মাদকাসক্তি-প্রয়োজন অভিন্ন চিকিৎসা নীতিমালা by আহমেদ হেলাল

২৬ জুন মাদকদ্রব্যের অপব্যবহার ও অবৈধ পাচারবিরোধী আন্তর্জাতিক দিবস। জাতিসংঘের মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রক দপ্তর (ইউনাইটেড ন্যাশনস অফিস অন ড্রাগস অ্যান্ড ক্রাইম) ১৯৮৭ সাল থেকে দিনটিকে পালন করে আসছে।
‘মাদক নয়, স্বাস্থ্যের কথা ভাবুন’—এই মূল ভাবনা নিয়ে ২০১০ সালে শুরু হওয়া মাদকবিরোধী প্রচারণা চলছে বিশ্বব্যাপী।

প্রচারণায় বলা হচ্ছে, ড্রাগ ইজ দ্য পারফেক্ট কিলার অব দ্য সোসাইটি (মাদক হচ্ছে সমাজের প্রকৃত ঘাতক)। পৃথিবীর সর্বত্র মাদক তার ভয়াবহ থাবা বিস্তার করে সমাজকে তলিয়ে দিচ্ছে অন্ধকারের দিকে। এ বছরের প্রতিপাদ্য হচ্ছে গ্লোবাল অ্যাকশন ফর হেলদি কমিউনিটিস উইথআউট ড্রাগ (মাদকমুক্ত স্বাস্থ্যবান সমাজের জন্য বিশ্বব্যাপী কর্মসূচি)।
আর এর জন্য পরিবার, বিদ্যায়তন এবং সামাজিক কাঠামো সুসংহত করার দিকে অধিকতর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হচ্ছে। বাংলাদেশে সম্প্রতি ঘটে যাওয়া বেশ কিছু হত্যা-নৃশংসতার সঙ্গে মাদকাসক্তির যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া গেছে। এক সরকারি হিসাবমতে, বাংলাদেশে মোট মাদকাসক্তের সংখ্যা ৪৬ লাখেরও বেশি। বেসরকারি সূত্রমতে এ সংখ্যা ৭০ লাখের কাছাকাছি। এদের মধ্যে প্রায় ৯১ শতাংশ কিশোর ও যুবক। অন্যদিকে নারী মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় দেড় লাখ। এটি কিন্তু প্রায় পাঁচ বছর আগের হিসাব। বর্তমানে এ সংখ্যা আরও অনেক বেশি।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে ১৮ বছরের ওপরে ০.৬৩ শতাংশ মানুষ মাদকাসক্ত। হাসপাতাল ও পুনর্বাসনকেন্দ্রগুলোর তথ্য অনুযায়ী, ১৮ বছরের নিচে যাদের বয়স, তাদের মধ্যে এ হার আরও বেশি। কেন মানুষ মাদক গ্রহণ করে—তরুণেরাই বা কেন বেশি আসক্ত হয়, এ নিয়ে বিশ্বব্যাপী গবেষণা হয়েছে বিস্তর, এখনো হচ্ছে। মাদকাসক্তির কারণ হিসেবে দৈহিক, মানসিক ও সামাজিক—এই তিন ধরনের কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে। আর তাই মাদকাসক্তির চিকিৎসা ও প্রতিরোধেও তিনটি ক্ষেত্রকে সমান গুরুত্ব দেওয়ার কথা নির্দেশিত হয়েছে।
যক্ষ্মা বা ম্যালেরিয়ার চেয়ে মাদকাসক্তি কোনো অংশেই কম ভয়াবহ নয়। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় এই মাদকাসক্তি নিয়ে নেই কোনো অভিন্ন জাতীয় চিকিৎসা নীতিমালা বা ন্যাশনাল গাইডলাইন। আর এই নীতিমালা না থাকার সুযোগ নিচ্ছে বিভিন্ন কথিত পুনর্বাসন সংস্থা এমনকি অপচিকিৎসকেরা। কারও কারও প্রচারণায় দেখা যায়, কেবল ‘আধ্যাত্মিক’ প্রক্রিয়ায় তারা মাদকাসক্তি নির্মূল করছে, কেউ বা কেবল ‘ব্যায়াম’ দিয়ে সারিয়ে