সমাজ-ক্ষমতায়নই নারীকে নিরাপদ করবে by রাশিদা সুলতানা

জাতিসংঘে নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীকে মূলধারায় আনা অতিগুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। জাতিসংঘ শান্তি মিশন দারফুরে কাজ করতে গিয়ে দেখেছি, নারীকে মূলধারায় আনা হচ্ছে লিঙ্গসমতা অর্জনের একটা স্ট্র্যাটেজি বা কৌশল। মূলধারায় আনয়ন লিঙ্গসাম্য অর্জনের একটা উপায়।


এই প্রকল্পের আওতায় সব নীতি প্রণয়ন, গবেষণা, বিতর্ক, আইন ও নীতিনির্ধারণ, শ্রমশক্তির প্রয়োগ ও পরিকল্পনা এবং কর্মসূচি ও প্রকল্পে নিশ্চয়তা দেওয়া হয় যে লিঙ্গসাম্য সব সময়ই প্রাথমিক বিবেচনায় থাকবে।
নারীর ক্ষমতায়ন এবং নারীকে মূলধারায় আনয়ন যাবতীয় উন্নয়ন চিন্তার কেন্দ্রে আছে। যে কারণে আন্তর্জাতিক ফৌজদারি আদালত (আইসিসি) সংগঠিত হয়েছিল একটা ভিকটিম-কেন্দ্রিক কোর্ট হিসেবে এবং পরিকল্পিতভাবে নারী জুরিদের অন্তর্ভুক্তিতে। একটা ভিকটিম ও সাক্ষী ইউনিটের প্রতিষ্ঠা, যা ভিকটিম ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা ও সহায়তা দেবে সম্ভাব্য তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে; বিশেষ করে শারীরিক, লৈঙ্গিক নির্যাতনের শিকার নারীদের জন্য যা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। উদাহরণস্বরূপ, ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল ফর রুয়ান্ডা কর্তৃক রুয়ান্ডায় তুতসিদের হত্যাকাণ্ডে অভিযুক্ত জ্যঁ পোল আকায়েসুকে ধর্ষণের অভিযোগেও অভিযুক্ত করা হয়েছিল। আর তা করা হয়েছিল, তিনজনের বিচারক প্যানেলে একমাত্র মহিলা বিচারকের দ্বারা সংগৃহীত একজন প্রত্যক্ষদর্শিনীর (ভিকটিমের মা) সাক্ষ্যে। এসব কারণেই আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারক নিয়োগ ও নির্বাচনে যেন নারী-বিচারকদের সুষ্ঠু প্রতিনিধিত্ব থাকে, সেদিকে নজর দেওয়া হয়।
মোদ্দা কথা, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা এবং ভিকটিম সাপোর্টের প্রতিটি পর্যায়ে বিচারক, আইনজীবী, তদন্তকারী কর্মকর্তা, ভিকটিম সাপোর্ট তদারকি—সবকিছুতে নারীর যথেষ্ট প্রতিনিধিত্ব নারী নির্যাতন প্রতিরোধ ও বিচারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। শক্তিশালী আইন থাকার পরও তদন্তকারী কর্মকর্তা পুরুষ হলে নারী নির্যাতন তদন্তে পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতাই প্রতিফলিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে। এ কারণে পৃথিবীর বহু দেশেই শক্তিশালী আইন থাকার পরও নারী নির্যাতন বেড়েই চলে। তবে পাশ্চাত্যের কোনো দেশে ইভ টিজিংয়ের শিকার হয়ে একটি মেয়ে আত্মহত্যা করবে, কিংবা স্বামীর নির্যাতনে অস্থির হয়ে সন্তানদের খুন করে নিজে আত্মহত্যাও করবে এটা কল্পনাও করা যায় না। কতটা নিরাপত্তাহীনতার বোধ থেকে এসব ঘটনা ঘটতে পারে? বাংলাদেশে প্রায় প্রত্যেকেই চারপাশে কোনো না কোনো নারীর প্রতি শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন দেখে বড় হয়েছে। এ জন্য পুরুষতান্ত্রিক সমাজ, ফৌজদারি বিচারব্যবস্থা—সবই দায়ী।
নারী নির্যাতন রোধে উন্নত দেশগুলোতে বিপুলসংখ্যক নারী তদন্তকারী কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয় এবং তাদের সুযোগ্য ও আত্মবিশ্বাসী করে তোলার জন্য দেশে-বিদেশে প্রশিক্ষিত করা হয়। একজন নারী বিচারক, নারী তদন্তকারী, নারী আইনজীবী নারী নির্যাতনের প্রভাব-প্রতিক্রিয়া যত ভালো বোঝেন, অবশ্যই একজন পুরুষের সেভাবে বোঝার কথা নয়। যে-কারণে পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে নারী নির্যাতন প্রতিরোধে এবং নারীকে মূলধারায় আনয়নের জন্য নারী বিচারক, নারী তদন্তকারী, ভিকটিম সাপোর্টসহ নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়।
সুইডিশ পুলিশের ২৫ শতাংশ নারী। দক্ষিণ আফ্রিকায় পুলিশের ৩৭ শতাংশ নারী। অন্যদিকে বাংলাদেশ পুলিশে নারীর অংশগ্রহণ ১ দশমিক ৩ শতাংশ। যদিও সিডও স্বাক্ষরকারী দেশ হিসেবে বাংলাদেশে ও অন্যান্য স্বাক্ষরকারী দেশের কর্মক্ষেত্রে (নেতৃত্ব, তৃণমূল, সর্বত্র) ৩০ শতাংশ নারীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কাজ করার কথা।
প্রশাসন ও পুলিশে নারীর ক্ষমতায়নের প্রভাব আর্থসামাজিকতায় এবং সামাজিক মনস্তত্ত্বে ব্যাপক এবং সুদূরপ্রসারী। বিভিন্ন জেলায় বিচারক, জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, ওসি, তদন্তকারী কর্মকর্তা হিসেবে নারীদের দেখলে অন্য নারী এবং তাদের মা-বাবার মনে তাঁদের মেয়েকেও ক্ষমতায়িত দেখার স্বপ্ন জন্মাতো। দেশের মেয়েরা আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতো এবং অনুপ্রাণিত হতো। বাংলাদেশের নারী আমিরা হক জাতিসংঘে আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল। কিন্তু এই বিরল ঘটনা বাংলাদেশের কত মেয়েকে এবং তাদের মা-বাবাকে স্বপ্ন দেখার সাহস দিয়েছে?
বাংলাদেশে সচিব, ডিআইজি, বিসিএস কর্মকর্তা পদে নারী আছে। ভারতের পর বাংলাদেশ থেকেই জাতিসংঘে পাঠানো হলো নারীদের পুলিশ ব্যাটালিয়ন। তবে স্বল্পসংখ্যক নারীর ক্ষমতায়ন দেখে আমরা যদি বিস্মৃত হয়ে যাই যে নারীর ক্ষমতায়নে এবং নারী নির্যাতন রোধে আমাদের বহু পথ পাড়ি দেওয়া এখনো বাকি, তাহলে এ দেশে নারীর ক্ষমতায়ন প্রতীকী ব্যাপার হয়েই থাকবে।

