হাওয়াই ড্রাইভ by ফেরদৌস আহমেদ

একসময় হয়তো আমাদের পরের প্রজন্মকে গল্প শোনাতে হবে, কীভাবে আমাদের জীবন চলত ক্লাউড কম্পিউটিংয়ের আগের জামানায়, যখন এক কম্পিউটার থেকে আরেক কম্পিউটারে তথ্য আদান-প্রদানের জন্য সিডি, মেমোরি কার্ড বা ইউএসবি ফ্ল্যাশ ড্রাইভ ব্যবহার করা হতো।


এ পদ্ধতিকে বলা হয় স্নিকারনেট, যেখানে ডিজিটাল তথ্য আদান-প্রদানের জন্য বাস্তব কোনো মাধ্যম বা যন্ত্রপাতির প্রয়োজন হয়। এসব তাদের কাছে আষাঢ়ে গল্পের মতো শোনাবে। কারণ, তত দিনে সব ধরনের ডিজিটাল তথ্যই ক্লাউডের মাধ্যমে আদান-প্রদান করা হবে। যদিও এখন পর্যন্ত ক্লাউডে তথ্য সংরক্ষণ(স্টোরেজ) খুব বেশি জনপ্রিয় হয়ে যায়নি, তবে বেশ কয়েকটি ক্লাউড স্টোরেজ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান বিনা মূল্যে নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্লাউড স্টোরেজ ব্যবহারকারীদের ব্যবহারের সুযোগ দিচ্ছে। এর মাধ্যমে একজন ব্যবহারকারী তার প্রয়োজনীয় ফাইল ইন্টারনেটে একটি নিদিষ্ট সার্ভারে সংরক্ষণ করতে পারে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী তা যেকোনো স্থান থেকে সেগুলো ব্যবহার করতে পারে। তবে যে কম্পিউটার থেকে ফাইল খুলবে, তাতে অবশ্যই ইন্টারনেট সংযোগ থাকতে হবে। বর্তমানে অনেক ব্যবহারকারীই তাদের পোর্টেবল হার্ডডিস্ক বা ফ্ল্যাশ ড্রাইভের পাশাপাশি ক্লাউড স্টোরেজ ব্যবহার করছে। এর সুবিধা হলো, বহনযোগ্য হার্ডডিস্ক বা ফ্ল্যাশড্রাইভ কম্পিউটারের সঙ্গে সংযোগ দিলে তা আপনা-আপনি ক্লাউড স্টোরেজের সঙ্গে সংযুক্ত হয়ে ফাইল হালনাগাদ করে নেয়। ফলে দুটি স্থানে ব্যবহারকারীর তথ্য সুরক্ষিত থাকে। কোনো কারণে হার্ডডিস্ক ফ্ল্যাশ ড্রাইভ ইত্যাদি নষ্ট বা হারিয়ে গেলে তা নিয়ে চিন্তায় পড়তে হয় না।