তুলছে মাদকাসক্তির মতো একটি রোগকে। আবার কোনো কোনো মহল মাদকাসক্তিকে রোগ বলতে নারাজ। যদিও আমেরিকান সোসাইটি অব সাইকিয়াট্রিক মেডিসিন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা প্রকাশিত ইন্টারন্যাশনাল ক্লাসিফিকেশন অব ডিজিজ ও বিশ্বের চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা মাদকাসক্তিকে নির্দেশিত করেছেন ‘ক্রনিক রিলান্সিং ব্রেইন ডিজিজ’ অর্থাৎ ‘দীর্ঘমেয়াদি এবং বারবার হতে পারে এমন একটি মস্তিষ্কের রোগ’ হিসেবে।
এই ‘মাদকাসক্তি কোনো রোগ নয়’ যারা বলে তারা প্রচলিত বিজ্ঞানসম্মত চিকিৎসার বিপরীতে ‘এসো নিজেরা করি’ ধাঁচের চিকিৎসাপদ্ধতি আবিষ্কার করেছে এবং এক অর্থে প্রতারণামূলক বাণিজ্য করছে। তাদের মধ্যে অনেকেই ছিল আগে মাদকসেবী। ফলে মাদকসেবনকে কোনো রোগ হিসেবে স্বীকার করার প্রবণতা তাদের মধ্যে থাকে না। তারা মাদকাসক্তিকে রোগ না বলে সমাজ, পরিবার ও সঙ্গকে দায়ী করে একধরনের আত্মতৃপ্তিতে তুষ্ট থাকে।
মাদকাসক্তির চিকিৎসা ও প্রতিরোধে অবধারিতভাবে দৈহিক-মানসিক-সামাজিক সব ক্ষেত্রের সমন্বয় প্রয়োজন। সেখানে কোনো কোনো ক্ষেত্রে দেখা যায়, কেবল ‘ওষুধভিত্তিক’ দৈহিক চিকিৎসা করে অথবা ওষুধ বাদ দিয়ে কেবল ‘কাউন্সেলিং’ দিয়ে মাদকাসক্তির খণ্ডিত চিকিৎসা করা হচ্ছে। ফলে পুনরায় আসক্ত হওয়ার আশঙ্কা বেড়েই যাচ্ছে। অভিভাবকেরা চান দ্রুত নিরাময়, কিন্তু মনে রাখতে হবে, মাদকাসক্তি নিরাময়ে সংক্ষিপ্ত পথের কোনো সুযোগ নেই। ডিটক্সিফিকেশন, উইথড্রয়াল লক্ষণ দূরকরণ, মটিভেশন, কাউন্সেলিং, সামাজিক ও পেশাগত পুনর্বাসন, পরবর্তীকালে পুনরাসক্ত না হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ইত্যাদি দীর্ঘমেয়াদি পথ পরিক্রম করে মাদকাসক্তির চিকিৎসা করা প্রয়োজন। আবার কোনো কোনো মাদকাসক্তি পুনর্বাসনকেন্দ্রের বিরুদ্ধে রয়েছে নানা অভিযোগ—রোগীকে শারীরিকভাবে নির্যাতন করা, মাদক সরবরাহ করা, অবৈধ ও নিষিদ্ধ ওষুধ প্রয়োগ করে চিকিৎসা করা ইত্যাদি। এসব কারণে ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও অনেক অভিভাবক তাঁর সন্তানকে চিকিৎসার আওতায় আনতে চান না। ফলে তাঁর সন্তানের জীবন হয়ে পড়ে বিপন্ন।
মাদকাসক্তি চিকিৎসার বর্তমান অবস্থা পরিবর্তন করতে একটি জাতীয় চিকিৎসা নীতিমালা প্রণয়ন করা প্রয়োজন, যার ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট সবাই অভিন্ন পদ্ধতিতে সব ক্ষেত্রকে (দৈহিক-মানসিক-সামাজিক) যথাযথ গুরুত্ব দিয়ে মাদকাসক্তির চিকিৎসা করবেন, সমাজকে বাঁচাবেন আসন্ন ধ্বংসের হাত থেকে।
ডা. আহমেদ হেলাল: মনোরোগবিদ্যা বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়।
soton73@gmail.com

No comments

Powered by Blogger.