তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংস্কার

ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি স্থান পায়। পরে ওই সংশোধনী চ্যালেঞ্জ করে আদালতে মামলা হয়। আদালতের রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বৈধতা দেওয়া হয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার আসে একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে যে ক্ষমতা থাকে সেটাও সীমাবদ্ধ।


কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ থাকতে না চাইলে কী করার আছে? বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়ে আমরা দেখেছি, নির্দিষ্ট সময়েরও অনেক বেশি সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় ছিল। শুধু তাই নয়, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে না, এমন অনেক কাজও করেছে বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আলোচিত বিষয় ছিল সংস্কার। রাজনৈতিক দলগুলোর সংস্কার নিয়ে তখন ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। বলতে গেলে, রাজনৈতিক দলগুলো চাপের মুখেই দলের অভ্যন্তরে সংস্কারের বিষয়টি নিয়ে ভাবতে বাধ্য হয়েছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে রাজনৈতিক দলগুলোতে বেশ কিছু নেতা ও কর্মী সরাসরি সংস্কারপন্থী হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যান। অনেকেরই রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ হুমকির মুখে পড়ে। এখন আবার সেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাই সংস্কারের মুখে পড়েছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা নিয়ে আদালতে শুনানি শুরু হয়েছে গত ১ মার্চ। আদালতের পক্ষ থেকে নিয়োগ করা হয়েছে অ্যামিকাস কিউরি, যাঁরা শুনানিতে আদালতকে আইনি সহায়তা দেবেন। অ্যামিকাস কিউরি হিসেবে রয়েছেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী টি এইচ খান, ড. কামাল হোসেন, মাহমুদুল ইসলাম, রফিক-উল হক, আমীর-উল ইসলাম, রোকনউদ্দিন মাহমুদ, আজমালুল হোসেন কিউসি ও ফিদা এম কামাল। গত কয়েক দিন আদালতে তাঁরা তাঁদের বক্তব্য পেশ করেছেন। গত বুধবার রফিক-উল হক বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখতে হলে অন্য পদ্ধতিতে রাখতে হবে। বিচার বিভাগকে এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত করা উচিত নয়। এক-এগারোর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, বিচারপতিদের বয়সসীমা বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এই করে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার ধারণাটি ধ্বংস করা হয়। তবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি বাতিল হলে দেশে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে বলে মত দিয়ে রফিক-উল হক আদালতে বলেন, বিচারপতিদের বাদ দিয়ে এ ব্যবস্থা পুনর্গঠন করা যেতে পারে। অ্যামিকাস কিউরি এম জহির বলেন, সরকার ও বিরোধী পক্ষ থেকে পাঁচজন করে সদস্য নিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন করা যেতে পারে। প্রধান দুটি জোটের ঐকমত্যের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করা যেতে পারে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থায় অবসরপ্রাপ্ত প্রধান বিচারপতির সরকারপ্রধান হওয়ার রীতি নিয়ে বিচার বিভাগ বিব্রত করার মতো পরিস্থিতিও সৃষ্টি হয়েছে। বিগত জোট সরকার বিদায় নেওয়ার পর এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। দেখা দিয়েছিল সংকট। এ প্রসঙ্গে অ্যামিকাস কিউরি ব্যারিস্টার রফিক-উল হক আদালতে বলেছেন, 'বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও নিরপেক্ষতার স্বার্থে' ব্যবস্থাটির পুনর্গঠন করে প্রধান উপদেষ্টার পদে প্রধান বিচারপতিকে না রাখাই উত্তম। তাঁর মতে, সাবেক প্রধান বিচারপতিদের দিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হলে, তাঁরা একজন যোগ্য ব্যক্তিকে প্রধান উপদেষ্টা পদে নিয়োগ দেওয়ার প্রস্তাব করবেন। অনেকের ধারণা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান কে হবেন, সেই চিন্তা মাথায় রেখে আপিল বিভাগে বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয়। জ্যেষ্ঠ বিচারপতিকে ডিঙিয়ে কনিষ্ঠ বিচারপতিকে নিয়োগ দেওয়া হয়, এমন কথাও চালু আছে। এ নিয়ে বাইরে অনেক কথা হয়। এটা বিচার বিভাগের জন্য বিব্রতকর। এটাও ঠিক, আপাতত তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিকল্প নেই। আরো কিছুদিনের জন্য তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখতে হবে। সে ক্ষেত্রে এমন সিদ্ধান্ত নিতে হবে যেন দেশের বিচারব্যবস্থা প্রশ্নের মুখে না পড়ে। আবার সেই বিতর্ক এড়াতে গিয়ে যেন বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের মতো অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো পরিস্থিতির সৃষ্টি না হয় সেদিকেও দৃষ্টি দিতে হবে।

No comments

Powered by Blogger.