গুগল ড্রাইভ
গুগল ড্রাইভ গুগলের ক্লাউড স্টোরেজ, এটি ব্যবহার করার জন্য www.drive.google.com ঠিকানার ওয়েবসাইট থেকে একটি সফটওয়্যার নামিয়েনিয়ে (ডাউনলোড) ইনস্টল করতে হবে। যাঁরা ইতিমধ্যেই গুগল ডক ব্যবহার শুরু করেছেন, তাঁদের জন্য গুগলের এ নতুন অপশনটি অত্যন্ত আকর্ষণীয়। কোনো বড় ফাইল কারও সঙ্গে ই-মেইলের মাধ্যমে শেয়ার না করে গুগল ডকের মাধ্যমে শেয়ার করলে তা ব্যবহার করা সহজ হয়ে যায়। ফলে বারবার ই-মেইল চালাচালির ঝামেলা থাকে না। এখন গুগল ড্রাইভের মাধ্যমে বড় বড় ফাইল সহজেই গুগল ড্রাইভের মাধ্যমে শেয়ার করা যাবে এবং এগুলো গুগল ডক অনলাইনে এক্সেস করা যাবে। এ ছাড়া ছবি আদান-প্রদানের জন্য গুগলের পিকাসা ওয়েব অ্যালবাম এবং গুগল প্লাস তো রয়েছেই। গুগল মিউজিকে ২০ হাজার পর্যন্ত গান অনলাইনে রাখা যায় এবং যেকোনো কম্পিউটার বা অ্যান্ড্রয়েড ডিভাইস থেকে সেগুলো শোনা যায়। গুগল ডকের মাধ্যমে অনলাইনে ফাইল শেয়ার এবং কোলাবরেট করা যায়। এর একটি চমৎকার অপশন হলো এটি অফলাইনেও ব্যবহার করা যায়। ফলে কোনো ব্যবহারকারীর তাৎক্ষণিক ইন্টারনেট ব্যবহারের অপশন না থাকলেও সে অফলাইনে কাজ সম্পন্ন করে পরে, অনলাইনে শেয়ার করতে পারে। এবং গুগল ডকের মজা হলো এতে সম্পাদনা করা কোনো ডক, প্রেজেনটেশন বা স্পের্ডশিটের ৩০ দিন আগের সংস্করণে ফিরে যেতে পারে। গুগল ড্রাইভ ৩০টির অধিক ফাইল ফরম্যাট শনাক্ত করতে পারে তার ব্রাইজার থেকে এবং যদি গুগল নির্দিষ্ট ফাইলের ফরম্যাট শনাক্ত করতে না পারে তবে তা গুগলের নিজস্ব ফরম্যাটে পরিবর্তন করে ক্লাউডে সংরক্ষণ করে। গুগলের এসব সুবিধা পিসি এবং ম্যাক কম্পিউটার ব্যবহারকারীরা ব্যবহার করতে পারবে।
গুগল ড্রাইভে ঢোকার জন্য গুগল বা জিমেইল ঠিকানার প্রয়োজন হবে। প্রাথমিকভাবে গুগল বিনা মূল্যে পাঁচ গিগাবাইট জায়গা দিচ্ছে ব্যবহারকারীদের।

মাইক্রোসফট স্কাইড্রাইভ
মাইক্রোসফটের দাবি অনুযায়ী, মাইক্রোসফট স্কাইড্রাইভ এ পর্যন্ত সবচেয়ে কার্যকর অনলাইন স্টোরেজ ব্যবস্থা (www.skydrive.com)। এর মাধ্যমে স্টোরেজ, অনলাইন ফাইল এক্সেস, কোলাবরেশন, নোট টেকিং, ছবি স্লাইড শো ফাইল শেয়ারিং করা যায়। স্কাইড্রাইভ ব্যবহারকারীদের বিনা মূল্যে সাত গিগাবাইট পর্যন্ত জায়গা দিয়ে থাকে। মাইক্রোসফটের মতে, এই পরিমাণ জায়গা ৯৯ শতাংশ ব্যবহারকারীর জন্য পর্যাপ্ত। যদি কোনো ব্যবহারকারীর আরও জায়গার প্রয়োজন হয় তবে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফির বিনিময়ে তা পাওয়া যাবে। স্কাইড্রাইভ ওয়েভ পিসি এবং ম্যাক অপারেটিং সিস্টেম সমর্থন করে। এ ছাড়া উইন্ডোজ ফোন, আইফোন এবং আইপ্যাডের জন্য স্কাইড্রাইভ অ্যাপস রয়েছে। এসব সুবিধা পেতে হলে অবশ্যই একজন ব্যবহারকারী উইন্ডোজ লাইভ আইডি থাকতে হবে। স্কাইড্রাইভ একটি বড় সুবিধা হলো এটি দিয়ে অনলাইনে মাইক্রোসফট অফিসের সব সুবিধা পাওয়া যায়। ফলে একজন ব্যবহারকারী যে অপারেটিং সিস্টেমই ব্যবহার করুক না কেন, সে বিনা মূল্যে অনলাইনে মাইক্রোসফট অফিসের বেশ কিছু সুবিধা পাবে। এ ছাড়া এখানেও গুগল ডকের মতো অফলাইনে কাজ করে তা অনলাইলে আপলোড করে তাতে কাজ করা যাবে এবং বিভিন্ন সংস্করণে ফিরে যাওয়া যাবে। মাইক্রোসফট অফিস ব্যবহারকারীদের জন্য এটি একটি চমৎকার অপশন।

