বিএমএ নির্বাচন- পেশাজীবীদের দলীয় রাজনীতি by রোবায়েত ফেরদৌস

পেশাজীবীদের দলীয় রাজনীতি কোন পর্যায়ে পৌঁছেছে, তা বোঝার জন্য প্রথম আলোর অগ্রসর পাঠকদের অনুরোধ করব এ পত্রিকার ১ ডিসেম্বরের পৃষ্ঠা তিনে প্রকাশিত সংবাদ ক্যাপশনটি আরেকবার দেখে নিতে: ‘চট্টগ্রামে নির্বাচন শেষে ব্যালট বাক্সের ওপর শুয়ে পড়ে তা রক্ষার চেষ্টা করেন স্বাচিপের বিদ্রোহী প্রার্থী
মিনহাজুর রহমান;’ ঠিক এর পাশেই আরেকটি সংবাদের শিরোনাম এ রকম: ‘স্বাচিপ বিজয়ী হতে যাচ্ছে/ ড্যাবের ফল প্রত্যাখ্যান’—এই সংবাদে চিকিৎসকদের নির্বাচনে ভোটে বাধা প্রদান, মারধর, চাপ তৈরি, কারচুপিসহ বিভিন্ন অভিযোগ আনা হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকার কিছু শিরোনাম ছিল এ রকম: ‘তিন পেশাজীবী সংগঠনের নির্বাচন,’ ‘ভয়ভীতি-হুমকিতে এফবিসিসিআইয়ের প্রার্থী ও ভোটাররা,’ ‘আইইবিতে গতবারের বিএনপি প্রার্থী এবার আওয়ামী লীগের!’ এসব শিরোনাম পড়লেই একজন পাঠকের কাছে স্পষ্ট হবে বাংলাদেশে চিকিৎসক, প্রকৌশলী আর ব্যবসায়ী সংগঠনগুলো পেশাজীবীদের অধিকার রক্ষার নামে দলীয় রাজনীতির কোন পঙ্কিলতায় নিজেদের নিয়োজিত করেছে। ভোটে জেতার জন্য টাকাপয়সা লেনদেন, প্রার্থীকে ঘুষ দিয়ে বসিয়ে দেওয়া, হুমকি-ধমকি প্রদানসহ হেন কাজ নেই তারা করছে না! আরেকটি খবর: ‘দুই ভাগ হলো সরকার সমর্থক আইনজীবীদের সংগঠন: একপক্ষে সাজেদা, অন্যপক্ষে সাহারা’—এর মানে আরও ভয়াবহ, এমনিতেই পেশাজীবীরা দলীয় রাজনীতিতে বিভক্ত, তার ওপরে এই বিভাজন কেবল পক্ষ-প্রতিপক্ষে সীমাবদ্ধ নয়, নিজ পক্ষ/ দলের ভেতরে আবার উপদলীয় কোন্দলে তাঁরা বিভাজিত হয়ে পড়ছেন।
মানতে দ্বিধা নেই, পেশাজীবীদের স্বার্থ-অধিকার রক্ষায় সংগঠন থাকতেই পারে। এতে কোনো দোষ নেই, কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দুঃখজনক বাস্তবতা এই যে পেশাজীবীরা মোটা দাগে সরকারি দল আর বিরোধী দলে ভাগ হয়ে পড়েছেন, প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্যানেলের একটি হয় আওয়ামী লীগ-সমর্থিত, অন্যটি হয় বিএনপি-সমর্থিত; এতে কোনো রাখঢাকের বালাই থাকে না; পিয়ন থেকে সচিব বলতে গেলে সবাই এ দুই শিবিরে ভাগ হয়ে পড়েছেন। আরও ভয়ংকর যে মহামান্য আদালতের মান্যবর বিচারকদের ক্ষেত্রেও এ রকম সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতিতে ঢুকে পড়ার অভিযোগ উচ্চারিত হচ্ছে। স্কুল-কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বাসমালিক, আইনজীবী, ট্রাকচালক, ব্যাংক, বিমা, সচিবালয়, ওলামা-মাশায়েখ, হোসিয়ারি সমিতির নেতা—সবাই দলীয় রাজনীতির ভিত্তিতে তাঁদের তথাকথিত নেতা নির্বাচিত করছেন। কোনোটা হচ্ছে একেবারে নগ্নভাবে, প্রকাশ্যে দলীয় লেজুড়বৃত্তিতে, কোনোটায় আবার কিছুটা আড়াল রাখা হচ্ছে। তবে মুখোশ চিরে মুখ চিনে নিতে বোধ করি কারোরই অসুবিধা হয় না। আর এই নেতারাই সংশ্লিষ্ট বিভাগের নিয়োগ-বাণিজ্য, ভর্তি-বাণিজ্য, পদোন্নতি, টেন্ডারসহ তাবৎ বিষয় নিয়ন্ত্রণ করছেন। পদ বা টাকাপয়সা ভাগাভাগির ক্ষেত্রে অনেক সময় দুই পক্ষের নেতাদের গোপন আঁতাতের খবরও আমরা পাই। এসব কারণে পেশাজীবীদের সংগঠনগুলোর কাছে তাঁদের পেশার মান-মর্যাদা-স্বার্থের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে নিজেদের ব্যক্তিস্বার্থ কিংবা ক্ষমতাসীন আর ক্ষমতামুখীন দলের রাজনৈতিক স্বার্থের বিষয়টি। একজন চিকিৎসক কিংবা একজন আমলা কত ভালো চিকিৎসক বা কত ভালো আমলা তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তিনি কত তীব্র আওয়ামী লীগ কিংবা কত তীক্ষ বিএনপি! কারণ, এই দলীয় আনুগত্যই শেষ বিচারে ঠিক করবে তাঁর পদ, অবস্থান, বিদেশে পড়ার বৃত্তি, অর্থবিত্ত, প্রভাব, সস্ত্রীক বা সস্বামী পরদেশ সফরের কাঙ্ক্ষিত সুযোগ; জীবনের রোশনাই আর ভাগ্যের খোলতাই নির্ভর করছে দলীয় রাজনীতির জটিল সমীকরণে তাঁর খেলার শক্তির ওপর; চাল আর কূটচালে প্রতিপক্ষকে পরাস্ত করে দলীয় নেতাদের কতটা নৈকট্যে কারা পৌঁছাতে পারলেন তার ওপর নির্ভর করছে শান-শওকত ও ক্যারিয়ার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দুটো প্যানেল—একটি আওয়ামীপন্থী নীল দল, অন্যটি বিএনপি-জামায়াতপন্থী সাদা দল। এদের ভেতরে আবার আনুগত্যের বিচারে পরিমাণগত ও গুণগত পার্থক্য আছে; যেমন কেউ গাঢ় নীল, কেউ আকাশি নীল আবার কেউবা হালকা নীল; অন্যদিকে আছে সাদা, সাদা আরও সাদা—কেউ কেউ এমন সাদা যে বাড়তি নীলের দরকারই নেই! তাঁদের মতাদর্শগত রঙের ঘনত্ব বা গাঢ়ত্বই হয়ে ওঠে ক্যারিয়ারের নীল লিটমাসকে লাল করার অন্যতম ক্যাটালিস্ট। তাঁকে যে সত্যিকার অর্থেই কোনো রাজনৈতিক আদর্শে বিশ্বাস করতে হবে বিষয়টি এমন নয়, তবে ভান করতে হবে যে তিনি ওই আদর্শের জন্য গাজী বা শহীদ হতেও সদা প্রস্তুত। ভান বলছি এ কারণে যে স্বার্থ বা ক্ষমতার কাছাকাছি যাওয়ার মহৎ উদ্দেশ্যে যে কেউ যেকোনো সময় নিজ দলের আদর্শ ত্যাগ করে অন্য দলে নাম লেখাতে পারেন।
এভাবে রাষ্ট্রে দলীয় রাজনীতি চর্চার যে নেতিবাচক সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে, সেখানে মেধা-যোগ্যতা প্রতিনিয়ত মার খাচ্ছে; দক্ষতা, সততা আর কর্মনিষ্ঠতার যথার্থ মূল্যায়ন হচ্ছে না। কে কতটা নগ্নভাবে দলীয় স্বার্থে গলাবাজি করতে পারে জীবনে তা-ই হয়ে ওঠে ওপরে ওঠার সিঁড়ি। আর রাজনীতিবিদেরা, যাঁরা মূলত দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পান, তাঁরা পেশাজীবীদের এই দলীয় রাজনীতিকে গেল কয়েক দশক ধরে কেবল উৎসাহিতই করেননি; বরং ক্রমে ক্রমে তা উসকে দিয়ে আজকের এ পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন; তাঁদের প্রত্যক্ষ প্রশ্রয়ের ফল আজকের বাংলাদেশে গজিয়ে ওঠা দলীয় লেজুড়বৃত্তির হাজারো পেশাজীবী সংগঠন। রাষ্ট্র ও সমাজে এর অভিঘাত যে খুবই মারাত্মক, তার নমুনা এখন আমরা ঠিকই টের পাচ্ছি। এর ফলে রাষ্ট্র ও সমাজ থেকে সুস্থ-সুন্দর প্রতিযোগিতার বোধ ক্রমশ তিরোহিত হয়ে যাচ্ছে। দলকানা রাজনীতিই হয়ে যাচ্ছে সবকিছুর মূল চালিকাশক্তি। অন্ধ দলীয় আনুগত্যের কাছে প্রতিদিন মার খাচ্ছে যোগ্যতা-দক্ষতা-মেধা-সততা-ন্যায়নিষ্ঠা। যোগ্যতম আর যোগ্যতররা হয়ে পড়ছেন হতাশ-বিচ্ছিন্ন; দেশের সার্বিক কর্মক্ষমতা বা উৎপাদনশীলতার ওপর পড়ছে নেতিবাচক প্রভাব।
সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাবিন্যাসের বিশ্লেষণ যদি করি, তবে এটা বোঝা স্পষ্ট হয়ে যায় যে একদা দুর্বল আর অযোগ্য পেশাজীবীরাই রাজনীতিকে ব্যবহার করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের এই সামাজিক ব্যাকরণের চারাগাছটি রোপণ করেছিলেন, আজ তা বেড়ে এই মহীরুহে পরিণত হয়েছে। পেশাজীবী সংগঠনগুলোকে রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে না চালিয়ে পেশাদারি মনোভাব নিয়ে পরিচালনা না করার ফলে তাদের মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শগত বিভক্তি আর স্বার্থের টানাপোড়েন আজ চরম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। রাজনীতিবিদেরা এ বিভক্তিতে সক্রিয়ভাবে মদদদাতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। ফলে পেশাদারি মনোভাব দিন দিন বিলুপ্তির পথে। যোগ্য-দক্ষ হওয়ার চেয়ে জিন্দাবাদের জোর সব ক্ষেত্রেই বেশি। এতে ব্যক্তি লাভবান হলেও দেশ-জাতি-সমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। মুখে পেশাদারির কথা বললেও নেতা-নেত্রীদের মননে রাজনৈতিক মতাদর্শের বিষয়টি প্রবল হওয়ায় দিন দিন দেশের পেশাজীবী সমাজ এ পথে চলতেই বাধ্য হচ্ছে; এতে পেশাজীবীরা পরিণত হচ্ছেন সামাজিক অজগরে!
কি আওয়ামী লীগ, কি বিএনপি, বছরের পর বছর ধরে দেশে চলছে দলীয়করণের মহোৎসব। দিন দিন মেধা-দক্ষতা-যোগ্যতা পিছিয়ে পড়তে পড়তে এখন আর অবশিষ্ট বিশেষ কিছুই নেই। এখনই লাগাম টেনে ধরতে না পারলে রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্ত মানুষ দিনে দিনে হিংস্র হয়ে উঠবে, এটাই স্বাভাবিক। নিজ নিজ পেশার স্বার্থে পেশাজীবীদের রাজনৈতিক মতাদর্শে বিভক্তির বিপক্ষে শক্ত অবস্থান গ্রহণ তাই জরুরি। আমরা মনে করি, বিভিন্ন পেশায় এখনো বড় অংশ আছেন, যাঁরা এই সংকীর্ণ দলীয় রাজনীতি থেকে নিজেদের বিপদমুক্ত দূরত্বে ধরে রাখতে সক্ষম হয়েছেন। রাষ্ট্রীয় কল্যাণের বিবেচনায় যাঁরা এই ক্ষতিকর সংস্কৃতির চর্চাকে অন্তর থেকে পরিত্যাজ্য ঘোষণা করেছেন, তাঁদের নীরবতা ভেঙে এগিয়ে আসতে হবে, জোটবদ্ধ হতে হবে এবং অবস্থার পরিবর্তন যে সম্ভব, তাঁকে প্রমাণ করে দিতে হবে। সবকিছুই নষ্টদের অধিকারে যেতে পারে না—এই আত্মম্ভরি আশায় যাঁরা স্বপ্ন দেখেন, তাঁদের সম্মিলিত প্রতিবাদই-প্রতিরোধই পারে ভেতর থেকে এই সংস্কৃতির রূপান্তর ঘটাতে।
রোবায়েত ফেরদৌস: শিক্ষক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
robaet.ferdous@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.