২.
নারীর উন্নয়নে এবং ক্ষমতায়নে দক্ষিণ আফ্রিকা বহু দেশের রোল মডেল হতে পারে। যেহেতু কালোরা এবং নারীরা বহু বছর দক্ষিণ আফ্রিকায় বহু বঞ্চনা ও বৈষম্যের শিকার হয়েছে; তাই সেখানে চাকরি, প্রশিক্ষণ, পদোন্নতি—সব ক্ষেত্রে কালোদের এবং নারীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হয়। দক্ষিণ আফ্রিকার সহকর্মীদের কাছ থেকে জানতে পারি, নারী নির্যাতন রোধকল্পে নারী পুলিশ কর্মকর্তারাই নারী নির্যাতনের তদন্ত করে থাকেন। সেখানে পুলিশে নিযুক্ত নারীদের ৬০ শতাংশ তদারকি (সুপারভাইজরি) পদে কাজ করেন।
সুদানের দারফুরে শান্তি মিশনে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপুলসংখ্যক নারী কর্মকর্তা অংশ নিয়ে থাকেন। এঁদের নারী নির্যাতন তদন্ত প্রশিক্ষণ, জাতিসংঘে পাঠানোর জন্য বিশেষায়িত প্রশিক্ষণসহ নানাভাবে প্রস্তুত করা হয়। দারফুরে শান্তি মিশনে দুই বছর কাজ করেছি কমিউনিটি পুলিশিং ইউনিটের টিম লিডার হিসেবে। মিশনের পুলিশ কমিশনার মাইকেল ফ্রায়ার ছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার কর্মকর্তা। সিনিয়র ম্যানেজমেন্ট মিটিংয়ে সব সময় তিনি বলেছেন, ‘আমাদের এই টেবিলে সিনিয়র ম্যানেজারদের মধ্যে ৫০ শতাংশ নারী দেখতে চাই।’ মানবসম্পদ বিভাগকে নির্দেশ দিতেন মিশনের নারী কর্মচারীদের ইন্টারভিউ করে যোগ্য নারীদের খুঁজে বের করে কমান্ডিং পজিশনে বসাতে।
জাতিসংঘ মিশনের শুরুতে নতুন আসা যেসব সুদানি নারীকে দেখেছি ভীরু ও দ্বিধাগ্রস্ত; দুই বছর পরে তাদের দেখেছি অন্য যেকোনো দেশের কর্মকর্তাদের মতোই যোগ্য ও আত্মবিশ্বাসী হয়ে উঠতে। এটাই প্রমাণ করে, নারীদের ক্ষমতায়িত করা গুরুত্বপূর্ণ জরুরি কাজ। সুদানের মতো অতি রক্ষণশীল দেশে জাতিসংঘের এত বিপুলসংখ্যক নারী নেতৃত্ব সুদানি মেয়েদের মনে নেতা বা কর্মকর্তা হওয়ার স্বপ্ন বুনে দিচ্ছে হয়তো।
বাংলাদেশের নারীরা আজ ইরাক, আফগানিস্তান, দারফুর, পূর্ব তিমুর, হাইতিসহ পৃথিবীর সব ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে সফলভাবে কাজ করছে। এ দেশের মেয়েরা স্বপ্ন দেখছে।
রাশিদা সুলতানা: গল্পকার। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার, বাংলাদেশ পুলিশ। বর্তমানে সুদানে জাতিসংঘের শান্তি মিশনে কর্মরত।

No comments

Powered by Blogger.