়াদবিটা অর্থাৎ আরও বড় অপরাধ করলাম, যাতে করে আমাকে শূলে চড়ালে পরে লোকে আপনাকে নির্দয় কিংবা অন্যায়কারী বাদশাহ না বলে।’ সম্রাট হেসে ফেলে দাসকে ক্ষমা করে দিলেন।
আতাউর রহমান: রম্যলেখক। ডাক বিভাগের সাবেক মহাপরিচালক।

No comments

Powered by Blogger.