তামাক নিয়ন্ত্রণ-আইনের সংশোধনী নিয়ে কী হচ্ছে? by আমীন আল রশীদ

বিদ্যমান আইনে তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ হলেও এর ফাঁক গলিয়ে হামেশাই বিড়ি-সিগারেটের বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে। কিন্তু প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এমন বিধান রাখা হয়েছে যে, কোনোফন্দি-ফিকিরেই আর তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া সম্ভব হবে না

ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন ২০০৫-এ কিছু সংশোধনীর প্রস্তাব আনা হলেও সেটি ক্যাবিনেটে অনুমোদিত হয়নি। সংবাদটি আমাদের উদ্বিগ্ন করে এ কারণে যে, এই সংশোধনীগুলো পাস না হলে দেশে বিদ্যমান ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনের দুর্বলতাগুলো থেকেই যাবে এবং বরাবরের মতো আইনের ফাঁক গলিয়ে বিড়ি ও সিগারেট কোম্পানিগুলো তাদের প্রচার অব্যাহত রাখবে। দ্বিতীয়ত, ধোঁয়াবিহীন তামাক, যেমন_ জর্দা, সাদাপাতা, গুল ইত্যাদি তামাক আইনের বাইরে থেকে যাবে। পাবলিক প্লেস ও স্মোকিং জোনের সংজ্ঞায় যেসব গলদ আছে, সেগুলোও থেকে যাবে। সামগ্রিকভাবে ধূমপান ও তামাকের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী যে আন্দোলন, তার বিপরীতে তামাক ও বিড়ি-সিগারেট কোম্পানিগুলোরই জয় হবে। যদি সিগারেট কোম্পানিগুলোর চাপে পড়ে সরকার শেষ পর্যন্ত এই আইনে সংশোধনী আনতে ব্যর্থ হয়, তাহলে প্রমাণ হবে যে, সরকারের কাছে তামাকজনিত রোগে বছরে ৫৭ হাজার মানুষের মৃত্যু এবং তিন লাখ ৮২ হাজার মানুষের পঙ্গুত্বের চেয়ে সাত হাজার কোটি টাকার রাজস্ব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
প্রসঙ্গত, গত ১৯ ডিসেম্বর ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) সংশোধনী আইনটি ক্যাবিনেট বৈঠকের কার্যসূচিতে ছিল। কিন্তু ওইদিন বিলটি নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। আমরা জানতে পেরেছি, এর আগের দিন ১৮ ডিসেম্বর একটি বৃহৎ সিগারেট কোম্পানির প্রতিনিধি দল অর্থমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে একটি চিঠি দেয়। ওই চিঠিতে তারা দাবি করে, আইনে যে সংশোধনীগুলো আনার প্রস্তাব করা হয়েছে, তা পাস হলে সরকারের রাজস্ব কমে যাবে এবং দেশের অর্থনীতিতে এর বিরূপ প্রভাব পড়বে।
এবার দেখা যাক বিদ্যমান আইনের কোন জায়গাগুলোয় সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে। বিদ্যমান আইনে তামাকজাত দ্রব্য বলতে বোঝানো হয়েছে কেবল তামাক থেকে তৈরি কোনো দ্রব্য, যা ধূমপানের মাধ্যমে শ্বাসের সঙ্গে টেনে নেওয়া যায়, যেমন_ বিড়ি, সিগারেট, চুরুট, সিগার ও পাইপে ব্যবহার্য মিশ্রণ (মিক্সার)। কিন্তু আইনের সংশোধনীতে ধোঁয়াবিহীন তামাকজাত দ্রব্য, যেগুলো চুষে বা চিবিয়ে গ্রহণ করা হয় যেমন_ গুল, জর্দা, সাদাপাতা, খৈনি ইত্যাদিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
বিদ্যমান আইনে তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ হলেও এর ফাঁক গলিয়ে হামেশাই বিড়ি-সিগারেটের বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে। কিন্তু প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এমন বিধান রাখা হয়েছে যে, কোনো ফন্দি-ফিকিরেই আর তামাকজাত পণ্যের বিজ্ঞাপন দেওয়া সম্ভব হবে না। বিদ্যমান আইনে ধূমপান এলাকা বা স্মোকিং জোনের সুযোগ রাখা হলেও প্রস্তাবিত সংশোধনীতে এই ধারাটিই বিলুপ্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ স্মোকিং জোন বলে কিছু থাকবে না। সবচেয়ে বড় যে সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে তা হলো ছবিসহ সতর্কবাণী। বিদ্যমান আইনে কেবল তামাকজাত দ্রব্যের গায়ে 'ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর'_ এ জাতীয় সতর্কবাণী লেখার কথা বলা হলেও প্রস্তাবিত সংশোধনীতে বলা হয়েছে, কেবল সতর্কবাণী নয়, বরং ছবিসহ সতর্কবাণী থাকতে হবে এবং তামাকজাত দ্রব্যের প্যাকেট, মোড়ক, কার্টন ও কৌটার উভয় পাশের উপরিভাগে এবং মূল প্রদর্শনী তলের কমপক্ষে ৫০ ভাগ জায়গাজুড়ে এই সতর্কবাণী থাকবে। এ রকম আরও বেশ কিছু সংশোধনীর প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু সিগারেট কোম্পানিগুলো জানে যে, এই সংশোধনীগুলো পাস হলে হুট করে তাদের পণ্যের বিক্রি কমে না গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব পড়বে। সেটা বুঝতে পেরেই তারা এখন এই আইন যাতে সংশোধনী আকারে পাস না হয়, সেজন্য উঠেপড়ে লেগেছে।
