শিক্ষা-ফাউন্ডেশনটি হোক শিক্ষা উন্নয়ন ব্যাংক by শেখ শাহবাজ রিয়াদ

প্রস্তাবিত শিক্ষা সহায়তা ফাউন্ডেশনের সব অর্থ দিয়ে 'বাংলাদেশ শিক্ষা উন্নয়ন ব্যাংক' প্রতিষ্ঠা করা হোক। ওই ব্যাংক শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবে। শিক্ষা উন্নয়ন ব্যাংক শুধু দেশের সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ষষ্ঠ থেকে স্নাতক শ্রেণী পর্যন্ত গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান বা বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুবিধার জন্যই কাজ করবে না


একটি সুখী, সমৃদ্ধ ও কল্যাণকামী দেশ গড়ার অভিযাত্রার অংশ হিসেবে ২০১১-১২ বছরের বাজেট ইতিমধ্যেই জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। বাজেটে মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে সর্বমোট ৩৪ হাজার ১৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। উল্লেখ্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন খাতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ, নারীর ক্ষমতায়ন ও শিশুকল্যাণ, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং সংখ্যালঘু ও স্বল্প সুবিধাপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের অধিকার লালন ও বিকাশের বিষয়টিসহ শিক্ষার সামগ্রিক বিষয়গুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ কথা সত্যি যে, মানবসম্পদ উন্নয়নের জন্য উপরোক্ত প্রতিটি খাতের উন্নয়ন সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু দুঃখজনক হলেও এ কথা সত্যি যে, মানবসম্পদ উন্নয়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট খাতগুলোতে উচ্চ পর্যায় থেকে মাঠ পর্যায় পর্যন্ত প্রত্যাশিত সমন্বয় কোনো সময়ই প্রতিষ্ঠিত হয়নি। যা আমাদের সব ক্ষেত্রের অর্থ, সময়, পরিশ্রমের বড় ধরনের অপচয়ের অন্যতম কারণ। যার কারণে প্রতি বছর হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেও আমরা প্রত্যাশিত ফল পাচ্ছি না। অর্থ বরাদ্দের পরিমাণসহ অধিকাংশ ক্ষেত্রে এবারের শিক্ষা বাজেট বিগত বছরগুলোর মতো গতানুগতিক হলেও দুই-তিনটি নতুন সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, যার ওপর ভিত্তি করে শিক্ষার মাধ্যমে সম্ভাবনার নতুন দিগন্তের সূচনা হতে পারে। এর একটি হচ্ছে 'প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ফাউন্ডেশন' ও অন্যটি হচ্ছে 'সৃজনশীল প্রতিভা অন্বেষণ'-এর প্রস্তাব। প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে অর্থমন্ত্রী তার বাজেটে উল্লেখ করেছেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর অভিপ্রায় অনুযায়ী দেশের সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ষষ্ঠ থেকে স্নাতক শ্রেণী পর্যন্ত গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান এবং বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুবিধার জন্য এ ফান্ড গঠন করা হবে। প্রস্তাবিত এ ফাউন্ডেশনের তহবিল গঠনের প্রক্রিয়াটিও নতুন। সরকারি-বেসরকারি অর্থায়নে এ ফাউন্ডেশনের তহবিল গঠিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এমনটি হলে শিক্ষাক্ষেত্রে পাবলিক-প্রাইভেট অংশীদারিত্বের নতুন যুগের সূচনা হবে। যদিও বিগত দু-এক বছর ধরে যোগাযোগ ও অন্যান্য ক্ষেত্রে এ রকম পিপিপির উদ্যোগ ও কর্মকাণ্ড শুরু হয়েছে। প্রস্তাবিত শিক্ষা সহায়তা ফাউন্ডেশনের অর্থসংস্থান প্রক্রিয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে, বীজ অর্থ বা প্রাথমিক মূলধনের একটি অংশ প্রদান করবে সরকার এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার আওতায় বাকি অংশের অর্থায়ন করবে। আগামী অর্থবছরে এ ফাউন্ডেশনের জন্য এক হাজার কোটি টাকার তহবিলের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যদি তার শিক্ষা সহায়তা তহবিল বৃদ্ধি করার জন্য দেশবাসীর কাছে অর্থ সাহায্য চান তাহলে অল্পদিনের মধ্যেই এটি বাংলাদেশের এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় তহবিলে পরিণত হবে বলে দৃঢ় বিশ্বাস। শিক্ষা যদি লাভজনক বিনিয়োগ হয় এবং সেখান থেকে আমরা গুণগত মানসম্মত কিছু পেতে চাই তাহলে সরকারের একার বিনিয়োগের মাধ্যমে তা সম্ভব নয়। সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের মাধ্যমেই তা হতে হবে। বিশেষ করে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে। এটি খুবই আশার কথা যে, বাংলাদেশে অনেক বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, বিশেষ করে বিভিন্ন ব্যাংক সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে শিক্ষাক্ষেত্রে বৃত্তি প্রদান, সংবর্ধনাসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়ে এগিয়ে আসছে। বিভিন্ন ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার ভূমিকাও উল্লেখ করার মতো। প্রতি বছর হাজার হাজার জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে এভাবে পুরস্কৃত করা হচ্ছে এবং দেখা যাচ্ছে বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করার ফলে এক শিক্ষার্থী কয়েকবার একই জাতীয় বৃত্তি পাচ্ছে। 