ড্রপবক্স
www.dropbox.com-কে মোটামুটি সবচেয়ে পুরোনো অনলাইন স্টোরেজ বলা যায়। ড্রপবক্স একটি বড় সুবিধা হলো এটি উইন্ডোজ, ম্যাক ও লিনাক্সসহ প্রায় ধরনের অপারেটিং সিস্টেম এবং মোবাইল ডিভাইসে কাজ করে। মোবাইল ডিভাইসের ফাইল ব্যাকআপের জন্য অনেকেই ড্রপবক্স ব্যবহার করে থাকে। একজন ব্যবহারকারীকে প্রথমে দুই গিগাবাইট স্টোরেজ দিয়ে শুরু করতে হয় এবং অন্য একজন ব্যবহারকারী যদি তার মাধ্যমে ড্রপবক্স ব্যবহার শুরু করে, তবে সে ৫০০ মেগাবাইট করে অতিরিক্ত জায়গা পাবে। ড্রপবক্স ব্যবহারবান্ধব হওয়ার ফলে এটি বেশি বিখ্যাত। এ ছাড়া ক্যামেরা, এসডি কার্ড থেকে এতে সরাসরি ফাইল আপলোড করা যায়। ড্রপবক্সের মাধ্যমে ডক ফাইল, অডিও এবং ভিডিও ফাইল শেয়ার করা যায়।

সুগার সিঙ্ক
www.sugarsync.com। এটি মূলত মোবাইল ফোনে ব্যবহার করার জন্য বেশ ভালো। মোটামুটি সব ধরনের মোবাইল ফোনে এই ক্লাউড স্টোরেজ সিস্টেম ব্যবহার করা যায়, যার মধ্যে অ্যান্ড্রয়েড, আইফোন, আইপ্যাড, অ্যামাজন কিন্ডেল সিমবিয়ান ব্ল্যাকবেরি অন্যতম। এ ছাড়া এটি উইন্ডোজ এক্সপি ও ভিসতা এবং ম্যাক্ওএসএক্সে কাজ করে। এর ব্যবহারকারীরা বিনা মূল্যে পাঁচ গিগাবাইট স্পেস পেয়ে থাকে। স্পেস বাড়ানোর জন্য অতিরিক্ত ফি প্রদান করতে হয়। এর সবচেয়ে কার্যকরী অপশন হলো নির্দিষ্ট ফোল্ডার একবার বাছাই করে দেওয়ার পর ব্যবহারকারী আর সে ফোল্ডার নিয়ে চিন্তা করতে হয় না। এটি আপনা-আপনিই আপডেট হতে থাকে। একবার ফাইল সেভ হয়ে গেলে তা অফলাইনে পরিবর্তন করলে, তা আপনা-আপনি হালনাগাদ হয়ে যায় অনলাইন হলে। এর মাধ্যমে বিভিন্ন সোশ্যাল নেটওয়ার্ক সাইটে ফটো বা ভিডিও শেয়ার করা যায়।

আইক্লাউড
এটি মূলত ম্যাক ওএসএক্স, আইফোন, আইপড টাচ ও আইপ্যাড ব্যবহারকারীদের জন্য অ্যাপলের বিশেষভাবে তৈরি। অ্যাপল পণ্য ব্যবহারকারীরা তাদের বিভিন্ন ডকুমেন্ট, ক্যালেন্ডার, কনট্যাকস ইত্যাদি এতে সংরক্ষণ করতে পারবে। এটি পাঁচ গিগাবাইট স্পেস বিনা মূল্যে দিয়ে থাকে। এর বেশি স্পেস ব্যবহার করতে চাইলে তার জন্য ফি দিতে হয়।
এ ছাড়া অ্যামাজন, এ ড্রাইভ, জাস্ট ক্লাউড, জিপ ড্রাইভ ইত্যাদি প্রতিষ্ঠান ও ক্লাউড স্টোরেজ সেবা দিয়ে থাকে। প্রয়োজন অনুযায়ী এগুলোও ব্যবহার করা যেতে পারে।
মিনেসোটা (যুক্তরাষ্ট্র) থেকে

No comments

Powered by Blogger.