এখানে পাঠককে মনে করিয়ে দিই, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার উদ্যোগে ২০০৩ সালে তামাক নিয়ন্ত্রণ বিষয়ে 'ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশন অন টোব্যাকো কন্ট্রোল (এফসিটিসি)' নামে যে আন্তর্জাতিক চুক্তিটি প্রণীত হয়, তাতে সর্বপ্রথম স্বাক্ষরকারী দেশ বাংলাদেশ। এখন পর্যন্ত বিশ্বের ১৭৩টি দেশ এফসিটিসির পক্ষভুক্ত হয়েছে। সে হিসেবে আমাদের দেশে যে ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইন আছে, সেটি এফসিটিসির আলোকেই যুগোপযোগী করা আমাদের সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। কিন্তু আমরা দেখছি উল্টো চিত্র।
সিগারেট কোম্পানিটি অর্থমন্ত্রীকে যে চিঠি দিয়েছে, সেখানে তারা বলেছে, যদি এফসিটিসির আলোকে তামাকপণ্যের ওপর কর আরোপ করা হয়, তাহলে এটি রাজস্ব বিভাগের স্বাধীনতা খর্ব করবে এবং রাজস্ব বিভাগের কর্তৃত্বের ওপর হস্তক্ষেপের শামিল হবে। চিঠিতে বলা হয়েছে, যদি তামাকের ওপর কর নীতিমালা সঠিকভাবে করা না হয়, তাহলে দেশের রাজস্বের ওপর আঘাত আসবে। চিঠিতে বলা হয়েছে, কৃষি খাতে তামাকচাষিদের জন্য ভর্তুকি ও ঋণ দেওয়া যাবে না বলে সরকার যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা ন্যায়সঙ্গত হবে না। কারণ তামাক চাষ করে যেসব কৃষক জীবিকা নির্বাহ করে, তাদের জীবন হুমকির মুখে পড়বে। তাছাড়া আইনে যেসব সংশোধনীর কথা বলা হয়েছে, সেগুলো পাস হলে বিড়ি-সিগারেট কোম্পানির কথিত লক্ষ্য লক্ষ শ্রমিকের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
দোকানে তামাকজাত দ্রব্যের প্রদর্শন করা যাবে না বলে আইনে সংশোধনীর কথা বলা হলেও সিগারেট কোম্পানির দাবি, যদি এ রকম বিজ্ঞাপনের সুযোগ দেওয়া না হয় তাহলে বিভিন্ন রকম নকল তামাকপণ্য বাজারে আসবে। এতে সরকারের রাজস্ব কমে যাবে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে ধূমপান নির্দিষ্টকরণ এলাকা বা স্মোকিং জোন তুলে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু সিগারেট কোম্পানি দাবি করেছে, নির্দিষ্ট জায়গায় অর্থাৎ স্মোকিং জোনে ধূমপান করা ধূমপায়ীদের অধিকার। সে ক্ষেত্রে স্মোকিং জোন কেমন হবে, সে বিষয়ে আইনে ব্যাখ্যা থাকতে পারে বলে ওই চিঠিতে বলা হয়েছে।
সিগারেট কোম্পানির এই চিঠির উপরে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত যে নোট দিয়েছেন, সেখানে তিনি বিষয়টি জরুরি পরীক্ষা করে পেশ করার নির্দেশ দেন এবং কার উদ্যোগে এই সংশোধনী আনা হচ্ছে তা রাজস্ব বোর্ডের কাছে জানতে চান। আমরা এখনও জানি না রাজস্ব বোর্ড এ বিষয়ে তাদের ব্যাখ্যা দিয়েছে কি-না। তবে এটুকু বলা যায় যে, সিগারেট কোম্পানিগুলো তাদের ব্যবসার স্বার্থে যত যুক্তিই তুলে ধরুক না কেন, জনস্বাস্থ্য বিবেচনায় ধূমপান ও তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে সংশোধনী আনা এখন সময়ের দাবি।
সবশেষে দুটি প্রশ্ন রাখতে চাই। প্রথম প্রশ্ন_ যে ব্যক্তিরা তামাক নিয়ন্ত্রণ আইনে প্রয়োজনীয় সংশোধনী আনার জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করলেন, তারা দেশের বিদ্যমান বাস্তবতা এবং আন্তর্জাতিক মান মাথায় রেখেই কাজটি করেছেন। সে ক্ষেত্রে যদি এই সংশোধনী পাস না হয় তাহলে ধরে নিতে হবে, এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে সরকারি-বেসরকারি পর্যায় থেকে যেসব ব্যক্তি জড়িত ছিলেন, তারা সবাই ভুল করেছেন। তাছাড়া একটি সিগারেট কোম্পানি, সেটি যত শক্তিশালীই হোক না কেন, তারা সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম এবং আইন-কানুন মেনে চলতে বাধ্য। সে হিসেবে দ্বিতীয় প্রশ্ন হলো, অর্থমন্ত্রী বা সরকারের কথায় সিগারেট কোম্পানি চলবে নাকি কোম্পানির কথায় সরকার চলবে?

আমীন আল রশীদ : সাংবাদিক
aminalrasheed@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.