'প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা সহায়তা ফাউন্ডেশন'-এর আওতায় এ জাতীয় সব উদ্যোগকে নিয়ে আসা যেতে পারে। সমন্বিত উদ্যোগ ও লক্ষ্য নিয়ে কাজ করলে সারাদেশে এটিকে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব হবে। এ ক্ষেত্রে আমাদের বিনীত প্রস্তাব হচ্ছে, প্রস্তাবিত শিক্ষা সহায়তা ফাউন্ডেশনের সব অর্থ দিয়ে 'বাংলাদেশ শিক্ষা উন্নয়ন ব্যাংক' প্রতিষ্ঠা করা হোক। ওই ব্যাংক শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও শিক্ষার সার্বিক উন্নয়নে কাজ করবে। শিক্ষা উন্নয়ন ব্যাংক শুধু দেশের সরকারি-বেসরকারি স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ষষ্ঠ থেকে স্নাতক শ্রেণী পর্যন্ত গরিব ও মেধাবী শিক্ষার্থীদের বৃত্তি প্রদান বা বিনা বেতনে অধ্যয়নের সুবিধার জন্যই কাজ করবে না, সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সঞ্চয় মানসিকতা তৈরি, ঋণপ্রাপ্তি ও শিক্ষাক্ষেত্রে বিনিয়োগে আগ্রহী শিক্ষা-উদ্যোক্তা তৈরি করবে। শিক্ষা উন্নয়ন ব্যাংকের অন্যতম কাজ হবে প্রতিবছর দেশব্যাপী বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৃজনশীল প্রতিভা খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে আর্থিক ও অন্যান্য পৃষ্ঠপোষকতা দান, যা এবারের বাজেটে সৃজনশীল প্রতিভা অন্বেষণ কার্যক্রম হিসেবে বিশেষভাবে গুরুত্ব পেয়েছে। এ কার্যক্রমে লক্ষ্য হিসেবে যদিও ভাষা ও সাহিত্য, গণিত, বিজ্ঞান ও কম্পিউটারের কথা উল্লেখ করা হয়েছে আমরা এর সঙ্গে আরও কয়েকটি ক্ষেত্রের নাম উল্লেখ করতে চাই। সেগুলো হলো সঙ্গীত, চারু ও কারুকলা, বিভিন্ন ধরনের খেলাধুলা, বিশেষ করে ফুটবল, ক্রিকেট, সাঁতার ও শরীরচর্চা। তাছাড়া এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক ও স্ন্াতকোত্তর পাস লাখ লাখ যুবককে কর্মসংস্থানমুখী করার পরিকল্পনা ও কৌশল নিয়ে কাজ করবে শিক্ষা উন্নয়ন ব্যাংক। একই সঙ্গে যেসব শিক্ষার্থী প্রতি বছর ফেল করে কিংবা স্কুল-কলেজ ছেড়ে চলে যায় তাদেরও শিক্ষা উন্নয়ন ব্যাংকের আওতায় আনতে হবে। দেশ-বিদেশের শ্রমবাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিভিন্ন স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। এ ক্ষেত্রে দেশ-বিদেশে উভয় স্থানে যে ক্ষেত্রটি সবচেয়ে সম্ভাবনাময় সেটি হলো ড্রাইভিং। আমাদের আগামী প্রজন্মের ড্রাইভারদের পরিকল্পিত প্রশিক্ষণের আওতায় নিয়ে আসতে পারলে ভবিষ্যতে সড়ক দুর্ঘটনা ও যানজটের মতো সমস্যা মোকাবেলা করা অনেক ক্ষেত্রে সহজ হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারীদের একটি বড় অংশ কিন্তু স্কুল পালানো কিংবা উচ্চশিক্ষায় ব্যর্থ বা অযোগ্য যুব সমাজ। ফেল করার কলঙ্ক, হতাশা, অনিশ্চয়তা, আদম বেপারী ও দালালদের হয়রানি এতসব বৈরী পরিস্থিতি মোকাবেলা করেও যদি তারা এত অবদান রাখতে পারে তাহলে পূর্ব নির্ধারিত পরিকল্পনা ও প্রশিক্ষণের আওতায় তাদের অবদান কয়েক গুণ বেড়ে যাবে নিশ্চিত। মেয়েদের আত্মকর্মসংস্থানের বিষয়টির জন্য বিশেষভাবে ভাবতে হবে। দেশীয় কাঁচামালনির্ভর কুটির শিল্প সেলাই ও অন্যান্য ক্ষেত্রে মেয়েদের পৃষ্ঠপোষকতা করতে পারলে তাদের যথোপযুক্তভাবে আত্মনির্ভরশীল করা সম্ভব হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, ঢাকা বা শহরমুখী জনতার স্রোত প্রতিরোধ এবং বৈষম্যহীন শিক্ষা ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে হলে এবং ভিশন-২০২১-এর স্বপ্ন সবার জন্য সত্যি করতে গতানুগতিক উন্নয়ন প্রচেষ্টার বাইরে নতুন করে ভাবতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ নির্মাণের মতো শিক্ষা উন্নয়ন ব্যাংকও হোক ভিশন-২০২১-এর স্বপ্ন পূরণের নতুন সম্ভাবনার দ্বার। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, অর্থমন্ত্রী ও শিক্ষামন্ত্রী মহোদয়সহ সংশ্লিষ্ট সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।

শেখ শাহবাজ রিয়াদ :সহকারী অধ্যাপক সরকারি টিচার্স ট্রেনিং কলেজ, ঢাকা
riadisrat1971@yahoo.com
 

No comments

Powered by Blogger.