ঐতিহ্যের পহেলা বৈশাখ by ইমরুল কায়েস

পহেলা বৈশাখ বাঙালির সর্বজনীন, সর্ববৃহৎ এবং অসাম্প্রদায়িক উৎসবের দিন। অতীতের ভুলত্রুটি ও ব্যর্থতার গল্গানি ভুলে নতুন করে সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনায় আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হয় নববর্ষের প্রথম দিন। মোগল সম্রাট আকবরের পূর্বে রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে হিজরি বর্ষপঞ্জি ব্যবহার ছিল কৃষক শ্রেণীর জন্য একটি ক্লেশকর ব্যাপার।


কারণ চান্দ্র ও সৌরবর্ষের মধ্যে ১১-১২ দিনের ব্যবধান এবং এ কারণে ৩১ চান্দ্রবর্ষ ৩০ সৌরবর্ষের সমান ছিল। সে সময় চান্দ্রবর্ষ অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করা হতো; কিন্তু ফসল সংগ্রহ করা হতো সৌরবর্ষ অনুযায়ী। সম্রাট আকবর তার রাজত্বের শুরু থেকেই দিন-তারিখ গণনায় একটি বিজ্ঞানভিত্তিক কর্মোপযোগী ও গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি চালুর জন্য বর্ষপঞ্জি সংস্কারের প্রয়োজন অনুভব করেন। এ উদ্দেশ্যে তিনি বিশিষ্ট বিজ্ঞানী ও জ্যোতির্বিদ আমির ফতেউল্লাহ সিরাজীকে প্রচলিত বর্ষপঞ্জিতে প্রয়োজনীয় পরিবর্তন সাধনের দায়িত্ব প্রদান করেন। তার প্রচেষ্টায় ৯৬৩ হিজরির মহররম মাসের শুরু থেকে বাংলা বর্ষের ৯৬৩ অব্দের সূত্রপাত হয়। যেহেতু ৯৬৩ হিজরির মহররম মাস বাংলা বৈশাখ মাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল, সেহেতু চৈত্র মাসের পরিবর্তে বৈশাখ মাসকে বাংলা বর্ষের প্রথম মাস করা হয়; চৈত্র ছিল শক বর্ষপঞ্জির প্রথম মাস। নতুন সনটি প্রথমে ফসলি সন নামে পরিচিত ছিল, পরে তা বঙ্গাব্দ নামে পরিচিত হয়। আধুনিক নববর্ষ উদযাপনের খবর প্রথম পাওয়া যায় ১৯১৭ সালে। এরপর ১৯৩৮ সালেও অনুরূপ কর্মকাণ্ডের উলেল্গখ পাওয়া যায়। পরবর্তী সময়ে ১৯৬৭ সালের আগে ঘটা করে পহেলা বৈশাখ পালনের রীতি তেমন একটা জনপ্রিয় হয়নি।
পহেলা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষের রূপ-বৈচিত্র্য বাংলার বহুমাত্রিক সমৃদ্ধ লোকসংস্কৃতির সুস্পষ্ট দর্শন। প্রকৃতপক্ষে বাংলা নববর্ষের রূপ তার আচরিত অনুষ্ঠানগুলোতেই ধরা পড়ে। বাঙালির স্বতঃস্ফূর্ত চিত্তচাঞ্চল্যের বহুমুখী অভিব্যক্তিই বড়-ছোট নানা অনুষ্ঠানে রূপ পরিগ্রহ করে। সর্বজনীন এবং স্থানীয় এ দু'ধরনের অনুষ্ঠান সমারোহে ফুটে ওঠে বাঙালির লোকসংস্কৃতির চিরাচরিত ধারা। নতুন বছরের উৎসবের সঙ্গে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর কৃষ্টি ও সংস্কৃতির নিবিড় যোগাযোগ। গ্রামে মানুষ ভোরে ঘুম থেকে ওঠে, নতুন জামাকাপড় পরে এবং আত্মীয়স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতে যায়। বাড়িঘর পরিষ্কার করা হয় এবং মোটামুটি সুন্দর করে সাজানো হয়। বিশেষ খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। কয়েকটি গ্রামের মিলিত এলাকায়, কোনো খোলা মাঠে আয়োজন করা হয় বৈশাখী মেলার। মেলাতে থাকে নানারকম কুটির শিল্পজাত সামগ্রীর বিপণন, থাকে নানারকম পিঠা-পুলির আয়োজন। অনেক স্থানে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তাভাত খাবারের ব্যবস্থাও থাকে। এদিনের একটি পুরনো সংস্কৃতি হলো গ্রামীণ ক্রীড়া প্রতিযোগিতার আয়োজন, যেমন_ বলীখেলা, লাঠিখেলা, ষাঁড়ের লড়াই, গরুর দৌড়, হা-ডু-ডু খেলা ইত্যাদি।
বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকায় প্রধান তিনটি ক্ষুদ্র জাতিসত্তা রয়েছে, যাদের প্রত্যেকেরই বছরের নতুন দিনে উৎসব আছে। ত্রিপুরাদের বৈশুখ, মারমাদের সাংগ্রাই ও চাকমাদের বিজু উৎসব। বর্তমানে তিনটি জাতিসত্তা একত্রে এই উৎসবটি পালন করে। যৌথ এই উৎসবের নাম বৈসাবি। উৎসবের নানা দিক রয়েছে। এর মধ্যে একটি হলো মারমাদের পানি উৎসব।
য় সাবেক শিক্ষার্থী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনা

No comments

Powered by Blogger.